উপ সম্পাদকীয়

পানি সংকট এবং ভবিষ্যত বাংলাদেশ

আবু মালিহা প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৮ ইং ০০:৪৩:১৭ | সংবাদটি ৫৩ বার পঠিত

পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া কোন সৃষ্ট জীবের বেঁচে থাকার কল্পনাই করা যায় না। সৃষ্টি লগ্ন থেকেই পানির গুরুত্ব অপরিসীম। সেই পানিই যদি সংকট ঘটে, তাহলে এ পৃথিবী বেঁচে থাকবে কী করে।
হ্যাঁ আজকে পানির সংকট সমস্যা ও সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে চাই। বিশেষ করে দেশের পানি নিয়ে ভাবনা এবং সংকট ও সমস্যা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে অবশ্যই পানি বিষয়ে আগে-ভাগেই সচেতন হওয়া দরকার। নদ-নদী বিধৌত এ দেশ সত্যিই মনোরম। পানির কোন অভাব নেই। খাল, বিল, নদী-নালা সহ এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে আজকে সুপেয় পানি বা বিশুদ্ধ পানি অনেক ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করে আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশে নাকি এখন সুপেয় পানির সংকট তীব্রতর হচ্ছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অত্যন্ত প্রয়োজন। সুস্থ জীবন যাপনের জন্য বিশুদ্ধ পানির কোন বিকল্প নেই। শুধু রাজধানীতেই নাকি সোয়া তিন কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন। সরকারী এবং বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় সেই প্রয়োজনটুকু সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু ইদানিং পত্র-পত্রিকায় এই পানি সংকট নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট হচ্ছে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলোতে। এবং সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞদের অভিমতও প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এতে কী সংকটের সমাধান হচ্ছে! দিনে দিনে যেভাবে বড় বড় দালান কোঠা সহ আবাসন ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সংকটকে আরো বেশি বৃদ্ধি করছে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোন কোন এলাকায় তো রীতিমত হাহাকার পরিস্থিতি। পানি শূন্যতায় মানুষ দিশেহারা। বিশেষ করে গরমের সময় সে অবস্থা আরো করুণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যদি পানির সংকট সমাধানে জাতীয়ভাবে এখন অগ্রসর না হই, তবে ভবিষ্যতে এ সংকট যে কত তীব্রতর হতে পারে, তা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আমরা চাই না পানির অভাবে কোন মানুষের প্রাণ সংকট ঘটুক। গোটা পৃথিবীর ৩ ভাগ পানি আর এক ভাগ মাটি। কিন্তু এতো পানি থাকতেও পানি সংকটে বিশ্ব এখন উৎকন্ঠিত। বিশেষ করে বেঁচে থাকার জন্য ব্যবহার করতে হয়, তা নিয়ে।
আজকে যদি ঢাকা শহর নিয়ে চিন্তা করা যায়, তাহলে তার ভবিষ্যত যে কতটা নাজুক হতে পারে, পানি নিয়ে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। দিনে দিনে ভূগর্ভস্থ পানির লেয়ার যেভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে তাতে পানির সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে আমাদের আশঙ্কা। তাছাড়া পানির নানা অপব্যবহারের ফলে এ সংকট আরো ব্যাপকতর হবে। ফলে এখনই এ ধরনের অপব্যবহার রোধ করতে হবে।
এছাড়া নালা, নর্দমা নোংরা পানিতে ভরপুর এবং বিভিন্ন বর্জ্য ফেলার কারণে দুষিত পরিবেশ সৃষ্টিতে এর মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিবে। অপরিকল্পিতভাবে পানি সরবরাহের সংযোগ এবং নগরায়ন বর্ধিষ্ণুতে সুস্থ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে। যত্রতত্র পানির সংযোগ পাইপ দিয়ে অনবরত পানি পড়ার দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। মাঝে মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ নিজস্ব প্রভাব সৃষ্টি করে কোন প্রকার ইঞ্জিনিয়ারিং কোড না মেনেই যত্রতত্র সংযোগ স্থাপন করে প্রকৃত ব্যবহার বিধির বাইরে এ সমস্ত ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। এতে নগর পরিকল্পনাবিদগণ কোন ধরনের আপত্তিও করতে পারছেন না বা সরকারী মহলের চাপে কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মকান্ডে জড়িতও রয়েছেন। এ সমস্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও পানি সংকট সৃষ্টিতে পিছপা নেই। প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিও কেউ অনুসরণ করছেন না। যার ফলে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। ফলে পানি নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে মোটেও ভাবা হচ্ছে না।
পৃথিবীর বিশাল পানি রাশির মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ পানি ব্যবহার যোগ্য বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অথচ ব্যাপকহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সেই পানি ব্যবহার যদি পরিমিতভাবে ব্যবহার করা না হয় তবে ভবিষ্যতে সংকটের আশংকা থাকতেই পারে। এর থেকে উত্তরণের জন্য বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং সবার জন্য নিরাপদ পানি ব্যবহারকে নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের পানি সংকট নিয়ে কেউ কেউ বলেন যে, কখনো যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, সম্ভবত এই পানির জন্যই হতে পারে। আমাদের কথা হচ্ছে, পানি নিয়ে বিশ্বযুদ্ধ হোক বা না হোক, সংকট যে গভীর হবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তাই এ ব্যাপারে পানি বিশেষজ্ঞদের দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ‘বর্তমান পানি সংকট এবং ভবিষ্যত ভাবনা’ এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে সুরাহা বের করার জন্য সকল মহলকেই এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান বিশ্বে পানি নিয়ে শুধু দেশীয় নয় আন্তর্জাতিকভাবেও ঠেলাঠেলি চলছে। এই যেমন আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও এই পানি নিয়ে কম ষড়যন্ত্র চলছে না। বিশেষ করে ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। তাদের সাথে আমাদের অভিন্ন নদীর সংযোগ স্থল গুলোতে নানা প্রকার ব্যারিকেড দিয়ে আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বাঁধা দিয়ে আসছে স্বাধীনতার পর থেকেই। অথচ ’৭৪ সালে ‘ফারাক্কা বাঁধ’ নামের পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালুর কথা বলে আজ পর্যন্ত তার কোন সুরাহা হয়নি। বাঁধের পর মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কা বাঁধের ব্যাপারে আন্দোলন পর্যন্ত করেছিলেন। আজো বাংলাদেশে এই বাঁধের প্রতিবাদে ‘ফারাক্কা দিবস’ পালন করা হয়। শুধু তাই নয় তিস্তা ভেড়িবাঁধ, টিপাই মুখ ভেড়িবাঁধ সহ বাংলাদেশের সাথে গুরুত্বপূর্ণ নদী সংযোগ স্থলে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে একচেটিয়াভাবে ভারত বাঁধ দিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন ধরণের জোরালো পদক্ষেপ নিতে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি বা আন্তর্জাতিক আদালতে এসবের বিরুদ্ধে একটি মামলা পর্যন্ত করেনি। আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ সরকারের কেনো এত গড়িমসি তা আমাদের বুঝে আসেনা। এটা কি ভারত প্রীতি না ভীতি! তা আল্লাহ মালুম। তবে কথা হচ্ছে, আমাদের পক্ষ থেকে সবকিছু আদায় করে নিলেও ভারত কিন্তু আমাদের কোন ন্যায্য হিস্যা দিতে আদৌও আন্তরিক নয়। তবে বাংলাদেশ যে পানি সংকট নিয়ে ভবিষ্যতে তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হবে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যদি না ভারত থেকে আমাদের ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে না পারি সে কথা বলাই বাহুল্য। এ পানি সংকট নিয়ে বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীন অবস্থা বিরাজ করবে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের নানা অভিমত পত্রিকান্তরে প্রকাশ পাচ্ছে।
অভিমতগুলোর একটি হচ্ছে ‘বিশ্বজুড়ে পানি সংকটের কারণ যতটা না প্রকৃতিগত তার চাইতে অনেক বেশী মনুষ্য সৃষ্ট’। বিশ্বের ২৬০টি দীর্ঘ ও বৃহৎ নদী বা ততোধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। নদ-নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও পরিবেশ-প্রতিবেশগত আরও নানান কারণে দুনিয়ার দেশে দেশে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে এরই মধ্যে। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের ১১০ কোটি মানুষ আজ সুপেয় পানির অধিকার হতে বঞ্চিত। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ হাজার শিশু মারা যায় পানিবাহিত রোগে। ডায়রিয়ায় মারা যায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ।
বলাবাহুল্য, ডায়রিয়া রোগের প্রধান কারণ দূষিত পানি। ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮৯ শতাংশ মানুষ পরিস্কার পানি পাচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও চীন অর্থনৈতিক অবস্থায় উন্নতির সাথে সাথে পানি সরবরাহেরও উন্নতি হয়েছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৯২ শতাংশ মানুষের কাছে পানি পৌঁছে যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেছিল জাতিসংঘ। কিন্তু সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। বিশ্বের জনসাধারণের একটা বিরাট অংশ অর্থাৎ ১১ শতাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। অন্য কথায় পৃথিবীর প্রায় ৮০ কোটি মানুষ (৭৮৩ মিলিয়ন) প্রতিদিন দূষিত পানি পান করছে। জাতিসংঘে সুপেয় পানির অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও সেখানে লক্ষ করা যায় যে, শুধু কাগজে কলমে আইন করে কাজ হয়না। অন্য হিসেবে বলা যায়, এই মিঠা পানির একটা বড় অংশ চলে যায় কৃষি কাজে অর্থাৎ ৮৩% এবং বাকী ১৭% শিল্প, গৃহস্থালী ও অন্যান্য কাজে। তাই পৃথিবীর পানি সম্পদ যা এক সময় অফুরন্ত উৎস হিসেবে গণ্য হতো, তা আজ বিরল সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে গোটা পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশংকা। যা থেকে বাংলাদেশের অবস্থা হবে ভয়াবহ। বিশেষ করে দেশের যত্রতত্র বর্জ্য অব্যবস্থাপনা, খাল-বিল, নদী-নালা অবৈধভাবে দখল করে অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন করা, নদী অব্যবস্থাপনা অর্থাৎ নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করা সহ নানাবিধ মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যা পানি সংকটকে ভবিষ্যতে আরো বাড়িয়ে দিবে। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন দেশের একজন পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মন্তব্য করেছেন, দেশীয়ভাবে পানি নীতি না থাকার কারণে এবং সরকারের পরিবেশ ও পানি মন্ত্রণালয়ের অদক্ষ ব্যবস্থাপনার সুযোগে দেশে পরিবেশ ও পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে সরকারের সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্টি নীতিমালা প্রণয়ন ও গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সংকট ও বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানব সৃষ্ট সংকটের কারণে দেশ আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে। যা আমাদের প্রতিনিয়তই ভাবিয়ে তুলছে।
অতএব, বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সহ পানি বিশেষজ্ঞদের এখনই ভাবতে হবে আমাদের দেশকে আগামীতে গুরুত্বর পানি সংকট থেকে কীভাবে হেফাজত করা যায়। তাই পানির অপচয় রোধ করে এবং বিশুদ্ধ পানির রিজার্ভ সৃষ্টি করে সুস্থ এবং নিরাপদ জীবনযাপনের উন্নত প্রযুক্তি সহ সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যত পানি সংকট দূরীকরণে পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। দেশের জনগণ তাই প্রত্যাশা করে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • শরৎকাল
  • বাংলাদেশের সঠিক জনসংখ্যা কত?
  • বিশ্ব-বরেণ্যদের উপাখ্যান আতাউর রহমান
  • মিয়ানমারের একগুঁয়েমি ও মিথ্যাচার
  • Developed by: Sparkle IT