ধর্ম ও জীবন

মক্কা বিজয় ও দশ মক্কান বধ

ডা. এম সোলায়মান খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৬-২০১৮ ইং ০২:২২:২৯ | সংবাদটি ৬০৪ বার পঠিত

ইবনে সাদ (৭৮৪-৮৪৫ খ্রি.) তার ‘কিতাব আল তাবাক্কাত আল কবীরে’ (ভলিউম-২, পৃষ্ঠা-১৬৮) লিখেছেন ‘অষ্টম হিজরীর রমজান মাসে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ১০ জনের একটি কালো তালিকা করা হয়’। ছয় পুরুষ এবং চার মহিলার এই তালিকা পশ্চিমে টেন মক্কান কিলিং বা ‘দশ মক্কান জবাই’ বলে আফসোস করা হয়।
মক্কা বিজয়ের স্ট্র্যাটেজি ছিল অস্ত্র নয়, রক্তাক্ত প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা, উদারতার মাধ্যমে শত্রুকে জয় করা। রাসুল (সা) মক্কায় ১৩ বছর প্যাগান কোরাইশদের অত্যাচার, অপমান, ঠাট্টা , মশকরা , বয়কট মোকাবেলা করে মদিনায় হিজরত করেন। সাত বছর তিন মাস সাতাশ দিন পর রাসুল (সা.) বিজয়ী বেশে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কার সকল জনগণের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করেন। বিজয়ী বীর ২০ বছর পুরোনো নির্দয় শত্রুর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে , এমন নজীর বিশ্ব ইতিহাসে নেই। এটা ইতিহাসের একমাত্র রক্তপাতহীন বিজয়।
‘মক্কা বিজয় বিনা রক্তপাতে হয়েছিল’ (কারেন আর্মস্ট্রং, মুহাম্মদ, পৃ-২৭৯) । ‘সেদিন দেখানো মহানুভবতা পরিণত হয়েছিল দ্বিতীয় বিজয়ে’ (বার্নাবী রজারসন, প্রফেট মুহাম্মদ, পৃ-১৮৩)। ‘যারা দীর্ঘ দিন মুহাম্মদকে ঘৃণা করেছে, প্রত্যাখান করেছে তাদের প্রতি তিনি যে মহানুভবতা, উদারতা দেখিয়েছেন তা তুলনাহীন’ (উইলিয়াম ম্যুর, লাইফ অব মুহম্মদ, পৃ-৩৯৮)।
রাসুল (সা.) মক্কার জনগণের জন্যে তিনস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ১. যে আবু সুফিয়ানের গৃহে থাকবে সে নিরাপদ। ২. যে তার ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে সে নিরাপদ। ৩. যে মসজিদুল হারাম এলাকায় থাকবে, সে নিরাপদ। (মুসলিম-হা/৪৩৯৬)।
আবু সুফিয়ান যখন এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রচার করছিলেন তখন তার স্ত্রী হিন্দা বিন্তে উতবা ক্ষিপ্ত হয়ে তার দাড়ি ধরে উপস্থিত জনতাকে বলেন ‘এই চর্বির বস্তাকে খতম করে দাও, বেটা কা-পুরুষ, জনগণের নিকৃষ্ট রক্ষক’ (আলফ্রেড গীয়োম, মুহম্মদ, পৃ- ৫৪৮, লেসলি হেজেলটন, দি ফার্স্ট মুসলিম, পৃ-২৫২)।
রাসুল (সা.) কাবার প্যাগান মূর্তিগুলি অপসারণকালে পাঠ করেন ‘সত্য এসে গেছে। মিথ্যা দূরীভূত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা দূরীভূত হয়েই থাকে’ (আল কুরআন ১৭ : ৮১, বুখারী-হা/৪২৮৭)। কোরাইশদেরকে বলেন ‘আমি তোমাদের সেই কথাই বলব যা ইউসুফ তার ভাইদেরকে বলেছিলেন (ইবনে হিশাম-২/৪১২)। পাঠ করলেন ‘তোমাদের প্রতি আজ কোন অভিযোগ নেই ‘(সুরা ইউসুফ, আয়াত-৯২)। যাও তোমরা সবাই মুক্ত , স্বাধীন ( আলফ্রেড গীয়োম , মুহম্মদ, পৃ - ৫৫৩)। এই কয়েকটা শব্দ গোটা আরব এবং বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছিল।
ইবনে সাদের কালো তালিকার দশজনের পরিচয় এবং পরিণতিÑ (১) ইকরামা ইবনে আবু জেহেল ঘোরতর শত্রু আবু জেহেলের পুত্র দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ইকরামা মক্কা বিজয়ের দিনসহ বদর, ওহুদ, খন্দক যুদ্ধে রাসুল (সা) এর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। পরাজিত ইকরামা গা ঢাকা দেন। ক্ষমা ঘোষণার সংবাদ পেয়ে হাজির হলে রাসূল (সা) বলেন ‘মুহাজির আরোহীকে স্বাগতম’ (তিরমিযি-হা/২৭৩৫)। এখানে মুহাজির অর্থ কুফরী থেকে ইসলামে হিজরতকারী। রাসুল (সা) তাকে ক্ষমা করেন এবং তার প্রয়াত পিতাকে কটু কথা বলতে নিষেধ করেন।
(২) হাব্বার ইবনে আসওয়াদ : হিজরতের সময় নবী কন্যা যায়নাব (রা) কে বর্ষা দিয়ে আঘাত করেন। যায়নাব (রা) গর্ভবতী ছিলেন। আঘাতের ফলে তার গর্ভপাত হয়ে যায়। গর্ভপাত জনিত জটিলতায় তিনি ইন্তেকাল করেন। হাব্বার ক্ষমা চাইলে রাসূল (সা) তার আদরের কন্যার খুনীকে নিমিষে ক্ষমা করে দেন (আর-রাহীক্ক, পৃ-৪৬৬-৪৬৭)। আবু লাহাবের পুত্র উৎবা (রা.) নবী কন্যা রোকাইয়া (রা.) কে তালাক দিয়েছিলেন। তিনিও ক্ষমা পান ( মার্টিন লিংগ্স , পৃ- ৪৪১ )। এখানে আক্রমন ছিল নির্মম। অপরাধ ছিল জঘন্য। আঘাত ছিল ব্যক্তিগত। কিন্তু ক্ষমা ছিল তাৎক্ষণিক।
(৩) আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ : ওহি লেখক ছিলেন। মুরতাদ হয়ে কুরআনকে বুজরকি বলে প্রত্যাখান করেন। কোরাইশরা তার গল্পকে পুঁজি করে নোংরা, কুৎসিত প্রচারণা চালায়। ওসমান (রা) এর সহায়তায় ক্ষমা চাইলে রাসুল (সা.) ক্ষমা করে দেন (হাসনাঈন হাইকেল, মুহম্মদ , পৃ-৪১০)।
(৪) মিক্কাইছ ইবনে সাবাবাহ : তার ভাই হিসাম একজন সাহাবীর অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় নিহত হন। মিক্কাইছ ফয়সালার মাধ্যমে সন্তোষ্ট হয়ে ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করে ঐ সাহাবীকে হত্যা করে মক্কায় পালিয়ে যান। এই পলাতক খুনি সাজা পায় ( ইবনে হিশাম - ৪/৬৫, ইফা)।
(৫) হুয়াইরিস বিন নুক্কাইদ : তিনি নবী কন্যা ফাতেমা (রা) ও কুলসুমা (রা) কে হিজরতের সময় তীর নিক্ষেপ করে গুরুতর আহত করেন। ক্ষমা চাননি । তাকে সাজা দেয়া হয়।
(৬) আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল : তিনি ছিলেন যাকাত আদায়কারী। তার সহকারীকে হত্যা করে যাকাতের মালামাল চুরি করে মক্কায় পালিয়ে যান । ফেরারী খুনি খাতাল সাজা পায় (আলফ্রেড গীয়োম, পৃ-৫৫০-৫৫১)। (৭) হিন্দা বিন্তে উৎবা : রণচন্ডী হিন্দা ওহুদ যুদ্ধে হামজা (রা) এর লাশ বিকৃত করেন। তীব্র বিদ্রোপাত্মক কবিতা রচনায় পারদর্শী হিন্দা ছিলেন কোরাইশদের প্রধান প্রপাগান্ডা মেশিন । ‘হিন্দা ক্ষমা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা প্রাপ্ত হন।’ (লেসলি হেজেলটন, দি ফার্স্ট মুসলিম, পৃ- ২৬০)।
(৮) সারাহ : ধড়িবাজ গুপ্তচর সারাহ গোপনীয় তথ্যাদি পাচারের সময় ধৃত হন ( ইবনে হিশাম ২/৩৯৮)। রাসুল (সা.) তাকে ক্ষমা করে দেন (তাবারী-৮/১৮০, মাইকেল ফিসবেন, ইবনে হিশাম- ৪/৬৬, ইফা) ।
(৯) ফারতানা এবং (১০) কারীবাহ : এদের পরিচয় নিয়ে টানা টানি। ইবনে ইসহাক এবং তাবারী বলছেন এরা খাতালের গায়িকা (গীয়োম, পৃ-৫৫১, তাবারী-৮/১৮০)। আন নাসাই এবং আবু দাউদ বলছেন এরা মিক্কাইসের গায়িকা (আন নাসাই-হা/২৬৭৮, আবু দাউদ-হা/২৬৮৪)। এদের মরা-বাঁচার সময় নিয়েও বাদানুবাদ। ফারতানা মারা যায় বিজয়ের দিন (প্রফেট ফর অল হিউমেনিটি, পৃ-৩২৮) । কারীবাহ মারা যায় বিজয়ের দিন। (তাবারী-৮/১৮১)। জীবিত ছিল ওমরের শাসন পর্যন্ত (ইবনে ইসহাক, পৃ-৫৫১) । জীবিত ছিল ওসমানের শাসন পর্যন্ত (ইবনে হিশাম-৪/৬৬, ইফা)। উল্লেখ্য, মক্কা বিজয়ের দিন কয়েক ঘন্টার জন্যে রক্তপাত হালাল করা হয়েছিল। পরে চিরকালের জন্যে হারাম করা হয়। (বুখারী - হা/২৪৩৪)।
ইবনে সাদের কালো তালিকা পুঁজি করে জনা কয়েক তালেবর ‘দশ মক্কান জবাই’ বলে বিলাপ করেন। ফচকে বিজ্ঞান মনস্ক মাতম করেন। তারা চেপে যান, তালিকার দশজন বধ হয়নি, শুধু তিন পলাতক খুনী তাদের অপরাধের জন্যে সাজা পায়। ছয় জন ক্ষমা পায়। একজনের পরিণতি ঘোলাটে। সাজা প্রাপ্তরা ক্ষমা চায়নি। কারেন আর্মস্ট্রং বলেন ‘কালো তালিকাভুক্ত যেকেউ ক্ষমা চাইলেই তা মন্জুর হয়েছে’ (মুহম্মদ, অনুবাদ শওকত হোসেন, পৃ-২৭৮)।
আরেকটি ফালতু প্রচারণা দেদারসে চালানো হয়। ইসলাম গ্রহণ না করায় তারা সাজা পায় । বিজয়ের পর মক্কার জনগণকে ইসলাম গ্রহণে চাপ দেয়া হয়নি। ‘সোহাইল ইবনে আমর রাসুল (সা) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেননি। নিজের ইচ্ছা মত অবাধে মক্কায় চলাফেরা করেন’ (মার্টিন লিংগ্স , পৃ-৪৪২) । সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া মুসলিম হবেন কিনা, ভেবে দেখার জন্যে দুই মাস সময় চান। রাসুল (সা.) চার মাস সময় দেন। (তাবারী-৮/১৮৫, মাইকেল ফিসবেন)। সোহাইল এবং সাফওয়ান অমুসলিম অবস্থায় হুনায়েনের যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে যোগ দেন। তারা তখনও প্যাগান দেবী লাত, উজ্জা, মানাতে বিশ্বাস রাখতেন’ (মার্টিন লিংগ্স, পৃ-৪৪৪) ।
বৃটিশ ইতিহাসবিদ ডি ল্যাসি ও’ল্যারী (১৮৭২-১৯৫৭) বলেন ‘বিজয়ী মুসলিমরা তাদের বিজিত দেশে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে, এটা ইতিহাসের নামে চালানো সবচেয়ে সেরা আষাঢ়ে গল্প’! (ইসলাম এট্ দি ক্রস রোড, পৃষ্টা-৮)।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT