পাঁচ মিশালী

কিছু দেখা কিছু শোনা

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৬-২০১৮ ইং ০৪:০৪:৩৬ | সংবাদটি ১৩০ বার পঠিত

মানুষের চরিত্র গঠনে সমাজ ব্যবস্থা না ধর্মের প্রভাব বেশি তা নিরূপণ করা কঠিন। তবে চরিত্রবান জাতি তথা মানুষ গঠনে উপরোক্ত উভয় উপাদানের প্রভাব কিছু না কিছু পড়ে থাকে। যে সমাজে বা রাষ্ট্রে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা রয়েছে সে দেশের নাগরিকদের নৈতিকতাও তুলনামূলক অনেক উর্ধে। অসৎ, অন্যায় এবং অপরাধমূলক কর্মকান্ডে কদাচিৎ জড়িত হয় তারা। আইনের শাসন রাষ্ট্রে বলবৎ থাকলে অনৈতিক কাজে জড়িত হতে নাগরিকগণ ভয় পায়। আবার প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তিও অসাধু হয় না। হতে পারে না। ধর্মের শিক্ষায় তার নৈতিকতা নিখাদ। তবে ধর্মহীন ব্যক্তিও সচ্চরিত্রবান হয়ে থাকে। ইউরোপের অধিকাংশ মানুষ ধর্মের তেমন তোয়াক্কা করে না।
তো, ইউরোপের প্রায় সব দেশেই খড়ংঃ ধহফ ঋড়ঁহফ (হারানো ও প্রাপ্তি) অফিস রয়েছে। কারো কোন কিছু হারিয়ে গেলে এবং কেউ তা পেয়ে থাকলে এই অফিসে জমা দিয়ে থাকে। অফিস কর্তৃপক্ষ জিনিস হারানো ব্যক্তির ঠিকানা সংগ্রহ করে বা টেলিফোন নাম্বার সংগ্রহ করে ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে বা টেলিফোনে যোগাযোগ করে অফিস থেকে খোয়ানো জিনিসটি নিয়ে যেতে বলে দেয়। যে লোক জিনিসটি অফিসে জমা দেয় সেও তার ঠিকানা বা টেলিফোন নং অফিসে দিয়ে যায় বা অফিস কর্তৃপক্ষ নিজেদের পক্ষ থেকে লিখে রাখে। ইউরোপিয়ান ভদ্রতা অনুযায়ী যিনি তার হারানো জিনিস ফেরত পেয়েছেন তাকে যে ব্যক্তি জিনিসটি এই অফিসে জমা দিয়েছেন বখ্শিস দেওয়া অনেকটা বাধ্যতামূলক। আমরা উপমহাদেশীয় অনেকে সে ব্যক্তিকে বখ্শিস প্রদানের রীতি না জানলে অফিক কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ন¤্রভাবে বলবে ‘আপনার জিনিসটি ফেরত পেলেন অথচ যে লোক তার সময় নষ্ট করে গাড়ি চালিয়ে বা ট্রাম-ট্রেনের টিকেট কেটে বা হেটে এসে জিনিসটি এই অফিসে এসে জমা দিলেন তাকে খুশি মনে কিছু উপহার তথা বখ্শিস দেওয়া উচিত।’ অবশ্য ইউরোপীয় শতভাগ লোক স্বেচ্ছায় বখ্শিস দিয়ে থাকে। এটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদাহরণ। তো, এই অফিসের কর্তৃপক্ষ বখ্শিসের টাকা আবার সেই ব্যক্তিকে ডেকে এনে তার হাতে দিয়ে বলে, ঐ দিন আপনি এই অফিসে যে জিনিসটি মালিকের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য জমা দিয়েছিলেন জিনিসটির মালিক তা ফেরত পেয়ে এই টাকা আপনাকে বখ্শিস হিসেবে দিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, বখ্শিস প্রদানের টাকার কোন হের ফের হয় না। আমাদের দেশে এমন হলে এই বখ্শিসের টাকা থেকেও অফিস কর্তৃপক্ষ কিছু রেখে দিতেন।
১৯৭৯ সালে এই লেখক জার্মানীর ফ্রোঙ্কফুর্ট শহরে একদিন লোকাল ট্রামে পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলি। দিন দশেক পর একদিন আমার নামে খড়ংঃ ড়ভ ঋড়ঁহফ অফিস থেকে একটি চিঠি আসে। সেই অফিসে আমি গেলে আমাকে জিজ্ঞেস করা হলো আমার কি কোন কাগজপত্র হেরেছে। আমি পাসপোর্টের কথা বললে তৎক্ষণাৎ আমার দস্তখত রেখে পাসপোর্ট হাতে পাই। আমার ঠিকানা কিভাবে পেলেন জিজ্ঞাসা করলে অফিসের লোকটি জানায় পুলিশ অফিস থেকে সংগ্রহ করেছি। এখানে উল্লেখ্য যে, জার্মানীতে বিদেশি ও স্থানীয় সব লোকদের বাসস্থানের ঠিকানা পুলিশ অফিসে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। স্থানীয়দের নিজেদের বাড়ি হোক আর বিদেশীদের বাসার মালিক বাসা ভাড়া দেওয়ার সাথে সাথে পুলিশ-নিবন্ধীকরণ ফরমটি পূরণ করে পুলিশে জমা দেয়ার জন্য বলে দেয়। সেল্ফ কার্বন্ড (ঝবষভ পধৎনড়হবফ) ফরমে তিনটি কপি থাকে। প্রথম কপি ভাড়াটিয়ার, দ্বিতীয় কপি পুুলিশ রাখবে এবং শেষ কপিটি বাসার মালিক বা কেয়ার টেকারের অফিসের জন্য। কাজেই জার্মানীতে অবৈধভাবে কোন বাসায় বা অন্যত্র লুকিয়ে থাকা অসম্ভব। গেস্ট হলেও কেয়ার টেকারকে অবশ্যই অবহিত করতে হবে। তো, পাসপোর্টটি হারিয়ে যাওয়ায় আমি খুবই পেরেশানী ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম এই কয়েকদিন। মনে মনে ভাবছিলাম যদি কোন সাদা চামড়াধারী লোক (স্থানীয় জার্মান সহ) পাসপোর্টটি না পায় এবং এশিয়ান বাংলাদেশী, পাকিস্তানী, ইন্ডিয়ান, আফগানী, শ্রীলঙ্কান এবং আফ্রিকান কালো অবয়বের কারো হাতে পড়ে তবে সেটি আর ফেরত পাবো না কোন সময়ে। মানিব্যাগ হলে তো ফেরত মিলার প্রশ্নই উঠে না। সেটিও কোন জার্মান পেয়ে থাকলে অক্ষত অবস্থায়ই পাওয়া যায় ফিরত। ভাগ্যিস, খড়ংঃ + ঋড়ঁহফ অফিস থেকে জানলাম আমার পাসপোর্টটি ট্রামের চালকের (জার্মান) হাতে পড়ে এবং ভদ্রলোক সেটি বর্ণিত অফিসে ডিউটি শেষে জমা দেয়।
আমাদের দেশে এ রকম অফিস আছে কি না জানা নেই। আর এ দেশে তো প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় হারানো বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ে। কতজন তার হারানো জিনিস ফিরে পায় তাও জানা যায় না। তবে মাঝে মধ্যে মসজিদে ওযু করার সময়ে ও গাড়িতে হারিয়ে যাওয়া ঘড়ি-কাপড়ের ব্যাগ মাঝে মধ্যে ফেরত মেলে তবে শতকরা হিসেবে তা পাঁচ পার্সেন্টও হবে না। এ নিবন্ধকার বেশ কয়েকবার সিএনজিতে মাছ, বাজার, খরচের পলিথিন ব্যাগ ভুলে ফেলে আসি। কোন দিন ফেরত পাইনি। অনেকে সিএনজিতে নাইওরী ব্যাগ ফেলে গেছেন কিন্তু ড্রাইভার ফেরত দেয়নি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT