উপ সম্পাদকীয়

বাণিজ্য যুদ্ধ ও উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা

মুহাম্মদ রুহুল আমীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৮ ইং ০২:৪১:০৭ | সংবাদটি ২২ বার পঠিত

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে যে যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তার অন্তর্নিহিত কাঠামোগত সমস্যা, তাত্ত্বিক দুর্বলতা, প্রায়োগিক প্রতারণা এবং সর্বোপরি বৈশ্বিক শক্তিসমূহের স্বার্থান্ধ বাস্তববাদের কারণে তা ক্রমেই ক্ষয় হতে থাকে। বিশ্বব্যবস্থার এ মৌলিক সমস্যাগুলোর কারণে পারমাণবিক যুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ প্রভৃতি মানবসভ্যতার স্বাভাবিক ধারা ও উন্নয়নের গতি থমকে দিয়েছে বার বার। একবিংশ শতাব্দী মানব জাতির সুখ-শান্তির বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হলেও বিশ্বব্যবস্থায় বিরাজমান সংকটের কারণে মানবসমাজ সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অনুমিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অর্থনৈতিক বাস্তববাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প শরণার্থী কূটনীতি, অভিবাসন নীতি ও সর্বব্যাপী বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ নীতি অনুসরণ করেন, যা আস্তে আস্তে তাকে বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধে ঠেলে দেয়। এ বাণিজ্য যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র পাশ্চাত্য এবং পাশ্চাত্য কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে জটিল আন্তঃতালাবদ্ধতায় শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ প্রথমদিকে স্নায়ুযুদ্ধের প্রবল প্রতিপক্ষ রাশিয়া ও ইরানসহ কতিপয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত হলেও অচিরেই তা দূরপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, পশ্চিম ইউরোপের পরীক্ষিত মিত্র রাষ্ট্রবলয় ও উত্তর আমেরিকায় বাণিজ্য-সহচর কানাডার বিরুদ্ধেও ঝলসে ওঠে।
কিমিয়া ও পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে। পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ট্রাম্প ঐ চুক্তি বাতিল করে পুনরায় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খড়্গ চাপিয়ে দেন। নির্বাচনকালীন সময়কার প্রতিজ্ঞা পালনে ট্রাম্প কি বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির আমূল পরিবর্তন করে চলেছেনÍ এমন প্রশ্ন অনেকের। উদীয়মান পরাশক্তি চীন হতে আমদানি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করে তিনি চীনকে ক্ষেপিয়ে তোলেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন ক্রয় বন্ধ করে ব্রাজিল ও রাশিয়া থেকে তা অধিকতর হারে ক্রয় করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প ইইউ ও কানাডা থেকে আমদানিকৃত অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাতের উপর কর আরোপ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের তাগিদেই তা করা হয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ২.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের উপর ইইউ শুল্ক ধার্য করেছে।
ট্রাম্প হয়ত চীনকে রুখতে বা বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির পুনর্মূল্যায়ন করতে সর্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন। কিন্তু তা যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্বশান্তির প্রতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় সবার সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ভোগ করছে। বিশ্ববাণিজ্য ডলারকেন্দ্রিক হওয়ায় তা তেমন অনুভূত হয়নি। কিন্তু ইউরেশিয়া ও এশিয়ায় উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে চীনের আবির্ভাব, রাশিয়ার শৌর্য, ইরান-ভারত-তুরস্কের নবতর উদয় আগামীদিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করবে। চীন, রাশিয়া, ইরানসহ অনেক রাষ্ট্র ইতোমধ্যে ডলারকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, ধারণা করা যায়, ইইউসহ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা আস্তে আস্তে ডলারবিহীন ব্যবস্থার (উব উড়ষষধৎরংধঃরড়হ) সাথে খাপ খাওয়াতে শুরু করবে। কারণ তারা ঋণগ্রস্ত সাম্রাজ্যের (ঊসঢ়রৎব ড়ভ উবনঃ) অংশীদার হয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধসমূহে জড়ানোর ভীতি থেকে মুক্ত হতে চায়। ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনস ও জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলেও সংস্থা দুটি আন্তর্জাতিকতা, বিশ্বময়তা ও সার্বজনীনতার চেতনা ও আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে থাকেনি। ফলে বৈশ্বিক ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক সুবিচার নিশ্চিত হয়নি। এ কারণে লোলুপ বৃহত্ রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে গ্রাস করার লক্ষ্যে বাণিজ্য অবরোধ, বাণিজ্যযুদ্ধ ও বাণিজ্য সংরক্ষণবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখতে গেলে ১৬৮৯ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রথমে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটিশরাজ উইলিয়াম অব অরেঞ্জ তখন ফরাসি মদের ওপর শুল্ক ধার্য করে এ বাণিজ্য যুদ্ধ বাধান। একই সময় চীন থেকে ব্রিটিশরা প্রচুর চা আমদানি করত। কিন্তু বাণিজ্য ঘাটতির কারণে এক পর্যায়ে তারা চীনে আফিম (ঙঢ়রঁস) রপ্তানি শুরু করে। যা পরবর্তী কালে, ১৮০০ সালে, অপিয়াম যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সুষ্ঠু বাণিজ্য বিশ্বশান্তির নিয়ামক ও পূর্ব শর্ত। অপরদিকে অসুস্থ বাণিজ্য, অসম বাণিজ্য, বাণিজ্যিক বিরোধ বিশ্বশান্তির অন্তরায়। বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পকে তাই বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধ থামানোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুসারে একটি রাষ্ট্র অযৌক্তিক শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাণিজ্যযুদ্ধের অবতারণা করেÍ যা আস্তে আস্তে মারাত্মক বৃহত্ যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক মন্দা-সংকট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করে। মহামন্দা (এৎবধঃ উবঢ়ৎবংংরড়হ) এমন একটি বাণিজ্যযুদ্ধের ফসল ছিল।
গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্য বিরোধের কারণে উগ্র সমরবাদের (সরষরঃধৎরংস) অভিশাপ নেমে আসেÍ যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে পৃথিবীকে নিক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী করডেল হুল (ঈড়ৎফবষষ ঐঁষষ) ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নোবেল কমিটি তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বের সারকথা এভাবে বিশ্লেষণ করেছিল, “পৃৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহের বন্ধুত্ব ও বাণিজ্য উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হলো উচ্চ শুল্ক এবং তা স্থায়ী আন্তর্জাতিক শান্তির জন্যও ক্ষতিকর।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুল ব্যাখ্যা করেন কিভাবে ১৯৩৮ সালের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ সকলকে ভয়ঙ্কর বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর মতে, “কেবল শান্তিময় পৃথিবীতেই রাষ্ট্রসমূহ স্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, কেবল সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভিত্তিই শান্তিময় পৃথিবীর নিশ্চয়তা দিতে পারে এবং কেবল সুস্থ, সুষম ও পারস্পরিক লাভজনক বিশ্ব বাণিজ্যই সমৃদ্ধিময় বিশ্ব অর্থনীতির সোপান রচনা করতে পারে।”
একবিংশ শতাব্দীর প্রবল পরাক্রমশালী পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে শান্তিকামী বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা অনেক। বিশ্বশান্তি রক্ষা ও বিশ্বসমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রতি বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা সর্বজনবিদিত, এ সত্য অনুধাবন করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অসম বিশ্ববাণিজ্য বন্ধ করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা নীতির পুনর্মূল্যায়ন করে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিশ্ব বাণিজ্য যুদ্ধ বন্ধ করে সমৃদ্ধিশালী আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সুদৃঢ় স্থাপনা গঠনে প্রত্যয়দীপ্ত হতে হবে। উদীয়মান বিশ্ব বাণিজ্য যুদ্ধের করাল গ্রাস পৃথিবীকে যদি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় তাহলে তা মানবসভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি ও ইস্যুর সমাধান করাও জরুরি। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্কন্ধে এ গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের নেতৃত্ব সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধারণের অর্জিত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে শান্তিময় বিশ্ব ও সমৃদ্ধিশালী পৃথিবীর স্বপ্নে আমরা ভরসা রাখতে চাই।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • Developed by: Sparkle IT