পাঁচ মিশালী

ফররুখ আহমদ : শতবর্ষ পরে

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০১৮ ইং ০৪:০৩:১৩ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করে যে বাংলাদেশ পেয়েছি তার আগে পাকিস্তান রাষ্ট্র নাম নিয়েও আমরা বাঙালি ছিলাম। তারও আগে আমরা ভারত অর্থাৎ ব্রিটিশ উপনিবেসিক শাসনীয় আমলেও এই বাংলার মানুষ বাঙালি ছিলাম। মোগল শাসনামলে আমরা মোগলাই হয়ে যাইনি বা আমাদের মাটি মোগলসুলভ আচরণ করেনি। তখনও বাঙালি হিন্দু মুসলিম সকল ধর্মের মানুষ মিলেই এই বাংলায় মাছ ধরে, ফসল ফলিয়ে, নদীতে নৌকা চালিয়ে, পিঠা খেয়ে, ঈদ উদযাপন করেছে, পূজা পালন করেছে। কিছু কিছু বাধা এসেছে তখনও; কিন্তু বাঙালি সম্মিলিতভাবেই জয় করেছে। বিভিন্ন ধর্মের লোকদের মাঝে অজ্ঞানতার কারণে কুসংস্কার প্রবল ছিলো। এসব ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বাংলার মাটির সন্তানেরা যারা জ্ঞান গরিমা সমৃদ্ধ ছিলেন তাদের ভূমিকা আজও বহমান এই স্বাধীন ভৌগোলিক বাংলাদেশ নামক দেশটিতে। সন্দেহ নেই তখনকার সময়ে আমাদের এই অঞ্চলের হিন্দু মুসলিম সম্মিলিত সমাজ বহির্বিশ্বের তুলনায় লেখাপড়া ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে খুব পিছিয়ে ছিলো। আর তখনই হিন্দু সমাজপতি, সমাজকর্মী ও চিন্তাশীলরা তাদের দিক থেকে চিন্তা করেছেন এবং লিখেছেন। কিছু পরে হলেও মুসলমান চিন্তাশীলরাও ব্রিটিশ শাসনামলে মসুলিমদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এগিয়ে এসেছেন।
ভূমিকার উপস্থাপন শেষে আমরা রচনার শিরোনামে মনোযোগ দিবো। বলছিলাম বাঙালিদেরকে চেতনার মূলে নাড়া দিয়ে জাগিয়েছেন অনেক মনীষী যারা এই বাংলার মৃত্তিকা গর্ভে লালিত ফুল, ফল, ফসল, জল, মাছ, পাখি আর গাছের কাছে ঋণী। আমিও আজন্ম ঋণী এই বাংলার বাতাস আর মাটির কাছে। সেই সাথে আমি এবং আমরা সকলেই পূর্বসূরী কবি সাহিত্যিকদের কাছে ঋণ অস্বীকার করার মতো অকৃতজ্ঞ হতে পারি না। সেই সব মনীষীদের অন্যতম হচ্ছেন ভাষা, দেশ ও মানবতার কবি ফররুখ আহমদ। তিনি বাঙালি। তবে সময়ে এই বাংলা ভূ-খন্ড ব্রিটিশ শাসনাধীন মুক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিন হয়েছে, তখন এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মানুষের মুক্তির কথা লিখেছেন। হ্যাঁ, পিছিয়ে পড়া বাঙালিদেরকে বিশেষ করে বাংলার মুসলিম সমাজকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রেখে হয়েছেন জাগরণের কবি। কবি ফররুখ আহমদের চিন্তার কেন্দ্রে সমসাময়িক বাঙালি মুসলমান বাঙালি মানুষ। তাই তাঁকে বিংশ শতাব্দির মানবতার কবি বললে ঠিক মূল্যায়নটি হবে মনে করি। আর সেই পথ ধরে আমি এই সময়ের বাঙালি। তাই তাঁকে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। তাঁর লেখায় ইসলামের ঐতিহ্য অধিক প্রাধান্য পেয়েছে এবং তা যুগ যুগ ধরে হয়ে আসা বাঙালি মুসলমানকে আন্দোলিত করেছে। তাই বলে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নন। কারণ, একটি দেশের যে কোনো সম্প্রদায় সজাগ হলে এর প্রভাবে সমস্ত দেশের মানুষের উন্নয়ন ঘটে। তাই কবি ফররুখ সকল মানুষের কবি। ফররুখ আহমদ কাব্যচর্চা করেছেন এবং তিনি সাহিত্যিক। সত্য প্রকাশ করাই সাহিত্য। কবি সাহিত্যিকগণ জ্ঞান আলোকে আলোকিত হয়ে সত্যকে সমাজের সর্বস্তরে প্রকাশ করেন। কবি সাহিত্যিকরা সর্বজনীন। এক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ ব্যতিক্রম নয়।
বাঙালি কবি ফররুখ আহমদের সাহিত্য কর্ম নিয়ে এখানে পরিচিত হবো। যারা তাঁর লেখা পড়েছেন এবং হামদ ও নাত শুনেছেন বুঝতে পেরেছেন যে, ফররুখ আহমদের লেখায় বাংলার পাশাপাশি প্রচুর বিদেশি শব্দ প্রয়োগ করেছেন। এমনটি আমরা বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল তারকাসম কাজী নজরুল ইসলামের গান ও অন্যান্য রচনায় পাই। তবে ফররুখ আহমদ তাঁর বিভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার করলেও তিনি তাঁর মাতৃভাষা বাংলাভাষাকে সকল বাঙালি কবির মতোই ভালোবেসেছেন এবং যথা সময়ে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন বাংলা ভাষার প্রতি। আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তাঁর গভীর সমর্থন ছিলো। তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার সমর্থন করতেন। তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই আমাদের ভাষা নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হলে কবি ফররুখ আহমদ আশ্বিন ১৩৫৪ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-১৯৪৭) সংখ্যা মাসিক সওগাত-এ ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’ নিবন্ধে লেখেন। ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে পর্যন্ত যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসির সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ তিনি আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহার করে ইসলামী ভাবধারায় লিখেছেন কবিতা, গজল, হামদ ও নাত। কবি ফররুখ আহমদ তাঁর লেখায় ইসলামের মূল সুর বা চেতনা তুলে ধরেছেন বেশি ক্ষেত্রে। বোধের ক্ষেত্রে সমসাময়িক পিছিয়ে থাকা বাংলার মুসলিম সমাজে এর প্রভাব পড়েছিলো। এজন্যেই তাঁকে তখনকার সময়ে বাঙালি মুসলিম রেনেসাঁ বা নবজাগরণের কবি বলা হয়েছিলো। তাঁর লেখাসমূহ এখন কালোত্তীর্ণ এবং তাঁর যে আহবান সেটি মানবিকতার। তাই তিনি অধিকতর মানবিক কবি। তাঁকে বিশেষ সম্প্রদায়ের বেঁধে মহাকালের পথে পিছিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। মানবতার কবি ফররুখ আহমদ আখ্যা দিলেই তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন হবে।
সাহিত্যে তাঁর অবদান অনেক। সাহিত্যের নানান শাখায় তিনি অবদান রাখলেও সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর কবি পরিচয় ফুটে উঠেছে বেশি। এর অনেকগুলো কারণের একটি হলো কবিতা ‘পাঞ্জেরি’। বাংলাদেশে খুব কম ছাত্র পাওয়া যাবে যারা কবি ফররুখ আহমদের ‘পাঞ্জেরি’ কবিতাটি পড়ে নি। তাই ছোটবেলা থেকেই ‘পাঞ্জেরি’ ও ‘ফররুখ আহমদ’ নাম দু’টি ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে মুখে। আমরা ছোটবেলায় বুঝে না বুঝেই চিৎকার করে বলতাম ‘রাত পোহাবার কতো দেরি পাঞ্জেরি’। মূলত এই একটি কবিতাই তাঁকে বাংলার মানুষের কাছে অমর করে রেখেছে। তাঁর অন্য বিশাল সৃষ্টি গবেষণায় প্রাধান্য পায়।
ফররুখ আহমদের সাহিত্যিক মূল্যায়ন একটি প্রবন্ধাকারে সম্ভব নয়। তারপরও এখানে তাঁর সমগ্র সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং তাঁর মূল্যায়ন সংক্ষেপে তুলে ধরছি যাতে করে, এ প্রজন্মের সন্তান আগামীর জন্যে তাঁকে খুঁজে নিতে পারে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ : সাত সাগরের মাঝি (ডিসেম্বর-১৯৪৪), সিরাজাম মুনীরা (সেপ্টেম্বর-১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (কাব্যনাট্য, জুন-১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (সেপ্টেম্বর-১৯৬৩), ধোলাই কাব্য (জানুয়ারি-১৯৬৩), হাতেম তায়ী (কাহিনীকাব্য, মে-১৯৬৬), নতুন লেখা (১৯৬৯), কাফেলা (১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনী (১৯৮১), সিন্দাবাদ (১৯৮৩), দিলরুবা (১৯৯৪)। তাঁর শিশুতোষ গ্রন্থ : পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), চাঁদের আসর (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০), ফুলের জলসা (১৯৮৫)। এখানে লক্ষ্যণীয়, তাঁর শিশুতোষ গ্রন্থসমূহের নাম বেশ সুন্দর। কবি ফররুখ আহমদকে তাঁর কর্মের জন্যে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তিনি ১৯৬০ খ্রীস্টিয় সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্ট পদক ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ এবং ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে আদমজী পুরস্কার ও ইউনেস্কো পুরস্কার পান। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ও ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে যথাক্রমে মরণোত্তর একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়। ফররুখ আহমদের বিকশিত কাব্য প্রতিভার প্রতি এখনও আমাদের শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে এবং আমরা তাঁকে খুঁজি।
শেষ করছি কবি ফররুখ আহমদের পারিবারিক, শিক্ষা ও কর্মময় জীবন সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিয়ে। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে (তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত) মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে জন্ম নেয়া বাঙালির জাগরণী চেতনা কবি ফররুখ আহমদের পিতা সৈয়দ হাতেম আলী ছিলেন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। তাঁর মায়ের নাম রওশন আখতার। ফররুখ আহমদ খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে মেট্টিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আইএ পাস করেন। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। প্রগতিশীল মননশীল ফররুখ আহমদ ছাত্রাবস্থায় বামপন্থী রাজনীতির প্রতি নিজেকে জড়িয়েছেন। সেখান থেকেই তাঁকে মানুষ ও সমাজের মুক্তির চিন্তা প্রভাবিত করে। তবে চল্লিশের দশকে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার এবং ধর্মীয় চিন্তার প্রভাবে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসেও পরিবর্তন আসে। দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে তৎকালীন ভারত ভাগে তিনি পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেন। কবি ফররুখ আহমদ ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি) কে বিয়ে করেন। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে তিনি ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লিখেন যা ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ন ১৩৪৯ সংখ্যায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। ফররুখ আহমদ এগারোজন সন্তানের জনক। তাঁরা হলেনÑ সৈয়দা শামারুখ বানু, সৈয়দা লালারুখ বানু, সৈয়দ আব্দুল্লাহেল মাহমুদ, সৈয়দ আব্দুল্লাহেল মাসুদ, সৈয়দ মনজুরে এলাহি, সৈয়দা ইয়াসমিন বানু, সৈয়দ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান (আহমদ আখতার), সৈয়দ মুহম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, সৈয়দ মুখলিসুর রহমান, সৈয়দ খলিলুর রহমান ও সৈয়দ মুহম্মদ আবদুহু। কর্মময় জীবন সম্পর্কে জানা যায়, ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কোলকাতায়। ১৯৪৩ খ্রিস্টিয় সালে আইজি প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ খ্রিস্টিয় সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ খ্রিস্টিয় সালে তিনি জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকুরি করেন। তিনি ১৯৪৫ খ্রিস্টিয় সালে মাসিক ‘মোহাম্মদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকুরি করেন ঢাকা বেতারে। ভারত ভাগের পর ১৯৪৮ খ্রিস্টিয় সালে ফররুখ আহমদ কোলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারে যোগদেন। এখানেই প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ খ্রিস্টিয় সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, ঢাকায় অবস্থানকালে এই স্টেশনের মায়া ছেড়ে মৃত্যুববণ করেন।

শেয়ার করুন
পাঁচ মিশালী এর আরো সংবাদ
  • কৃষিভিত্তিক ব্যতিক্রমী এক প্রকাশনা
  • আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সহজলভ্য ব্যবহার
  • নয়কুড়ি কান্দা ও ছয়কুড়ি বিলে এক দিন
  • একজন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ
  • তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও মুন্সি মেহেরুল্লাহ
  • দাদুর বিদায়
  • ভারত ভ্রমণের কথকতা
  • কিছু দেখা কিছু শোনা
  • ঘুরে এলাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি
  • দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক ভালোলাগা মানুষ
  • ফররুখ আহমদ : শতবর্ষ পরে
  • হাওর টানে পর্যটনে
  • অনুসরণযোগ্য এক ক্ষণজন্মা
  • বিড়ম্বিত অতিথি
  • ফার্সি ভাষার মহাকবি
  • আত্মরক্ষায় উশু
  • তার মূলধন ছিল তিনশো’ টাকা
  • প্রাণঘাতি বজ্রপাত : মুক্তির উপায়
  • চিকিৎসা শাস্ত্রে রোজার উপকারিতা
  • চিকিৎসা শাস্ত্রে রোজার উপকারিতা
  • Developed by: Sparkle IT