ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০২:৫৫ | সংবাদটি ২৮০ বার পঠিত

দু’হাজার বছর আগে রোমানরা হাতে লিখে সংবাদপত্র প্রকাশ করেছে। এর অনেকদিন পর ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মে মার্শম্যান বের করেন ‘সমাচার দর্পণ’ নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজ। এটিই প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। বাংলা সংবাদপত্রটি প্রকাশের মাত্র তের বছরের মাথায় সিলেটের এক কৃতীসন্তান কলকাতায় নিজেকে একজন সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তিনি হচ্ছেন মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ইটা পাঁচগাঁওয়ের গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য (১৭৯৯-১৮৫৯)। পন্ডিত গুড়গুড়ি ভট্টাচার্য নামে সবাই তাকে জানতো। সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, মৌলভীবাজারের ইটা পাঁচগাঁর গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য (তর্কবাগীশ) সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, বাংলার সংবাদপত্র জগতের অন্যতম পথিকৃৎ। গৌরীশঙ্কর শুধু সিলেটেরই প্রথম সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অসাধারণ প্রতিভাবান এক সাংবাদিক। তার সম্পর্কে ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, বস্তুত উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সংবাদপত্রে সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব বলতে বোঝাত চারজনকেÑভবানীচরণ, গৌরীশঙ্কর, ঈশ্বর গুপ্ত আর অক্ষয় দত্ত। গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যকে আমরা অনুধাবন করতে পারি কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যের মন্তব্য থেকে। তিনি তাকে বাংলা সংবাদপত্রের অন্যতম জনক কবি ঈশ^র গুপ্তের প্রতিদ্বন্দ্বী সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন, ‘ইনি কলকাতা হইতে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ (প্রথম প্রকাশ ১৮৩৯) ও ‘রসরাজ’ পত্রিকা প্রকাশ করিয়া গুপ্তের সম্বাদ প্রভাকরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিয়াছিলেন। এই পত্রিকাদ্বয় বাংলা সেবায় প্রথম যুগে কলিকাতায় এক আলোড়ন সৃষ্টি করিয়াছিলেন।’
আগেই উল্লেখ করেছিÑগৌরীশঙ্করের কর্মক্ষেত্র ছিলো কলকাতা। প্রথমে তিনি কলকাতায় ‘জ্ঞানান্বেষণ’ নামের পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকাটি ছিলো কলকাতার ইংরেজি জানা শিক্ষিত উদারপন্থীদের মুখপত্র। পত্রিকাটির প্রকাশক ছিলেন দক্ষিণানন্দন (পরে দক্ষিণারঞ্জন) মুখোপাধ্যায়। দক্ষিণারঞ্জন ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জুন জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকাটি বের করেন। তখন তার বয়স ছিলো সতের বছর এবং পত্রিকার সম্পাদক গৌরীশঙ্করের বয়স ছিলো ৩২ বছর। পত্রিকাটি বাংলা ভাষায় বের হত। প্রথম প্রকাশের দু’বছর পর পত্রিকাটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
গৌরীশঙ্কর উদার মতাবলম্বী ছিলেন, গোড়াপন্থীরা তাকে পছন্দ করতো না। এজন্যে তাকে ও জ্ঞানান্বেষণকে কটাক্ষ করে সমসাময়িক ‘সম্বাদ তিমিরনাশক (প্রথম প্রকাশ ১৮২৩) সম্পাদক কৃষ্ণমোহন দাস এক প্রবন্ধে লেখেনÑ‘দক্ষিণানন্দন ঠাকুর...একজন মদ্যপায়িকে পন্ডিত জানিয়া চাকর রাখিয়াছেন। সে নাস্তিক হিন্দুদ্বেষী কাগজ আরম্ভাবধি কেবল ধার্মিকবর শ্রীযুক্ত চন্দ্রিকাকর মহাশয়কে কটু কহে আর হিন্দুশাস্ত্র ভাল নহে তাহারি দোষ আপন বুদ্ধিতে যাহা আইসে তাহাই লিখে। এজন্য ভদ্রলোক মাত্র কেহ ঐ কাগজ পাঠ করেন না। (সমাচার দর্পণ ২১ জানুয়ারি ১৮৩২)’
জ্ঞানান্বেষণ ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি বন্ধ হবার কারণ হিসেবে বলা হয় গৌরীশঙ্কর পত্রিকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় পত্রিকাটি বেশীদিন টিকেনি। গৌরীশঙ্কর ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকাটি ছেড়ে দেন। নিজে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। ‘সম্পাদক হিসেবে শ্রীনাথ রায়ের নাম থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সম্বাদ ভাস্করের পরিচালক ছিলেন গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ (গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য)।’
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ, চতূর্থভাগ, শিলচর ১৩২৪) গ্রন্থে সম্বাদ ভাস্করকে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে উল্লেখ করলেও পত্রিকাটি কিন্তু দৈনিক ছিলো না। হাসান শাহরিয়ার উল্লেখ করেছেন,Ñসম্বাদ ভাস্কর পত্রিকায় দিনতারিখ লেখা থাকত এইভাবে:১১২ সংখ্যা ১২ বালম ইং ১৮৫১ সাল ২ জানুয়ারি। দানীশাব্দ ১০০ আন্দুলয়াÑজাব্দা: ৮৩ বাঙ্গালা ১২৫৭ সাল ১৯ পৌষ বৃহস্পতিবার মূল্য মাসে ১ টকা আগামী ৮ টাকা। প্রথম দিকে এটি ছিল সাপ্তাহিক; প্রতি মঙ্গলবারে প্রকাশিত হত। এর কলাম সংখ্যা ছিল তিন। পরে ১৮৪৮ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবারে বের হতে থাকে। ‘সম্বাদ ভাস্কর’ ১৮৪৯ সালের ১২ এপ্রিল থেকে সপ্তাহে তিনদিন অর্থাৎ বৃহস্পতি, শনি ও মঙ্গলবার প্রকাশিত হতে থাকে। এ সম্পর্কে ১৮৪৯ সালের ১২ এপ্রিল (১ বৈশাখ ১২৫৬) সম্পাদকীয় স্তম্ভে লেখা হয়: আমরা অদ্যাবধি ভাস্কর পত্রকে সপ্তাহে বারত্রয় অর্থাৎ বৃহস্পতিবার, শনিবার, মঙ্গলবার এই তিনবারে প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলাম...’ পত্রিকার কলামও হলো চার; সাইজ ১৯ বাই ১২ ইঞ্চি। প্রথম পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন থাকতো। প্রথম দিকে পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় লেখা থাকতো: ‘ এই সংবাদ ভাস্কর পত্র সহর কলিকাতা সিমুলিয়ার হেদুয়ার উত্তর বড় রাস্তার ধারে রায়ের পুস্করিণীর পশ্চিমাংশে শ্রীযুক্ত বাবু আশুতোষ দেব মহাশয়ের বাটীতে প্রতি মঙ্গলবারে ভাস্কর যন্ত্রে প্রকাশ হয়।’ অর্ধ-সাপ্তাহিক হওয়ার পর প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হত: ‘এই সংবাদ ভাস্কর পত্র সহর কলিকাতার শোভাবাজার বালাখানার বাগানে শ্রীগৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের নিজ ভবনে প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবাসরীয় প্রাতঃকালে প্রকাশ হয়’। বারত্রয় হওয়ার পর লেখা থাকতো :‘এই সংবাদ ভাস্কর পত্র সহর কলিকাতার শোভাবাজার বালাখানার বাগানে শ্রী গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের নিজ ভবনে প্রতি মঙ্গল এবং বৃহস্পতি ও শনিবাসরীয় প্রাতঃকালীন প্রকাশ হয়।’
হাসান শাহরিয়ার আরো উল্লেখ করেছেন, ‘সম্বাদ ভাস্কর’-এর ১১৯ সংখ্যা (শনিবার ১৮ জানুয়ারি, ১৮৫১; পৃষ্ঠা ১০৮৫ থেকে ১০৮৮) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংবাদের শিরোনামের পর একটি দাঁড়ি ব্যবহার করা হত। যেমন, ‘মাদ্রাজ নগরীর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রীযুক্ত স্যার বর্টন সাহেব।’ ‘সদর দেওয়ানী আদালত।’ ‘বিবিধ সমাচার।’ ‘বিলাতীয় সমাচার।’ ইত্যাদি।
অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য বলেছেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যেসব বাংলা সাময়িকপত্র বাঙালির শিক্ষা, সাহিত্য, স্ত্রী শিক্ষাবিস্তার, বিধবা বিবাহ প্রচলন প্রভৃতি সমাজ সংস্কারমুলক কর্মে ও দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য চেষ্টিত ছিল, সম্বাদ ভাস্কর তাহাদের অন্যতম, প্রধানতম বলিলেও সম্ভবত অত্যুক্তি হইবে না।’
হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, উনিশ শতকের প্রথমার্ধে প্রকাশিত উচ্চাঙ্গের সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ ছিল অন্যতম। নির্ভীক এবং বলিষ্ঠ সাংবাদিকতার কারণে ‘সম্বাদ ভাস্কর’ ঐ সময়ের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে নেয়। সতীদাহ ও বহু বিবাহের বিরোধীতা এবং বিধবা বিবাহ ও নারী শিক্ষার পক্ষ সমর্থন করে।
গৌরীশঙ্কর একজন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন। সম্বাদ ভাস্কর’র মাধ্যমে তার নির্ভীকতা ফুটে উঠেছে। সম্বাদ ভাস্কর সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লেখতে কুন্ঠাবোধ করেনি। এমনকি ইংরেজ শাসকদেরকেও ছেড়ে কথা বলেননি। ‘ইংরেজ কর্মচারীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও ‘সম্বাদ ভাস্কর’ ছিল সোচ্চার। এমনকি ইংরেজদের প্রতারক বলেও আখ্যায়িত করেছে।’
নির্ভীকতার জন্যে গৌরীশঙ্করকেও কম খেসারত দিতে হয়নি। একবার একজন বৈষ্ণবের সাথে ব্রাহ্মণ কন্যার বিয়েকে কেন্দ্র করে আন্দুলের রাজা দুই ব্রাহ্মণকে ধর্মসভা থেকে বের করে দেন। এনিয়ে রাজপরিবারের কর্মকান্ড বিষয়ে একটি চিঠি ভাস্কর অফিসে আসে। গৌরীশঙ্কর সেই চিঠিটি না ছেপে রাজার কাজের সমালোচনা করে একটি চিঠি পত্রিকায় প্রকাশ করেন। এতে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জানুয়ারি রাজার গুন্ডাবাহিনি ভাস্কর পত্রিকার সম্পাদক শ্রীনাথ রায়কে মারধর এবং অপহরণ করে। সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলে রাজা আত্মগোপন করেন। আদালত অবমাননা হয়। শেষমেষ সুপ্রিমকোর্টের বিচারে রাজাকে অর্থদন্ড দিতে হয়। এই ঘটনার কিছুদিন পর অক্টোবর মাসে শ্রীনাথ রায় মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকে পত্রিকার সব দায়িত্ব পড়ে গৌরীশঙ্করের উপর। ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন,‘১৮৪০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত শ্রীনাথ রায় ‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। অবশ্য পত্রিকার যাবতীয় সম্পাদনা গৌরীশঙ্করই করতেন। গৌরীশঙ্করের নির্ভীক লেখনীর দায়ভাগ হিসাবে শ্রীনাথ রায়কে নিদারুণ দৈহিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে ঘটনাটি অভিনব।’
‘এমনকি একটি ‘মানহানিকর’ লেখা প্রকাশের জন্য আদালত সম্বাদ ভাস্কর সম্পাদক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যকে জরিমানা ও কারাদন্ড প্রদান করে।’ পরে জমিদার জগন্নাথপ্রসাদ মল্লিক এবং তার কর্মচারী ঈশ^রচন্দ্র ঘোষাল জামিন হয়ে গৌরীশঙ্করকে যথাসময়ে কারাগার থেকে মুক্ত করেন।
প্রফেসর নন্দলাল শর্মা বলেছেন, গৌরীশঙ্কর আমৃত্যু সম্বাদ ভাস্কর সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার পালিত পুত্র (তিনি অপুত্রক ছিলেন) ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য এই পত্রিকা অনেকদিন সম্পাদনা করেছেন। দীর্ঘস্থায়ী সম্বাদভাস্কর ‘সে যুগের একখানি উৎকৃষ্ট সংবাদপত্র। (ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, বাংলা সাময়িকপত্র, কলকাতা, ১৩৪৬, পৃ. ৯২)’ সম্বাদভাস্কর পত্রিকার কিছু কপি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, কলকাতার বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষদ গ্রন্থাগারে এবং যাদবপুরে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের যতীন্দ্রমোহন সংগ্রহশালায় (যাদবপুর, কলকাতা) সংরক্ষিত আছে।
গৌরীশঙ্কর ‘সম্বাদ রসরাজ’ ও ‘হিন্দুরতœকমলাকার’ নামে দুটো পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। সম্বাদ রসরাজ ছিলো ব্যঙ্গ পত্রিকা। নির্ভীক সাংবাদিক গৌরীশঙ্কর অন্যায়ের সাথে আপোস না করায় বার বার তাকে বিপদের মুখে পড়তে হয়েছে। সম্বাদরসরাজ পত্রিকায় কাশিমবাজারের রাজা কৃষ্ণনাথের কুৎসা প্রকাশিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে রাজা মানহানির মোকদ্দমা করেন। এতে গৌরীশঙ্করের বিনাশ্রমে ছয় মাসের জেল, পাঁচশত টাকা জরিমানা এবং এক হাজার টাকার দুজন জামিন দেয়ার আদেশ হয়। ‘১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্বাদরসরাজ পত্রে লালা ঈশ^রীপ্রসাদের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার করায় গৌরীশঙ্কর আবার ছয়মাস কারাবাস করেন। ‘কিন্তু এই দুইবার (পূর্বে আরেকবার) কারাবাসের দুর্ভোগেও গৌরীশঙ্করের চৈতন্য হইল না। শেষে বিধবা বিবাহ প্রসঙ্গে কলিকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারকে আক্রমণ করায় পুনরায় তাহার বিরুদ্ধে মকদ্দমা হইবার উপক্রম হইয়াছিল। অবশেষে গৌরীশঙ্কর সম্বাদরসরাজের প্রচার বন্ধ করিয়া সে যাত্রা অব্যাহতি পাইয়াছিলেন।’ (ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, বাংলা সাময়িকপত্র, পৃ.৯৭)
সম্বাদরসরাজে র সাথে কলমীলড়াই করতে ১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে গোবিন্দ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় সংবাদ রসময় বের করেন। গৌরীশঙ্করের প্রগতিশীলতা প্রবীণপন্থীরা সহ্য করতে পারতেন না। এজন্যে তিনি তার সময়ে খুবই আলোচিত ছিলেন।
১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ ফেব্রুয়ারি গৌরীশঙ্কর সম্বাদরসরাজ-এর প্রকাশ বন্ধ করেন। তার মৃত্যুর পর তার পালিতপুত্র ক্ষেত্রমোহন ভট্টাচার্য পত্রিকাটি আবার বের করেছিলেন। ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও কলকাতার উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরিতে সম্বাদরসরাজ-এর কয়েকটি কপি সংরক্ষিত আছে।’
সম্বাদরসরাজ-এর প্রকাশনা স্থগিত রাখার তিন সপ্তাহ পর গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ ‘হিন্দুরতœকমলাকর’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেন। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি (১৪ ফাল্গুন, ১২৬৩ বঙ্গাব্দ) এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বের হয়। তিনি আমৃত্যু এই পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ১৮৫৮-৫৯ সালের উনিশ সংখ্যা ‘হিন্দুরতœকমলাকর’ সংরক্ষিত আছে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি গৌরীশঙ্কর লেখালেখিও করতেন। বিদ্যাসাগর যুগের সুচনা হবার আগেই তিনি গদ্যে লেখালেখি করেন। এজন্যে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের আলাদা একটি অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। তখন হাতে গোনা কয়েকজন গদ্যে লেখালেখি করতেন। সেই সময়ের অনেক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখতেন। ১২৫৪ (১৮৪৭ খ্রি.) বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ সংবাদপ্রভাকর পত্রিকা তাদের পত্রিকার উনত্রিশজন প্রবীণ লেখকের নামের একটি তালিকা বের করে। সেই তালিকার তৃতীয় স্থানে ছিলো গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের নাম।
গৌরীশঙ্কর শুধুই সংবাদপত্রে লেখালেখি করেননি, বইও লিখেছেন। তিনি শিশুদের জন্যে নীতি-কথা নামে একটি বই লিখেছিলেন। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর নীতিকথা নামের শিশুদের জন্যে লেখা বইটি বের করেছিলেন। তার নীতিকথার তিনটি ভাগ বের হয়েছিলো এবং অনেকগুলো সংস্করণ হয়েছিলো।
গৌরীশঙ্কর শ্রীমদ্ভগব˜ গীতা অনুবাদ করেছিলেন। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তার অনুদিত শ্রীমদ্বগবদগীতার নবম অধ্যায় পর্যন্ত বই আকারে বের হয় এবং ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে তার অনূদিত পুরো গীতা বের হয়েছিলো। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ সেপ্টেম্বর ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’ পত্রিকায় লেখা হয়Ñ‘ সুবিজ্ঞ পন্ডিতবর ভাস্কর সম্পাদক শ্রীযুক্ত গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ ভট্টাচার্য কর্তৃক ভগবদ্গীতা গ্রন্থ গৌড়ীয় সাধুভাষায় অনুবাদিত হইয়া মূল টীকা সহিত পরিস্কাররূপে মুদ্রাক্ষিকান্তর প্রকাশিত হইয়াছে। (ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, সংবাদপত্রে সেকালের কথা, ২য় খন্ড, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, কলকাতা ১৩৪০, পৃ. ২৭৩)
জ্ঞানপ্রদীপ নামে একটি শিশুতোষ গ্রন্থ লিখেছিলেন গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ। বইটির প্রথম খন্ড ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই এবং দ্বিতীয় খন্ড ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। ভূগোল সার নামে তিনি আরো একটি বই লিখেছিলেন। এটি ছিলো পৃথিবীর আকার ও বিবরণ বিষয়ক একটি বই। বিভিন্ন বই থেকে নেয়া তথ্য নিয়ে বইটি লিখেছিলেন তিনি। বইটি বের হয় ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর। নীতিরতœ নামের বইটি বের ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে।
কাশীরাম দাসের অনুবাদে ‘মহাভারত’ যখন ছাপা হয়ে বের হয় তখন শ্রীরামপুরের কেরি সাহেবের পন্ডিত, যশোরের জয়গোপাল তর্কালঙ্কার অনুবাদটির অনেক স্থান পরিবর্তন করে শুদ্ধ করেন। জয়গোপালের পর গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশও বইটি সংশোধনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গৌরীশঙ্করের সংশোধিত মহাভারত ১ম খন্ড ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয় খন্ড ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তার সম্পাদিত ও অনুবাদ করা ‘চন্ডী’ বইটি বের হয়।
শুধু লেখালেখি নয় শিক্ষা ও সামাজিক বিভিন্ন কাজে তিনি সরাসরি অংশ নিতেন। ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা থেকে জানা যায় কলকাতায় প্রতি বৃহস্পতিবারে ‘বঙ্গভাষা প্রবেশিকা’ নামে একটি সভা হত। গৌরীশঙ্কর সেই সভায় নিয়মিত অংশ নিতেন। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সভায় সভাপতিত্বও করতেন। শিক্ষা ও সামাজিক কাজকর্মে তার অংশগ্রহণের কথা সেই সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হত।
গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের পিতার নাম জগন্নাথ ভট্টাচার্য। জগন্নাথের দুই ছেলে শ্রীনাথ ও গৌরীশঙ্কর। গৌরীশঙ্কর গৌর বর্ণ ও খর্ব্বাকৃতি পুরুষ ছিলেন। লেখাপড়া শেষ হবার আগেই তার মায়ের মৃত্যু হয়। কিশোর বয়সেই তিনি তার বাবাকেও হারান। শৈশবে তিনি গ্রামের টোলে ব্যাকরণ ও সাহিত্য শিক্ষা করেন। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র পনের বছর বয়সে দুঃসাহসী গৌরীশঙ্কর কাউকে কিছু না বলেই নবদ্বীপ চলে যান। সেখানে এক অধ্যাপক তার প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দেন। ‘তৎকালে দেশে বিদ্যা আর অর্থের অভাব ছিল না, অধ্যাপকবর্গ ছাত্রের আহার দিতেন, দেশের জমিদারবর্গ হইতে তাঁহার সাহায্য পাইতেন।’ এজন্যে সেই অধ্যাপকের বাসায় অধ্যয়ন করতে গৌরীশঙ্করের কোন অসুবিধে হলো না। তিনি তার অসাধারণ প্রতিভার জন্যে খুব কম সময়েই সবার নজর কাড়তে পারলেন। নবদ্বীপে ন্যায় পাঠ করে তিনি অধ্য

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সাত মার্চের কবিতা ও সিলেট বেতার কেন্দ্র
  • পার্বত্য তথ্য সংকটের মূল্যায়ন
  • সিলেটের প্রাচীন ‘গড়’ কিভাবে ‘গৌড়’ হলো
  • ৮৭ বছরের গৌরব নিয়ে দাঁড়িয়ে সরকারি কিন্ডারগার্টেন প্রাথমিক বিদ্যালয় জিন্দাবাজার
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • Developed by: Sparkle IT