পাঁচ মিশালী

ঘুরে এলাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি

জ্যোতিষ মজুমদার প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০১৮ ইং ০৪:০৪:০৮ | সংবাদটি ৩৩ বার পঠিত

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, যার আরেক নাম কমনওয়েলথ সমাধিকেন্দ্র। স্থানীয় লোকদের কাছে এটি ইংরেজদের কবর স্থান হিসেবে পরিচিত হলেও আসলে এখানে সারিবদ্ধভাবে শায়িত রয়েছেন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সাধারণ সৈনিক থেকে বিগ্রেডিয়ার পদমর্যাদার ব্যক্তিদের এখানে সমাহিত করা হয়েছে।
১৯৪১ সালের ১১ই ডিসেম্বর জাপানের ১৫ ডিভিশন সৈন্যবাহিনীর বার্মা আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে জাপানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সুচনা হয়। আগ্রাসী জাপানি সৈন্য বাহিনীর হাত থেকে এই ভারতীয় উপমহাদেশ রক্ষা এবং হারানো রাজ্য বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) পুনরুদ্ধারের মিশনে জেনারেল উইলিয়াম স্লিমের নেতৃত্বে মাঠে নামেন ব্রিটিশ বাহিনী। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি বাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর বেশকিছু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, যার মধ্যে অন্যতম কোহিমার যুদ্ধ, আরাকানের যুদ্ধ ইত্যাদি। ১৯৪৫ সালের ৬ই মে জেনারেল ফ্রাঙ্ক মেসারভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনীর রেঙ্গুন দখলের মধ্য দিয়ে এই ফ্রন্টে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। বিভিন্ন ফ্রন্টে নিহত ব্রিটিশ সৈন্যদের উপযুক্ত মর্যাদায় সমাহিত করার উদ্দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয় বেশ কিছু ওয়ার সিমেট্রি যার দুটির অবস্থান আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশে।
১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মায় সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের ২৭০০০ নিহত সেনাদের স্মৃতি সংরক্ষণে ভারতে ১০টি, মিয়ানমারে ৩টি, সিঙ্গাপুরে ১টি, মালয়েশিয়ায় ১টি, জাপানে ১টি, থাইল্যান্ডে ২টি, পাকিস্তানে ২টি, বাংলাদেশে ২টি সহ মোট ২২টি সমাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়। কুমিল্ল¬ার ময়নামতি তখনকার সময়ে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম হলেও তৎকালীন সেনাবাহিনীর বড় একটি ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এখানে স্থাপিত হয় বড় একটি হাসপাতাল। ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে সমাহিত অধিকাংশ এই হাসপাতালেরই মৃত সৈনিক। যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু লাশ স্থানান্তর করেও এখানে সমাহিত করা হয়। এ ছাড়াও কুমিল্ল¬া ছিল যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহের ঘাঁটি এবং ১৯৪৪ সালে ইম্ফলে স্থানান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত চতুর্দশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর।
ময়নামতি সমাধি ক্ষেত্রটি মূলতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও ব্রিটিশ সৈন্যদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৩/৪৪ সালে তৈরী করা হয়। কুমিল্ল¬া শহর থেকে ৬/৭ কি. মি. দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন কুমিল্ল¬া ক্যান্টনমেন্টের টিপরা রাজার ও ময়নামতি সাহেবের বাজারের মাঝামাঝি কুমিল্ল¬া-সিলেট সড়কের বায়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে সারে চার একর পাহাড়ি ভূমিজুড়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় এ কমনওয়েলথ সমাধি ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে অন্য আরেকটি কমনওয়েলথ সমাধি ক্ষেত্র রয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে ৭৫৫ জন সৈনিকের সমাধি ক্ষেত্র রয়েছে এই সমাধি ক্ষেত্রটি (পড়সসড়হ-বিধষঃয ধিৎ মৎধাবং পড়সসরংংরড়হ [পমিপ]) কর্তৃক প্রতিষ্টিত হয়েছিল এবং তারাই এই সমাধি ক্ষেত্রটি পরিচালনা করেন। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সমাধি ক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একখানা দেয়াল ফলক লাগানো রয়েছে। ভিতরে সরাসরি সামনে প্রশস্ত পথ, যার দু’পাশে সারি সারি কবর ফলক। সৈন্যদের নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী কবর ফলকে তাদের নাম, মৃত্যু তারিখ ও পদবীর পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়। যেমন খ্রিস্টানদের কবর ফলকে ক্রুশ, মুসলমানদের কবর ফলকে আরবি লেখা (যেমন হুয়াল গাফুর) উল্লেখযোগ্য। প্রশান্ত পথ ধরে সোজা সম্মুখে রয়েছে সিঁড়ি দেয়া বেদি, তার উপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় পবিত্র প্রতীক ক্রুশ। প্রতি দু’টি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ শোভা-পাচ্ছে। এ ছাড়া পুরো সমাধি ক্ষেত্রেই রয়েছে প্রচুর গাছ। ওয়ার সিমেট্রির চারপাশে বিভিন্ন ফুল গাছ ও ফলের গাছ দেখা যায়। ঘন সবুজ দূর্বাঘাস ওয়ার সিমেট্রিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলেছে। সবুজে ঘেরা বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ বেষ্টিত এই জায়গায় গেলে আনন্দিত মনকে অজানা এক বিষণœতার পরশ দিয়ে যায় ।
সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশান্ত পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসাথে ২৩ টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই স্থানটি মূলতঃ ২৩ জন বিমান সৈনিকের একটি গণকবর, যেখানে লেখা রয়েছে- ঞযবংব ঢ়ষধয়ঁবং নবধৎ ঃযব হধসবং ড়ভ ঃবিসঃু ঃযৎবব ধরৎসবস যিড়ংব ৎবসধরহং ষরব যবৎব রহ ধসব মৎধাব.
এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৭ জন সৈনিক। বাহিনী অনুযায়ী এখানে রয়েছে ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক । সর্বমোট ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছে আর ১৪ জন সৈনিকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন
পাঁচ মিশালী এর আরো সংবাদ
  • কৃষিভিত্তিক ব্যতিক্রমী এক প্রকাশনা
  • আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সহজলভ্য ব্যবহার
  • নয়কুড়ি কান্দা ও ছয়কুড়ি বিলে এক দিন
  • একজন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ
  • তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও মুন্সি মেহেরুল্লাহ
  • দাদুর বিদায়
  • ভারত ভ্রমণের কথকতা
  • কিছু দেখা কিছু শোনা
  • ঘুরে এলাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি
  • দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক ভালোলাগা মানুষ
  • ফররুখ আহমদ : শতবর্ষ পরে
  • হাওর টানে পর্যটনে
  • অনুসরণযোগ্য এক ক্ষণজন্মা
  • বিড়ম্বিত অতিথি
  • ফার্সি ভাষার মহাকবি
  • আত্মরক্ষায় উশু
  • তার মূলধন ছিল তিনশো’ টাকা
  • প্রাণঘাতি বজ্রপাত : মুক্তির উপায়
  • চিকিৎসা শাস্ত্রে রোজার উপকারিতা
  • চিকিৎসা শাস্ত্রে রোজার উপকারিতা
  • Developed by: Sparkle IT