স্বাস্থ্য কুশল

নিরাপদ মাতৃত্ব রক্ষায় প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মিডওয়াইফ

সৈয়দা রওশন আরা পারভীন প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৩:১৩ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মায়ের মৃত্যুহার অনেক বেশি। বাংলাদেশে মায়ের মৃত্যুহার প্রতি এক লক্ষ জীবিত শিশু জন্মে ১৯৪ জন। অধিকাংশ মৃত্যুই গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে হয়ে থাকে। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বাস করে গ্রামে, যেখানে অধিকাংশ মায়েরা তাদের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসূতিকালীন সেবা ও যতেœর জন্য অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ এবং সনাতনী ধাত্রীদের উপর নির্ভরশীল। গর্ভসংক্রান্ত যেসব জটিলতায় মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটে তার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। যদি সময় মতো এসব জটিলতা সনাক্ত করে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাহলে এসব মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মিডওয়াইফ।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতাসহ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবার কথা সরাসরি উল্লেখ আছে। এসডিজির লক্ষ্য ৩-এ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা ও সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু কমাতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যে সর্বজনীন প্রবেশাধিকার। এসডিজির লক্ষ্য ৫-এ লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন করা এবং এসডিজির লক্ষ্য ১০-এ বৈষম্য হ্রাস করতে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এসডিজির এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন পেশাদার মিডওয়াইফ পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তাদের অংশীদার করা। পেশাদার মিডওয়াইফেরা বিশ্বজুড়ে যৌন ও প্রজনন বিষয়ে অভিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। তারা নারী ও মেয়েদের অধিকার রক্ষায়ও সরব। পেশাদার মিডওয়াইফেরা আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির সহায়তায় নারীদের সেবা দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি পেশাদার মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি করেছে।
নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য মিডওয়াইফের সেবা অপরিহার্য। মাতৃমৃত্যু কমাতে এই সেবার বিশেষ ভূমিকা আছে। মিডওয়াইফারি সেবার প্রসার ও এই সেবার ব্যাপ্তির ব্যাপারে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতি আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে জাতিসংঘে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। মিডওয়াইফ শিক্ষা, প্রশিক্ষণে এখন ১৬টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মিডওয়াইফারি শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশে ২০১২ সালে এই পেশা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এরই আলোকে বেসরকারি পর্যায়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তার ৬টি সহযোগী সংস্থার অংশীদারিত্বে এবং ঢাকায় অবস্থিত একটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা পরিচালিত ডেভেলপিং মিডওয়াইফ প্রকল্প (ডিএমপি) বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০১২ সাল থেকে যার আর্থিক সহায়তা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষ ও সক্ষম মিডওয়াইফ পেশাজীবি তৈরি করা, যারা মা ও নবজাতকের জন্য উন্নত ও গুনগতমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।
ডিপ্লোমা-ইন-মিডওয়াইফারি তিন বছর মেয়াদি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যার মন্ত্রনালয় কর্তৃক অনুমোদিত। প্রতি বছর দুটি সেমিষ্টার হিসেবে তিন বছরে ছয়টি সেমিষ্টারের মাধ্যমে এই শিক্ষা কার্যক্রমটি সম্পন্ন হয়। এই শিক্ষা কার্যক্রমটি জাতীয় মানদন্ড অনুযায়ী প্রণীত দক্ষতা-ভিত্তিক পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে যা বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ৬টি মডিউলসহ এই শিক্ষা কার্যক্রমে ৪৭টি মডিউল-এর শিক্ষা সম্পন্ন করা হয়, যার ৪০ শতাংশ তাত্ত্বিক এবং ৬০ শতাংশ ব্যবহারিক শিক্ষা। শিক্ষার্থীরা কমিউনিটিতে গিয়ে তত্ত্বীয় শিক্ষার ব্যবহারিক অনুশীলনের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। এই শিক্ষা কার্যক্রমের যাবতীয় উপকরণ প্রস্তুত, বিতরণ, গুনগত মান নিশ্চিত করা এবং একাডেমিক সাইটে তা সরবরাহের তত্ত্বাবধানে আছে ডেভেলপিং মিডওয়াইফ প্রকল্পের মিডওয়াইফারি এডুকেশন টিম। এছাড়া প্রকল্পটির সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টেকনিক্যাল এ্যাডভাইজরী গ্রুপ আছে যারা প্রকল্পটিকে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদানের জন্য বছরে দুবার সম্মিলিত হয়।
মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবায় একজন মিডওয়াইফের ভূমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখনই একজন প্রসূতির ও নবজাতকের সেবা প্রদানকারীর প্রয়োজন হয়, অবশ্যই এমন একজনকে বেছে নিতে হবে যে সবচাইতে নিরাপদে ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সন্তান জন্মদানে সহায়তা করে। কমিউনিটি বেইজড মিডওয়াইফারি শিক্ষা কার্যক্রমটি দেশের প্রত্যন্ত ও অনুন্নত গ্রামীণ ও শহুরে জনপদে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে বাংলাদেশ সরকারের ‘দেশে দক্ষ মিডওয়াইফ’ গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অবদান রাখছে। একজন মিডওয়াইফ শুধুমাত্র একজন নারীকেই নয় বরং একটি পরিবারের ও কমিউনিটির স্বাস্থ্যগত পরামর্শদাতা, যিনি স্বাস্থ্য কাউন্সিলিং ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
একজন মিডওয়াইফ একাধারে সেবাদানকারী, গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী সময়ে একজন নারী ও নবাগত শিশুর সহায়তাকারী। নারী পুরুষকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব গ্রহণে তৈরি হতে ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। নারীর সার্বিক স্বাস্থ্যশিক্ষা বিশেষ করে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত করায় সহায়তা প্রদান করে। শুধুমাত্র হাসপাতালেই আবদ্ধ নয় বাড়িতে, কমিউনিটিতে, ক্লিনিকে যে কোন পরিবেশে ও পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারেন একজন মিডওয়াইফ। একজন মাকে গর্ভকালীন সময় থেকে শুরু করে সরকারি সিডিউল অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় চেকআপ, টিটি টিকা গ্রহণ, প্রসব প্রস্তুতী ও প্রসবে সহায়তা ও প্রসব পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেন মিডওয়াইফ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি সহযোগী সংস্থার মধ্যে অন্যতম একটি হলো সীমান্তিক। জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি এই উন্নয়ন সংস্থা ১৯৭৯ সাল থেকে সিলেট বিভাগে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে সার্বিকভাবে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের অবস্থার উন্নতি ঘটলেও সিলেট বিভাগ এ ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে আছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সীমান্তিক পরিচালিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন একাডেমিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তিক ডিল্পোমা ইন নার্সিং সায়েন্স এন্ড মিডওয়াইফারি, কমিউনিটে প্যারামেডিক, মেডিকেল অ্যাসিষ্টান্ট এবং ডিপ্লোমা-ইন-মিডওয়াইফারি প্রকল্প অন্যতম।
ডিপ্লোমা-ইন-মিডওয়াইফারি প্রকল্প ২০১২ সাল থেকে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে পরিচালনা করে আসছে। ইতিমধ্যে প্রথম ব্যাচের ৩০ জন ছাত্রী ডিসেম্বর ২০১৫ সালে এবং দ্বিতীয় ব্যাচ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। এখানে উল্লেখ্য যে ২০১৭ সালের গ্রাজুয়েশন পরীক্ষায় ব্র্যাকের ৬টি সহযোগী সংস্থার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সীমান্তিক এবং ৬টি ব্যাচের ১৫০ জন ছাত্রীর মধ্যে প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্রীও সীমান্তিকের। সিলেট মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র উপশহর পয়েন্টে সুবিশাল নিজস্ব ক্যাম্পাস সীমান্তিকের। অভিজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলী দ্বারা ক্লাশ পরিচালনা এবং সুপরিসর মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারনেট সমৃদ্ধ পর্যাপ্তসংখক শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। আছে ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি ও মনোরম ছাত্রীনিবাস। বিদেশে উচ্চবেতনে চাকুরি ও উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ সুবিধার জন্য রয়েছে ইংরেজি ও আরবী পাঠ্যক্রম। সরকারি হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল প্রাকটিসের সুযোগসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও ক্লিনিক্যাল প্রাকটিস করে ছাত্রীরা। সীমান্তিক বিশ্বাস করে শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল মিডওয়াইফারি কর্মীবৃন্দই পারে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি নিরাপদ প্রসব ও প্রসব পরবর্তী নারী ও নবজাত শিশুর সেবা নিশ্চিত করতে। মিডওয়াইফই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবেন বলে প্রত্যাশা করছি।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • থাইরয়েড সমস্যা ও সমাধান
  • আমের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগুণ
  • এলোভেরা ও প্রপোলিস : দাঁতের যতেœ চমৎকার এক জুটি
  • অর্জুনের এত্তো গুণ
  • রোগ প্রতিরোধে আমলকী
  • ঔষধি গুণের ইলিশ
  • ওমেগা-থ্রি : মানবদেহে এর গুরুত্ব
  • নিরাপদ মাতৃত্ব রক্ষায় প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মিডওয়াইফ
  • রক্ত স্বল্পতা : জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • দেশে দেশে রোজা
  • যাকাত দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার
  • এতেকাফ ঈমানি তারবিয়াতের পাঠশালা
  • এলার্জির চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা
  • রোগ প্রতিরোধে তেঁতুল
  •  শিশুর প্রস্রাবে ইনফেকশন
  • ত্বকের সোরিয়াসিস
  • হেঁচকি উঠলে কী করবেন
  • কানে পানি জমে গেলে
  • গরমে ত্বকে র‌্যাশ উঠলে করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT