উপ সম্পাদকীয়

আপন ভুবন, অচেনা আকাশ

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৫:০১ | সংবাদটি ৫২ বার পঠিত

রাত দশটার দিকে ফিরলাম মোল্লা সাহেবের বাসা থেকে। ওখানে বড় জোর মিনিট বিশেক ছিলাম। বাসায় ফিরে সহকর্মী-বন্ধুবান্ধব-সুহৃদ সবাইকে বিদায় করে বসলাম একটা বড় কাজ নিয়ে। কাজটি হচ্ছে, আমার উত্তরসূরীর জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার ওপর একটি প্রতিবেদন লিখে রেখে যাওয়া। এটা ছিল সে আমলের একটি সুন্দর ঐতিহ্য। এই প্রতিবেদনের ইংরেজি নাম ছিল ‘নোট টু সাকসেসর’ উত্তরসূরীর জন্য প্রতিবেদন। এটা হাতে লেখা হতো এর জন্য নির্ধারিত একটি বাঁধাই করা মোটা রেজিস্টার খাতায় এবং লেখক এটা নিজে হস্তান্তর করতেন তাঁর উত্তরসূরীর নিকট, অথবা অন্যান্য গোপনীয় কাগজপত্রের সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যেদিন যোগ দেই সেদিন গভীর রাত পর্যন্ত জেগে জেগে এই জীর্ণ-মলিন দলিলটি পাঠ করেছিলাম। সেই ৩০/৪০ বছর বা তারও আগে দেশি-বিদেশি, কালো-ধলো এস ডি ও সাহেবদের লেখা কত কথা, কত সরস মন্তব্য, কত দুর্যোগ-সঙ্কটের বর্ণনা, গোপনীয় তথ্যের উল্লেখ। এ যেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার এক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
এবার আমি বসেছি আমার প্রিয় মহকুমা, আমার প্রথম প্রেম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে আমি কাঁটায় কাঁটায় ছ’মাস (১৭.৪.৬৯-১৬.১০.৬৯) যেভাবে দেখেছি তার বাখান শোনাতে। ভোর হলেই সপরিবারে রওনা হয়ে যাব কুলাউড়া। অন্য সব কাজকর্ম-বাঁধাছাদা শেষ, এখন আমি এই রাত্রির নির্জনতায় ছোট অফিস রুমে বসে লিখব ‘নোট টু সাকসেসর’। গৃহিণী বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাচ্ছেন, খালেক চলে গেছে অনেক আগে, বৃদ্ধা রাজুর মাও ঘুমাচ্ছে। এই ছোটখাট একতলা বাংলো বাড়িটির চারদিক নীরব নিস্তব্ধ। রোজ দুপুরের ধূসর রঙের বড় বড় ঘুঘুগুলোও নিশ্চিন্তে নিদ্রামগ্ন এখন।
প্রথমে ভেবেছিলাম, আট-দশ পৃষ্ঠার একটা দায়সারা নোট লিখে শুয়ে পড়ব। মাত্র ছ’মাসের অভিজ্ঞতা, কী আর এমন। কিন্তু লিখতে শুরু করে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। কত কথা, কত স্মৃতি, কত মানুষ ভিড় করে এল কলমের মুখে। যখন লেখা শেষ হল তখন মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফযরের আযানের ধ্বনি। কখন যে এক শ পৃষ্ঠার মত লেখা হয়ে গেছে।
পাদটীকা : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডাকনাম ছিল বি’বাড়িয়া, শুনতে যা আমার কাছে সব সময় বিরক্তিকর লাগত, আজও লাগে। এ যেন যে-মেয়ের নাম কমলা তাকে সংক্ষেপে কলা ডাকার মত। এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় আরেক পাগলামি শুরু করেছিল তৎকালীন পাঞ্জাবি ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহ। আমি তখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এ ডি সি হিসেবে কেবল যোগদান করেছি কুমিল্লায়। শুনি, সাদুল্লাহ সাহেব ফরমান জারি করেছেন : এখন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম হল রহমানবাড়িয়া। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক বস। কাজটা তিনি করলেন খুব সহজে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শব্দটির ইংরেজি বানানের প্রথম অক্ষর বি বাদ দিলেই হয়ে যায় রহমানবাড়িয়া। ব্রাহ্মণ হয়ে যায় রহমান। তিনি চিঠি লিখে সবাইকে এই নতুন নামকরণের কথা জানিয়ে দিলেন এবং দাপ্তরিক সকল কাজকর্মে নিজে এই নতুন নাম ব্যবহার করতে শুরু করলেন। ডি.সি, এসপিসহ সকলকে এই নতুন নাম ‘রহমানবাড়িয়া’ ব্যবহার করার জন্য জোর তাগাদা দিলেন। আমি ও আমার বস ডি.সি জনাব নূরুন্নবী চৌধুরী বিষয়টি বোর্ড অব রেভেনিউকে জানিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত চাইলাম। আমরা জানতাম, বিষয়টি এত সোজা না যে রবার দিয়ে ঘসে বি অক্ষর তুলে দিলাম, আর অমনি ব্রাহ্মণ হয়ে গেল রহমান!....সরকারের সিদ্ধান্ত আসার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল ডিসেম্বরে, আর ওই পাগল ব্রিগেডিয়ার ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির একজন হয়ে ব্রাহ্মণকে রহমান বানানো এবং আরও অনেক কবীরা গুনাহর বোঝা মাথায় নিয়ে উৎপাটিত হল বাংলাদেশ থেকে।
১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে চলে যাওয়ার অল্প কিছুদিন আগে মমতাজের মেজ বোন শামসুন্নাহারের বিয়ে হয় বরিশালের অধ্যাপক আব্দুল হালিম খানের সঙ্গে। তিনি ছিলেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ও ঝিনাইদহের তৎকালীন এস ডি পি ও মাহবুবুর রহমান অনেক তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিকেই পাকবাহিনীর হাতে তিনি নির্মমভাবে শহীদ হন।
এর আগে ১৯৬৮ সালে আমার শ্যালিকা দিলুর বিয়ে হয়। তবে কোন বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি এবং সময়মত জানতে না পারায় ওই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে আমি যোগ দিতে পারিনি। অন্য শ্যালিকা খুকুর বিয়ে অবশ্য বেশ জাঁকজমকের সঙ্গেই হয়েছিল ওই একই বছর।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এত তাড়াতাড়ি যে চলে যাব এটা আব্বা-আম্মাও ভাবেননি। তবে তাঁদের মন খারাপ, আমি পশ্চিম পাকিস্তান চলে যাচ্ছি বলে। বিশেষ করে আম্মার। তিনি আড়ালে চোখের পানি মুছছেন টের পেলাম। এরই ভেতর ঝটিকা সফরের মত গ্রামে গিয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম। সবচেয়ে খারাপ লাগল আমার অশীতিপর বৃদ্ধা নানী ও মাতৃস্থানীয়া মেজ খালাকে ছেড়ে যেতে।
লাহোর রওনা হওয়ার আগের দিন কুলাউড়ার বাসায় আম্মা আমাকে পাশে বসিয়ে কয়েকটি উপদেশমূলক কথা বললেন। এর মধ্যে একটি কথা ছিল, আমি যেন সব সময় আমার ভাইবোনদের প্রতি লক্ষ্য রাখি। বিশেষ করে, আমি কোনদিনও যেন বড় ভাইকে ভুলে না যাই। কথাটা শুনে আমি ব্যথাই পেলাম মনে। কারণ আমি সারাজীবন আমার ভাইবোনদের সবাইকে কাছে টেনে রেখেছি। বড় ভাই বোধ হয় ভাবতেন, আমি সি এস পি হওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে গেছি। আম্মাকেও বোধ হয় এমনি একটি ধারণা দিয়ে থাকবেন। কিন্তু এটা ছিল একটা মস্ত বড় ভুল ধারণা। আম্মাকে আমি আশ্বস্ত করলাম, সারাজীবন আমার আচার-আচরণে এ রকম কিছু প্রকাশ পায়নি, ভবিষ্যতেও পাবে না। এই কথাটি বলার সময় আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে বড় সুহৃদ, বড় বন্ধু, আম্মাও আমাকে ভুল বুঝতে শুরু করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার আগে আমার উদ্দেশ্যে আম্মার কথাগুলো কেন জানি তাঁর অন্তিম উপদেশের মত শোনাচ্ছিল। তাতে করে কথাগুলো আরও বেশি করে মনে বেজেছিল আমার।
অবশ্য দু’বছর পর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসে দেখি, না সবই ঠিক আছে। আম্মার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আগের মতই অটুট আছে। সেই ছেলেবেলার পড়া ছড়া মনে পড়ছে : কিসের মাসি, কিসের পিসি, কিসের বৃন্দাবন/ঘরে ফিরে দেখি আমি মা বড় ধন।
শাহদারা ও মন্ডি বাহাউদ্দিন :
অমিত্রাক্ষর মিত্রতা
পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের, মানে বাঙালিদের জন্য আর যাই হোক কোন ‘বৃন্দাবন’ ছিল না। বরং আবহাওয়া, কথাবার্তা, খাওয়া-দাওয়া, চালচলন সবই ছিল কেমন, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ডিসএগ্রিয়েবল’ বা বেয়াড়া ধরনের। কখনও কখনও বৈরীই বলা চলে। তবু চাকরির শর্তানুযায়ী পাকিস্তানের যে কোন অঞ্চলে চাকরি করতে বাধ্য ছিলাম বলে এতে না বলার কোন সুযোগ ছিল না। ‘ইন্টার-উইং ট্রান্সফারের’ আওতায় আমাদের ১৯৬৬ সালের ব্যাচের মোট চৌদ্দজন সি এস পি অফিসারের ভেতর প্রথম সাতজনকে সেবার পাঠানো হল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মহকুমাগুলোতে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে। পাঞ্জাব প্রদেশে পোস্টিং হল জালাল, হুদা (ড. এ টি এম শামসুল হুদা, বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার), শওকত আলী (ড. এ এম এম শওকত আলী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) ও আমার। এর ভেতর একমাত্র আমার কপালে জুটল লাহোর শহরের উপকন্ঠে একটি মহকুমা। বাকিরা সবাই লাহোর থেকে দূরে দূরে। আমার মহকুমার নাম ছিল ফিরোজওয়ালা এ্যাট শাহদারা। কেমন বেখাপ্পা নাম। অনেকটা স্ট্রাটফোর্ড-আপোন-আভন-এর মত। লাহোরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইরাবতী (ইংরেজি নাম রাভি) নদীর পুল পার হলেই শুরু আমার মহকুমা। ওটা আবার শেখপুরা জেলায়, যদিও কার্যত লাহোরের সঙ্গেই সব কায়কারবার।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিদেশে কর্মসংস্থান : সমস্যা ও সম্ভাবনা
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • শিশুর সুরক্ষা ও গণমাধ্যম
  • উন্নয়নের অভিযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • Developed by: Sparkle IT