শিশু মেলা

অনুতপ্ত মন

সঞ্জয় কর প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৭-২০১৮ ইং ০২:১৯:৩১ | সংবাদটি ১৮৫ বার পঠিত

রক্তাক্ত অবস্থায় মাথায় হাত চেপে ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে দৌড়াচ্ছিল রফিক। আবছা অন্ধকারে চেনা যাচ্ছিল না তাকে। গ্রামের আঁকা-বাঁকা রাস্তা দুই পাশে ধানক্ষেত। ধানক্ষেতে জোনাকির নিভো-নিভো আলোর ঝলকানি। সবে মাত্র সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে। আকাশে উকি দিচ্ছে আধখানা চাঁদ। কে যেন রফিকের হাত ঝাপটে ধরে বলে ‘কি হয়েছে আপনার’ কন্ঠটি শুনে সস্তি পেল রফিক। শুকনো গলাটা ভিজে উঠলো তার। রোদে ফেটে চৌচির মাটিটা যেন বৃষ্টির পরশ পেল। রফিক বলে,
- ইমাম সাহেব আমি রফিক।
- অহ রফিক, কি হয়েছে তোমার?
রফিক কথা বলতে পারছেনা। সে রাস্তার পাশে ঘাসের উপর বসে পড়ে। তার হাত, পা থর থর করে কাঁপছে। রক্ত আর ঘামে তার সারা শরীর মাখামাখি। এক পায়ে সেন্ডেল আর এক পা খালি। রফিক বলে ‘রেল স্টেশনের পাশের রাস্তা দিয়ে বিকেল বেলা আমি হাঁটছিলাম ঠিক জঙ্গল বাড়ীর সামনে যেতেই কে যেন বিকট সুরে আমাকে থামতে বলে। আমি চতুর্দিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাইনা। ভয় পেয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করি। তারপর আর কিছুই বলতে পারিনা। হঠাৎ আমার মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হয়, আমি চোখ মেলে দেখি রাত হয়ে গেছে। রাস্তার উপর শুয়ে আছি। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াই এবং দৌড় দেই। এতক্ষণে অনেক লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। রফিকের মতো আরও অনেকে বলেন জঙ্গল বাড়ির সামনে কেউ হাসির শব্দ শুনেছেন, বাচ্চার কান্না শুনেছেন, কেউবা মেয়ে লোকের ডাক শুনেছেন। তারা তাতে সাড়া না দিয়ে আল্লাহর নাম নিতে নিতে দ্রুত চলে এসেছেন। একজন লোক অনেক কষ্টে ভিড়ের মধ্যে থেকে মাথা উচিয়ে বলেন, ‘ইমাম সাহেব একদিন রাতে জঙ্গল বাড়ীর ডান পাশে চালতা গাছের নিচে এলোকেশী এক মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। অন্ধকারে সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলনা। আমি ভয়ে ভয়ে সামনে আগাই কি আশ্চর্য্য মহিলাটি অদৃশ্য হয়ে গেল।’
বিষয়টি সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। জঙ্গল বাড়ির পাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া রাস্তাটি থানা শহরের সাথে সংযোগ স্থাপনকারি একমাত্র রাস্তা। বিকল্প রাস্তা না থাকায় বিষয়টি গ্রামের অনেককেই ভাবিয়ে তুললো। দলে-দলে লোকজন ইমাম সাহেবের কাছে আসতে লাগলো। ইমাম সাহেব সবার হাতে একটি করে তাবিজ ধরিয়ে দেন যার হাদিয়া মাত্র পঞ্চাশ টাকা। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে পঞ্চাশ টাকাই অনেক বেশী। কিন্তু কি আর করা প্রাণতো বাঁচাতে হবে। ইমাম সাহেব সারা রাত জেগে তাবিজ লেখেন। দিনের বেলা গ্রামের মানুষেরা লাইন ধরে তাবিজ নেয়।
রফিকের ঘটনার পর এক সপ্তাহ চলে গেল। আর কোন অঘটন ঘটলোনা। গ্রামের মানুষের মধ্যে সস্তি ফিরে এলো। সেই সাথে ইমাম সাহেবের প্রতি সকলের আস্থা বেড়ে গেল। যে যার সাধ্য মতো প্রায় প্রতিদিনই ইমাম সাহেবকে দাওয়াত করে খাওয়াতে লাগলো। কেউ কেউ কাপড়-চোপড় দিল। ইমাম সাহেবকে রাস্তায় পেলে সালাম দিয়ে মাথা এগিয়ে দিতে দেখা গেল অনেকেই, ইমাম সাহেব ফু দিলেই পকেট থেকে বিশ/পঞ্চাশ টাকার একটি নোট তার হাতে গুজে দিয়ে হাসিমুখে চলে যেতে দেখা গেল।
সিলেট-ছাতক রেল লাইনে সকাল বিকাল ২টি ট্রেনই আসা যাওয়া করে। এই লাইনের ট্রেনগুলো যেমন জরাজীর্ণ তেমনি স্টেশনগুলোও। লাইনটির প্রতি কর্তৃপক্ষের বেশ উদাসীনতা লক্ষনীয়। এই লাইনের ছোট একটি স্টেশন সৎপুর। চতুর্দিকে গাছ পালায় ঘেরা স্টেশনটির পাশে একটি অফিস কোয়ার্টার। দীর্ঘদিন এই সড়কে রেল চলাচল বন্ধ থাকায় কোয়ার্টারটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকে। জঙ্গলে চতুর্দিক ঘিরে ফেলে। কোয়ার্টারের সীমানা প্রাচীর ফাটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড এক বট গাছ। গ্রামের মানুষের ধারনা এই বট গাছটি ভূত-পেতœীর আবাসস্থল। এই অফিস কোয়ার্টারকে গ্রামের মানুষ জঙ্গল বাড়ী বলে। ভয়ে এই বাড়ীতে কেউ যাওয়া আসা করে না। পুনরায় যখন সিলেট-ছাতক রেল লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হয় তখন জঙ্গল বাড়ীকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সংস্কার করে একজন স্টেশন কর্মকর্তা তার পরিবারবর্গ নিয়ে ওঠেন। স্টেশন কর্মকর্তা মনির সাহেবের পরিবারের সদস্য সংখ্যা মাত্র চারজন। স্ত্রী, পুত্র, বৃদ্ধা মা এবং তিনি নিজে। মনির সাহেবের ছেলের নাম মন। মন খুব চঞ্চল কিন্তু মেধাবী। অত্র এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সে খুব প্রশংসা কুড়িয়েছে। যেমন সুনাম তেমন দুর্নামও কুড়াতে লাগলো ছেলেটি। প্রতিদিন তার উপর একটানা একটা অভিযোগ আসে। আজ কারও ছেলেকে মেরেছে, কাল কারও বাড়ীতে আম চুরি করেছে, কখন বা দলবল নিয়ে চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছুড়ছে...। মন পঞ্চম শ্রেণি সমাপনী পরিক্ষার্থী তার ২য় সাময়িক পরিক্ষা শেষ হয়েছে। পরিক্ষার জন্য কয়েকদিন কোন বিচার আসেনি তার উপর কারণ এই কয়েকদিন পড়াশোনায় খুব মনযোগী ছিল সে। পড়াশোনার চাপে দুষ্টামির সুযোগ পায়নি মন।
রাত প্রায় সাতটা কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছে, বৃষ্টি থেমে গেলেও গাছের পাতায় জমা পানি টুপটুপ করে এখনও পড়ছে। আকাশে কোন তারা নেই। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ দেখে মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি হবে। গ্রামের মসজিদের পাশের চায়ের দোকানে অনেক লোক জড়ো হয়েছেন। কেউ চা খাচ্ছেন, কেউবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ পরেই নামাজ তাই নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরবেন সবাই। এমন সময় হন্ত দন্ত হয়ে একটি ছেলে ঢুকলো চায়ের দোকানে। মনে হচ্ছে ছেলেটি কাদায় গড়াগড়ি দিয়ে এসেছে। দু’জন লোক পানির জগ নিয়ে ছেলেটির মুখের কাদা সরিয়ে দিলেন। এবার সবাই চিনে নিলেন ছেলেটিকে। সে এই গ্রামের মরহুম আতর সাহেবের ছেলে আমজদ। আমজদ জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে বলে, “আমি জঙ্গল বাড়ীর পাশ দিয়ে আসছিলাম। একজন মেয়ে মানুষ আমার নাম ধরে ডাকলো। আমি পিছন ফিরে তাকাতেই কাদা ছুড়ে মারতে লাগলো। আল্লাহর নাম নিতে নিতে কোন রকমে জান বাঁচিয়ে এলাম। চায়ের দোকানে বসা একজন লোক ধমকের সুরে বললেন, ‘ইমাম সাহেবের তাবিজ সঙ্গে ছিল না বুঝি?’
-ছিল
-তাহলে?
আমজদ আর কোন কথা বলেনা। সে নীরবে বসে থাকে। এখনো তার মন থেকে ভয় দূর হয়নি।
সন্ধ্যাবেলা মনদের ঘরে খুব আনন্দ হয়েছে। চা খেতে খেতে খুব হেসেছেন মনের আম্মা। মন মুখ দিয়ে বিভিন্ন জীব জন্তুর ডাক, পাখির ডাক ডাকছিল। বাচ্চার কান্না শুনাচ্ছিল। মেয়েলি কন্ঠে, বুড়োদের কন্ঠে কথা বলছিল। এগুলো সে তার ছোট মামার কাছ থেকে রপ্ত করেছে। এখন সে মামার চেয়েও দক্ষ।
মনির সাহেব অনেকক্ষণ ধরে দরজায় কড়া নাড়ছেন। ভিতর থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এবার তিনি রেগে গিয়ে ধমকের সুরে বলেন, ‘মনের আম্মা দরজা খোল’ দ্বিতীয় বার আর ডাকতে হলো না। মনের আম্মা দরজা খুললেন। দরজা খুলেই চমকে ওঠেন তিনি। মনির সাহেবের মাথা থেকে দর দর করে রক্ত ঝরছে। মনির সাহেবকে ধরতে ধরতে মনের আম্মা বলেন,
- মাথায় কি হয়েছে?
- কে যেন ঢিল ছুড়েছে।
মনির সাহেবকে বিছানায় বসিয়ে রক্ত মুছে, সেভলন লাগিয়ে কাপড় দিয়ে শক্ত করে মাথা বেঁধে দিলেন মনের আম্মা। মনির সাহেব বলেন ‘মন কোথায়’ বলতে না বলতে মন ছাদ থেকে নেমে এল। প্রিয় আব্বুর এমন অবস্থা দেখে মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তার। সে দৌড়ে গিয়ে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে।
রাতের বেলা সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু মনের চোখে ঘুম নেই। সে কিছুক্ষণ পর পর আব্বুকে দেখে, আব্বুর মাথায় হাত বুলায়। ঘুমের দেবী মনের চোখ স্পর্শই করতে পারলেন না। ফযরের আযান শুনে ঘুম ভাঙ্গে মনির সাহেবের। মনকে সজাগ দেখে তিনি বিষ্মিত হন।
- কি মন ঘুম আসছেনা?
- না বাবা।
- কেন?
- বাবা আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই।
- বলো।
মন আব্বুকে সব কথা খুলে বলে। মনির সাহেব প্রথমে খুব রাগান্বিত হলেন। পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন
- এসব তুমি কেন করলে?
- আব্বু মানুষকে ভয় দেখাতে আমার আনন্দ লাগে।
- তোমার আনন্দ অনেকের কষ্টের কারণ হয়ে যায়। তা কি তুমি বোঝ?
মন কোন কথা বলে না। মাথা নিচু করে বসে থাকে সে। মনির সাহেব বলেন
- তুমি যে আমার মাথায় ঢিল ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছ এতে তুমি কষ্ট পাওনি?
- খুব কষ্ট পেয়েছি আব্বু। কিন্তু আমিতো অন্ধকারে তোমাকে চিনতে পারিনি।
- শোন মন তুমি যাদের মাথায় ঢিল ছুড়েছ, ভয় দেখিয়েছ, কাদা ছুড়ে মেরেছ তারা কারও না কারও আব্বু কিংবা ভাই।
Ñআমি আগে বুঝতে পারিনি আব্বু। আর এমন কাজ করব না।
মনির সাহেব বলেন, ‘চলো আজ তুমি আমার সাথে নামাজ পড়বে। নামাজ পড়ে তোমার অপকর্মের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ নামাজ শেষ করে মন আব্বুর হাত ধরে বাড়ি ফিরছে। চতুর্দিক ধীরে ধীরে ফর্সা হয়ে উঠছে। পাখিরা কুহু-কুহু ডাকছে। পূর্ব আকাশে কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্যের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হবে। মন কোন কথা বলছেনা। বিবেকের আদালতে নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হচ্ছে। সে খুবই অনুতপ্ত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT