শিশু মেলা

মদন

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৭-২০১৮ ইং ০২:১৯:০১ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

ওর নাম সাইফুল ইসলাম। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন ওর বন্ধু বান্ধব ওকে পরখ করে একটা উপনাম ঠিক করেছে। মদন। লেখাপড়ায় সে মোটামুটি ভাল ছাত্র। ক্লাসের প্রতিটি পরীক্ষায় নয়/দশের ভিতরে থাকে। রোজ রোজ স্কুলের পড়া শিখে আসে। শিক্ষকদের মান্য করে সে। কখনও বেয়াদবী করে না সে। স্যারেরা যা বলেন, তাই করে। স্কুলের একজন নিয়মিত ছাত্র হিসাবে ওর খ্যাতি রয়েছে। পড়া মুখস্ত করতে সে ওস্তাদ। সকল বিষয়ই মোটামুটি বুঝে। কিন্তু যেটি বুঝে না সেটি মুখস্ত করে ফেলে। এমন কি গণিত পর্যন্ত। একটুও দুষ্টুমী করে না সে। গায়ে পড়ে বন্ধুরা ওকে চেতাতে চাইলেও সে চেতে না। বেশি বিরক্ত হলেও বলে- প্লিজ হাবলু, প্লিজ মজলু এরকম কর না। আমার ভাল্লাগে না। ও যেন পাথরের মূর্তি। একটুও মিথ্যে বলে না। সাধারণেরা স্যারের বকাঝকা থেকে বাচার জন্য মিথ্যের আশ্রয় নেয়। কিন্তু সে বেহেশতে যাক বা দোজখে সেটি বিবেচনা করে না। যা ঘটে সেটিই বলে। ছেলে মেয়েরা একই স্কুলে পড়ে। মেয়েদের রয়েছে একটি বিশাল কমন রুম। ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক ক্লাসের মেয়েরা ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে স্যারদের সাথে আসে, ওদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বসে। ঘণ্টা শেষে স্যার ক্লাসে থাকতেই ওদের আগে বের করেন। তারপর স্যার চলে যান ওদের পিছু পিছু। মেয়েদের আসন খালি থাকে। পরবর্তী ঘন্টায় ওরা স্যারদের পিছু আসে। আসন গ্রহণ করে। ক্লাস চলে। ক্লাস শেষে আবারও স্যার ওদের ক্লাস থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেন। ওরা বেরিয়ে যায়। এভাবেই চলে মদনের স্কুল।
একদিন ক্লাসে এক দুষ্টু ছেলে কাগজ ছুড়ে মেরেছে একটা মেয়ের উপর। স্যার সেটা খেয়াল করেননি। মেয়েটি স্যারের কাছে নালিশ করে ‘স্যার কে কাগজ ছুড়ে মেরেছে আমার প্রতি।’ স্যার বললেন- কে মেরেছে? মেয়েটি নাম বলতে পারলো না। বলল ওদিক থেকে এসেছে। স্যার বেশ তর্জন গর্জন শুরু করছেন। কেউ কিছু বলছে না। অগত্যা সাইফুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বলল- স্যার, ও মেরেছে বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করল। স্যার বললেন- কে? নাম বল। ও বলল- ‘হাবুল’। স্যার বললেন- আচ্ছা তুমিই সেই দুষ্টু ছেলে। ক্লাসের শেষে আমার সাথে যাবে।
সেদিন শিক্ষক কমন রুমে আচ্ছা প্রহার খেয়ে আসল হাবুল। ক্লাসে এসেই ধরল সাইফুলকে। বলল- হেই ব্যাটা মদন। মদনের মদন। তুই আর সাক্ষী দেয়ার জায়গা পেলি না? ওই বেটি তোর কী হয়? খালাতো বোন? চোখ মুখ লাল করে হাত কচলাতে কচলাতে কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে বলতে লাগলো সে। সেই থেকে সাইফুলের উপাধি ‘মদন’।
ইতোমধ্যে স্কুলের সবাই ঐ নামটি মুখস্ত করেছে। ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ওকে এক নামেই চেনে। শিক্ষকদের কাছেও সে একটি সুনাম অর্জন করেছে সেটি হলে সত্যবাদিতা। ও সব সময় সত্য কথাটাই বলে- এ জন্য শিক্ষকরা ওর উপর নির্ভর করেন। ক্লাসে কোনো কিছু ঘটলেই সাক্ষী হিসেবে সাইফুলের ডাক পড়ে। সাইফুল যা দেখেছে হুবহু তাহাই বলে। এতে যারা শাস্তির আওতায় আসে তারা ওর নাম একেবারেই ভুলে যায়। ‘মদন’ ছাড়া আর কিছুই বলে না।
বেশ ক’বছর গত হলো। সাইফুল এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। সাইফুলের ভাই শরিফুল উঠেছে ক্লাস নাইনে। শরীফুলও সাইফুলের কারণে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। অর্থাৎ মদনের ভাই মদন। অবশ্য সাইফুলের মত ততটা নয়। মাঝে মধ্যে ক্লাসে রসিকতা করে ওর বন্ধুরা এটা বলে। ক্লাসের বন্ধুদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি বন্ধু হিসেবে যেটি বুঝে নেয়া উচিত, সেটি শরীফুল বুঝে না। কারণে অকারণে হঠাৎ সরল হয়ে বন্ধুদের ব্যাপারে স্যারদের কাছে নালিশ করে। এতে মাঝে মধ্যে শরীফুলের অনেক বন্ধু শাস্তির সম্মুখীন হয়। ওর বন্ধুরা ওকে বলে কীরে তোর ভাল মন্দ বুঝার জ্ঞান নেই। কোনটা ঢং আর কোনটা রং বুঝে উঠতে পারিস না? ক্লাসে মজা করে অনেকে অনেক কিছুই করে। তাই বলে তুই বিচার প্রার্থী হবে? ও বুঝতে পারছি তুইতো মদনের ভাই; আরেক মদন।
সেদিন ক্লাস চলাকালীন সাইফুল ইসলাম কি কাজে স্কুলে ঢুকেছে। ক্লাস নাইনের ছাত্ররা সেটা দেখে ফেলে। ইসলামী শিক্ষার ক্লাস চলছিল। উনি পড়াচ্ছেন তো পড়াচ্ছেনই। এক হাতে বই নিয়ে হেঁটে হেঁটে পড়ান। যে দিকে যাচ্ছেন ওদিকের ছাত্ররা মনোযোগী ভাব দেখায় কিন্তু পিছনের ছাত্ররা কি করছে সেটি তিনি খেয়াল করতে পারেন না। শিক্ষক যখন পেছনে ফিরলেন ঠিক সেই সময় একটা ফিস ফিসানি শুরু হল। হেই চেয়ে দেখ মদনের ভাই এসেছে। সবাই উৎসুক হয়ে দেখে আর শরীফুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাইফুল হেঁটে হেঁটে একদম ক্লাস নাইনের দোর গোড়ায় চলে আসে। হঠাৎ ইসলাম শিক্ষার স্যার শামসুল ইসলামের চোখ পড়ে ওর উপর। তিনি পড়ানো বন্ধ করে ওকে ডাকেন- এই ছেলে অবায় আস। এটি শুনে ছাত্ররা হাসাহাসি শুরু করেছে। শুদ্ধ ভাষার মাঝখানে সিলেটী শব্দ। অবায় মানে এদিকে। যাই হোক এক ফসলা হাসাহাসির মধ্য দিয়ে সাইফুল ঢুকলো ক্লাস নাইনে। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলÑ ‘কেমন আছেন স্যার?’ শরীর ভাল আছে স্যার? জবাব দিয়ে শামসুল স্যার জিজ্ঞেস করলেন ‘ও তুমি তো এসএসসি পাশ করে ফেলেছ। সাইফুল বলল- জ্বী স্যার। তো এখন কোথায় ভর্তি হয়েছ?
-সাইফুল জবাব দেয়- স্যার মদনে।
-মদনে বলতে মদন মোহন কলেজ?
-জ্বী স্যার।
এদিকে সমস্ত ক্লাসে হাসির রোল উঠেছে। এক দিকে তো মদনের ভাই মদন ঢুকেছে ক্লাসে। ক্লাসের উৎসুক ছেলে মেয়ে তাকিয়েছিল সেদিকে। স্যারের প্রশ্নের জবাবে যখন সে বলেছে ‘মদনে, তখন হাসি আর কেউ ধরে রাখতে পারেনি। হাসির খোরাক এটাই- নাম তার মদন ওর ভাই মদন আর সে ভর্তিও হয়েছে মদন মোহন কলেজে। এদের হাসি দেখে শামসুল স্যার খুবই রাগান্বিত হলেন। এক ধমক দিয়ে সবাইকে শান্ত হতে বাধ্য করলেন। তিনি সাইফুলকে বললেন- বাবা কিছু মনে কর না। তোমরা তো কত ভদ্রভাবে ক্লাস করতে। আর এখন ভর্তি হয়েছে দুষ্টের দল। ওদের কন্ট্রোল করাই দায়। সাইফুল সালাম দিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে অফিসের দিকে হাঁটা দিল...।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT