সাহিত্য

অন্য কোথাও

আবদুল হাই মিনার প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০৪:১০ | সংবাদটি ১৫০ বার পঠিত

হঠাৎ তার মনে হল, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, আজ। এখন।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে কুল কুল করে ঘামতে লাগলো আরশাদ মাহমুদ।
মগজের কোন গহন গভীর থেকে কেউ জানান দিল, যা ঘটতে যাচ্ছে তা ভয়ঙ্কর। খুব ভয়ঙ্কর!
হাতের মুঠোয় গাড়ি আর গেরাজের চাবি। দুটোই ঘামে ভিজে গেছে। দুর্বলভাবে মাথা ঘোরালো সে জানালার দিকে।
বাইরে এপ্রিলের ঝরঝরে সকাল। তেরছা হয়ে রোদ ঢুকছে নিচের তলার ঘরের ভেতর। মৃদু বাতাস বইছে। বেশ আরামদায়ক বাতাস। একটা গানের কলি মনে করতে চেষ্টা করল সে। পারছে না। গেরাজের কাছাকাছি চলে আসার পর আবার বাইরে খোলামেলা প্রকৃতির দিকে তাকালো। নীল আকাশে দু’তিন ফালি মেঘের টুকরো ভেসে আছে। এত নীল আকাশ! গেটের ধারে সার ধরে দাঁড়ানো দেবদারুর পাতা স্থির থাকলেও ফেন্স-এর দু’দিকে যে চার পাঁচটি শিরীষ, অ্যাকেসিয়া সে গুলোর ডাল আর পাতা ভোরের মৃদু বাতাসে অথির হয়ে ওঠছে। হঠাৎ তার মনে পড়ে যায় গানের কলিগুলো, একটু আগে যেগুলো মনে করতে পারছিল না,
বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ।
আনে আমার মনের কোণে সেই চরণের ছন্দ।
স্বপ্ন শেষের বাতায়নে হঠাৎ-আসা ক্ষণে ক্ষণে
আধো-ঘুমের-প্রান্ত-ছোঁয়া বকুলমালার গন্ধ....
শান্ত বৈশাখের সকালটাকে কি কেউ কোনোদিন খেয়াল করেছে? খুশি মনে চারদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে আরশাদ মাহমুদ। জগৎ সংসারে দিন ও রাত্রিতে কতরকমে যে কত ভাবের খেলা চলছে, সে সবের খোঁজ কে রাখে! বৈশাখের এই অমৃত সকাল সারা জীবন তার মনে দাগ কেটে থাকবে। ‘আধো-ঘুমের-প্রান্ত-ছোঁয়া বকুলমালার গন্ধ...’ ওহ্!
এতোক্ষণ যে ভয়ের অনুভূতি তাকে সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল এখন আর তা নেই।
গাড়ির গেরাজের কাছাকাছি চলে এসেছে। গেটএর তালায় আলতো স্পর্শ বুলিয়ে পকেট থেকে চাবি বের করল সে। তারপর পেছন ফিরে চেয়েই আবার ঘামতে শুরু করল। একটা ভয়ের শিরশিরে অনুভূতি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। গেরাজের ভেতরেই কী সেই ভয়ের উৎস? দুর্বলভাবে ঘাড় ফিরিয়ে কলাপ্সেব্ল গেট দিয়ে ভেতরে তাকালো। নিরীহ গাড়িদুটি চুপচাপ ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। চাবিটি তালায় লাগানোর সময়ই বুঝে ফেলল এই তালা আজ সে খুলতে পারবে না।
সারা জীবনভর চেষ্টা করে গেলেও সম্ভব হবে না।
বোকার মত কিছুক্ষণ গেটের কাছে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থেকে পরে মরিয়া হয়ে চাবি ঘোরালো আরশাদ মাহমুদ।
হল না।
হাত কাঁপছে। আরেকবার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? কেউ কি তাকে ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে।
তার শুভাকাঙ্খি অদৃশ্য কেউ?
উঁহু।
ঘরে ফিরে গিয়ে আরেক কাপ চা খাওয়া যায়। আরশাদ মাহমুদ ঘুরে দাঁড়িয়ে তার ডুপ্লেক্স বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো। কয়েক পা চলার পরই আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। কেউ বাধা দিচ্ছে। অবচেতন মনের ভেতর কেউ ঢুকে পড়েছে। জানান দিচ্ছে, যেওনা। সেখানে বিপদ। বিরাট বিপদ!
বাড়ির গেট খোলে রাস্তায় নেমে এলো সে। রীতিমত কাঁপছে। ঠা-া আঠালো ঘামে শীতল গা।
কোথায় যাওয়া যায়?
বাসা থেকে বেরিয়েছিল অফিসে যাবে বলে। একটু আগেই বেরিয়ে পড়েছিল। এখন আর সেখানেও যেতে ইচ্ছে করছে না। গাড়ি নিয়ে আসা হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। পথের ধারের শিরীষ জারুলের ডালে বাতাস বইছে। ঠা-া বাতাসে গা জুড়িয়ে যাচ্ছে। গা ছাড়া ভাব নিয়ে কিছুক্ষণ মিশন রোড ধরে হেঁটে সোজা চলে এসেছে মেন্দিবাগে।
ঘুমের শহর আস্তে আস্তে জাগছে। মানুষজনের চলাফেরা শুরু হয়েছে মাত্র। বাজওয়ার পাশে হেরিটেজ টাওয়ারে তার অফিস। সেখানটা পেছন ফেলে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হল। মেন্দিবাগের শেষ সীমানায় এসে দূরের কালো পীচের সড়ক দিয়ে দৃষ্টি অনেক দূর ছড়িয়ে দেয়। কোথায় গিয়ে মিশেছে এটি?
একটি কালো ক্লুগার স্যাৎ করে তার পাশ কেটে চলে গেল।
গাড়ির ড্রাইভিং সিটে নজরুলকে দেখতে পায়। ডান হাত স্টিয়ারিং হুইলে। বাঁ হাত দিয়ে উষ্কখুষ্ক চুল পাট করতে করতে চিন্তিত মুখে দ্রুত কোথায় চলেছে। তার অফিস তো এদিকে নয়। এতো সকালে তাহলে কোথায় চলেছে!
নদীর তীর ধরে বাঁয়ে ছোট্ট সুন্দর একটি পথ আনমনে কোনদিকে যে চলে গেছে! শান্ত আর বেশ নিরিবিলি। আরশাদ মাহমুদ ওদিকে পা বাড়ায়। দুয়েকজন পরিচিত লোকের দেখা মেলে। না দেখার ভান করে কাটিয়ে দেয়। কথা বলতে গেলেই বিপদ। হাজারো প্রশ্ন আর খেজুরে-আলাপের যন্ত্রণায় মরতে হবে। তারচেয়ে চুপেচাপে হেঁটে চলে যাওয়া ভাল। নদী থেকে আরামের বাতাস এসে গায়ে আছড়ে পড়ছে। বিন্না বনে র্শর্শ শব্দ। দুপুর হওয়ার আগেই শঙ্খচিল নীল আকাশে পাখা মেলেছে। তার চলার পথের দু’দিকে ভাটফুল ফোটে রয়েছে। বাতাসের দোলায় নড়ছে ও গুলো। ঘামে ভেজা আঠালো গা শুকিয়েছে অনেক আগে। কিন্তু বুকের ভেতর গভীরভাবে বাসা-বেঁধে-থাকা সেই হিমশীতল আতঙ্ক এখনো তাকে তাড়িয়ে ফিরছে।
আরও দ্রুত, আরশাদ মাহমুদ, আরও জোরে। তোমাকে পালাতে হবে, দূরে, অনেক দূরে। মগজের কোন জায়গা থেকে কেউ বলে উঠল।
পারছি না। অসহায়ভাবে বিড়বিড় করে ও।
পারতে হবে। উপায় নেই। এই পথ, নদী, এ নিসর্গ, লোকালয়, এ গুলো থেকে অনেক দূরে-
কে? কে কথা বলে!
দুর্বলভাবে মাথা হেলালো ও। ইকড়, বাজালি বনের ফাঁক ফোকর দিয়ে পথ চলে গেছে আরও গভীরে। আরশাদ মাহমুদ ওই দিকে মাথা গলিয়ে দেয়। কপালে আর নাকে, ঘাড়ের পেছনে, শিরদাঁড়ার নলির বাইরের চামড়ায় চিকন ধারায় চিন্চিনে ঘাম আবার দেখা দিয়েছে। কারো নিঃশ্বাস যেন ঘাড়ের কাছে গরম ছাড়ছে। গরম না। ঠা-া হিমশীতল। বরফের মত। দৌড়াতে চেষ্টা করল ও। হোঁচট খেলো। উঠে দাঁড়িয়ে এবার উর্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল। একটা ছাই রঙা নিশান গাড়ি আসছে তার পেছন পেছন। আস্তে আস্তে। ওটাতেই কি সেই অমোঘ নিয়তি! পিস্তল কিরিচ চপার নিয়ে বসা?
প্রায় দৌড়োনোর মত ছুটতে লাগল আরশাদ মাহমুদ।
কতদূর ছুটে এসেছে নিজেই জানে না।
গোদারা দিয়ে নদী পার হয়েছে একদল অচেনা লোকের সাথে।
জালালপুরের কাছাকাছি আসতেই তার সম্বিৎ ফিরে।
শরীর অসাড় হয়ে আসছে। জুতো আর মোজার ভেতরে পায়ের বুড়ো কানি আঙ্গুলে স্পষ্ট অনুভব করছে বড় বড় ফোঁসকার যন্ত্রণা। একটা জারুলের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে একটুকু ভাবতে চেষ্টা করে, কী হয়েছে তার। সে কি ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে! পাগল হয়ে যাচ্ছে? সবি স্বপ্ন অথবা হেলুসিনেশন!
জুতোমোজা খুলে ফেলে আরশাদ মাহমুদ। আবার ঠা-া বাতাস বইতে শুরু করেছে। রোদ ততোক্ষণে তেতে উঠলেও বাতাসের স্পর্শে শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে। নদীর টল্টলে স্বচ্ছ জলে দু’টি নৌকা ভেসে চলেছে। সাদা পালে বাতাস লেগেছে। সাবলীল গতিতে র্ত র্ত করে এগিয়ে চলেছে ও দুটো। ইঞ্জিন-নৌকার এই আগ্রাসী যুগে পালের নাও-এর এমন সুন্দর দৃশ্য আজকাল কল্পনা করাও কঠিন। মুগ্ধ চোখে আরশাদ মাহমুদ সেদিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ। সড়কের দু’দিকে জারুল শিসুগাছের ঠা-া ছায়া। বিন্না আর ঘাসবনের ওপারে ধানের ক্ষেত। একটা সোঁদা গন্ধ এসে লাগছে নাকে। আরও দূরে দৃষ্টি ছড়ালে নীলাভ ছায়া-ছায়া গাঁয়ের রেখা ভেসে ওঠে চোখে। ভাল লাগছে। ভয়ের অনুভূতি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে মন থেকে।
দুটো থুই আর বুলবুলি এসে বসেছে জারুলের ডালে। সেখানে নেচে নেচে কিচিরমিচর করছে থুইদুটো। নিঃসঙ্গ বুলবুলিটি ছোট্ট একটা ডালে বসে একমনে গান গেয়ে চলেছে। শিরীষ আর শিসুগাছের পাতা বাতাসে দোল খাচ্ছে।
গাছের গুড়ির হেলান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গভীর মমতায় চারদিকে তাকায় আরশাদ মাহমুদ। নীল আকাশ থেকে যেন সোনা গলে পড়ছে চরাচরে। আশীর্বাদ ঝরাচ্ছে সকলখানে। শান্ত নিরিবিলি গাঁয়ের এই পীচ সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হল পৃথিবী এতো সুন্দর! কালো বিটুমিনের পীচের সড়ক তার সামনে দিয়ে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কে জানে! পেছন ফিরে তাকালো সে। বাঁ দিকের সড়ক দিয়ে হাঁটা লাগালে আবার সেই গোদারা, তারপর মেন্দিবাগ, বাজওয়ার আকাশছোঁয়া টাওয়ার, নয়াসড়ক, শাহী-ঈদগাহ্ তারপর তার স্বপ্নের মত ডুপ্লেক্স, চিবিদ-এ পোঁছে যাবে।
ভয় আর আতঙ্ক কখন দূর হয়ে গেছে। শুধু বোধের অতীত কী এক শূণ্যতায় বুকটা হাহাকার করে ওঠে। বিষণœœ দৃষ্টিতে পেছনের পথের দিকে তাকায় আনমনে। সে কি ফিরে যাবে এই পথে? কে যেন বলেছিল, ফেলে-আসা পথ দিয়ে ফিরে যাওয়ার মত বিড়ম্বনা আর নেই।
পাতলা এলোমেলো চুলে আঙ্গুল চালিয়ে সেগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে সমুখে বিস্তৃত পথের দিকে পা বাড়ায় আরশাদ মাহমুদ।
পেছনে পড়ে থাকে ঘরে ফেরার পথ।
বুঝে ফেলেছে সে, আজ সকালেই তার মৃত্যু হয়েছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT