ধর্ম ও জীবন

অপচয় প্রতিরোধে ইসলাম

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০১৮ ইং ০২:২১:৪১ | সংবাদটি ১১৬ বার পঠিত

অপচয় মানে বেহুদা খরচ করা, অপব্যয় করা, ক্ষতি করা, বাড়াবাড়ি করা, সীমালঙ্ঘন করা। অপচয়ের মাধ্যমে ধন-সম্পদের ক্ষয় হয়, অভাব বৃদ্ধি পায়, অপচয়ের মাধ্যমে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। কবির ভাষায়Ñ ‘যেজন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি/ আশু গৃহে তার দেখিবেনা আর নিশীথে প্রদীপ বাতি।’ ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে- ডধংঃব হড়ঃ ধিহঃ হড়ঃ অর্থাৎ অপচয় করো না, অভাবে পড়ো না। ঘুম থেকে উঠে রাতে নিদ্রা যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই অপচয়ের ছড়াছড়ি। আমরা অনেকে অপচয়ের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি। এই অপচয়ের কারণে ব্যক্তি উন্নয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পর্যন্ত চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপচয়-অপব্যয় জাতীয় উন্নয়নের অন্তরায়। পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অপচয়, খাদ্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে অপচয়, সম্পদ তৈজসপত্রের অপচয়, বিবাহ-শাদীর ক্ষেত্রে অপচয়, সময়ের অপচয়, কথাবার্তার অপচয়, সরকারি অফিস আদালতে অপচয়, কুসংস্কারমূলক অপচয়, গান-বাজনা ও খেলাধুলায় অপচয়, সর্বশেষে ওজু-গোসলের পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অচয়। মোটকথা, অপচয় আর অপচয় সর্বত্রই অপচয়। অপচয় যেমন ব্যক্তির জন্য কল্যাণের নয় তেমনি জাতির জন্যও কল্যাণকর নয়। এজন্য সর্বদা অপচয় করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘আহার কর, পান কর কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
একজন মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ সে যখন ব্যয় করে তখন সে অপচয় করে না, কার্পণ্যও করে নাÑ সে এ ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না কার্পণ্যও করে না; বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়।’ (সূরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)
একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ সে প্রয়োজন মোতাবিক ব্যয় করে অর্থাৎ যেখানে যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই ব্যয় করে তাতে কমবেশি করে না। ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের পরিচয়। রাসূলেপাক (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেনÑ ‘কোনো ব্যক্তির ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা তার বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।’ (আহমদ)
অন্য একখানা হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘যে ব্যক্তি ব্যায়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে সে কখনও ফকির হয় না।’ (আহমদ)
সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে যে সব অপচয় করা হয় তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় করার কথা আসলে প্রথমেই বিবাহ-শাদীর কথা এসে যায়। বিয়েতে বর ও কনের বাড়িতে আলোকসজ্জিত গেইট, গায়ে হলুদ, ভিডিও, নাচ-গানের আয়োজন এতে লক্ষ লক্ষ টাকার অপচয় করা হয়। বিশেষ করে বিবাহ অনুষ্ঠান, বৌভাত অনুষ্ঠানে খাদ্য-পানীয়ের যে অপচয় হয় তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। বিবাহ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। আর ঐ বিবাহ বরকতপূর্ণ বিবাহ যাতে কম খরচ হয়, কষ্ট কম হয়। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘যে বিবাহে কম খরচ হয় এবং কষ্ট কম হয় সে বিবাহই অধিক বরতকপূর্ণ বিবাহ।’ (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা : ২৬৮)
অযথা সময় ব্যয় করা আমাদের অনেকের অভ্যাস। প্রত্যেক কাজের জন্য যেমন আল্লাহর দরবারে আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে তেমনি প্রত্যেকটি মুহূর্ত আমরা কোনো কাজের মধ্যে ব্যয় করেছি সেই সময়টুকুও আমাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুলেপাক (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘পাঁচটি বিষয়কে তার বিপরীত পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে গণিমত বা মূল্যবান মনে করÑ ১) বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে। ২) অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। ৩) ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে। ৪) দরিদ্র হওয়ার পূর্বে সম্পদশালী অবস্থাকে। ৫) মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।’ আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকেই গুরুত্ব দিতে হবে, প্রতিটি মুহূর্তকে এমনভাবে অতিবাহিত করতে হবে যাতে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়। কোনোক্রমেই সময়ের অপচয় করা যাবে না। অযথা বা বেহুদা কথাবার্তা বলে আমরা অনেক মারাত্মক গুনাহ করে থাকি। আমরা কথাবার্তার বা বক্তব্যেরও অপচয় করে থাকি। হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ (অযথা কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে) নিরবতার উপর কায়েম থাকা ষাট বছরের নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম’ (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ; ৪১৪)
কথাবার্তার অপচয় করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আমরা ওজু করার সময়ও পানির অপচয় করে থাকি। এটা মোটেই কাম্য নয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেনÑ একদিন নবী (সা.) হযরত সা’দ (রা.) এর ওজু করার সময় তাকে অতিক্রম করলেন। নবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন হে সা’দ! ওজুতে এটা কি ধরনের অপচয়? হযরত সা’দ (রা.) আরজ করলেনÑ হে আল্লাহর রাসুল! ওজুতেও কি অপচয় হয়? নবী (সা.) জবাবে বললেনÑ হ্যাঁ। ওজুর মধ্যেও অপচয় হয়ে থাকে, যদিও তুমি প্রবাহিত নদীর উপর ওজু কর। (আহমদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা : ৪৭)
অপচয়কারীকে পবিত্র কুরআনে ‘শয়তানের ভাই’ বলা হয়েছে। (সূরা : বনী ইসরাঈল, আয়াত : ২৭)
তাই অপচয় করা থেকে বিরত থাকা আমাদের সকলের উচিত।

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT