শিশু মেলা

অঙ্গীকার

সঞ্জয় কর প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৬-২০১৮ ইং ০২:১২:০৮ | সংবাদটি ১৫৯ বার পঠিত

গ্রামে চোরের উপদ্রব বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো ঘরে চোর ঢুকছে। এ চুরি সাধারণ চুরি নয়। বিশেষ ধরনের চুরি। চোরেরা ঘরে ঢুকে কোন টাকা-পয়সা, সোনা-দানা কিছুই নিচ্ছেনা, শুধুমাত্র রান্না ঘরের খাবার যা যা পাচ্ছে, তা খেয়ে ভাতের হাঁড়িতে মলত্যাগ করে চলে যাচ্ছে, পঞ্চায়েত প্রধান গেদাব আলী সাহেবের কাছে এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি অভিযোগ এসেছে। তিনি খুব চিন্তায় আছেন।
প্রতি তিন বছর পর গ্রামের পঞ্চায়েতপ্রধান নির্বাচিত হন। নির্বাচিত ব্যক্তি গ্রামের আশয়-বিষয়, বিচার-আদালতে নেতৃত্ব দেন। গত মাসে পঞ্চায়েতপ্রধান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতি বছর সিলেকশনে নির্বাচিত হতেন পঞ্চায়েতপ্রধান। এবার হলো ইলেকশন। গেদাব আলীর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গ্রামের প্রভাবশালী রতন বাবু। নির্বাচনের দুই দিন আগে তিনি রাতের বেলা সবার অগোচরে গেদাব আলীর কক্ষে প্রবেশ করেন। কিন্তু বের হয়ে আসেন রাগে ফুসফুস করতে করতে। রতন বাবুর ধারণা, তিনি নির্বাচনে হেরে যাবেন। তাই তিনি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে গেদাব আলীকে নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। তার ধারনাই ঠিক হলো। ভোটের লড়াইয়ে হেরে গেলেন রতন বাবু।
গ্রামের চুরির ঘটনায় রতন বাবুর হাত নেই তো? পঞ্চায়েতপ্রধানের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সে এমন কাজ করাচ্ছে না তো? মনে মনে ভাবেন গেদাব আলী।
গেদাব আলীর বিরাট বাড়ি। তিন তলা বিল্ডিং। বাড়ির ভিতরে বিভিন্ন ধরনের ফল গাছ। সুন্দর একটি ফুলের বাগান। বাগানে প্রতি রাতেই ফুলপরীরা আনাগোনা করে। পরীদের পরশে সকাল বেলা ফুলের সুবাসে মুখরিত হয় চতুর্দিক। বাড়ির এক কোণে শান বাঁধানো পুকুরঘাট। পুকুরের টলমলে জলে মাছেরা সাঁতার কাটে। সামান্য আওয়াজ পেলেই মাছগুলো ডুবে যায় পুকুরের অতল গহীনে। এত্তো বড় বাড়িতে মানুষ থাকেন মাত্র চারজন। গেদাব আলী তার স্ত্রী, শালা ও ছোট ভাই নুরু পাগলা।
নুরু পাগলা হিসাবের বাহিরে বললেই চলে। সে কখনোই ঘরে থাকেনা। রাতের বেলা কখনো বারান্দায়, কখনো উঠানের ঘাসে, কখনোবা পুকুরের পারে শুয়ে পড়ে। আর দিনের বেলা টইটই করে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কারো সাথে কোন কথা বলে না। মনে মনে কী যেন ভাবে।
নিজের বাড়িতে কোন খাবার খায়না নুরু পাগলা। খিদে পেলে গ্রামের বাজারের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে হাত পাতে। কেউ একটা পঁচা কলা, কেউবা পোড়া রুটি ধরিয়ে বিদায় করে। গেদাব আলী সাহেব যদিও গ্রামের বাজারের দোকানদারদের বলে রেখেছেন ‘আমার ভাই নুরু পাগলা যা চায়, তা আপনারা দিবেন, টাকা-পয়সা আমি দেব’। কিন্তু দোকানদাররা নুরু পাগলাকে চাহিদামত খাবার দেন না। কারণ পঞ্চায়েতপ্রধানের কাছে তারা টাকা-পয়সা চাইতে পারবেন না।
নুরু পাগলা দীর্ঘদিন পাগলাগারোদে ছিল। কিছুটা সুস্থ হওয়ায় আদরের ভাইকে বাড়িতে নিয়ে আসেন গেদাব আলী।
গ্রামে একের পর এক চুরি হচ্ছে। গেদাব আলী সাহেব অতিষ্ট হয়ে গ্রামের যুবকদের দিয়ে কয়েকটি দল গঠন করে রাতের বেলা পাহারার ব্যবস্থা করলেন।
একটু আগেই ফজরের আযান হয়েছে। আযান শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় গেদাব আলীর। চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় উঠে বসেন তিনি। দরজার দিকে তাকিয়েই চমকে ওঠেন গেদাব আলী। কী আশ্চর্য, দরজা খোলা কেন? চোর আসেনি তো! মনে মনে ভাবেন তিনি।
চারদিকে তাকিয়ে দেখে নেন ঘরের সব জিনিসপত্র ঠিক আছে কিনা। সব ঠিক আছে, শুধু সুমন বিছানায় নেই দেখে গেদাব আলী বারান্দায় বের হন। বাহিরে হিমেল হাওয়া বইছে। রাতের আঁধার এখনো কাটেনি। বাড়ির উঠানে পায়চারি করছে সুমন। কিছুক্ষণ পর পর দাঁড়িয়ে লম্বা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। বরই গাছে ঢিল ছুড়ছে। বেশ কয়েকটি পাখি গাছের ডালে উঠছে আবার মাটিতে নামছে। সুমন পাখিগুলো ধরার বৃথা চেষ্টা করছে। কখনোবা গাছের সবুজ পাতার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। পাতা ছিড়ে নিখোঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গতরাতে সুমন জেলখানা থেকে বাড়ি ফিরেছে সেজন্য গেদাব আলীর কী আনন্দ! অনেকদিন পর তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছেন। কিন্তু সুমনের মা আশিকা বেগমের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। রাগে ফুস ফুস করছেন। তিনি চান না সুমন বাড়িতে থাকুক। আশিকা বেগম গেদাব আলীর ২য় স্ত্রী, সুমনের সৎমা। সুমনের মা মারা যাওয়ার পর গেদাব আলী আশিকা বেগমকে বিয়ে করেছেন। নামাজের সময় চলে যাচ্ছে। গেদাব আলী সুমনের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। সুমন বলে ‘ঐ ইট পাথরের জেলখানা থেকে গ্রামের কুঁড়ে ঘরই অনেক ভালো বাবা। জানো বাবা, অনেকদিন এ রকম কাক ডাকা ভোর দেখিনি, পাখিদের সুমধুর ডাক শুনিনি, প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নিতে পারিনি। গেদাব আলী ছেলেকে শান্ত¦না দিয়ে বলেন ‘তোমাকে আর জেলখানায় যেতে হবেনা বাবা।’
সুমনের মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিলনা। হাত তুলে মসজিদের দিকে ইঙ্গিত করে সে। বাপ-ছেলে দু’জনেই হাত ধরাধরি করে নামাজ পড়তে যান।
গেদাব আলী ১ম বিয়ে করেন ঢাকা শহরে। ঢাকা শহরে তার শ্বশুরালয়ে তিনি খুব কমই যেতেন। কখনোবা শ্বশুর বাড়িতে গেলে কোনভাবে একরাত থেকেই চলে আসতেন। কারণ এ বাড়িকে তার জেলখানার মত মনে হতো। একটি বাড়ির সাথে আরেকটি বাড়ি, এক বিন্দুও ফাঁক নেই। বাড়িতে উঠোন নেই, গাছপালা নেই, ছোট ছোট অন্ধকার কক্ষ। তিনি যেন নিঃশ্বাস নিতে পারতেন না। তাই তিনি তার ১ম শ্বশুর বাড়িকে এখনো পর্যন্ত জেলখানাই বলেন। সুমনের সৎ মা চাইতেন সুমন সেখানেই থাকুক।
আশিকা বেগমের পীড়াপীড়িতে গেদাব আলী বাধ্য হয়েছিলেন ছেলেকে ইট পাথরের জেলখানায় পাঠাতে। সুমনের বয়স তখন ছিল মাত্র ৯ বছর। তার মামা তাকে শহরে প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। মামা-মামি দু’জনেই সকালে অফিসে চলে যেতেন। মামা অফিসে যাবার সময় সুমনকে স্কুলে দিয়ে যেতেন। স্কুল থেকে তাকে নিয়ে আসতো কাজের বুয়া। তারপর সারাদিন গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হতো তাকে। বুয়া বারান্দার গ্রীলে তালা দিয়ে রাখতো। খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ছটফট করতো সুমন। ঘর থেকে বের হওয়ার কোন উপায় ছিলনা। এক সময় মামা বাড়ীকে সুমনেরও ইট পাথরের জেলখানা মনে হচ্ছিল। গাঁয়ের মুক্ত বাতাস, খোলা মাঠ, উদাস দুপুর, পড়ন্ত বিকেল, রাখালের বাঁশির সুর ক্রমাগত হাতছানি দিচ্ছিল তাকে।
এতক্ষণে নামাজ শেষ হয়ে গেছে। আঁধার কেটে গেছে। পূব আকাশে উকি দিচ্ছে লাল সূর্য। বাপ-ছেলে প্রশান্ত মনে বাড়ি ফিরলেন। আশিকা বেগম মন খারাপ করে বিছানায় বসে আছেন। গেদাব আলীকে হাত ধরে বিছানায় বসালেন এবং ছেলেকে কুলে নিয়ে বললেন ‘বাবা আমি চেয়েছিলাম তুমি শহরের নামি-দামী স্কুলে পড়, মানুষের মতো মানুষ হও। তোমার বাবা জানেন যে, ডাক্তার বলেছেন আমি কোনদিন সন্তানের মা হতে পারবোনা। তোমাকে নিয়েই আমাদের স্বপ্ন। তুমি লেখাপড়া করে বড় চাকরী করবে। এজন্য আমি তোমার বাবার কথা উপেক্ষা করে, বুকে পাথর বেঁেধ শহরে পাঠিয়েছিলাম তোমাকে।’
আশিকা বেগমের চোখ দিয়ে অঝর ধারায় জল পড়ছে। গেদাব আলী স্ত্রীর পিঠে হাত রেখে বলেন ‘আমি সবই বুঝি আশিকা। কিন্তু আমার একমাত্র ছেলে সুমন। সে চোখের আড়াল হলে আমার বড় কষ্ট হয়। তবে আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি হাইস্কুলের পড়া শেষ হলে আমি সুমনকে শহরের ভাল কলেজে ভর্তি করব।’
এবার গেদাব আলী ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন ‘তুমি কি মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না?’ সুমন বাবার কথা শুনে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় এবং মায়ের হাতে হাত রেখে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করে।
বাহিরে কোলাহল শুনে গেদাব আলী বারান্দায় বের হয়ে চমকে ওঠেন। পাহারাদার যুবকেরা নুরু পাগলাকে দুই হাতে ধরে বারান্দার দিকে আসছে। গেদাব আলী এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করেন এবং মনে মনে ভাবেন ছোটবেলা নুরু পাগলা যখন সুস্থ ছিল, তখন ঘরে ভাল কিছু রান্না হলে সে পেট পুরে খেত। আর খাওয়া থেকে ওঠা মাত্রই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে টয়লেটে যেতে হতো তাকে। বেশ মনে আছে গেদাব আলীর। হিসেব মিলে যায় তার। তাহলে নুরু পাগলাই চুরির ঘটনার সাথে জড়িত!
নুরু পাগলাকে নিয়ে গেদাব আলীর সামনে দাঁড়ায় যুবকেরা। রাগে ও লজ্জায় গেদাব আলীর মুখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বড় বড় চোখে নুরু পাগলার দিকে তাকান। নুরু পাগলা মুচকি হাসে। কেউ কিছু বলার আগেই গেদাব আলী নুরু পাগলাকে ধমক দেন। যত জোরে ধমক দেন, তত জোরেই হেসে ওঠে নুরু পাগলা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT