পাঁচ মিশালী

দাদুর বিদায়

মো. মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৭-২০১৮ ইং ০২:৪২:১৪ | সংবাদটি ১৩৮ বার পঠিত

দাদু আমেরিকা প্রবাসী। সেই কবে থেকে আমেরিকা যাওয়া আসা করছেন। দাদু বাড়ি এলে আমরা সবাই খুশি। কিন্তু বিদায়ের সময় মনে বড়ই কষ্ট লাগে। হৃদয় কেমন যেন চিন্ চিন্ করে। বছরে অন্তত একবার দাদু প্রিয়দেশ বাংলাদেশে আসেন। এসে দুই মাসের কম থাকেন না। দাদুর যাওয়া আসা দেখতে দেখতে আমরা তিন বোন অভ্যস্ত। দাদু আসলে কতো আত্মীয়-স্বজন আসেন আবার বিদায়ের সময় সবাই জড়ো হন। দাদু যখন বাংলাদেশে আসেন তখন দাদু প্রায়ই বলতেনÑ আহ্! মনটা ভরে যায় এই যে সবাইকে দেখছি কতো ভালো লাগছে। দেশীয় লোক, দেশীয় কথা-বার্তা মন ভরে যায়।
দাদুকে দেখতাম সকাল বেলা ফজরের নামাজ শেষে বাগান বাড়িতে পাখিদের কলকাকলি শুনতে খুব পছন্দ করতেন। পাখির কিচির মিচির দেখে দাদু মজা করতেন। দাদু একদিন এভাবে আনন্দ উপভোগ করতে করতে সকালের নাস্তা খাওয়াই ভুলে গেলেন। আব্বু দাদুকে খোঁজে নিয়ে আসলেন। দাদু আব্বুকে বললেন; দেখ মাজেদ প্রবাসে থাকলেও দেশকে মোটেও ভুলতে পারি না। দেশের আকাশ, বাতাস, পাখির কলকাকলি, সব কিছু সব সময় মনে পড়ে। আমার মনে হয় এই টান রেখে আমি আর আমেরিকা যাব না। দীর্ঘ দিন এখন বাংলাদেশে থাকতে চাই। কিন্তু না টিকেটের সময় হয়ে গেলে দাদু ঠিকই আমেরিকা চলে যান। দাদুকে বিদায় দিতে আবার সবাই সমবেত হন। একবার আব্বু বড়ই অসুস্থ্য হয়ে পড়লেন। আব্বুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। ডাক্তাররা রোগ নির্ণয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি দেওয়া হলো। দীর্ঘ দিন ক্লিনিকে শুনে দাদু দেশে চলে আসলেন। অবশেষে আব্বুকে বাঁচানো গেলো না। তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।
দাদু ভীষণ চিন্তায় পড়লেন। এখন তিনি আমাদেরকে রেখে কিভাবে আমেরিকা যাবেন। ছোট চাচু আর দাদু আমেরিকা থাকতেন। আমরা তিন বোন এশা, নিশা ও তৃষা মা-বাবাকে নিয়ে দেশে বাস করি। কিন্তু বাবা নেই তাই আমাদেরকে রেখে দাদু আমেরিকা যেতে মন সায় দিচ্ছে না। দাদু থেকেই গেলেন। আমাদেরকে পরম আদর দিয়ে আগলে রাখেন। একদিন দাদু মাকে বলল; মা রাফিয়া তুমি আমার ছেলের বউ নয়, তুমি আমার মা। মাজেদ মারা যাওয়ার পর তুমি একদম ভেঙ্গে পড়েছো। তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি আর আমেরিকা যাব না তোমাদের নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। এমনিতেই বাংলাদেশ আমার খুব ভালো লাগে। এখন নাত্নীদের সাথে হেসে খেলে আর গল্প করে ভালো সময় কাটানো যাবে। রাফিয়া; ঠিক আছে বাবা। আল্লাহর হুকুম হয়েছে তাই আমি বিধবা হয়েছি। আপনার ¯েœহ পাব এ ব্যাপারে আমি কোনো চিন্তা করি না। দাদু একদিন সন্ধ্যার পর বিলম্বে বাড়ি ফিরলেন। দাদুর হাতে একটি বড় কেক। উপরে লেখা ‘রাফিয়া মা মণির জন্মের উপহার।’ আম্মু দেখে অবাক এবং খুব খুশি হয়েছেন। দাদু আমাদেরকে ক্রীম মেখে দেন। স্কুলে যাওয়ার সময় ফ্রগ এগিয়ে দেন। এক সাথে খেতে বসেন। আমাদের সবাইকে নিয়ে গল্প করেন। আমেরিকার গল্প মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এভাবে ৪ বৎসর কেটে যায়। দাদুর এখন হাটাচলা করতে কষ্ট হয়। বয়স ৯২ বছর। দাদু একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠছেন না। আম্মু চিৎকার দেয়, পাশের ঘরের সবাই জড়ো হয়। তারপর আত্মীয়-স্বজন, অনেক লোক আসতে থাকেন দাদু আমেরিকা যাবার বিদায়ের মতো। কিন্তু সবাই কান্না করছে। দাদু আমেরিকা যাওয়ার সময় একটি গাড়ি আসে কিন্তু আজ এলো মসজিদ থেকে খাটিয়া। সে খাটিয়া চড়ে দাদু চির বিদায় হলেন। আমরা তাকিয়ে রইলাম। বিদায় দাদু।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT