স্বাস্থ্য কুশল

ঔষধি গুণের ইলিশ

মো. মাহফুজুর রহমান মনজু প্রকাশিত হয়েছে: ০২-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৫:৪১ | সংবাদটি ৭৪১ বার পঠিত

ইলিশ, যার বৈজ্ঞানিক নাম ঞবহঁধষড়ংধ রষরংযধ. এটি শ্রেণি বিন্যাসগতভাবে এনিমেলিয়া কিংডম এর অন্তর্ভুক্ত কর্ডাটা পর্বের ক্লুপিডি ফ্যামিলির ঞবহঁধষড়ংধ গনের অতি সুস্বাদু একটি সামুদ্রিক মাছ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। আমাদের মোট আহরণকৃত মাছের প্রায় ১২% হলো ইলিশ এবং জিডিপিতে তার অবদান প্রায় ১.১৫%। সম্প্রতি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্যাটেন্ট স্বীকৃতি পেয়েছে। এরা সাগর, মোহনা ও নদীতে বাস করে জীবনের বিভিন্ন অবস্থায়। আরব সাগর, লোহিত সাগর, বঙ্গোপসাগর, ভিয়েতনাম সাগর, চীন সাগরে এর উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। সাতিল আরব, ইরান-ইরাকের টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী, পাকিস্তানের ইন্ডাস নদী, ভারতের পূর্ব পশ্চিমের নদীতে, মায়ানমারের ইরাওর্য়ার্ডি নদী, বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও উপকূলীয় নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। এরা পরিযায়ী মাছ। প্রজননকালে সাগর হতে স্বাদু পানির নদীতে পরিযান করে। স্বাদু পানিতে ডিম পাড়ে, ডিম ফুটে বাচ্চা হয়, কিছু বড় হয় পরে আবার সাগরে চলে যায় এবং জীবনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করে। প্রজননকালে আবার নদীতে ফিরে যায়। এরা বছরের লম্বা সময় ধরে প্রজনন করে। যা সাধারণত মে মাস থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত বিস্তৃত। বঙ্গোপসাগরের ইলিশ এর প্রজননকাল দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে ছোট পরিসরে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস ও বৃহৎ পরিসরে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশে ধৃত ইলিশের ৮৮% দেশীয় বাজারে বাজারজাত করা হয় এবং বাকী ১২% বিদেশে রপ্তানী করা হয়।
খাদ্যমানের দিক থেকে ইলিশ খুবই উচ্চ খাদ্যমান সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম ইলিশ এ ময়েশ্চার, প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ও এনার্জি যথাক্রমে ৬৬.৯৪% থেকে ৭২.০৪%, ১৮.৯৫% থেকে ২০.৫৬%, ৪.৯৭% থেকে ৮.২১%, ৩.০৮% থেকে ৪.৮৪% এবং ১২৮.৩৮% থেকে ১৬১.৬৮% কিলোক্যালরী পাওয়া যায়। তাছাড়া অধিক পরিমাণে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ পাওয়া যায়। যা অন্য যেকোন ভোজনকৃত মাছ কিংবা মাংসের থেকে বেশি।
হাইপারকলেষ্টেরোলেমিয়া খুবই উদ্বেগজনক রোগ যা রক্তের মধ্যে উচ্চমাত্রায় কলেষ্টেরল এর উপস্থিতিকে বুঝায়। হাইপারকলেষ্টেরোলেমিকে করোনারী হার্ট ডিজিজ (ঈঐউ) ও এমেরোস্কেরোসিম এর প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একে হাইপারলিপিডেমিয়া ও বলা হয় এবং মূলত সিরাম কলেষ্টেরল ও লো ডেন্সিটি লাইপোপ্রোটিন (খউখ) থেকে নির্ধারণ করা হয়। এথেরোস্কেরোসিস হচ্ছে ধমণীর মধ্যে ময়লা জমে রক্ত চলাচলে বাধা প্রদান করা ফলশ্রুতিতে হার্টে ব্লক হয়। যার ফলে মানুষ হ্রদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়। এই ব্লকগুলি এমন সময় ধরা পড়ে তখন ডাক্তার এর তেমন কিছুই করার থাকে না। রক্তে খউখ কে কমানোর মাধ্যমে এথেরোস্কেরোসিসকে পরিবর্তন করে হার্ট ফেইলিউরকে কমানো সম্ভব।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে ইলিশের উপযোগিতা প্রতীয়মান হয়েছে। এ থেকে দেখা যায় ইলিশের তেলের মধ্যে থাকে লম্বা চেইনের পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড (চটঋঅঝ) বিশেষ করে ইকোস্পন্টিনয়িক ঊচঅ এবং ডকোসাহেক্সানয়িক এসিড উঐঅ যা হার্টের জন্য খুবই উপকারী, তাছাড়া বহুমুত্র (ডায়াবেটিক) রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও ধমনীর বিভিন্ন রোগ কমাতে সাহায্য করে। ইলিশের তেল এর ড-৩ চটঋঅং টি ভ্যাজিটেবল তেল ড-৬ চটঋঅং থেকে বেশি কার্যকর মানুষের লিপিও প্রোফাইল কম রাখতে। ডকো হেক্সানয়িক এসিড উঐঅ সিরাম কলেষ্টেরল কমাতে ভীষণ কার্যকর যা গবেষণা ও বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রমাণিত। মহামারী সংক্রান্ত গবেষণা (ঊঢ়রফবসরপ ৎবংবধৎপয) থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রক্তের কলেষ্টেরল এবং লো ডেন্সিটি লাইপোপ্রোটিন (খউখ) কমায় ও হাই ডেন্সিটি লাইপোপ্রোটিন বৃদ্ধি করে এবং এভাবেই করোনারী রোগ জনিত মৃত্যুর হার কমাতে সহায়তা করে। অনুমান করা হয়, জাপানীদের মূলে রয়েছে বেশি পরিমাণে মাছ ও সাগর থেকে আহরিত খাবার। অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে ১০০ গ্রাম ইলিশ প্রতিদিন ১০ মাস খাওয়ার ফলে সিরাম কলেষ্টেরল লেবেল ২৮৫.১ থেকে কমে ২৪৪.৬ সম/ফ/ হয় যা ১৪.২% কম।
অতি আহরণ, ছোট ঝাটকা ধরা, প্রজননকাল না মেনে ডিম ওয়ালা মা মাছ ধরার কারণে অতি সুস্বাদু ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন এ মাছ প্রায় বিপন্ন ছিল। বিগত কয়েক বছর থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ পরিমাণে উৎপাদন, আহরণ এবং ইলিশের অবাদ বিচরণ ও প্রজননের লক্ষে আইন প্রণয়ন করেছেন। এতদউদ্দ্যেশে পহেলা মার্চ থেকে ৩০ শে এপ্রিল পর্যন্ত এবং পহেলা অক্টোবর থেকে ২২শে অক্টোবর পর্যন্ত বছরের এই দুই সময় সব ধরনের ইলিশ ধরা, সংরক্ষণ, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের শাস্তি ও আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই সময়ে মাছ না ধরতে পারার কারণে জেলেরা যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন তা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইন প্রয়োগে বাংলাদেশ নেভি, কোস্ট গার্ড, বিমান বাহিনী, জেলা ও উপজেলা কর্মকর্তা ও র‌্যাব সদা সচেষ্ট ও তৎপর রয়েছেন। ফলশ্রুতিতে বিগত ২/৩ বছর থেকে দূলর্ভ হওয়া ইলিশ জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ার কারণে দেশীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে বিশাল মুদ্রা। আসুন সরকারের দেওয়া আইন মানি ও ইলিশের দেশীয় উৎপাদন বাড়াই, বেশি পরিমাণে ইলিশ খাই এবং সুস্থ থাকি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT