স্বাস্থ্য কুশল

ওমেগা-থ্রি : মানবদেহে এর গুরুত্ব

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৪:১৮ | সংবাদটি ১৯২ বার পঠিত

একটি কার্বক্সিলমূলক যুক্ত এলিফেটিক জৈব যৌগসমূহকে ফ্যাটি এসিড বলা হয়। যেমনÑ এসিটিক এসিড (সিরকা বা ভিনেগার)। ফ্যাটি এসিড শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এটি দু’প্রকার। যথাÑ সেচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ও আনসেচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত। মাংসে সেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়। যেমনÑ চিকেন, বিফ, মাটন ইত্যাদি। সেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড বেশি পরিমাণে খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কারণ এতে শরীরে কোলেস্টেরল জমা হয়ে ব্লকেজ ও হার্ট এটাক দেখা দিতে পারে। সেই তুলনায় আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড নিরাপদ যা মাছ, মাছের তেল ও বিভিন্ন ভেজিটেবল অয়েলে পাওয়া যায়। আনসেচুরেটড ফ্যাটি এসিড আবার দু’প্রকার। যথাÑ এসেনশিয়াল ও নন-এসেনশিয়াল। এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড হচ্ছে সেই এসিড যা শরীরে উৎপন্ন হয় না এবং যার জন্য খাদ্য উৎসের উপর নির্ভর করতে হয়। নন-এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড হচ্ছে সেই এসিড যা শরীরে অন্যান্য খাদ্য উপাদানের বিয়োজন থেকে উৎপন্ন হয়। এজন্য সরাসরি কোন খাদ্যের উপর নির্ভর করতে হয় না। ওমেগা-নাইন ফ্যাটি এসিড হচ্ছে একটি নন-এসেনশিয়াল ফ্যাট এসিড। ওমেগা-নাইন এর একটি ভালো উৎস হলো অলিভ অয়েল।
ফিরে যাচ্ছি এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড প্রসঙ্গে। এটি আবার দু’প্রকার। যথাÑ ওমেগা-থ্রি ও ওমেগা-সিক্স। ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি এসিডের উৎস হলো বিভিন্ন ভেজিটেবল অয়েল। যেমন- কর্ন অয়েল, সয়াবিন অয়েল, ক্যানালা অয়েল, বাদাম তেল, সূর্যমুখী তেল ইত্যাদি। আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয় হলো ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড। ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি এসিডের উৎসগুলো সহজলভ্য হলেও বর্তমানে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের উৎস ততোটা সহজলভ্য নয়। অথচ এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। ওমেগা-থ্রি এর দু’টি উদাহরণ হলো ইকোসাপেন্টানয়িক এসিড ও ডকোসাহেক্সানয়িক এসিড। সংক্ষেপে ঊচঅ ও উঐঅ।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো দ্বীপ হলো গ্রীণল্যান্ড। এটি আর্কটিক সাগর ও উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত। এর আয়তন ২.১৬ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর বারোতম বৃহত্তম দেশ। জনসংখ্যা মাত্র ৫৭ হাজার। ডঃ জন ডিয়ারবার্গ নামক একজন চিকিৎসক যাকে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের আবিষ্কারক বলা হয়। তিনি ১৯৭০ সালে একদল ডেনিশ চিকিৎসককে নিয়ে গ্রীণল্যান্ড এস্কিমো জাতির উপরে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। এছাড়া আরো চারবার অর্থাৎ মোট পাঁচবার তিনি গ্রীণল্যান্ড ভ্রমণ করেন এস্কিমোদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সাড়ে তিনশ’র মতো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এ থেকে জানা যায় এস্কিমো জাতি বরফে আচ্ছাদিত গ্রীনল্যান্ড বাস করলেও এবং সেখানে পুষ্টিকর খাবারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলেও তাদের স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে ভালো। বিশেষ করে দু’টি রোগ থেকে তারা ছিলো একেবারেই মুক্ত। এগুলো হলো হৃদরোগ ও আর্থ্রাইটিস। অর্থাৎ তাদের হৃদপিন্ড সব সময় সুস্থ এবং হাড়ের গঠনও মজবুত। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এস্কিমোরা পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-থ্রি ফ্যটি এসিড গ্রহণ করে বলেই তারা এতো সুস্থ। আর এই ফ্যাটি এসিডের যোগান তারা পেয়ে থাকে বরফে আচ্ছাদিত আর্কটিক সাগরের তলদেশে বিচরণকারী বিভিন্ন জাতের সামুদ্রিক মাছ থেকে। প্রচলিত বাজার দর অনুযায়ী এই মাছগুলো খুব দামী। যেমনÑ টুনা, সেরেনা, স্যামন, সার্ডিন, এনকভি, মেকারেল, কেলামারি, কডফিশ ইত্যাদি। একজন মানুষের হার্ট সুস্থ রাখার জন্য প্রতিদিন ১০০০-২০০০ মিলিগ্রাম এবং হাড় মজবুত রাখার জন্য প্রতিদিন ৬০০০-৯০০০ মিলিগ্রাম ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড তার খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত। এস্কিমোরা এটি পর্যাপ্ত পরিমাণে সহজেই পেয়ে থাকে। তাই তারা এতো সুস্থ। ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের উৎসগুলোকে গুণগত মানের দিক থেকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যেমনÑ গুড, বেটার ও বেস্ট।
১) গুড বা ভালো উৎসÑ এগুলো হলো ভেজিটেবল অয়েল। তবে এতে সীমিত পরিমাণ ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়।
২) বেটার বা আরো ভালো উৎসÑ এগুলো হলো বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ। সামুদ্রিক মাছ ভালো উৎস হলেও পরিবেশ দূষণের প্রভাবে আজকাল সাগরের পানিও দূষিত হচ্ছে। এ পানিতে বিষাক্ত ধাতু মার্কারি পাওয়া গেছে। মাছের খামারে যদি সামুদ্রিক মাছের চাষ করা হয় তবে বিভিন্ন ক্যামিকেল মিশ্রিত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া বাজারে মাছ নিয়ে আসার সময় তাতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় যাতে মাছ দীর্ঘসময় তাজা থাকে ও পঁচে না যায়। এসব কারণে মাছের উৎসকেও এখন আর সেরা বা ১০০% বিশুদ্ধ উৎস বলা যায় না।
৩) বেস্ট বা সবচেয়ে ভালো উৎস আজকাল সচেতন মানুষ মাত্রই দৈনন্দিন খাদ্যের পাশাপাশি ফুড সাপ্লিমেন্টস্ বা খাদ্য পরিপূরক গ্রহণ করে থাকেন। খাদ্য থেকে প্রাপ্ত পুষ্টির ঘাটতি আমরা খাদ্য পরিপূরক গ্রহণের মাধ্যমে পুষিয়ে নিয়ে থাকি। আর্কটিক সাগরে বসবাসকারী মাছের উৎস থেকে প্রাপ্ত তেল থেকে তৈরি ফুড সাপ্লিমেন্টস্ বা খাদ্য পরিপূরক বর্তমান সময়ে আমাদের জন্য হতে পারে ওমেগা-থ্রি এসিডের সবচেয়ে ভালো ও চমৎকার উৎস। আর্কটিক সাগরের অধিকাংশ জলভাগ বছরের পুরোটা সময়ই বরফে আচ্ছাদিত থাকে। তাই এখানে পানি দূষণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই বরফের নিচে বিচরণকারী মাছগুলো ফরমালিন বা অন্যান্য ক্যামিক্যাল থেকে মুক্ত থাকার কারণে বিশুদ্ধ ও তরতাজা থাকে।
কীভাবে বুঝবেন বাজারে প্রচলিত ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের ফুড সাপ্লিমেন্টগুলোর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য উত্তম? সেক্ষেত্রে রইলো কিছু নির্দেশিকাÑ
১) মানুষের দেহে ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি এসিডের প্রয়োজনীয় অনুপাত হলো ১:১। ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি এসিডের উৎস বিভিন্ন ভেজিটেবিল অয়েল হওয়াতে এটি সহজলভ্য। কিছু ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের উৎস সহজলভ্য না হওয়াতে মানুষের শরীরে এ দু’টি ফ্যাটি এসিডের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ দু’টিই এসেনশিয়াল বা অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড যা শরীরের জন্য প্রয়োজন।
২) মানবদেহে ঊচঅ ও উঐঅ এর প্রয়োজনীয় অনুপাত হলো ১:৪। অর্থাৎ শরীরে ঊচঅ যতোটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে চারগুণ বেশি প্রয়োজন উঐঅ।
৩) ওমেগা-থ্রি ফুড সাপ্লিমেন্টে অন্যান্য উপাদানের পাশাপাশি ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-ই থাকাও প্রয়োজন। যে ফুট সাপ্লিমেন্টেস্ খাওয়ার মাধ্যমে উপরোক্ত চাহিদাগুলো পরিপূর্ণভাবে পূরণ করা যাবে সেটিই হবে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের বেস্ট বা উত্তম উৎস।
মানবদেহে ওমেগা-ত্রি ফ্যাটি এসিডের উপকারিতাগুলো হলো :
১) এটি হার্ট সুস্থ রাখে। ২) অস্থিসন্ধি বা জয়েন্ট মজবুত রাখে। ৩) ত্বক সুন্দর রাখে। ৪) দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। ৫) ব্রেন ও নার্ভ ভালো রাখে। আবেগ ও আচরণগত উন্নতি সাধন করে। ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের এ টু জেড আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি এটি মানবদেহের জন্য কতো গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওমেগা-থ্রি সংযুক্ত হোক আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT