পাঁচ মিশালী

ভারত ভ্রমণের কথকতা

আতাউর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৮ ইং ০২:৪১:৫৩ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত

‘দিল্লি দূর আস্ত’ ও ‘দিল্লি হনুজ দূর আস্ত’, ফারসি ভাষায় এ দুটি কালান্তক কথা, যেগুলোর আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে ‘দিল্লি দূরে আছে’ ও ‘দিল্লি এখনো দূরে আছে,’ আবাল্য আমাদের পরিচিত। বাস্তবিক মুঘলেরা, যাদের মাতৃভাষা ছিল ফারসি, প্রায় সাড়ে তিন শ বছর উপমহাদেশ শাসন করায় অফিস-আদালতের দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসি। যেজন্য আজ অবধি আমাদের দেশের অফিস-আদালতে উকিল, মোক্তার, তহশিলদার, সেরেস্তাদার ইত্যাদি শব্দ। আর অঞ্চলবিশেষে অভিজাত মহলে ‘ইসেম শরিফ’ (নাম), ‘দৌলতখানা’ (বাড়ির ঠিকানা) ইত্যাকার ফারসি শব্দ বহুল প্রচলিত এবং এ নিয়ে বেশকিছু মজার গল্পও আছে : এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘আপনার ইসেম শরিফ কী?’ সে কিছুই বুঝতে না পেরে জবাব দিল’ ‘ভালো কইলে তো কইছেনই। তয় খারাপ কিছু কইলে আপনার চৌদ্দগুষ্টি ইসমে শরিফ’। অন্য একজন প্লেনে ভ্রমণকালে তাকে ‘আপনার ইসমে শরিফ কী’ জিজ্ঞাসা করায় সে নাকি বিমূঢ় হয়ে মক্কা শরিফ মদিনা শরিফের অনুসরণে জবাব দিয়েছিল, ‘ঢাকা শরিফ’।
সে যাই হোক। প্রথমোক্ত কথাগুলো যে দিল্লির নিজামুদ্দিন আউলিয়া কর্তৃক উচ্চারিত, তা বোধকরি বহুজ্ঞাত। হজরত নিজামুদ্দিন প্রথমে ছিলেন ডাকাত, পরে স্রষ্টার অশেষ কৃপায় তিনি পরিবর্তিত হন সিদ্ধপুরুষে। তো দিল্লিতে একসময় শুরু হয়ে গেল দ্বন্দ্ব, দরবেশে-বাদশাহে নিজামুদ্দিনে-গিয়াসুদ্দিনে। সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক বানাবেন দিল্লির উপকণ্ঠে নবনির্মিত নগর তুঘলকাবাদে দুর্ভেদ্য প্রাচীর। আর মানুষের পানির কষ্ট নিবারণার্থে নিজামুদ্দিন দরবেশ খনন করাবেন দিঘি। সে যুগে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল সীমিত। সুলতান গেছেন বঙ্গদেশে বিদ্রোহ দমন করতে, আর এই সুযোগে দরবেশ শ্রমিকদের দ্বারা তার দিঘি খননের কাজ সেরে ফেললেন; অন্যদিকে প্রাচীরের কাজ রইল অসমাপ্ত। সুলতান ফিরে আসছেন সংবাদ পেয়ে দরবেশের সুহৃদ ও মুরিদরা তার রোষ থেকে বাঁচতে দরবেশকে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তার মুখে এক কথা, দিল্লি দূর আস্ত। আর মাত্র এক দিনের পথ বাকি, তখনো সবাই তাড়া লাগালে তিনি স্মিতহাস্যে বললেন, ‘দিল্লি হনুজ দূর আস্ত’। আর ঘটলও তাই। সুলতানের অভ্যর্থনার জন্য নগর-প্রান্তে নির্মিত শামিয়ানার রাজসিক মঞ্চে তিনি কনিষ্ঠ পুত্রসহ আরোহণের অল্পক্ষণের মধ্যেই হাতির কুচকাওয়াজের সময় একটি হাতির শির সঞ্চালনে প্রথমে মঞ্চের একটি স্তম্ভ ও পরে কড়-কড়াৎ শব্দে গোটা শামিয়ানা ভেঙে পড়াতে ওটার নিচে চাপা পড়ে সপুত্র সুলতান ইহলোক ত্যাগ করলেন। যাযাবর তার ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন, ‘সমস্ত ঐহিক ঐশ্বর্য, প্রতাপ ও মহিমা নিয়ে সপুত্র গিয়াসুদ্দিনের শোচনীয় জীবনান্ত ঘটল নগরপ্রান্তে। দিল্লি রইল চিরকালের জন্য তার জীবিত পদক্ষেপের অতীত।’
সুধী পাঠক! দিল্লিতে হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজার পরিদর্শনকালে উপরোক্ত কাহিনীটি অপরিহার্যভাবে আমার মনের কোণে উঁকিঝুঁকি মারছিল। কিন্তু সে কেচ্ছা পরের, আগের কথাটা আগে সেরে নিই।
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের প্লেনে চড়ে দিল্লিতে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ও আমার স্ত্রী আলাদা হয়ে গেলাম। ‘আলাদা হয়ে গেলাম’ বলতে আপনারা অন্যথা বুঝবেন না যেন। আসলে ব্যাপার হচ্ছে ইন্ডিয়ান ডাক বিভাগের একজন সিনিয়র পুরুষ অফিসার আমাকে নিয়ে গেলেন দিল্লি শহরের কয়েকটি ডাকঘরে নতুন প্রবর্তিত কম্পিউটারাইজড কাউন্টারসমূহ পরিদর্শনে, আর একজন জুনিয়র মহিলা অফিসার আমার স্ত্রীকে নিয়ে গেলেন শাড়ির দোকানে। শাড়ি, জুয়েলারি ও ক্রোকারিজের প্রতি মহিলাদের আকর্ষণ চিরন্তন এবং কিছু মহিলা একত্রিত হলেই সাধারণত এগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা জমে ওঠে। তো একবার এক মহিলা-সমাবেশে একজন ‘এখন থেকে আমরা উচ্চমার্গের কথা বলব; হাও অ্যাবাউট চায়না’ বলতেই আরেকজন বলে উঠলেন, ‘হা, বৌন চায়নার ক্রোকারিজের গুণগতমান খুব ভালো, আমি গতকালই ভালো দামে একটি ডিনার সেট কিনেছি।’ অর্থাৎ প্রথমজন চায়না বলতে চীনদের বোঝাচ্ছিলেন; দ্বিতীয়জন বুঝলেন চীনামাটির বাসন-কোসন। অনেকটা সেই স্কুল ছাত্রটির মতো আর কি, যাকে যে বিষয়েই রচনা লিখতে দেওয়া হোক সে কুমির নিয়ে আসবেই। তো একবার তাকে পলাশীর যুদ্ধের ওপর রচনা লিখতে বলায় সে নাকি লিখেছিল : ‘পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ইংরেজ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফরকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়াছিলেন; করিয়া তিনি খাল কাটিয়া কুমির আনিলেন।’ বাকিটা কুমির সম্পর্কিত রচনা। হা-হা-হা!
তো সেদিনই অপরাহ্নে আবার একত্রিত হয়ে আমরা স্বামী-স্ত্রীতে প্রথমে গেলাম হজরত নিজামুদ্দিনের মাজার জিয়ারত করতে এবং বলাই বাহুল্য, সেখানে গিয়েই আমার মনে পড়ে গিয়েছিল নিবন্ধের প্রারম্ভিক প্যারাগুলোয় বর্ণিত কথা ও কাহিনী। অতঃপর দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদ, লাটভবন ও সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিসৌধ, যেটা দর্শনমাত্রই সাদৃশ্যহেতু তাজমহলের কথা মনে পড়ে যায়, সেটা হয়ে অবশেষে কুতুবমিনার সেই মিনার যেটা একসময় ছিল তাজমহলের মতোই পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম এবং যেটা নির্মাণ করেছিলেন দাস-রাজবংশ খ্যাত সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক। ভারতবর্ষে রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর প্রধানত জয়ের স্মারক হিসেবেই নাকি তিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং পঞ্চম তলাবিশিষ্ট মিনারটির সর্বোপরি দুটি তলা দুবার নাকি বজ্রপাতে ভেঙে পড়ে এবং সুলতান মুহম্মদ তুঘলক ও ফিরোজ শাহ্ তুঘলক সেগুলো সারিয়ে তোলেন। মিনারের সর্বাঙ্গে দৃশ্যমান লতা-পাতা ও ফুলের সমারোহ সহযোগে সংযোজিত কারুকার্য নিঃসন্দেহে এর সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। আগে নাকি মিনারের ওপর যাওয়া যেত; কিন্তু ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেটা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতদসত্বেও কুতুবমিনার আজ অবধি তার নির্মাতার জয়গান গেয়েই চলেছে। আশ্চর্যের কিছুই নয় যে, ইদানীং আমার জন্মস্থান সিলেটে একটি সম্মাননা-প্রদান অনুষ্ঠানে স্থানীয় কলেজের বাংলার ভূতপূর্ব অধ্যাপক যখন আমাকে ‘রম্যরচনার কুতুবমিনার’ বলে অভিহিত করছিলেন, তখন সেটা অতিশয়োক্তি হলেও শুনতে খুব শ্রুতিমধুর লাগছিল।
সে যাকগে। সেদিন রাতে সস্ত্রীক ইন্ডিয়ান ডাক বিভাগের ডিজি-কাম-সচিব সোম সাহেবের সরকারি বাসায় ডিনার খেয়ে ডাক বিভাগের ভিআইপি রেস্ট হাউসে রাতযাপন-পূর্বক পরদিন সকালে বিভাগীয় যানবাহনেই আমরা রওনা হলাম তাজমহল দেখতে, আগ্রার উদ্দেশে; সঙ্গে গাইড হিসেবে যথারীতি একজন পোস্টাল অফিসার, গৌরকান্তি কাশ্মীরি শ্রী হীরালাল চৌধুরী। প্রসঙ্গত, তাজমহল পরিদর্শন শেষে আমাদের দুই প্রধানতম কবিই কালজয়ী কবিতার চরণ লিখে গেছেন বিশ্বকবি লিখেছেন, কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল/এ তাজমহল, আর জাতীয় কবি লিখেছেন, ‘তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখেছ কি তার প্রাণ/অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শাহজাহান’। সর্বোপরি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সস্ত্রীক তাহমহল পরিদর্শন শেষে বলে গেছেন, ‘পৃথিবীতে কুল্লে দুই ধরনের মানুষ আছেন, যারা তাজমহল দেখেছেন ও যারা দেখেননি।’ দিল্লি থেকে আগ্রার দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। আমরা আগ্রার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, হঠাৎ নজরে এলো এক বিশাল দেউড়ি, নাম যার ‘বুলন্দ দরওয়াজা’। ব্যাপার কী? না, জায়গাটা হচ্ছে সেকেন্দ্রাবাদ ও সেখানে সম্রাট আকবরের সমাধিসৌধ অবস্থিত। আগ্রা যেতে যে পথে সেকেন্দ্রাবাদ পড়ে তা জানতাম না; তাই বিস্ময়ে ও আনন্দের পরিসীমা রইল না। তৎক্ষণাৎ থেমে নেমে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। সম্রাট আকবর স্বয়ং নাকি ১৬০২ সালে তার সমাধিসৌধ নির্মাণ শুরু করেন। তবে তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি, সমাপ্ত করেছেন পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৫ সালে। প্রায় ১০০ একরব্যাপী বিস্তৃত সমাধি ক্ষেত্রটির অভ্যন্তরে অনেক চিত্রা হরিণ আর কৃষ্ণবর্ণ বানর ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিল; বানরগুলো আবার মানবশিশুদের মতো হাত থেকে খাবার কেড়ে নিয়ে খেতে অভ্যস্ত। তা সমাধিসৌধটি দেখার সময় সম্রাট আকবর প্রসঙ্গে আমার চিন্তাস্রোতে যে ব্যাপারগুলো ভেসে এলো, সেগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ : পিতা সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুতে জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর মাত্র ১৪ বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং লেখাপড়া কম জানলেও তিনি ছিলেন সত্যিই একজন দক্ষ প্রশাসক ও শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তার দরবারের ‘নবরতœ’দের মধ্যে বীরবল, মোল্লা দোপিয়াজা, তানসেন এবং আবুল ফজল (যনি আকবরের নির্দেশে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি করেছিলেন) ও ফৈজি ভ্রাতৃদ্বয়ের মতো গুণীজন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বীরবলের আসল নাম ছিল মহেশ এবং সম্রাট আকবর তাকে দিল্লিতে কাকের সংখ্যা কত প্রশ্ন করায় প্রত্যুত্তরে তিনি যে বলেছিলেন ‘নয় হাজার নয় শ নিরানব্বই এবং এর কম হলে বুঝতে হবে কিছু কাক বাইরে বেড়াতে গেছে ও বেশি হলে বুঝতে হবে বাইরে থেকে বেড়াতে এসেছে, সে গল্প বোধকরি সবাইর জানা। তবে মোল্লা দোপিয়াজা সম্পর্কে একটি খুব মজার গল্প আছে, তা হয়তো অনেকেই জানেন না মোল্লা দোপিয়াজার সুখ্যাতি শুনে একবার ইরান থেকে এক মৌলভি তার সঙ্গে বাহাস করার উদ্দেশ্যে দিল্লির দরবারে এসে উপস্থিত। ওটাকে অধিকতর আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে মৌলভি মুখে তর্ক করার পরিবর্তে আঙুলের সাহায্যে ইশারায় সওয়াল-জওয়াবের প্রস্তাব করলে মোল্লাজি দ্বিমত করলেন না। নির্দিষ্ট দিন ও ক্ষণে বাহাস শুরু হয়ে গেলে প্রথমেই মৌলভি ডান হাতের তর্জনী তুলে ধরলে পর মোল্লাজি তাকে দুই আঙুল তুলে দেখালেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে মৌলভি তিন আঙুল দেখালে তিনি চার আঙুল এবং মৌলভি পাঁচ আঙুল দেখালে তিনি বজ্রমুষ্টি দেখিয়ে দিলেন। এরপর মৌলভি পকেট থেকে একটি ডিম বের করে দেখালে তিনিও পকেট থেকে একটি পিয়াজ বের করে প্রদর্শন করলেন। মৌলভি তখন রণে ভঙ্গ দিয়ে মোল্লাজির অসাক্ষাতে সম্রাটের কৌতূহল চরিতার্থে জানালেন, ‘আমার সব প্রশ্নের উত্তরই মোল্লাজির জানা আছে। আমি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় বোঝাতে এক আঙুল দেখালে তিনি দুই আঙুল দেখিয়ে বোঝালেন যে আল্লাহ ইহকাল ও পরকাল দোজাহানেরই মালিক। আমি তিন আঙুল দেখিয়ে বোঝালাম প্রাণিজগতে প্রধান তিনটি অধ্যায় মাতৃগর্ভ, জন্ম ও মৃত্যু। তিনি চার আঙুল দেখিয়ে বোঝালেন প্রাণীদের শরীর চার জিনিসে গঠিতÍ আব, খাক্, বা’দ ও আতশ (পানি, মাটি, বায়ু ও অগ্নি)। আমি পাঁচ আঙুল দেখিয়ে বোঝালাম পাক পাঞ্জাতন তথা ইসলামের মহিমান্বিত পাঁচজন পয়গম্বর (সা.), তৎকন্যা ফাতেমা (রা.), তার স্বামী হজরত আলী (রা.) ও পুত্রদ্বয়। তিনি বজ্রমুষ্টি দেখিয়ে বোঝালেন যে আল্লাহই তাদের শক্তির উৎস। অতঃপর আমি পৃথিবী ও সেটাকে বেষ্টনকারী আকাশ বোঝাতে ডিম দেখালে তিনি পিয়াজ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, আকাশ বিভিন্ন স্তরে সজ্জিত। অতএব, তার সঙ্গে বাহাস করে লাভ নেই বিধায় আমি চললাম।
মৌলভি চলে গেলে পর মোল্লাজি সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, জাহাপনা! সে আমার দিকে তর্জনী তুলে ধরায় ভাবলাম সে আমার এক চোখ কানা করে দেবে বলছে। আমি তখন দুই আঙুল দেখিয়ে বোঝালাম যে সে ক্ষেত্রে আমি তার দুই চোখ কানা করে দেব। সে যখন তিন আঙুল দেখাল তখন ভাবলাম সে বলছে যে আমাকে তিনটি লাথি দেবে। তাই আমি চার আঙুল দেখিয়ে বোঝালাম যে সে ক্ষেত্রে আমি চারটি লাথি লাগাব। সে যখন হাতের চেটো দেখিয়ে চড় মারবে বোঝাল তখন আমি মুষ্টি দেখিয়ে ঘুষি মারব বুঝিয়ে দিলাম। অতঃপর সে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পকেট থেকে ডিম বের করল। কিন্তু ভদ্রতায়ই বা আমি হারতে যাব কেন? তাই আমিও পিয়াজ প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিলাম, তুমি ইচ্ছা করলে অমলেট বানিয়ে খেতে পারো। মোল্লাজির কথা শুনে সম্রাট আকবর নাকি সেদিন অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলেন।
যাই হোক, আমরা সম্রাট আকবরের কবরে ফাতিহা পাঠান্তে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আগ্রা পৌঁছে গেলাম এবং সেখানে পৌঁছেই প্রথমে উপস্থিত হলাম আগ্রা দুর্গে সেই দুর্গ যেখানে বিপতœীক শাহজাহান বৃদ্ধ বয়সে পুত্রকর্তৃক অন্তরিন হয়ে আমৃত্যু অবস্থান করেন এবং পিতার সেবা-শুশ্রুষার্থে কন্যা কবি জাহানারাও স্বেচ্ছায় বন্দিত্ববরণ করেন। দুর্গের অভ্যন্তরস্থ একদার দেওয়ান-ই-আম ও দেওয়ান-ই খাস হয়ে যে কক্ষটিতে উপবিষ্ট থেকে সম্রাট শাহজাহান তৎকর্তৃক যমুনা তীরে প্রিয়তমা পতœী আরজুমান্দ বানু ওরফে মমতাজ মহলের স্মৃতিরক্ষার্থে ২০ হাজার লোকের ২২ বছরের পরিশ্রমে নির্মিত তাজমহলের দিকে নিষ্পলক চেয়ে থাকতেন, সেখানে পৌঁছে নীরবে দীর্ঘশ্বাস পরিত্যাগ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
অতঃপর গেলাম তাজমহল দর্শনে এবং প্রথম দর্শনেই যে শিহরণ ও অনুভূতি হলো তা বর্ণনার মতো পর্যাপ্ত শব্দাবলি এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লেখকের স্টকে নেই। তদুপরি জনশ্রুতি অনুসারে চন্দ্রালোকিত রজনীতে তাজের গায়ে যে একটা অনির্বচনীয় আভা ফুটে ওঠে, সময়ের সংকীর্ণতার কারণে তা দেখাও সম্ভব হয়ে ওঠেনি; যেমন করে সম্ভব হয়নি অনতিদূরে ফতেহপুর সিক্রিতে অবস্থিত দরবেশ সেলিম চিশতির মাজার পরিদর্শনও। তবে তাজমহলের পুরোটাই দেখেছি এবং তাতেই আমরা মুগ্ধ ও পরিতৃপ্ত। সাধে কি আর ফারসি শায়ের লিখে রেখেছেন, আগর ফেরদৌস সেবরুইয়ে জমি আস্ত/হামি আস্ত, হামি আস্ত ও হামি আস্তÍ পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থেকে থাকে/তাহলে তা এখানেই, এখানেই এবং এখানেই! আর তাজমহলে না গেলে কোনোকালেই আমার জানা হতো না যে স্থাপত্যটির নাম প্রথমে ছিল মমতাজ মহল; প্রায় ২০০ বছর পর ‘মম’ কেটে করা হয়েছে তাজমহল এবং তাতে নামটির সৌকর্য অবশ্যই বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাকি রইল আজমিরে গিয়ে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনসংক্রান্ত বিবরণ। স্থানাভাবে এস্থলে বিস্তারিত বিবরণ প্রদান সম্ভব নয়; তবে এতটুকু না বললেই নয় যে, একজন আল্লাহর ওলি যেখানে শুয়ে আছেন সে জায়গাটার একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে বইকি। তাই আজমির শরিফ জিয়ারতের পুণ্যস্মৃতি আমৃত্যু আমার মনে জাগরূক থাকবে। তবে একজন হাক্কানি পীর ও আলেমের বংশধর হিসেবে আমি শিরকের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলাম; কেননা আল্লাহতায়ালা তার পাক কালামে স্পষ্টতই বলেছেন, ‘আমি সব অপরাধ ক্ষমা করব, কিন্তু শিরকের অপরাধকে নয়’।
পরিশেষে সম্ভাব্য পর্যটকদের একটা টিপস দিয়ে রাখি : আপনারা যখন দিল্লি ও আগ্রা যাবেন তখন দিল্লির লাড্ডু ও আগ্রার পেয়ারা খুঁজতে ভুলবেন না। জানেন তো, বিয়ে-শাদি সম্পর্কে বলা হয় যে, দিল্লি কা লাড্ডু যো খায়া উও পস্তায়া, যো নাহি খায়া উও ভি পস্তায়া’? এদিকে আগ্রার পেয়ারার খ্যাতিও উপমহাদেশব্যাপী বিস্তৃত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT