সম্পাদকীয় যে ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও আঘাতকারীকে ক্ষমা করে আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি ও পাপ মার্জনা করেন। -আল হাদিস

বাঁশ বেত শিল্পের বিপর্যয়

প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০১৮ ইং ০১:০৭:৩৭ | সংবাদটি ২৮ বার পঠিত

ছেলেবেলা কবিতাটি পড়েননি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ ওঠেছে ঐ’। হয়তো অলস মুহূর্তে আজও ভেসে ওঠে চোখের সামনে সেই বাঁশ বাগান, সেই চাঁদ। আজ এই ধরনের দৃশ্য শুধু কল্পনায়ই পাওয়া যাবে। কিন্তু ছেলেবেলায় সেটা ছিলো বাস্তব। কারণ এখন আকাশে চাঁদ ওঠে ঠিকই, কিন্তু সেই বাঁশ বাগান নেই। ছায়া সুনিবিড় গ্রাম থেকে, একে একে যেন হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ বাগান। সেইসঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেতশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক-কারিগর বেকার হয়ে পড়ছে। সরকারের অসহযোগিতা এবং সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবে উদ্ভব হয়েছে এই পরিস্থিতির। বাঁশ ও বেতের সামগ্রীর বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যাপক প্রসার ঘটাও বাঁশ-বেত শিল্পের ধ্বংসের আরেকটি কারণ। যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষ বাঁশ ও বেতের তৈরি আসবাবপত্র ব্যবহার করে আসছে। এই দ্রব্যের ব্যবহার অনেকের কাছে এক ধরনের ‘আভিজাত্য’ বলেই মনে হয়। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলেই প্রথমে এই বাঁশ ও বেতের আসবাবপত্র তৈরি এবং ব্যবহার শুরু হয় প্রথমে। এরপর তা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখন এই শিল্প প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
বাঁশ ও বেতশিল্পের গোড়াপত্তন হয় সিলেট অঞ্চলে সর্বপ্রথম। এর কাঁচামাল অর্থাৎ বাঁশ ও বেতের উৎপাদন এখানে প্রচুর হয় বলেই সাধারণ মানুষ এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে- চেয়ার, টেবিল, সোফা, আলমিরা, খাট, পালংক, মোড়া, দোলনা, অফিস পার্টিশনসহ অন্যান্য দ্রব্য। ঘরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য এই সব আসবাবপত্রের ‘ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাঁশ-বেতসামগ্রী বিদেশে রপ্তানী করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। সুদূর অতীত থেকে এই ধারা শুরু হলেও বর্তমানে এতে ভাটা পড়েছে। এখন অনেকটাই কমে গেছে এই রপ্তানী। নানা সমস্যায় রয়েছে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক-কারিগর-ব্যবসায়ী।
প্রধানতঃ কাঁচামালের অভাবে এই শিল্পের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। বাঁশ ও বেতের একসময় যথেষ্ট উৎপাদন হতো এদেশে। কিন্তু ইদানিং তেমন উৎপাদন হচ্ছে না। উৎপাদনের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বনজঙ্গল পরিস্কার করে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ফসল চাষের ফলে এখন বাঁশ ও বেতের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। তাছাড়া, পরিকল্পিতভাবে এগুলো চাষেরও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। অপরদিকে দেশে বেতের উৎপাদন না হওয়ায় ভারত ও বার্মা থেকে চোরাই পথে বেত আমদানী করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে সংশ্লিষ্টদের অতিরিক্ত অর্থব্যয় হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দামও পড়ছে বেশি। এই শিল্পে বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে এর বিকল্প প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যাপক বিস্তার। বাঁশ-বেতের সামগ্রীর তুলনায় প্লাস্টিক সামগ্রীর দামও তুলনামূলকভাবে কম। এ জন্য ক্রেতারাও প্লাস্টিক সামগ্রীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। প্রথমে এর কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উদ্যোগে বিশেষ বিশেষ এলাকায় বাঁশ-বেত চাষেরও উদ্যোগ নেয়া দরকার। এই ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান যারা গড়ে তুলেছে বা যারা আগ্রহী তাদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নানাভাবে উৎসাহ প্রদান করা দরকার। কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানী করা হয় চোরাই পথে। এটা বন্ধ করতে হবে। বাঁশবেত আমাদের নিজস্ব সম্পদ। এর উৎপাদন আমাদেরকেই বাড়াতে হবে। শুধু তাই নয়, বাঁশ বেতের সামগ্রী বিদেশে রপ্তানী করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT