উপ সম্পাদকীয়

বর্ষণমুখর সন্ধ্যা

রঞ্জিত কুমার দে প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৭-২০১৮ ইং ০০:৪০:৪০ | সংবাদটি ৯৫৪ বার পঠিত

সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়তেই কাল মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল। শুনেছিলাম আষাঢ় মাসে দেয়া ডাকলে ক্ষেতের আল পার হওয়ার আগেই বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মেঘের ঘনঘটা দেখে মন দমে গেল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল
“নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই লাইন ক’টি মনে করেই বাইরে যাবার প্রস্তুতি পাল্টে ফেললাম। প্রকৃতি যেন এরই অপেক্ষায় ছিল। আকাশের গাল বেয়ে ছুটে বৃষ্টির ধারা। ভাবলাম বর্ষণমুখর এই সন্ধ্যেটা ঘরেই কাটুক। আষাঢ় মাস। সারাদিন আকাশ ছিল ঘন মেঘে ঢাকা। বর্ষার ঝরঝর সারাদিন ঝরছে তো ঝরছেই বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই। অবিশ্রান্ত বর্ষণের এ যেন মহোৎসব। বৃষ্টি বিধৌত পথের দুপাশে জমে উঠেছে পানি। আশেপাশের ডোবা-নালাও পানিতে টইটুম্বুর। সারাদিন ঘরে বসেই কাটল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাইরে বের হওয়া সম্ভব হয়নি। একসময় আঁধার ঘন হয়ে আসল। বুঝতে পারলাম সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশের সূর্যাস্তের বর্ণবাহর আজ কারো চোখে পড়লনা। আজকের সন্ধ্যা অন্যান্য দিনের সন্ধ্যা থেকে ভিন্নতর। ঘরের ভেতর আঁধারের আল্পনা। জানালা খুলে দূরে দৃষ্টি দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু চারদিক ঝাপসা। প্রকৃতি যেন ¯িœগ্ধ, শান্ত ও পরিচ্ছন্ন। একদিকে সন্ধ্যার অন্ধকার, অন্যদিকে বৃষ্টির প্রচন্ডতা, দুয়ে মিলে কি চমৎকার এক সন্ধ্যা প্রকৃতি। সন্ধ্যার এ রূপ ধরা পড়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়-
‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে
তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’
অন্ধকারে একা বসে আছি। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে আর গাছপালা মূঢ়ের মত খাড়া দাঁড়িয়ে ভিজছে। মাঝে মাঝে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভাসছে। দূরে ডাহুকের ডাক মনে ভয়ার্ত শিহরণ জাগাচ্ছে। ঝি ঝি পোকার একটানা ঝি ঝি ডাক এবং ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর মিলে এক অপূর্ব ঐকতানের সৃষ্টি করছে। অন্য সময় যা বিরক্তিকর মনে হত এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তাও মনে এক রকম ভাল লাগার রেশ সৃষ্টি করল। বৃষ্টির সময় বই পড়া ভারি মজা, তাই ‘মেঘদূত’ হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। ‘মেঘদূত’ কাব্যের কথা মনে পড়ল। এমন বর্ষণমুখর সন্ধ্যাতে নিশ্চয়ই মক্ষ মেঘকে দূত করে পাঠিয়ে রামগিরি পর্বতে একা নিঃসঙ্গ হয়েছিলেন। মনে পড়ল সেই উড্ডয়িনী, সেই অবন্তী, সেই শ্রাবন্তী, সেই বিদিশা নগরী, রেবা, শিপ্রানদী।
বৃষ্টি এমন প্রবলভাবে নেমে এল। রাতের নিবিড় অন্ধকার ছেয়ে ফেলল সমস্ত বিশ্বচরাচর। বারিধারার অবিশ্রাম ধ্বনিতরঙ্গ মিলে এক অন্য রকম পরিবেশের সৃষ্টি হল। আমি অবাক হয়ে ভাবতে থাকলাম সেই বিরাট শিল্পীর কথা যাঁর এই বিপুল আয়োজন। বর্ষার সন্ধ্যায় আমার মত নিরস, কাটখোট্টা মানুষের মনেও ভাবনার উদ্রেক করে দিল। আর আমি ভাবতে থাকলাম এ জন্যই বর্ষাকে নিয়ে বাঙালি কবিদের এত মাতামাতি-এত হৈ চৈ।
লেখক : অবঃ শিক্ষক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • একুশ আমাদের অহংকার
  • দেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম
  • একুশে : বাঙালি জাতিসত্তার সংগ্রামের ইতিহাস
  • অনন্য গৌরবের একুশে
  • স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী
  • ভেনেজুয়েলা প্রেক্ষাপট ও একনায়কতন্ত্র মতবাদ
  • সিটি কর্পোরেশনের সবুজায়ন
  • উচ্চশিক্ষায় উপেক্ষিত বাংলা
  • উপেক্ষিত যাত্রী অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব
  • ‘জীবন শেষের গান’ ও প্রসঙ্গ কথা
  • স্কুল-কলেজগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
  • সাম্প্রতিক কথকতা
  • রেস্টুরেন্টে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাচ্ছি?
  • বেকার লোকের সংখ্যা বেড়েই চলছে
  • প্রসঙ্গ : সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা বাঁধ
  • বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ঠেকাতে হবে
  • ভাটি বাংলার মরমী সাধক শাহ আব্দুল করিম
  • মৃত্যুঞ্জয়ী বীর জেনারেল ওসমানী
  • বই পড়ার আনন্দ
  • যে মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রতিদ্বন্দ্বী
  • Developed by: Sparkle IT