সাহিত্য

জাগরণের কবি ফররুখ

বেলাল আহমদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৪:৫৬ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

তিনি আত্মসচেতন ধার্মিক। তাঁর কবিতা ছিল অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে। তাতে মানবতাবোধ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠত। তাঁর কবিতায় ইসলামের অতীত গৌরব, ঐশ্বর্য আর সৌকর্যের অনুষঙ্গ ফিরে এসেছে বহুবার বহুভাবে। তাঁর লেখায় সুদূরপ্রসারী কল্পনা, নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে বিরাজমান। কাব্য রচনায় তিনি নিজের মৌলিক আদর্শে সুমহান ছিলেন। তিনি ইসলামি গৌরব গাঁথার কৃতী রূপকার। কবি ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতায় যাদুকরী ছন্দের দোলাÑ
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা’/ নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।’
কবিতাটি পড়তে গেলেই সবুজ পাতার কাঁপন হৃদয়ে নাচন তুলে। যেমন ‘নীল আকাশে চমকায় তলোয়ার’ (বার দরিয়ায়) ‘নিকষ আকিক বিছানো’ (সিন্দাবাদ) ‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?’ ‘প্রবাল দ্বীপের নারিকেল শাখা বাতাসে উঠিছে বাজি।’ (সাত সাগরের মাঝি)।
অদ্ভুত তার রচনাশৈলী। পড়ার সঙ্গে চোখে ফুটে ওঠে তরুরাজিনীলা দেখা যায় মালদ্বীপের ছবি তার সামনে নেমে পড়েছে বিরাট পাখা মেলে সিন্ধু-ঈগল। সুদূর সিন্দুপারে হেরার রাজতোরণ অভিমুখে সিন্দাবাদের অভিযাত্রা নেক জীবন্ত আমেজে অভিসিক্ত করে তুলে পাঠকের অন্তর। আরবী ফারসী শব্দ যোগে তাঁর কবিতায় অপূর্ব মাধুর্য ফুটে ওঠে।
ব্যক্তি জীবনে কবি প্রশংসা পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন এসব সস্তা প্রশংসা পছন্দ করি না। আমি প্রশংসা জন্য কলম ধরিনি। আমি লিখছি আল্লাহ উদ্দেশ্যে, তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। তার জীবনের নীতি ছিল একমাত্র আল্লাহর কাছে হাত পাতবো। আমার মাথা একমাত্র আল্লাহর কাছে নত করতে পারি।
কবি তার প্রত্যয়ের বিপরীতে কোন ধারাকে পছন্দ করতেন না। তার জীবন চলেছে তার আপনার ছন্দে ও তালে। কখনও ভৈরবী কখনও বা পূরবী। আপন আদর্শের প্রতি তার যে অবিচল লিখা ছিল, সেটা তাঁর প্রতি সকলের শ্রদ্ধা জাগিয়েছিল।
ফররুখ আহমদ প্রকৃতই নির্যাতিত মানবতার কবি ছিলেন। সুস্থ সবল জীবন ধর্মে কবি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন উন্নতশীর এবং শৈল্পিক। জীবনেও ছিলেন মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী। লোভী মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে মৃতের শব তাঁকে ব্যথিত ও পিড়ীত করেছে। তিনি লিখেছেনÑ
তারপুর আসিলে সময় বিস্মময়।/তোমার শৃঙ্খলগত মাংশপিন্ডে পদাঘাত হানি/নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বারপ্রান্ত টানি/আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু দীর্ণ নিখিলে অভিশাপ বও/ধ্বংস হও/তুমি ধ্বংস হও।
যে জড় সভ্যতা এবং মৃত সভ্যতার দাশ ‘স্ফীত মেদ’ শোষক সমাজকে কবি ‘পদাঘাতহানি’ জাহান্নাম দ্বারপ্রান্তে টেনে নেয়ার সংকল্প বাংলা ১৩৫০-এ প্রকাশ করেছিলেন। তারা এখনও পৃথিবীর সর্বত্র ছোবল মারছে। বিপর্যস্ত করছে সাধারণ মানুষের জীবন। তিনি আকাশে চাঁদ দেখিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ‘দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালির বাঁধ’। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, ‘নতুন পানিতে হাল খুলে দাও হে মাঝি সিন্দাবাদ’।
কবি ফররুখ আহমদ একজন প্রকৃতই জীবন শিল্পী। কবির অনেক সনেট ও কবিতা দৃঢ় সংবদ্ধ, অনবদ্য, নিপূর্ণ শিল্প কর্ম। প্রেমিক কবি ফররুখ গান রচনায়ও হাত সম্প্রসারিত ছিল। তাছাড়া তিনি হামদ, নাত, গজল রচনাতেও ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শিশুদের জন্যেও গান লিখেছেন। যেমনÑ
তোরা চাসনে কিছু কারো কাছে, খোদার মদদ ছাড়া।/তোরা পরের উপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাড়া।
কবি ফররুখ আহমদ প্রেমের গানও লিখেছেন :
যে বসন্ত ফিরে যায়/জীবনে সে ফিরবে না হায়/শেষ হবে তার সাথে/এ দিনের সব গান।
কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্য জগতে ছিলেন একক এবং অদ্বিতীয়। কবি ফররুখ ছিলেন ইসলাম ও শরীয়তের নিগূঢ় অনুগামী। তাঁর গোটা জীবনে তিনি এক মর্দে মুমিনের সত্যনিষ্ঠ চিত্র অঙ্কন করতে পেরেছিলেন। ফররুখ ছিলেন একজন আদর্শবাদী পুরুষ। সর্বোপরি তিনি ছিলেন ঈমানের দীপ্ত শিখায় উজ্জ্বল ও বলীয়ান।
কবি ফররুখ আহমদ ব্যক্তিজীবনেও রসিক ছিলেন। পাকিস্তানী আমলে খান উপাধি বেশ জমজমাট ছিল। বাঙালি মুসলমানরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের দেখে অনেকেই ‘খান’ ব্যবহার করতেন। তাই না দেখে কবি ছড়া কাটলেনÑ
একে খান, ওকে খান/আগে খান, পিছে খান/যাকে পান, তাকে খান।
কবি ফররুখ আহমদ কুরআনের চিরন্তনী বাণী ও অনুপম কাব্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছু কিছু আয়াতের তর্জমা করেন। তার এই কাব্যানুবাদ তৎকালীন ‘সাওগাত’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ পর্যায়ে সূরা আয়াতুল কুরসির মর্মানুবাদের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছিÑ
তিনি আল্লাহ চির জীবন্ত শাশ্বত প্রাণবান/তিনি অতন্দ্র চির উপাস্য একক অধীশ্বর/পৃথিবী নীলের মধ্যবর্তী সম্পদ, সুমহান/সবই শুধু তার, সবাই করে তাঁর করুণার নির্ভর/তাঁর অনুমতি বিনা কে করতে পারে বলো আবেদন?/তিনি যে প্রাজ্ঞ যাহা সম্মুখে যা পিছে সংগোপন,/তাহার অসীম করুণা ব্যতীত পারে না মানব মন/বুঝিতে তাহার বিপুল জ্ঞানের বিন্দু নিদর্শন।
জ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বাসে জোর না বাঁধিলে বাক্য বন্ধন সুদৃঢ় হয় না। কবির কাব্য সাধনাই ছিল বিশ্বাসের মালা গাঁথা।
কবির সচেতন প্রয়াসের ফসল-‘হরফের ছড়া’, ‘ছড়ার আসর’, ‘পাখির বাসা’ ইত্যাদি শিশু ও কিশোর গ্রন্থ এবং পুঁথি কাব্যে ‘হাতেম তা’য়ী’, গীতি কাব্যে ‘নৌফেল ও হাতেম’। কাব্য তার ‘সাত সাগরের মাঝি’ সিরাজুম মুনীরা, ডাহুক, পাঞ্জেরী, সিন্দাবাদ, বার দরিয়ার শেষ রাত্রি মুহূর্তের কবিতা প্রভৃতি কাব্য গ্রন্থ তাঁকে আদর্শ নিষ্ঠ খাঁটি ও নির্লোভ কবির খেতাব এনে দিয়েছে।
ফররুখের কৃতিত্ব তিনি আদর্শের স্বপ্নে আপোষহীন। তিনি শব্দ চয়নে অস্বাভাবিক সাফল্য অর্জন করেছেন। শখ চয়নের ক্ষেত্রে আরবী, ফারসী শব্দের পাশাপাশি তৎসম ও তদ্ভব শব্দের ব্যবহার করতে কার্পণ্য করেননি।
কবি ফররুখ আহমদ মূলত ইসলামী রেনেসাঁর কবি। তিনি ইসলামের জীবনাদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী। তার কবিতায় ইসলামের গণজাগরণবাদের বাণীতে মুখরিত।
আমরা মানুষকে বিচার করি খ-িত রূপে। মার্কিন কবি ওয়ালেস স্টিভেনসের সুখপাঠ্য একটি কবিতার নাম ‘লাইন ওয়েজ অফ লুকিং এ্যাট এ নাইটিঙ্গেল। কবিতাটির বক্তব্য হলোÑ একটি বুলবুলিকে নয়টি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা সম্ভব এবং সবকটি দৃষ্টিকোণই সুষমাম-িত। বলাবাহুল্য এই কবি কল্পনায় একটি জিনিসকে বহুভাবে দেখা সম্ভব। কিন্তু যারা সৌন্দর্য বিশ্লেষণ না করে নিজের প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির বিচার বিশ্লেষণ করেন তারা অনেকটা ময়ুরের সৌন্দর্য না দেখে তার পা দেখার মতো কা- করেন।
কবি জীবনব্যাপী সমুদ্রের বালুকারাশি থেকে ঝিনুক কুড়িয়েছেন মুক্তা অন্বেষণের জন্য। তাঁর সাধনার কমতি ছিল না বলেই তিনি সফল হতে পেরেছিলেন। পরিশেষে কবির ভাষায় শেষ কথা বলিÑ
কিছু লেখা হলো আর/অলিখিত রয়ে গেল ঢের/কিছু বলা হলো আর হয়নি/অনেক কিছু বলা।/অনেক দিগন্তে আজও হয় নাই/শুরু পথ চলা/কে জানে সকল কথা।/কে পেয়েছে সংজ্ঞা সময়ের।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT