সাহিত্য

মলাটের ভিতরে বিচিত্র অবয়ব

হুসাইন মুহাম্মদ ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৫:৩০ | সংবাদটি ১৫৫ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্যে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে ছড়ার অবস্থান। যে কোন বিষয়কে সহজ-সাবলীল, হৃদয়গ্রাহী ও বোধগম্য করে উপস্থাপন করার উপযুক্ত মাধ্যম হলো ছড়া। সাহিত্য বিশারদগণ বলেন, ছড়াই বাংলা সাহিত্যের আদিসৃষ্টি বা মাতা। ধরা যায় প্রত্যেক ছড়াই এক ধরণের কবিতা। আবার প্রত্যেক কবিতা ছড়া নয়। ছড়ার প্রকাশ ও ব্যাপ্তি অন্ত্যমিলের হাতধরে। ছড়ায় ছন্দের প্রবহমানতা চিত্রের রূপ অনিন্দ্য পদ্ধতিতে বয়ান করে। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগেও যখন বাংলা ভাষা সুনির্দিষ্ট লিখিত রূপ পায়নি, তখন থেকেই লোকেরা মুখে মুখে ছড়া রচনা করে মনের ভাব প্রকাশ করতো। সেইসব ছড়াকে আদি বা লোকছড়া বলা হয়। আর আধুনিক যুগের ছড়াকে বলা হয় আধুনিক ছড়া।
অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, ‘ছড়া যদি কৃত্রিম হয় তবে তা ছড়াই নয়, তা হালকা চালের পদ্য। তাতে বাহাদুরি থাকতে পারে, কারিগরি থাকতে পারে, কিন্তু তা আবহমানকাল প্রচলিত খাটি দেশজ ছড়ার সঙ্গে মিশ খায় না। মিশ খাওয়ানোটাই আমার লক্ষ্য। যদি লক্ষ্যভেদ করতে পারি তবেই আমার ছড়া মিশ খাবে, নয়তো নয়’। অন্যদিকে ছড়াকার আবদুল হাসিব এর মতে, ‘ছন্দ আর অন্ত্যমিলের প্রতি যতœশীল হয়ে হালকা চালে সহজ শব্দের সমন্বয় সাধন করে বিষয়কে প্রকাশ করবার জন্যে যে পদ বা পদসমষ্টির সৃষ্টি করা হয় তাকে ছড়া বলে।’ উপরোক্ত দুটি সংজ্ঞা থেকে ছড়া সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়। ছড়া হতে হবে হালকা চালের পদ্য। অর্থবহ শব্দচয়ন, ছন্দের কারুকাজ ও যথাযথ অন্ত্যমিল থাকতে হবে।
ছড়াসাহিত্যে বেলাল মনজু একটি পরিচিত নাম। প্রবাসের নানাবিধ গ্লানী ও ব্যস্ততা সত্ত্বেও অবিরাম লিখে চলেছেন। পত্র-পত্রিকা ছাড়াও অনলাইনে বিভিন্ন সাহিত্যগ্রুপে এই ছড়াকারের রয়েছে সক্রিয় উপস্থিতি। ২০১৮ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় ছড়াগ্রন্থ ‘মা’। বেলাল মনজু প্রণীত ‘মা’ গ্রন্থটি বিচিত্র অবয়ব ধারণ করে আছে। ৬৪ পৃষ্টার (চার ফর্মা) এই গ্রন্থে ৪৮ টি ছড়ার সমাবেশ ঘটেছে। প্রত্যেকটি ছড়াই সরল হৃদয় ও হৃদয়গ্রাহী চিত্রের ভাব উন্মোচন করে বিষয়বস্তুর আন্তভিন্নতার ভিতর দিয়ে। ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে’ শিরোনামে শুরু হওয়া এই গ্রন্থটি সমাপ্ত হয়েছে ‘প্রতিবাদ’ ছড়ার মাধ্যমে।
‘সুপ্ত আমার অন্তরে
বাড়ছে শিশু মন্তরে।
নিত্য করে জিগাংসা
খুঁজে বেড়ায় মিমাংসা।
যাচ্ছে এখন ক্রান্তিকাল
চুপটি কেন মহাকাল।
আসছে জোয়ার সমুদ্রে
মিথ্যে কেন প্রবোধরে।
ছড়ায়ে দাও ছন্দরে
নোঙর খোলা বন্দরে।
কিসের এতো অলীকভয়
পদতলে করবো জয়।’
(অসমাপ্ত)
‘প্রতিবাদ’-এ মাত্রা ও অন্তমিলের যথাযথ প্রয়োগ করে বেলাল মনজু জাগতিক অশুদ্ধতা, অবরুদ্ধ শান্তি ও দুনিয়াব্যাপী অসুন্দরের বিস্তারকে উল্লেখ করেন। সমাজের পীঠে ‘জীর্ণজরা’র আক্রমন দেখে তার আত্মা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। একইসঙ্গে মানুষ ও মানবতার সমন্বয়ে একটি নতুন পৃথিবী গড়ার আহবান জানায়।
একদিন এক দিনভিখারি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল
হেঁটে হেঁটে পেরে ভিতর ভীষণ ক্ষুধা পাচ্ছিল
সামনে বিশাল বাড়ী যে এক গেটে তালা ঝুলছিল
খানিক পরে গার্ডে এসে গেটের তালা খুলছিল
ঐ ভিখারী গার্ডকে গিয়ে বিনয় করে বলছিল
একটু যদি খাবার দিতে ক্ষিধাতে পেঠ জ্বলছিল
গার্ডটা অনেক ভালো মানুষ নরম যে তার দিল ছিল
বাড়ীতে এক ভোজন সভায় সবাই এসে মিলছিল
বাড়ির গিন্নি বাড়ির ভিতর তাদের নিয়ে খাচ্ছিল
গার্ডটি গিয়ে কয় ভিখারি খাবার কিছু চাচ্ছিল
গিন্নি তখন রেগেমেগে গার্ডকে অনেক বকছিল
ফন্নী খাবে খোরমাপোলাও খুব ভালো তো শখছিল।
(বৃদ্ধাশ্রম, অসমাপ্ত)
‘ছন্দ আর অন্তমিলের প্রতি’ বেলাল মনজু কতটা ‘যতœশীল’ তা প্রকাশ পায় এই ছড়ায়। ‘যাচ্ছিলো, পাচ্ছিল। ঝুলছিল, খুলছিল’ ইত্যাদি অন্ত্যমিলগুলো অনর্গল তরঙ্গের প্রবাহে পাঠকান্তরে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। মাত্রার পরিপূর্ণ মিল রেখে একইসঙ্গে সমাজের অসুস্থ প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। এভাবে তার অন্যান্য ছড়া, যেমনÑ
রবীন্দ্রনাথ স্কুল পালাতেন
নজরুল তো পড়লোই না,
লালনে তো দুহাত দিয়ে
বই কখনো ধরলোই না।
কার্নেগী খুব গরীব ছিলেন
ময়লা পোষাক গায় ছিল,
সেই দোষেতে পার্কে উনার
ঢুকতে বারণ তায় ছিল।
তিরিশ বছর পরে তিনিই
সেই পার্কটি কিনে নেন,
সবার জন্য ওপেন করে
পয়সাকড়ি বিনে দেন।
(সাফল্য, অসমাপ্ত)
আকাশ কতো বিশাল দেখো
বৃষ্টি ঢালে ধরায়,
পাখ-পাখালি, গাছ-গাছালি
বাঁচিয়ে রাখে ধরায়।
সেই আকাশই লঘুচাপে
হঠাৎ উঠে রেগে,
ধরার উপর আঘাত হানে
ক্ষিপ্রবায়ু বেগে।
(রাগ, অসমাপ্ত)
রুক্ষ শীতে শুষ্ক যখন
ওষ্ট ফেটে দু’খান,
ভদ্রলোকে প্রলেপ মেখে
উমের ভিতর লুকান।
ঊষার কালে তুষার যখন
হিমও বায়ু বহে,
ছেঁড়া বস্ত্রে নিঃস্ব তাহা
কী! যাতনায় সহে।
(নিঃস্ব, অসমাপ্ত)
না, এটি না গল্প কথা
কিংবা কোন কল্প কথা
বলছি আমি বাংলাদেশের
দুর্নীতিটার দিক
প্রশাসনে নেইতো শাসন
নেতার মুখে বড় ভাষণ
সত্যটা আজ ফিক
ধিক তোমাদের ধিক।
(ধিক তোমাদের ধিক, অসমাপ্ত)
একই বছরে তার আরেকটি শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ বের হয়। বাচ্চাদের হৃদয়ের মতো নরোম ও সাবলীল ‘ঢিসুম ঢিসুম ভিসুম ভিসুম’। সহজ শব্দের কারুকাজে নান্দনিক ছন্দ গঠন করতে পারদর্শী বেলাল মনজু শিশুতোষ কয়েকটি ছড়া যেমন,
এসো একটা গল্প বলি
গল্প হলো যাদুর,
এই দেখে নাও একটি কাঠি
একটি আছে মাদুর।
(যাদুর গল্প, সংক্ষেপিত)
অচেনা এক মাঠের পরে
একটি গরুর পাল গেল
মাঠের রূপে মুগ্ধ হয়ে
পুরোটা বিকাল গেল।
(অচেনা মাঠ)
কাঁথাসেলাই থেকে মাগো
একটু সুতা দাও,
উড়োজাহাজ ভিড় করেছে
পাশের বনের ঝাও।
(উড়োজাহাজ)
প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ ছাড়াও বাংলাদেশ, ভারত ও ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত যৌথগ্রন্থে রয়েছে বেলাল মনজু’র অংশগ্রহণ।
নান্দনিক এই ছড়াকার ১৯৮৩ সালের ১৮ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাধীন জাউয়াবাজার এলাকার দেবেরগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবদুল মোছাব্বির ও মাতা সুফিয়া খাতুন।
বেলাল মনজু দেশে পড়াশোনা করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লন্ডনস্থ হোয়াইটচ্যাপেল কলেজ ও ইউপি ভিসি থেকে হেইচএনডি ইন বিজন্যাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্রাইটন শহরে বসবাস করছেন। লেখালেখি তার প্রিয় শখের মধ্যে অন্যতম। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থ দুটি। ‘মা’, দাঁড়িকমা প্রকাশন, পৃষ্টা ৬৪, মূল্য ১৩৫ টাকা। ঢিসুম ঢিসুম ভিসুম ভিসুম, পাপড়ি প্রকাশন, পৃষ্টা ১৬, মূল্য ৬০ টাকা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT