ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০১:৫২ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং-শুক্রবার ১০ অগ্রহায়ণ ১৪০৭ বাংলা, ২৪ নভেম্বর ২০০০ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)।
সামগ্রিকভাবে পর্বতাঞ্চলের ভূমি জরিপ না হলেও, বন্দোবস্তি সূত্রে কিছু জায়গা জমি, কর্ণফুলী হ্রদের দ্বারা প্লাবিত এলাকা এবং ১৯৬৪ সালে কানাডার ফরেস্টল ফরেস্টরী এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কর্তৃক অনুষ্ঠিত আংশিক জরিপের মাধ্যমে কিছু তথ্য লাভ করা গেছে। দেখা যায় কর্ণফুলী হ্রদের প্রভাবিত অঞ্চল হলো ২৫৬ বর্গমাইল বা ১৬৩৮৪০ একর। তন্মধ্যে ৫৪০০০ একর কৃষি জমিও অন্তর্ভুক্ত। বলা হয়ে থাকে ঐ নিমজ্জিত কৃষি জমি হলো গোটা পার্বত্য কৃষি জমির ৪০% এবং এ জমির মালিকও ভোগ দখলকার কৃষক পরিবার সংখ্যায় ১০,০০০ এবং তধোতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত জুমিয়া পরিবার ৮০০০।
গত পঞ্চাশের দশকে গোটা পার্বত্য অঞ্চলে বন্দোবস্তিভুক্ত মোট জমির পরিমাণ ছিলো ৪০০০ একর মাত্র এবং তারও ২০০০ একর একা মাং সর্দারের বন্দোবস্তিভুক্ত নিজস্ব জমি। এটা প্লেনিং বোর্ডের পদত্ত হিসাব, যা প্রফেসার পিয়ের বেসানেত লিখিত পুস্তক ট্রাইবস ম্যান ওফ দি চিটাগাং হিল ট্রাক্টস-এ লিপিবদ্ধ আছে। সুতরাং অবশিষ্ট দু’হাজার একর বন্দোবস্তিভুক্ত জমি মাত্র ব্যক্তিগত বৈধ সম্পত্তির পর্যায়ে পড়ে। আবার প্রকৃত লাঙল চাষী হওয়ার সূত্রে অধিকাংশ সমতল কৃষি জমি বাঙালিদের চাষাধীন ছিলো এবং তারা ছিলো বৈধ বন্দোবস্তিধারী, অথবা পাহাড়ী মালিকের বর্গাদার চাষী। কারণ অধিকাংশ পাহাড়ী লাঙল চাষে অভ্যস্ত ছিলো না।
প্রশাসনিক রাজনৈতিক ও সংখ্যাগত আধিপত্যের কারণে পাহাড়ীরা স্থানীয় জায়গা জমির উপর বন্দোবস্তি হীন দখলাধিকার বিস্তার করেছিলেন। সার্কেল প্রধান, মৌজা প্রধান, পাড়া প্রধান ও বাজার চৌধুরীদের ৯৯% পাহাড়ী হওয়া এবং তাদের হাতে প্রাথমিক ভূমি প্রশাসন ন্যস্ত থাকায় পাহাড়ীরা পছন্দসই জায়গাজমিতে বন্দোবস্তি বহির্ভুত দখলাধিকার বিস্তারের সুযোগ পেয়েছেন। সরকার ও এ কারণে হেডম্যানদের প্রাথমিক পত্তন দানের ক্ষমতা দান করেন যে, সহজে জমি পেলে জুমিয়ারা ক্ষতিকর জুম পেশার বিকল্প রূপে হাল কৃষিতে উৎসাহিত হবে। কিন্তু সরকারের এই শুভেচ্ছা এ কারণে ব্যর্থ হয় যে, হেডম্যান কার্বারী ও চীফদের আয় রোজগার ও ক্ষমতার উৎস হলো জুম কৃষি। তাই তারা তৎ প্রতি অধিক উৎসাহী ছিলেন। ফলে একই সাথে জুম চাষ ও সমতল কৃষি জমি দখলের প্রক্রিয়া চলেছে। যেহেতু হেডম্যান পত্তন দিয়েছেন এবং জমির উপর বাধাহীন ভোগাধিকার বর্তে গেছে, তাই জেলা বা মহকুমা প্রশাসন থেকে চূড়ান্ত বন্দোবস্তি গ্রহণকে কেউই জরুরি মনে করেনি। বন্দোবস্তি হীন ও খাজনা সালামী পরিশোধহীন এরূপ জমিতে তবু আইনানুগ ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কার্যতঃ ঐ জমি সরকারের খাস সম্পত্তির অন্তর্ভুক্তই থেকে গেছে। এসব জায়গা জমি অঘোষিতভাবে পাহাড়ীদের লাখেরাজ বা নিষ্কর সম্পত্তিও নয়। অতীতের সেই সরকারী উদারতার পরিণাম ফল হলো পাহাড়ীদের এ দাবী। গোটা পার্বত্য অঞ্চলই জুম্ম জাতির নিজস্ব সম্পত্তি। এর বিপরীতে সরকার কখনো বলেনি যে, আসলে এটি খাস ও বন আইন ঘোষিত রাষ্ট্রীয় বন, মৌখিক আখ্যায়িত সরকারী সম্পত্তি মাত্র নয়। ১৮৬৫ সালের এক্ট নং ৭ ধারা নং ২ বলে বৈধভাবে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চলটি কঠোরভাবে সংরক্ষিত হয়নি এবং এর প্রশাসন বন বিভাগের হাতে হস্তান্তরিত না হয়ে সাধারণ প্রশাসনের হাতেই রাখা হয়। ফলে এটি শিথিলভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ডেপুটি কমিশনাররা দীর্ঘকাল এই অঞ্চলের বনজ সম্পদ আহরণের পারমিট ও জায়গা জমির লীজ ও বন্দোবস্তি প্রদান করে এসেছেন এবং বাধা না দেয়ায় জুমিয়ারাও তাতে অবাধ জুম চাষ করেছে। যেহেতু সংরক্ষিত আর রাষ্ট্রীয় বনের বাহিরে অতিরিক্ত কোনো আবাদযোগ্য জমি অবশিষ্ট ছিলো না, সেহেতু ভূমিহীন পাহাড়ীদের বাড়ি ঘরের প্রয়োজন মেটাতে তাদের দ্বারা তিরিশ শতক গ্রাম্য খাস জমি বিনা বন্দোবস্তিতে ভোগ দখলের ছাড় মঞ্জুর করা হয়। এই শৈথিল্যের ফলে রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চলের অনাবাদ-যোগ্যতা কঠোরভাবে মানা হয়নি। এহেতু এখন কাগজে কলমেই মাত্র রাষ্ট্রীয় বনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। অধিকন্তু বনাভ্যন্তরের অধিকাংশ আবাদী অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে বন থেকে অবমুক্ত হয়নি। তা করতে হলে ১৮৬৫ সালের এক্ট নং ৭ এর ধারা নং ২ এর উপর সংশোধনী আনতে হবে। এটি প্রচলিত আইন হিসাবে এখনো কার্যকর আছে বলে, ভিন্ন কোনো উপায়ে পত্তনকৃত গ্রামাঞ্চলকে রাষ্ট্রীয় বন থেকে অবমুক্ত করা সম্ভব নয়। যারা জুম ভূমির দাবিতে গোটা পর্বতাঞ্চলকে জুমিয়ানদের জাতীয় ভূমি বলে দাবী করেন, তারা এ কথাটি অবহেলা করেন যে, আসলে জুম চাষটাই বে আইনী।
সে স্থলে জুম ভূমির সংস্থানই আইনসঙ্গত নয়। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের অনেক অপ্রয়োজনীয় ধারাই বাতিল ও রহিত হয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি জুম নিয়ন্ত্রণমূলক ধারা নং ৪১ ও ৪১ (এ) কার্যকর আছে এবং তা আমলযোগ্য।
কর্ণফুলী হ্রদের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনে পঞ্চাশের দশকে মাত্র ৪৫৯.০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা বনমুক্ত করা হয়েছে। অবশিষ্ট আবাদী অঞ্চল এখনো কাগজে পত্রে বন হয়ে আছে। বন থেকে অবমুক্তির আদেশ ছাড়াই সমুদয় গ্রামাঞ্চল অনানুষ্ঠানিক বনমুক্ত এলাকা। এর বাসিন্দাদের মাঝে যাদের লীজ বা বন্দোবস্তি দলিল আছে, একমাত্র তারাই বৈধ বাসিন্দা। বাদ বাকি সবাই অবৈধ দখলদার। এই দখল পুরুষানুক্রিমক হলেও তা বৈধ বলে স্বীকার্য নয়। সুতরাং জুমিয়াদের তো বটেই, অন্য অনেকেরও সরকারী খাস বনভুক্ত বাড়ি ঘর জায়গা জমি বাগান ও খামার ইত্যাদিতে মালিকানার দাবী ভিত্তিহীন। এরা সবাই জবর দখলদার বাসিন্দা আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT