সাহিত্য

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ, শতবর্ষপূর্তির প্রেক্ষিত

নৃপেন্দ্রলাল দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০৫:৩৭ | সংবাদটি ২২৩ বার পঠিত

‘যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি,
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই ভিক্ষালব্ধ ধনে।’
ঐক্যতান-রবীন্দ্রনাথ
‘কবিপ্রণাম’ নামের সুখ্যাত গ্রন্থের সম্পাদক শ্রী নলিনীকুমার ভদ্র তাঁর ‘অবতরনিকা’ নামক সম্পাদকীয় নিবন্ধের শেষাংশে লেখেন-
‘কবির জীবনী থেকে এ তিনটি দিনের কাহিনী (সিলেট ভ্রমণের ৩ দিন) বাদ দিয়ে যদি কোনো শ্রীহট্টের ইতিহাস লেখা হয় তাহলে তা হবে অসম্পূর্ণ। অনাগত যুগে আমাদের ভবিষ্যদ্বংশীয়েরা এ কাহিনী পড়ে গর্ব অনুভব করবে- যদিও ঈর্ষা করবে তারা আমাদের অপরিসীম সৌভাগ্যকে।’
আজ একশ বছর পর সত্যি আমরা হিংসে করি তাঁদের সৌভাগ্যকে। কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথের চরণ চিহ্নে ঐতিহ্যের গৌরব গরিমার স্থাপত্য সৃজিত হয়েছিল শ্রীহট্ট সিলেটে। ১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ সিলেটে এসেছিলেন। তিনটি ব্যস্ত দিন অতিবাহিত করেছিলেন। নাগরিক সংবর্ধনায়, মহিলাদের মানপত্র গ্রহণে, মুরারীচাঁদ কলেজের ছাত্রদের সামনে ভাষণ দিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন মণিপুরী জীবনযাত্রা ও নৃত্য দেখতে মাসিমপুর গ্রামে। মণিপুরী বয়ন শিল্প দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। মুরারীচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ, অধ্যাপকদের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আব্দুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া), মৌলভী আব্দুল করিম, পৌরসভার চেয়ারম্যান সুখময় চৌধুরী নগেন্দ্র দত্ত প্রমুখের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মহাজীবনে এই তিনটি দিন হয়ত তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু আমাদের কাছে তৎকালে বাংলা থেকে নির্বাসিত সিলেটের কাছে তাঁর মহাপ্রব্রজ্যা ছিল এক গৌরবের সমাচার। অতি সংক্ষেপে তাঁর ভ্রমণকথার কিছু খন্ড চিত্র তুলে ধরতে চাই। আমার ‘শ্রীভূমি সিলেটের রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের ৪র্থ সংস্করণে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছি।
১৯১৯ থেকে ২০১৯ শতবর্ষ বিস্তৃত রবীন্দ্রনাথের শ্রীহট্ট-সিলেটে আগমনের খ্যাতকীর্তি ঘটনাক্রম আবারও স্মরণ করতে চাই। সাহিত্যসেবী ও সংস্কৃতি সাধকদের কাছে তুলে ধরতে চাই সিলেটের রবীন্দ্র ভ্রমণ কথার তাৎপর্যকে। নানা আকাঙ্খার কথাও ব্যক্ত করতে চাই সুধীজনের কাছে। বিপুল আয়োজনে উদযাপিত হোক শতবর্ষপূর্তি উৎসব, এই বিনীত আহ্বান জানাই সহৃদয় হৃদয়সংবাদী সিলেটের মেধাবী কৃষ্টিবানদের কাছে।
যাত্ররম্ভ গুয়াহাটিতে তিন দিন অতি ব্যস্ত সময় কাটিয়ে রবীন্দ্রনাথ ৩ নভেম্বর ১৯১৯ সন্ধ্যার ট্রেনে সিলেট যাত্রা করেন। সারা দিন ট্রেনে ছিলেন। লামডিং জংশনে যাত্রা বিরতি করে বিকেলে পৌঁছেন বদরপুর জংশন স্টেশনে। বদরপুর থেকে প্রাক্তন শান্তিনিকেতনিক মনোরঞ্জন চৌধুরী ও তাঁর সঙ্গীতশিল্পী স্ত্রী ইন্দু দেবী যোগ দেন রবীন্দ্র পরিকর দলে। করিমগঞ্জে রেলগাড়ি তিন মিনিট দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল। ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এই সভায় প্রধান শিক্ষক ভারতচন্দ্র চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। করিমগঞ্জে রবীন্দ্রনাথকে যে মানপত্র দেয়া হয়েছিল সেটি বিশ্বভারতীয় রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত আছে। (আমার শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ বইতে মানপত্রটি আছে) নতুন রেললাইনে রাতে ট্রেন চলতো না। তাই কুলাউড়া রেল স্টেশনেই কবিকে রাত্রি যাপন করতে হয়। সিলেট থেকে বিশিষ্টজনরা এসে কুলাউড়া জংশনে যোগ দেন।
কুলাউড়া থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে সকালে যাত্রা করেন সপারিষদ রবীন্দ্রনাথ। বরমচাল স্টেশনে উমেশচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে বহুলোক এলেন শোভাযাত্রা সহকারে। সকাল সাড়ে আটটায় কবি পৌঁছলেন সিলেট রেলস্টেশনে। সিলেটের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে লালদিন হয়ে রইলো ৫ নভেম্বর ১৯১৯, ১৯ কার্তিক ১৩২৬। তখনও কীনব্রীজ তৈরি হয়নি, কবিকে নৌকায় করে শহরে নিয়ে আসা হয়। কবি অবস্থান করছিলেন শহরের উত্তরপূর্ব কোণে টমাস সাহেবের বাংলোয়।
সফরসূচি-৪ নভেম্বর কবি সিলেটে আসেন। ৩ দিন সিলেটে ছিলেন। ৮ নভেম্বর সিলেট ত্যাগ করেন আগরতলার উদ্দেশ্যে। যদিও প্রভাত মুখোপাধ্যায় লিখেছেন সিলেট থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন তথ্যটি ভ্রমাত্মক।
ক) ৫ নভেম্বর সকালে শ্রীহট্ট ব্রাহ্মমন্দিরে উপাসনায় যোগদান করেন। সেখানে ব্রহ্মসঙ্গীত ‘বীণা বাজাও হে মম অন্তরে’ গাইলেন। ইন্দু দেবী গাইলেন- ‘মোর সন্ধ্যায় তুমি সুন্দর বেশে এসেছো তোমায় করি গো নমস্কার।’
খ) ৬ নভেম্বর সকালে টাউন হলে কবিকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সভাপতি ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া)। উদ্বোধনী সঙ্গীত লিখেছিলেন অম্বিকা চরণ দেব। গায়ক যতীন্দ্রমোহন দেব। তাঁরা দু’জনই ছিলেন উকিল। রবীন্দ্রনাথ ‘বাঙালির সাধনা’ বিষয়ে বক্তৃতা দেন।
গ) অই দিন দুপুরে মুরারীচাঁদ কলেজের অধ্যাপক নলিনীমোহন মুখোপাধ্যায় শাস্ত্রীর বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজে যোগদান করেন। শাস্ত্রী মশাই রবীন্দ্র প্রশস্তিমূলক কবিতা পাঠ করেন।
ঘ) বেলা দুটোয় ব্রহ্মমন্দিরে শ্রীহট্টের মহিলাবৃন্দ কবিকে সংবর্ধনা দেয়। অভিনন্দন পত্র পাঠ করেন নলিনীবালা দেবী। রূপার পাত্রে মানপত্র দেয়া হয়। মানপত্রটির পূর্ণপাঠ আছে আমার ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে। সিলেটের মহিলাদের সঙ্গে একটি ছবি তোলা হয়।
ঙ) বিকেল তিনটেয় কবি গুরু যান মাছিমপুর মণিপুরী বয়ন শিল্প ও নৃত্য দেখতে। ছেলেরা রাখাল নৃত্য প্রদর্শন করে। দলনেতা ছিলেন নীলেশ্বর মুখার্জি। কবি মুগ্ধ হন নৃত্য দেখে।
চ) সন্ধ্যায় টাউন হলে জনসভা।
পরদিন ৭ নভেম্বর খুব সকালে ব্রাহ্মণসমাজের সম্পাদক গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ মহোদয়ের বাড়িতে যান দলবলসহ কবি। সেখানে একটি সম্মেলক ছবি তোলা হয়। (ছবিটি এখানে যুক্ত করা হলো)। দু’টি শিশুর নামকরণ করেন কবি।
১. দুপুরে যান মুরারীচাঁদ কলেজ ছাত্রাবাসে। সেখানে কয়েক হাজার লোকের সমাবেশে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কবিগুরু ‘আকাক্সক্ষা’ শীর্ষক বক্তৃতা করেন। সেটা পরে ইংরেজি অনুবাদ করে ‘মডার্ণ রিভিউ’ পত্রিকায় ছাপা হয়। বক্তৃতাটি পরবর্তীকালে পাঠ্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল প্রবেশিকা স্তরে। ‘শ্রীভূমি সিলেটের রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে ভাষণটি সংকলিত হয়েছে।
২. মুরারীচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ অপূর্ব দত্তের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ।
৩. রায় বাহাদুর নগেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে সন্ধ্যায় চা-চক্র।
৪. রাত ন-টায় কবির বাসস্থানে এসে মণিপুরী ছেলেমেয়েরা কবিকে রাসনৃত্য দেখায়, কবি খুব মুগ্ধ হন। শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্য শিক্ষার জন্য শিক্ষক চান। পরে কয়েকজন মণিপুরী নৃত্য শিক্ষক শান্তিনিকেতনে যান। কমলগঞ্জ উপজেলার নীলেশ্বর মুখার্জি তাঁদের অন্যতম।
পরদিন ৮ নভেম্বর সকালে রবীন্দ্রনাথ আগরতলার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন।
সিলেট ভ্রমণের আনন্দ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসবিদ ও কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কালিদাস নাগকে ৩ ডিসেম্বর ১৯১৯ সালে এক চিঠিতে লিখেন-
‘আশ্রমে ফিরে এসেছি। পাহাড় (শিলং) থেকে নেমে আসবার পথে গৌহাটি, শিলেট (সিলেট) ও আগরতলা ঘুরে এলুম। বলা বাহুল্য বক্তৃতার ত্রুটি হয়নি। দিনে চারটে করে বেশ প্রমাণসই বক্তৃতা দিয়েছি এমন দুর্ঘটনাও ঘটেছে। এমনতর রসনার অমিতাচারে আমি যে রাজী হয়েছি তার কারণ ওখানকার লোকেরা এখনও আমাকে হৃদয় দিয়ে আদর করে থাকে এটা দেখে বিস্মিত হয়েছিলুম। বুঝলুম কলকাতা অঞ্চলের লোকের মত ওরা এখনো আমাকে এত বেশি চেনেনি ওরা আমাকে যা-তা একটা কিছু মনে করে। তাই সেই সুযোগ পেয়ে খুব করে ওদের আমার মনের কথা শুনিয়ে দিয়ে এলুম।---- (চিঠিপত্র-১২)
সভাপতির উর্দুতে ভাষণ।
নাগরিক সংবর্ধনা সভার সভাপতি আব্দুল মজিদ সাহেব উর্দু ভাষায় সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন। সৈয়দ মুর্তজা আলী তার ‘আমাদের কালের কথা’ বইতে ভাষণের কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রতিক্রিয়া।
‘আকাক্সক্ষা’ বক্তৃতা শুনে সতেরো বছর বয়েসী মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন আকাক্সক্ষাকে বড় করতে হলে কী করতে হবে এই প্রশ্ন করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিঠির জবাব দিয়েছিলেন। মূল রবীন্দ্র হস্তাক্ষর যুক্ত পত্রটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিশ্বভারতীতে মুজতবা আলীই ছিলেন প্রথম বাইরের ছাত্র।
সিকান্দর আলীকে চিঠি-
অবিভক্ত আসামের মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এক মহতী সম্মেলনে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ শারীরিক অক্ষমতার কথা বলে একটি চিঠি দেন ঔপন্যাসিক সাংবাদিক সিকান্দর আলীকে। নয়া জামানা সম্পাদক সিকান্দর আলী চিঠি পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। মূল চিঠিটি পাওয়া যাচ্ছে না।
রবীন্দ্র পত্র প্রাপক সিলেটিরা
সিলেটের প্রায় দশজন ব্যক্তির কাছে রবীন্দ্রনাথের চিঠি আছে। নানা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চিঠিগুলি লিখেছেন। অতি মূল্যবান সে সব চিঠি কোথাও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। নানা পত্রালীপুঞ্জে ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে আছে এসব রবীন্দ্রপত্র। কিছু পত্র বিলীয়মান।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নবীগঞ্জের গুরুপ্রসন্ন দাসগুপ্তের কাছে লেখা চিঠি- আমি তাঁদের হবিগঞ্জের বাড়িতে দেখেছি। কয়েকটি ছবিও ছিল। সেগুলি এখন আর পাওয়া যায় না। গীতাঞ্জলি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব কী ছিল সেটা জানা যায় হবিগঞ্জের সাটিয়াজুরী গ্রামের উপেন্দ্র চন্দ্র করকে লেখা চিঠিতে। ইংরেজি অনুবাদে রবীন্দ্র ছোট গল্প যে ইংরেজ পাঠকের মনের মতো হয় না সেই তথ্য আছে সত্যভূষণ সেনকে লেখা চিঠিতে। বিশ্বভারতীর মূল সুর সর্বপ্রথম ধরতে পেরেছিলেন সতীশচন্দ্র রায়- এসব জরুরী প্রসঙ্গ রবীন্দ্র পত্রে রয়েছে। অবিলম্বে পত্রগুলি গ্রন্থবন্ধ না হলে সিলেটের সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে রক্তসম্পর্ক ছিল সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে চিঠিগুলি আছে। কিন্তু চিঠি আছে রবীন্দ্রভবন অভিলেখাগারে।
শ্রীহট্ট বধূর রান্না
রাটিশালের শশীন্দ্র সিংহের স্ত্রী, শান্তিনিকেতনের শিক্ষিকা কুমুদিনী সিংহের রান্না রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ছিল। মীরা দেবীর চিঠিতে তার পরিচয় আছে। এই কুমুদিনীর ছেলে সমরেশকে কবি ডাকতেন সঙ্গীতেশ বলে। বালক সমরেশ রবীন্দ্রনাট্যে গান গাইতেন।
রবীন্দ্র সঙ্গীতে সিলেটিরা
১৯২০ সালে রবীন্দ্রনাথ লন্ডন থেকে এক চিঠিতে অনাদি দস্তিরদারকে লেখেন- ‘তুমিই একদিন সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষ হবে।’ অনাদি দস্তিদার রবীন্দ্র সঙ্গীত শিক্ষার স্কুল গীতবিতান কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বভারতীর বাইরে এটাই ছিল প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত শিক্ষালয়। অনাদি দস্তিদার বত্রিশ খন্ড ‘স্বরবিতান’ প্রণয়ন করেছিলন। অমলা রায় চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘কুইনী’ বলে ডাকতেন তিনিও কয়েকটি রেকর্ড করেছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের। রেবা রায় ছিলেন রবীন্দ্র নৃত্য নাট্যের অন্যতম প্রিয় শিল্পী। রবীন্দ্রনাথ তাকে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। দীনেন দত্ত ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন। কিরণশশী দে রবীন্দ্র সঙ্গীত বিষয়ে বইও লিখেছেন। বর্তমান কালেও রানা সিংহ, অনিমেষ কর প্রমুখরা খ্যাতি পেয়েছেন রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে।
রবীন্দ্রনাথ ‘ভূমিকা’ লিখেছিলেন।
মৌলভী আব্দুল করিম সাহেবের বই ‘ইসলামস কন্ট্রিভিউশন টু দি সাইন্স এন্ড সিভিলাইজেশন’- বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সংক্ষিপ্ত অথচ অতিমূল্যবান এই ভূমিকার হিন্দু-মুসলিম মিলনের কথা আছে। মৌলভী আব্দুল করিমের লেখা ‘ভারতে মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস’ বইটিরও মূল্যায়ন করে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতী’ পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথ যখন সিলেট আসেন তখন অভ্যর্থনাকারী হিসেবে তাঁর বন্ধু মৌলভী আব্দুল করিম তাঁর পাশে বসেছিলেন গাড়িতে।
শ্রীভূমি সম্পর্কে।
রবীন্দ্রনাথ কেবল মাত্র সিলেটকে নিয়েই কবিতা লেখেন। অন্যকোন স্থান সম্পর্কে কোথাও কবিতা লিখেছিলেন কি না জানা যায় না। রবীন্দ্র হস্তাক্ষরে লেখা কবিতাটির শিরোনাম ছিল না। তারিখও ছিল না। স্থান নামও ছিল না। কবিপ্রণামে ‘শ্রীভূমি’ নামে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে কবিতাটির মূল কপি আছে বিড়লা সংগ্রহে। রবীন্দ্রতত্ত্ব রতœাকর ড. উষারঞ্জন ভট্টাচার্য অনুমান করেন ১৯৩৬ সালে এই কবিতা রচিত হয়েছিল। আমরা অন্য তথ্য থেকে জেনেছি কবিতাটি লেখা হয়েছিল নগেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে।
এক বালিকার কথা
হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাসী গ্রামের এক অখ্যাত বালিকা সুপ্রভা দত্ত (রায় সাহেব মহেন্দ্র চন্দ্র দত্তের কন্যা) রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন তাকে একটা কবিতা লিখে দিতে। এই চিঠির জবাবে রবীন্দ্রনাথ ২১ জানুয়ারি ১৯৩২ সালে সুপ্রভাকে একটি কবিতা লিখে পাঠান। এই সুপ্রভা দত্ত পরবর্তী কালে শিলং এ একটি কলেজের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন। কলকাতার ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরে যান। এই মনস্বিনী নারী ছিলেন আজীবন রবীন্দ্র প্রেমিকা। তাকে লেখা দুর্লভ কবিতাটি নি¤েœ দেয়া হলো ঃ-
‘আমার আপন ভালো লাগায়
রচি আমার গান,
তুমি দিলে তোমার আপন
ভালো লাগার দান।
মোর আনন্দ এমনি করে
নিলে আঁচল পেতে
তোমার আনন্দেতে।’
কবিপ্রণাম
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ডিসেম্বর ১৯৪১ খ্রি: সিলেটের জামতলার বাণীচক্র ভবন থেকে ‘কবি প্রণাম’ নামে এক অসাধারণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তৎকালীন বঙ্গদেশ ও আসামের শ্রেষ্ঠ লেখকরা এতে লিখেছিলেন। পত্রস্থ হয়েছিল রবীন্দ্রপত্র, ছবি ও সিলেট ভ্রমণকথা। সম্পাদনা করেছিলেন নলিনী কুমার ভদ্র, মৃনাল কান্তি দাশ, অমিয়াংশু এন্দ ও সুধীরেন্দ্র নারায়ণ সিংহ মজুমদার। সম্প্রতি কোলকাতা থেকে বইটি পুন:প্রকাশিত হয়েছে। জ্যোতির্ময় সিংহ বইটির মুদ্রণ করেছিলেন সিলেট। মূল গ্রন্থের প্রচ্ছদ অঙ্কন করেছিলেন নন্দলাল বসু। ড. ঊষারঞ্জন সম্পাদিত বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ।
শেষ কথা:
পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রপ্রেমী সিলেটিরা। তাঁদেরকে আহ্বান করা যায় প্রীতি সম্মেলনে। ভারতের নানা রাজ্যে সিলেটিরা আছেন তারাও যোগ দিতে পারেন। মাননীয় অর্থমন্ত্রী, অর্থ প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, হুইপ আছেন সিলেটের লোক তাঁদের সহযোগ আমাদের কল্পনা ও স্বপ্নসাধকে বাস্তবায়িত করতে পারে। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি ক্ষেত্রের সুধীজন সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে পারেন এই সিলেট রবীন্দ্র সভ্যতা সৃজনে।
সম্প্রতি সিলেট মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ এক সভায় জানিয়েছেন, ইতিহাস প্রসিদ্ধ শেখঘাট এহিয়া ভিলার জিতু মিয়ার বাড়ির বরেণ্য এক সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বি.এল (১৮৯৪-১৯৫৫) সেই সময়ের কথা তাঁর নিজস্ব ডায়েরীতে লিখে রেখে গেছেন। সেই মূল্যবান ডায়েরীটি (১৯০৮-১৯৫৫) রক্ষিত আছে। সেখান থেকেও আমরা অনেক তথ্য পেতে পারি।
কুলাউড়া রেল জংশনে রবীন্দ্রনাথ রাত্রি যাপন করেছিলেন। সেখান থেকে সূচনা করা যায় শতাব্দী বিস্তৃত রবীন্দ্র স্মরণ। সেই সময় সিলেট থেকে অনেক রবীন্দ্রপ্রেমী কুলাউড়া গিয়েছিলেন রবীন্দ্রসান্নিধ্যে রাত যাপনের জন্যে। মিসেস ইয়েল রবার্টসনও গিয়েছিলেন। তাঁকে দেখে রবীন্দ্রনাথ হেসে হেসে বলেছিলেন- ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’।
পুনশ্চ:
শতবর্ষ পূর্তিতে করণীয়-
১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সিলেট এসেছিলেন। ২০১৯ সালে তাঁর সিলেট ভ্রমণের শতবর্ষপূর্তি হচ্ছে। তাঁর এই মহাপ্রব্রজ্যাকে স্মরণীয়তম করে রাখার জন্যে আমাদের রবীন্দ্র বিশ্বে স্থান করে নেবার জন্যে অনেক সারস্বত কর্ম করার আছে।
১. একটি শতবর্ষপূর্তি উৎসব সাধারণ সমিতি গঠন করা, যার সদস্য সংখ্যা হবে ১০১ জন।
২. ২১ সদস্য বিশিষ্ট কার্যকরী পর্ষদ ও নানা উপ-পর্ষদ।
৩. একটি রবীন্দ্র

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT