ধর্ম ও জীবন

নারীর পর্দা নিয়ে কিছু কথা

মো. মিনহাজুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৭-২০১৮ ইং ০১:২৪:২৩ | সংবাদটি ১৪৭ বার পঠিত

একজন মুসলিম হিসেবে প্রতিদিন যখন ঘর বা বাসস্থান হতে বের হয়ে কর্মসংস্থান, রাস্তাঘাট, সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানেই যাই সেখানে আমাদের নারী সমাজের বেপর্দা বিচরণ দেখে হৃদয়ে আঘাত লাগে। আর সেই আঘাত থেকেই নারীর পর্দা বিষয়ে লেখার প্রবল ইচ্ছা কাজ করে অনেক দিন থেকে। আমাদের সমাজে যেখানে নারীকেন্দ্রিক কোনো অনুষ্ঠান সেখানে কিংবা ম্যাগ্যাজিন, পত্র, পত্রিকা হাতে নিলেই দেখা যায় নারীর মযার্দা বা সম্মান নিয়ে আলোচনা। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল সেখানে কেউ অনুধাবন করে না যে, পর্দা ছাড়া নারীর সম্মান বা মযার্দা বৃদ্ধি করা যায় না। পবিত্র কোরানুল কারীম ও হাদিসের বাংলা অনুবাদ পড়তে গিয়ে বিভিন্ন সময় অনুধাবন করলাম যে একমাত্র ইসলাম ধর্মই নারীর মর্যাদা বা সম্মান সবচেয়ে বেশি দিয়েছে। আর সেখান থেকে আরো একটি বিষয় অনুধাবন করলাম তা হল পর্দা ছাড়া কোনো ক্রমেই নারীর মর্যাদা বা সম্মান বৃদ্ধি করা যায় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাইশ তেইশ বছর বয়সের দুই জন রমণী ঘর হতে বের হল, একজন পর্দা ছাড়া পোশাক পরিধান করেছে আর অন্য জন হাতে মোজা, চোখে কালো চশমা, হিজাব সহ বোরকা পরিধান করেছে। এখন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে রাস্তা ঘাটে থাকা বখাটে ছেলেরা কার দিকে নজর দিবে এবং দুই একটা অশ্লীল গানের কলি মুখ হতে বের করবে কাকে লক্ষ্য করে। সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী যে কেউ বলবে নিশ্চয় বোরকা পরিধানকারী রমনীকে লক্ষ্য করে নয় । ইভটিজিং এর দায় শুধু বখাটেদের উপর বর্তায় না, কিছুটা চলাফেরার উপর বর্তায়। একটা প্রশ্ন রাখতে চাই, তা হল কয়টা বোরকা পরা মেয়ে অফিসে সহকর্মীর যৌন লালসার শিকার হয়েছে? কয়টা বোরকা পরা মেয়ে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে? কয়টা বোরকা পরা মেয়ে ধর্ষণ ঘটনার শিকার হয়েছে?
এবার বলি পশ্চিমা বিশ্বের কথা যারা নারীদের পর্দায় বিশ্বাসী নয় কিন্তু মুখে নারীর সম্মানে বিশ্বাসী, তারাই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ ঘটনার জন্ম দিয়েছে। বুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিষ্ট্রিক্র, ন্যাশনাল ভায়োল্যান্স এগেইন্সট উইমেন সার্ভার, কমিউনিটি অব ইনফরমেশন, এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টস ব্যুরো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাস্টিস ইন্সটিটিউট অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইত্যাদি সংগঠনের জরিপ অনুসারে ধর্ষণের ঘটনায় পৃথিবীতে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র। আরো ভয়ংকর বিষয় হল প্রতি ১০৭ সেকেন্ডে একজন মহিলা ধর্ষণের শিকার হয় যুক্তরাষ্ট্রে। তথ্য অনুসারে বছরে ৮৫ হাজার মহিলা ধর্ষণের শিকার হয় গ্রেট ব্রিটেনে, [তথ্য সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক ০৭ জুলাই ২০১৫]।
যে দেশে যত বেশি, পর্দাকে বাদ দিয়ে নগ্নতা বাড়বে সে দেশে ধর্ষণের হার তত বেশি বাড়বে। ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রিজের নামে আমাদের পাশের দেশ ভারতে নগ্নতাকে উৎসাহ দেওয়ায় ধর্ষণের হার বেড়ে গেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল ২০১২ সালে নয়া দিল্লিতে চলন্ত বাসের মধ্যে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনা, নয়া দিল্লিতে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ছোট খাটো ধর্ষণ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ওয়ান ইন্ডিয়া পত্রিকা এক প্রতিবেদনে বলেছে সারা ভারতে এ ধরনের ঘটনা কমবেশি ঘটে। সুপ্রিয় পাঠক উদাহরণ দিয়ে না বুঝিয়ে আপনাদের প্রতি আকুল আবেদন করে বলছি শীতল মস্তিষ্কে একটি বার লক্ষ করুন, দেখবেন সমগ্র পৃথিবীতে যেখানে পর্দার জীবন বাদ দিয়ে নগ্নতার জীবন বেছে নেওয়া হচ্ছে সেখানেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। নারীদের সম্মান, মর্যাদা নষ্ট করার জন্য পশ্চিমারা তাদের অভিনব কৌশলে নারীদেরকে বেপর্দা বানানোর চেষ্টা করছে। তাদের একটাই উদ্দেশ্য নারীদেরকে বেপর্দা বানানো গেলে সহজেই তাদেরকে ভোগ করা যাবে।
লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি একমাত্র ইসলাম ধর্মই নারীদেরকে সবচেয়ে বেশি সম্মান বা মর্যাদা দিয়েছে। আর পর্দা ছাড়া নারীর সম্মান বা মর্যাদা বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। আসুন আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলাম নারীদের পর্দা নিয়ে কি বলেছে তার দিকে একটু লক্ষ্য করি, পবিত্র কোরানুল কারীমে মহান আল্লাহ্ আমাদের প্রিয় নবী (সা.) কে বলেন, ইমানদার নারীদেরকে বলে দাও তাদের দৃষ্টি অবনমিত করতে আর তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করতে, আর তাদের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে যা এমনিতে প্রকাশিত হয় তা ব্যতীত। তাদের ঘাড় ও বুক যেন মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মহিলাগণ, স্বীয় মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনামুক্ত পুরুষ আর নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া অন্যের কাছে নিজের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদাচারণা না করে, হে মুমিনগণ আল্লাহর নিকট তাওবাহ কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার, (সূরা : আননূর, আয়াত : ৩১)।
আয়শা (রা.) বলেন উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মহিলারা নিজের চাদর ছিড়ে তা নিয়ে মুখমন্ডল ঢাকল (বুখারী হাদিস নং-৪৭৫৮)। মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করো, প্রাচীন জাহেলী যুগের নারীদের মত নিজেকে প্রদর্শন করো না (সূরা : আযাব, আয়াত : ৩৩)।
উক্ত আয়াতে পর্দার নির্দেশ থাকার পরও আমাদের সমাজের মহিলারা নিজেকে যেভাবে প্রদর্শন করেন তা পবিত্র কোরানুল কারীমের এই আয়াতের বিরোধীতার সামিল। মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) কে আরো বলেন হে নবী আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, অন্যদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন তারা যেন, তাদের চাদরের আঁচল নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দেয়, এটাই অধিক উওম নিয়ম এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না (সূরা : আযহাব, আয়াত : ৫৯)।
মহান আল্লাহর এই নির্দেশনা মানা প্রত্যেক নারীর মহান দায়িত্ব। পবিত্র কুরআন মাজীদে মহান আল্লাহ আরো বলেনÑবৃদ্ধা নারী যারা বিবাহের আশা রাখে না তাদের বাহ্যিক পোশাক (চাদর, বোরকা ইত্যাদি) খুলে রাখলে কোনো অপরাধ হবে না তবে এটা হতে বিরত থাকাই উওম, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ (সূরা : আননূর, আয়াত : ৬০), অথচ সুপ্রিয় পাঠক আমাদের সমাজে রাস্তা ঘাটে দেখবেন যখন মা ও মেয়ে একসাথে কোথাও যাচ্ছে তখন বৃদ্ধা মা বোরকা ও হিজাব পরিহিত অন্য দিকে বিবাহযোগ্য মেয়ে আধুনিকতার নামে অর্ধনগ্ন। সমাজের এই অবস্থাটাই এই আয়াতের বিরোধিতার সামিল।
হাদিস গ্রন্থগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন রাসূল (সা.) বলেছেন দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামী যারা গরুর লেজ সদৃশ বেত দ্বারা মানুষকে প্রহার করে এবং যেসব নারী এত পাতলা পোশাক পরিধান করে যে তার ভেতর দিয়ে শরীরের অংশ দেখা যায় এবং উটের কুঁজের মতন কেশ বিন্যাস করবে। এ নারী জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবেনা যা বহুদূর থেকে পাওয়া যায় (সহীহ মুসলিম হাদিস নং-২১২৭, মুসনাদে আহমদ হাদিস নং-৮৬৬৫)। আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.) আরো বলেছেন তিন শ্রেণীর মানুষ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা । প্রথম শ্রেণী- যারা যেকোন প্রকার নেশা দ্রব্য পান বা গ্রহণ করে । ২য় শ্রেণী- পিতা মাতার অবাধ্য যারা, ৩য় শ্রেণী- দাইউস, ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারের পর্দা প্রথা চালু রাখেনি, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বেপর্দা ছিলো, বেহায়াপনা ছিলো কিন্তু সে বাধা প্রদান করেনি। পরিবারের কর্তা হিসেবে বেপর্দা বেহায়াপনা বন্ধ না করার জন্য, এই শাস্তি পাবে সে। (মুসনাদে আহমদ ২/৬৯)।
আসুন আমরা আজ থেকে সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে নারীদেরকে পর্দার ভিতর নিয়ে আসতে চেষ্টা করি। নিজের দৃষ্টি শক্তিকেও সংযত রাখি। মানুষকে পর্দার গুরুত্ব বুঝাতে চেষ্টা করি। হাদিস শরীফে এসেছে ‘পর্দার ক্ষেত্রে মানুষকে সহযোগিতা করা উচিত’ (বুখারী হাদিস নং-৬১৮৫)। সর্বশেষ পর্দার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে ভুলভ্রান্তির জন্য মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। পাঠক সমাজ পড়ে উপকৃত হলে আমার আত্মা তৃপ্তি পাবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে পর্দার সাথে চলাফেরা করার তৌফিক দান করুন এই কামনা ব্যক্ত করে শেষ করছি। আমীন ॥

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  • প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমান (রাহ.) ও সাদাকায়ে জারিয়া
  • রাসূলের সাথে জান্নাত
  • মাতা-পিতার অবাধ্যতার শাস্তি
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • বিশ্বনবীর কাব্যপ্রীতি
  • শতবর্ষের স্থাপত্য সিকন্দরপুর জামে মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  •  আত্মার খাদ্য
  • মানব জীবনে আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
  • সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ : ইসলাম কী বলে
  • মৃত্যুর আগে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করি
  •   তাফসীর
  • ইসলামে বিনোদনের গুরুত্ব
  • কুরআনে হাফিজের মর্যাদা
  • মদীনা রাষ্ট্রের যাবতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্র ছিল মসজিদ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • এতিম শিশু
  • বার্মিংহামে আল কুরআনের হাতে লেখা প্রাচীন কপি
  • রাসুলের সমগ্র জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়
  • মৌল কর্তব্য আল-কুরআনের বিধান
  • Developed by: Sparkle IT