উপ সম্পাদকীয়

পাকিস্তান : সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে শংকা

এডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০৪:৪৪ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

২০১৭ সালের ইলেকটোরাল সংস্কার আইনের আলোকে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী ২৫ শে জুলাই পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট জাতীয় সরকার গঠন করে দেশটির রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে।
পাকিস্তানের জন্য সাধারণ নির্বাচনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ও স্থাপন করতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে গণতান্ত্রিক চর্চা ও প্রক্রিয়া মজবুত হবে এবং পর্যায়ক্রমে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।
ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যাটেজিক লোকেশনে অবস্থিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম ১৯৪৭ সালে। এ হিসেবে দেশটি এখন স্বাধীনতার ৭১ বছর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সাত দশক অতিবাহিত হলেও দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো খুবই দুর্বল; গড়ে ওঠেনি শক্তিশালী নির্বাচনী কাঠামো সহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহ। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একমাত্র শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দেশটির শাসন কার্যে সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে সেই স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই। আরও রয়েছে শক্তিশালী বেসামরিক আমলাতন্ত্র। এ দুটি প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কারণে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হতে পারেনি। যে কারণে ৭১ বছরের মধ্যে ৬০ বছরই পাকিস্তান শাসিত হয়েছে স্ট্রংম্যান এর অধীনে একনায়কতান্ত্রিক সর্বাত্মকবাদী ব্যবস্থায়। দেখা যায়, এ সময়কালে দেশটি শাসন করেছেন ১১ জন একনায়ক শাসক এবং এর মধ্যে ৪ জন ছিলেন সামরিক বাহিনী থেকে আগত শাসক, যারা জোর করে সামরিক আইনজারী করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিয়েছিলেন এবং অন্যদিকে ৭ জন ছিলেন বেসামরিক লোক। এ সাত জনের মধ্যে আবার ৩ জন এসেছিলেন বেসামরিক আমলাতন্ত্র থেকে। বাকী ৪ জন অবশ্য প্রকৃত রাজনীতিবিদ ছিলেন। এ চিত্রই প্রমাণ করে পাকিস্তানে কখনো সঠিক অর্থে গণতন্ত্রচর্চা হয়নি। তাই গণতন্ত্রও বিকশিত হতে পারেনি। অন্যদিকে এটি বলা যায় যে, গণতন্ত্রচর্চার অভাবহেতু দেশে স্বাধীন বিচার বিভাগ যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়নি কখনো, তেমনি মুক্ত গণমাধ্যমের অভাবও রয়েছে দেশটিতে। অথচ রাষ্ট্র ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং স্ট্রংম্যান শাসনের প্রতিরোধের জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মুক্ত গণমাধ্যম অপরিহার্য।
পাকিস্তানের আইন সভা, জাতীয় পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সম্ভবতঃ ২০১৩ সালের নির্বাচনে গঠিত জাতীয় পরিষদ পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছে এবং পরবর্তী পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের জন্য ২৫ শে জুলাই নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। দেশটির নিবন্ধিত শতাধিক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে বলে দেশটির নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে। শতাধিক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলতঃ ৩টি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এ তিনটি রাজনৈতিক দল হলো, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ), পাকিস্তান পিপলস পার্টি, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পার্টি। নওয়াজ শরীফ, যিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক আজীবনের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়েছেন, তিনি তাঁর দল মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন পরোক্ষভাবে। অন্যদিকে, পিপলস পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো। আর ইনসাফ পার্টির নেতৃত্বে আছেন সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান।
পাকিস্তানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আর্মি, ইন্টার সার্ভিস গোয়েন্দা (আইএসআই), তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং মুক্ত-নিরপেক্ষ মিডিয়া, স্বাধীন বিচার বিভাগ, এ ছয়টি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য। পাকিস্তানের প্রেক্ষিতে অবশ্য আর্মি এবং ইন্টার সার্ভিস গোয়েন্দা সংস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা ব্যতীত অবাধ, সুষ্ঠু এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা একেবারেই অসম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞজনেরা। এমন কী, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সচেতন জনগণও মনে করেন তেমনটাই। কেননা, পাকিস্তানে একটি কথা প্রচলিত আছে, আর্মি যেমনটি চাইবে নির্বাচনের ফলাফল তেমনটিই হবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানে জমে ওঠা নির্বাচনী প্রচারণার চূড়ান্ত ফয়সালা কী হবে সেটি নির্ভর করছে একমাত্র সেনা বাহিনীর ভূমিকার ওপর। অবশ্য পাকিস্তান সেনা বাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনা বাহিনী সম্ভব সব কিছু করবে। অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশন, বেসামরিক আমলা প্রশাসন, সবাই একই সুরে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রত্যয় ব্যক্ত করে চলেছেন।
পাকিস্তানের নির্বাচনী মাঠের চিত্র অবশ্য ভিন্ন। সেনা বাহিনী এবং ইন্টার সার্ভিস গোয়েন্দা সংস্থার চলমান ভূমিকা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল নয় বলে অভিযোগ ওঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহ এবং পর্যবেক্ষকদের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব অনুভব করে অভিযোগ তুলেছেন সেনাবাহিনী এবং জুডিসিয়ারী মিলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করেছিলো এবং পুনরায় যাতে তাঁর দল বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে না আসতে পারে সেজন্য সেনাবাহিনী, বিশেষ করে ইন্টার সার্ভিস গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে, তাঁর দলের লোকজনদের নানা উপায়ে হয়রানী করছে এবং গণমাধ্যম গুলোর ওপর নানামুখি বিধি নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। এ জন্য মিডিয়া স্বাধীনভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন নওয়াজ শরীফ।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপরিমেয় ক্ষমতার চিত্র ফুটে ওঠেছে লাহোর ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারী রিজভী-এর মন্তব্য থেকে। তিনি মন্তব্য করেছেন, ইমরান খানের (ইনসাফ দলের প্রধান) রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় হচ্ছে সেনাবাহিনীর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতার জন্য। সেনাবাহিনীর সাথে তাঁর সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও ভিত্তি ততই মজবুত হচ্ছে। ইমরান এটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পাকিস্তানে কাজ করতে হলে সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক রেখেই কাজ করতে হবে। তিনি আরো যুক্তি দেখান যে, সেনাবাহিনীর সাথে ঝগড়া করে পাকিস্তানে টিকে থাকা যাবে না (বাই ফাইটিং উইথ দি মিলিটারী ইউ কেননট রান দি স্টেইট)।
নওয়াজ শরীফের অভিযোগ সেনাবাহিনী নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে না। ইমরান খানের দলের প্রতি সমর্থন রয়েছে সেনাবাহিনীর। এজন্য মিডিয়ার ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপের পাশাপাশি নওয়াজের বক্তব্য প্রচারে সেন্সর আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকেও মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অভিযোগ আনা হয়েছে। আর ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম নির্দেশকতা তালিকায় বিশ্বের ১৮০ টি রাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের স্থান ১৩৯। অর্থাৎ সার্বিকভাবেই পাকিস্তানের গণমাধ্যম স্বাধীন নয়। এরূপ অবস্থায় আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের সংবাদ কাভারেজ যাতে স্বাধীন ও মুক্তভাবে প্রকাশ ও প্রচার করা যায় সেজন্য ব্যবস্থা নিতে দেশটির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়েছে রাইটস গ্রুপ। দি কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, এ ইউ.এস বেইছড এডভোকেসি গ্রুপও একই আহবান জানিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এর নির্বাহী পরিচালক জুয়েল সাইমন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি লিখিত এক পত্রে লিখেছেন, পাকিস্তানের মিডিয়া স্বাধীনভাবে রিপোর্ট করতে পারছে না। তাই মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আহবান জানানো হয়েছে ঐ পত্রের মাধ্যমে। ২রা জুলাই সোমবারে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে এ পত্র পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে আল জাজিরার রিপোর্টে।
মুক্ত এবং স্বচ্ছ নির্বাচন হবে কীনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে, প্রশ্ন ওঠেছে শক্তিশালী সেনা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না দেশী-বিদেশী মিডিয়া। নির্বাচনী মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো সমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না,- এ ধরনের বিস্তর প্রশ্ন ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আগামী ২৫ শে জুলাই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দেশের গণতন্ত্রের জন্য এবং এক বেসামরিক নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের হাত থেকে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচিত অপর বেসামরিক সরকারের নিকট রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্পনের নজির সৃষ্টি করার জন্য ২৫ শে জুলাইয়ের নির্বাচন সম্পন্ন করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ, যদিও সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক শাসনের লক্ষ্যে পৌঁছা এখনো অনেক দূরবর্তী।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বিদেশে কর্মসংস্থান : সমস্যা ও সম্ভাবনা
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • শিশুর সুরক্ষা ও গণমাধ্যম
  • উন্নয়নের অভিযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ
  • ডাক বিভাগ ফিরে পাচ্ছে প্রাণ
  • আমরা সবাই ভালো হলে দেশ ভালো হবে
  • ‘জাতীয় বীর’ কৃষকদের নিয়ে কিছু কথা
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • Developed by: Sparkle IT