সাহিত্য

সড়ক

মোঃ ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৪:০২ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

লাশের উপর বারবার আছড়ে পড়ছে আছমা। হাসপাতালের নার্স আয়া কেউ তাকে ধরে রাখতে পারছে না। তার গগনবিদারী কান্নার চিৎকারে হাসপাতালের তৃতীয় তলার অপারেশন থিয়েটারের দেয়াল কেঁপে উঠছে। আছমার আর্তনাদ শুনে চারপাশের রোগী ও রোগীর সাথে থাকা লোকজন চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না। সবাই ঝরঝর করে কেঁদে যাচ্ছে তার সাথে। হাসপাতাল হতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্য সহজে চোখে পড়ে না। আছমা চিৎকার করে বলছে, আমাকে ছাড়। আমি মার কাছে যাব। বাবার কাছে যাব। আমি তাদের সাথে জাদুঘর চিড়িয়াখানা শিশুপার্ক ঘুরে বেড়াব।
আজ আছমাকে নিয়ে তার মা বাবা বের হয়েছিল সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতে। ছুটির দিনটা তারা মেয়েটাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে কাটাবে। কেনাকাটা করবে। দর্শনীয় স্থানগুলো দেখে আছমা আনন্দে নাচবে হাততালি দিবে। নতুন জামা কাপড় পেয়ে সে খুব খুশি হবে।
আছমার বাবা মা দু’জনই গার্মেন্টেসে চাকুরি করে। কাজের চাপ আর অর্থের অভাবে তারা আছমার অনেক স্বাদ আহ্লাদ সব সময় পূরণ করতে পারে না। অনেকদিন ধরেই তারা দিনক্ষণ ঠিক করে রেখেছে। সামনে ছুটির দিনে তারা তিনজন একত্রে বের হবে। সারা ঢাকা শহর ঘুরে রাতে বাসায় ফিরবে।
ঘিঞ্জির মত বাসা। বাসা হতে বের হয়ে ছিপছিপে সরু রাস্তা পায়ে হেটে বড় সড়কে উঠতে হয়। বড় সড়কে ওঠে তারা বাসের জন্যে অপেক্ষা করছে। আচমকা একটা বাস এসে আছমার মা বাবাকে চাকার তলে ফেলে পিষে দ্রুতবেগে চলে যায়। আছমা তাদের পেছনে ছিল বলে বেঁচে যায়। আছমার আর্তচিৎকারে কয়েকজন পথচারি ধরাধরি করে তাদের একটা টেম্পুতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছার অল্পক্ষণ পরেই তারা দু’জন মারা যায়া তাদের মৃত্যুর পর হতে আছমা শান্ত হতে পারছে না, তাকে কেউ সান্ত¦না দিতে পারছে না। সে হাউমাউ করে কখনও চিৎকার করে নিথর দেহে মা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
একজন নার্স আছমার মাথায় ¯েœহের হাত বুলিয়ে বলল, তুমি কান্না থামাও। তোমার আত্মীয় স্বজনকে খবর দাও। তোমার বাবা মার লাশের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। নার্সের কথা শুনে আছমা একদম চুপ হয়ে যায়। তার চোখ হতে আর পানি পড়ছে না। গলা হতে কোন কান্না বের হচ্ছে না। এ দুনিয়ায় তার মা বাবা ছাড়া কোন আপনজন নেই। যারা আছে আছমা তাদের চিনে না। শুধুমাত্র একজন চাচাকে চিনে। যিনি মাঝে মধ্যে তাদের বাসায় আসতেন। যা করতে হয় তাকে একাই করতে হবে। কে যেন ভেতর থেকে বলে ওঠে, আছমা তোর মা বাবার দাফন কাফনের ব্যবস্থা তুকে করতে হবে। কিন্তু সে কিভাবে কী করবে কিছুই বুঝে ওঠতে পারছে না।
তোমার আপনজনকে ফোন কর। নার্স আছমার চোখের পানি টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বলল।
আছমা নার্সের বুকে মাথা রেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলল, আন্টি গ্রামের বাড়িতে একজন চাচা আছেন। তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আমি চিনি না।
ঠিকানা জান? নার্স জিজ্ঞাসা করলেন।
জি জানি।
নার্সের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটা এম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। নিথর মা বাবার লাশের পাশে আছমা পাথর হয়ে বসে আছে। করুণ সুরে সাইরেন বাজিয়ে লাশের গাড়ি ভোরে ঠিকানা মত এসে পৌঁছল। উঠোনে সাইরেনের শব্দ শুনে আছমার চাচা চাচী ধরফর করে ওঠে দরজা খোলে বের হয়। আছমা তাদের জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। জোহরের নামাজের পর দাফন শেষ হয়। অসহায় আছমা জড়োসড়ো হয়ে চাচার ঘরে চুপচাপ বসা। সে এখন কি করবে! কোথায় যাবে! কার কাছে থাকবে! কে তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে! তার বই খাতা, কলম, স্কুল ড্রেস, ব্যাগ, জেএসসি পরীক্ষা এসবের কি হবে। তার মা বাবা কাজে যাওয়ার আগে আর স্কুলে পৌঁছে দেবে না। বিকেল বেলা গলির মুখে সে মা বাবার জন্যে অপেক্ষায় থাকবে না। আছমার মনটা হঠাৎ এমন ঝড়ের ঝাপটায় দুমড়ে মুচড়ে যায়। সে ভাবছে আর ছোট শিশুর মত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে।
আছমা সকাল সন্ধ্যা তার মা বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বিড়বিড় করে তার মা বাবার সাথে কথা বলে। কবরের পাশে বিলাপ করে কাঁদে। তার চোখের পানি শুকায় না। তার মনের ভেতরটা খানখান হয়ে বারবার ভেঙ্গে যাচ্ছে। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে তার হৃদপিন্ডের শিরা উপশিরাগুলো। খন্ড বিখন্ড হয়ে ছিড়ে চৌচির হয়ে ছিটকে পড়ে কলিজা। যখন তখন তার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। কবরের পাশে দাঁড়ালে সে সাময়িক শান্তি পায়। কবরের দিকে তাকিয়ে আপন মনে কথা বলে সে মনটাকে হালকা করার চেষ্টা করে। আছমার চাচী বিষয়টা লক্ষ্য করে তার চাচাকে বলে। আছমার উপর ভূতের আছর লেগেছে। তাকে ঘুঙুর বাবার আস্তানায় নিয়ে যেতে পরামর্শ দেয়।
আছমাকে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ঘুঙুর বাবার আখড়ায় তার চাচা নিয়ে যায়। পুরানো জমিদার বাড়ির নির্জন জঙ্গলে ঘুঙুর বাবার সদল বলে অবস্থান। ঘুঙুর বাবার গলায়, বাহুতে, পায়ে ঘুঙুরের মালা। অসংখ্য ঘুঙুর পরে সে চলাফেরা করে। সে মুখে খুব কম কথা বলে। ঘুঙুরের ঝনঝন শব্দই হলো তার ভাষা। ঘুঙুরের ঝনঝন শব্দের ভাষা তার পুরানো শিষ্যরা বুঝে। শব্দের ভাষা শুনে বুঝে শিষ্যরা সে অনুযায়ী কাজ করে। মুখে কথা বলা দরকার পড়ে না।
ঘুঙুর বাবা চোখ বন্ধ করে আসনে বসা। আছমাকে তার সামনে বসানো হয়। ঘুঙুর বাবা বিকট শব্দ করে চোখ খোললেন। শব্দ শুনে ভয়ে আছমার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ঘুঙুর বাবা আছমার নিষ্পাপ মুখের দিকে বিশ্রী চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসল। গলার ঘুঙুরের মালা নাড়াল। তারপর ডান বাহুর মালা। পুরানো শিষ্য জমিলা আছমার চাচাকে ঘুঙুরের ঝনঝন শব্দের ব্যাখ্যা বুঝাল- আচমাকে বড় ভূতে পেয়েছে। তাকে রেখে যেতে হবে। সাত দিন ঝাড় ফু দিলে ভূত পালাবে।
আছমার চাচা তাকে রেখে চলে যাচ্ছে। আছমা কিছুতেই এখানে থাকবে না। সে তার চাচার হাত চেপে ধরে। তার চাচা আছমার হাত জোর করে ছাড়িয়ে চলে যায়। আছমার মনটা হায় হায় করে ঢুকরে কেঁদে ওঠে। অসহায় আছমা দুই হাতে মুখ ঢেকে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছে। তার মায়ের বয়েসি জমিলা এবং আর একজন মহিলা তাকে টেনে হেছড়ে একটা খুপড়ি ঘরে নিয়ে যায়। তাকে ঘরে রেখে চলে যেতেই আছমা জমিলার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে। জমিলা ঘুরে দাঁড়াতেই আছমা তার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে বলে, মা আমাকে একা রেখে কোথায় যাচ্ছ?
আছমার মুখে মা ডাক শুনে জমিলার মাতৃহৃদয়টা উছলে ওঠে। জমিলা আছমাকে বুকে চেপে ধরে বলে, ডাক আমাকে মা বলে ডাক। এক যুগ পরে তোর মুখে মা ডাক শুনলাম। আমার আমিনা বেঁচে থাকলে তোর মত হত। সে নিশ্চয় আমাকে মুখ ভরে এমন করে মা বলে ডাকত। আছমা বুঝতে পারে এ মহিলার এক মেয়ে ছিল। সে এক যুগ আগে মারা গেছে। আছমা কাঁদু কাঁদু গলায় বলে, মা আমাকে এ নরকপুর থেকে বাঁচাও। আমি স্কুলে যেতে চাই। আমি জেএসসি পরীক্ষা দিতে চাই।
জমিলা আছমার মুখে তার জীবনের করুণ কাহিনী শুনে কেঁদে চোখের জলে বুক ভাসায়। জমিলা মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় সে আছমাকে এখান থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করবে এতে তার কপালে যা ঘটার ঘটবে।
গোধূলি লগ্নে ঘুঙুর বাবা গভীর বনের ভেতরে সাধনায় বসে। এ সময় সব সেবা দাসদাসিরা তার পেছনে বাধ্য হয়ে ধ্যানে বসতে হয়। সবাইকে হাত জোর করে ধ্যানে মগ্ন হতে হয়। জমিলা স্থির সিদ্ধান্ত নেয় এ সময়ে তাকে পালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু সন্ধ্যাবেলা একটা বাচ্চা মেয়ে একা কোথায় যাবে। কার কাছে আশ্রয় নেবে। চাচা চাচির কাছেও জায়গা হয়নি। জমিলা ভাবনার মোড় ঘুরায়। এ নরকপুরিতে অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে আর নয়। সেও এখান থেকে আছমার সাথে পালিয়ে যাবে। আছমাকে নিয়ে দূরে কোথাও গিয়ে নতুন করে সংসার পাতবে। বাকী জীবন আছমার মাঝে তার মেয়েকে খুঁজে ফিরবে। আছমাকে লেখাপড়া শিখিয়ে সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। পালানোর সময় ঘুঙুর বাবা দেখে ফেললে জান খতম। কপালে যা আছে তা ঘটবে। কিন্তু এ নরকপুরিতে এমন একটা অসহায় নিষ্পাপ মেয়েকে ছেড়ে দিতে তার বিবেক মানছে না। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও সে আছমাকে রক্ষা করবে। ঘুঙুর বাবা গোধূলি লগ্নে ধ্যানে মগ্ন। তার ভক্ত অনুরক্ত সব শিষ্যরাই ধ্যানে মগ্ন। জমিলা আজ ধ্যান করতে যায়নি। সে আছমাকে নিয়ে পালাবে।
জমিলা সবজি কাটার বটি আঁচলে লুকায়। আছমার হাতে তিন হাত লম্বা একটা রড দেয়। তারা আখড়া হতে বের হয়ে দৌড়তে থাকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। মনে আতঙ্ক সংশয়। এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল। আবছা আঁধারে বনের আঁকা বাঁকা মেঠো পথে তারা দৌড়াচ্ছে। গোধূলি লগ্নের সূর্যের লালিমা মিলিয়ে গেছে। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঘন বনে গাছপালার কারণে একটু বেশি অন্ধকার লাগছে। জমিলা ঠাহর করে মেঠো পথে দৌড়ে চলছে। কারণ তাকে রাত গভীর হওয়ার আগেই বড়রাস্তায় উঠতে হবে। জমিলা আছমাকে শক্ত হাতে ধরে দৌড়াচ্ছে। আছমা এভাবে দৌড়ে অভ্যস্ত নয়। তবু সে প্রাণপণ জমিলার সাথে দৌড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
হঠাৎ ঘুঙুরের ঝনঝন শব্দ। জমিলা থমকে যায়। আছমা ভয়ে শিউরে ওঠে। তার সারা শরীরের লোম আতঙ্কে কাটা দিয়ে ওঠে। জমিলা ভাবে তার কান ভুল শুনেছে। এখানে ঘুঙুরের আওয়াজ হওয়ার কথা না। কিন্তু না। আচমকা ঝোপের আড়াল হতে বিকট শব্দ করে ঘুঙুর বাবা দুই হাত মেলে তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। ঘুঙুর বাবার পেছনে আখড়ার সব নারি পুরুষ। এ আখড়া হতে যারা পালানো চেষ্টা করে ধরা পড়লে াতকে ঘুঙুর বাবা নিজ হাতে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়। জমিলা বুঝতে পারে তাদের দু’জনের মৃত্যু নিশ্চিত। মরার আগে একবার বাঁচার চেষ্টা করা যাক। ঘুঙুরের অনেক অত্যাচার নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেছে জমিলা। মরার আগে কিছুটা প্রতিশোধ নিয়ে মরলেও তার আত্মা শান্তি পাবে।
জমিলা তার আঁচলে লুকানো দা বের করে এলোপাতাড়ি কুপাতে শুরু করে। আছমাও তার হাতের রড দিয়ে ঘুঙুর বাবাসহ সবাইকে পেটাতে থাকে। এমন অতকিত আক্রমণ আর দুই পলাতক নারির বাঘিনী রূপ দেখে ঘুঙুর বাবা ও তার দল বলের সবাই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যায়। তারা সাহস হারিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। জীবন বাঁচাতে যে যেভাবে পারে চলে যায়। জমিলা আর আছমা ঘুঙুর বাবাকে ইচ্ছে মত পেটায়। দু’জনের মার খেতে খেতে ঘুঙুর বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জমিলা আছমা দা রড ফেলে আবার দৌড়াতে শুরু করে।
আঁধার রাতে আরও অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর তাদের চোখে আলো ধরা পড়ে। দূরে গাড়ি চলাচলের আলো। আলো দেখে তাদের মনে সাহস জাগে। কাছে পিচ সড়ক হবে। তারা গাড়ির আলোকে লক্ষ্য করে দ্রুত গতিতে হাটতে থাকে। বড় সড়কে ওঠে জমিলা আছমা গাড়িতে চড়ে বসে। গাড়ি কোথায় যাবে। তারা কোথা যাবে কিছুই জানা নেই। অচেনা অজানা গন্তব্যে যাত্রা। গাড়ি দ্রুত গতিতে চলছে। গাড়ির ঝাকুনিতে ক্লান্ত দু’জনই ঘুমিয়ে পড়ে। শেষ রাতে গাড়ি এসে থামে ঢাকায়। জমিলার কোমরে একটা টাকার খুতি বাঁধা থাকত। খুতিতে বেশ কিছু টাকা সে জমিয়ে রাখত। এত ঝড় ঝাপটার পরও তার খুতিটা জায়গা মত আছে।
তারা ফ্রেস হয়ে চা নাশতা খায়। দু’জন মিলে প্ল্যান করে তারা আগের ভাড়া বাসায় গিয়ে উঠবে। জমিলা গার্মেন্টসে চাকুরি করবে। আছমা আগের স্কুল থেকে জেএসসি পরীক্ষা দিবে। আছমার যত ইচ্ছে পড়বে। জমিলা টাকা পয়সা যোগান দিবে। মা মেয়ে মিলে দু’জনের নতুন সুখের সংসার হবে। আবার দুজনের মনে সুন্দর করে জীবন গড়ার আশার আলো জ্বলে ওঠে। তারা তাড়াহুড়া করে নাশতা শেষ করে। আনন্দিত মনে হোটেল হতে বের হয়। সড়কের ওপাড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হবে। সড়কের দুই দিক থেকে অসংখ্য গাড়ি আসা যাওয়া করছে। তারা সাবধানের সাথে সড়ক পার হচ্ছে। আছমার এক হাত জমিলা ধরে আছে। সড়কের মাঝামাঝি যেতেই দুই দিক থেকে দুইটা বাস পাগলা হাতির মত ছুটে আসে। জমিলা শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আছমাকে ধাক্কা দেয়। আছমা সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। জমিলা দুই বাসের মাঝে চাপা খায়। জমিলাকে চাপা দিয়ে গাড়ি দুইটা একটু পিছু হটে। জমিলার লন্ডভন্ড দেহ সড়কে পড়ে আছে। দেহ বলতে এক খন্ড মাংসপিন্ড। কালো পিচ রাস্তা লাল রক্তে ভেসে গেছে। আছমা সড়কের পাড়ে পড়ে আছে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তার নতুন স্বপ্নের জমিলা মায়ের হাড়গুড় গুঁড়ো হয়ে পড়ে আছে। আছমা মা বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাস্তায় মানুষের ভিড় জমে যায়। কিছু মানুষ আছমাকে ঘিরে ভিড় করছে। অতি সাহসী কিছু পথচারি জমিলার লন্ডভন্ড দেহ দেখছে।
আছমার জ্ঞান ফিরে এলো। সে চোখ খোলে তাকিয়ে দেখল। সে একটা হাসপাতালে শুয়ে আছে। সে মা বলে চিৎকার দিতেই নার্স ডাক্তার ছুটে আসন। নার্স ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলেন, সড়কে দুই গাড়ির মাঝে চাপা পড়ে মারা যাওয়া মহিলা তোমার মা?
জি আমার মা।
নার্স ভ্যাবাচেকা খেয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, কয়দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তোমার মা বাবা মারা গেছে। আমি এ¤ু^ল্যান্স ভাড়া করে গ্রামের বাড়িতে লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। এখন আবার বলছ এ মহিলাও তোমার মা।
আছমা কেমন করে বুঝাবে এ জমিলা নামের মহিলা দুই বার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে। মা সন্তানের জন্যে কামানের সামনে বুক পেতে দেন। সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের গলা বাড়িয়ে দেন তলোয়ারের তলে। যে কোনকিছুর বিনিময়ে আপন সন্তান বেঁচে থাকুক। এমন কামনা গর্ভধারিনী প্রত্যেক মায়ের অন্তরে থাকে। কিন্তু জমিলা তাকে পেটে ধরেনি। ক্ষণিকের পরিচয় মাত্র। এ অল্প সময়ে মা মেয়ের বন্ধন সুদৃঢ়ভাবে বেঁধে যায়। নিজের জীবন নিঃশেষ করে তাকে বাঁচাল। মা যেমন ভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে আপন সন্তানকে রক্ষা করে ঠিক তেমন করে তাকে বাঁচাল। তিনি মায়ের চেয়ে কোন অংশে কম। এখন থেকে তিনিই তার মা। কিন্তু তিনি তো বেঁচে নেই। তাকে নিয়ে নতুন করে ঘর বেঁধে সংসার করে বাঁচতে চেয়েছিল। হায় নিষ্ঠুর সড়ক। সড়ক তার সব স্বপ্ন কেড়ে নিল। ধ্বংস করে দিল তার সব স্বাদ আহ্লাদ।
আছমার নিরবতা দেখে নার্স তাকে ধমকের সুরে বললেন, মা নিয়ে নাটক রাখ। সত্যি করে বল তোমার আসল মা কে? আছমা এবার কেঁদে ফেলে। আছমার আহাজারি দেখে গত কয়দিন আগে তার মা বাবার মৃত্যুতে নার্সের মন গলে নরম হয়েছিল। আজও আছমার নিষ্পাপ কিশোরী মুখের দিকে তাকিয়ে নার্স বুঝতে পারেন নিশ্চয় এখানে কোন একটা ঘটনা আছে। নার্স আছমার কাছে নুন ঘটনা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আছমা তাকে সব কিছু খুলে বলে। আছমার জীবনের করুণ পরিণতি শুনে নার্স দরম মাখা গলায় বললেন, তুমি আমার সাথে চল। আমার একমাত্র মেয়ে ডাক্তারি পাস করে স্বামীর সাথে বিদেশে থাকে। তোমার লেখাপড়া ভরণ পোষণ এর সব দায় দায়িত্ব আমার। এখন থেকে তুমিই আমাকে মা বলে ডাকবে। আজ হতে আমি তোমার মা। তুমি আমার মেয়ে। আছমার বিধ্বস্ত চেহারায় একটুকরো আনন্দের ঝিলিক ফুটে ওঠে। জমিলার দাফন শেষ করে আছমা আর নার্স মিলে। বিকেল বেলা আছমা নতুন আশ্রয়ে সুন্দর জীবন গঠনের প্রত্যাশা নিয়ে রওয়ানা হয়। তার নার্স মায়ের সাথে সড়ক পথে দুরু দুরু বুকে বাসে চড়ে বসে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT