সম্পাদকীয়

উচ্চ শব্দ কাড়ছে শ্রবণশক্তি

প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৭-২০১৮ ইং ০৩:০৬:১৫ | সংবাদটি ৮১ বার পঠিত

উচ্চ শব্দে গান শুনে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছে মানুষ। যারা উচ্চ শব্দে গান শুনেন তাদের সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের মতে, একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ উচ্চ শব্দে গান শোনা শ্রবণশক্তির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। উচ্চ শব্দে গান শোনার ফলে সারা বিশ্বে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ শ্রবণশক্তি হারিয়েছে। এদের অন্তত: ৪০ শতাংশ বিভিন্ন ক্লাব বা বারে লাইভ কনসার্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে। শ্রবণশক্তি হারানোর এই প্রবণতা ১২ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি। ফলে বর্তমানে বিশ্বে তরুণ ও মধ্যবয়সী একশ ১০ কোটির বেশি মানুষ শ্রবণশক্তি হারানোর ঝুঁকির সম্মুখীন। অডিও প্লেয়ার বা লাইভ কনসার্টের মতো অনুষ্ঠান শ্রবণশক্তির ওপর মারাত্মক হুমকি। চিকিৎসকদের মতে, শ্রবণশক্তি রক্ষায় দিনে এক ঘণ্টার বেশি গান না শোনাই ভালো। আর গান শোনার সময় ভলিউম যেন ৬০ শতাংশের কম থাকে। তাছাড়া, উচ্চ শব্দ হয় এমন স্থান এড়িয়ে চলা এবং গান শোনার সময় মাঝে মধ্যে বিরতি দেয়া দরকার বলেও চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন।
শব্দদূষণ হচ্ছে একটি নীরব ঘাতক। শহর-বন্দর গ্রাম সর্বত্র মানুষ শিকার হচ্ছে এই শব্দ দূষণের। শব্দদূষণে স্বাভাবিক জনজীবন যেমন অতিষ্ঠ তেমনি এ থেকে নানা রোগের জন্ম হচ্ছে মানবদেহে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে। আইনে শাস্তির বিধানও আছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই। আইনে যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও অহরহ ব্যবহৃত হচ্ছে হাইড্রোলিক হর্ন। ১৯৯৭ সালে প্রণীত পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিমালায় নীরব এলাকায় দিনে এবং রাতে যথাক্রমে ৪০ ও ৩৫ ডেসিবেল হচ্ছে শব্দের ধার্য্যকৃত সীমা বা মাত্রা। আবাসিক এলাকায় এর মাত্রা যথাক্রমে ৫০ এবং ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু এই আইন মানছে না কেউই। শুধু তা-ই নয়, অতিরিক্ত শব্দ যে শব্দদূষণ হিসেবে গণ্য হয় এবং এটা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা-ও জানে না অনেকে।
উচ্চ শব্দে গান শোনা ও যানবাহনের হর্ন ছাড়াও শব্দদূষণের জন্য আরও অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ শব্দের হুইসেল, কলকারখানার আওয়াজ, পাথর ভাঙার যন্ত্রের শব্দ, মিক্সার মেশিনের শব্দ ইত্যাদি। বাস-ট্রাকসহ লক্কর ঝক্কর মার্কা যানবাহনের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ সৃষ্টি করছে শব্দদূষণ। যেখানে সেখানে যখন তখন মাইকের আওয়াজও শব্দদূষণের জন্য দায়ী। যানবাহনের চালকরা উচ্চমাত্রায় হর্ন বাজানোকে ‘বিলাসিতা’ হিসেবে মনে করে। তারা অনেক সময় বিনা প্রয়োজনেও হর্ন বাজায়। মানুষের জন্য সহনশীল শব্দের মাত্রা হচ্ছে ৩৫ থেকে ৫০ ডেসিবেল। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে বিভিন্নভাবে শব্দ হচ্ছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। আর এই শব্দদূষণ থেকে মানবদেহে নানা রোগ ব্যাধির জন্ম হচ্ছে। মানুষের হার্ট, কিডনি এবং মস্তিষ্কের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে উচ্চমাত্রার শব্দ। কানে কম শোনা, গ্যাস্ট্রিক ও ডায়াবেটিসের অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চমাত্রার শব্দ। শব্দদূষণের ফলে নগরবাসী ৯টি মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রথমে দরকার মানুষের সচেতনতা। যারা শব্দদূষণ সৃষ্টি করছে তাদেরকে এ ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে হবে যে, তাদের সৃষ্ট শব্দদূষণে পরিবেশে শান্তি বিঘিœত হচ্ছে, মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাছাড়া, এই সংক্রান্ত আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। আইনে রয়েছে ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় যানবাহনের হর্ন বাজানো যাবে না, আবাসিক এলাকায় ইট পাথর ভাঙার মেশিন ব্যবহার আবাসিক ভবনের পাঁচশ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া, আবাসিক এলাকায় মিক্সার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য মেশিন সন্ধ্যে সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ ধরনের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে এলাকার হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের অনুমতি নেয়ারও বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই। সরকার এবং জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে নীরব ঘাতক শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রিত হোক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT