উপ সম্পাদকীয়

স্পীকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী

মোঃ রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৮ ইং ০০:৪৩:৪৫ | সংবাদটি ১২৮ বার পঠিত

বৃহত্তর সিলেট জেলার প্রাণপুরুষ, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্পীকার মরহুম হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সতেরতম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০১ সালের ১০ই জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই মৃত্যৃবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বিশেষ করে আধুনিক কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রূপকার হিসেবে। যে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সবদিক দিয়ে অনগ্রসর ছিল। ছাতক থানার কিয়দংশ, গোয়াইনঘাট থানার কিয়দংশ ও সিলেট সদর উপজেলার কিয়দংশ নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা গঠিত হয় ১৯৮৩ সালে। ১৯৮৫ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদকে নিয়ে তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আসেন। তিনি এই উপজেলাকে নিজের উপজেলা হিসেবে ঘোষণা দেন। সেই থেকে তিনি কোম্পানীগঞ্জবাসীর সুখে-দুঃখে একজন সত্যিকার অভিভাবক হিসেবে আবির্ভুত হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়ামিন চৌধুরী এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ১৯৮৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি জাতিসংঘের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতির পদ অলংকিত করেন। জাতিসংঘের সভাপতি নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, আমি এমন এক সংসদীয় এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছি, যেখানে আজ পর্যন্ত আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি। আমি সেই কোম্পানীগঞ্জবাসীর সর্বাত্মক উন্নতি কামনা করছি। তাঁর এই সাক্ষাতকারে কোম্পানীগঞ্জবাসীর নাম সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়। যা নিয়ে কোম্পানীগঞ্জবাসী গর্ববোধ করে। সেই মহান মানুষকে সংসদীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে পেয়ে ধন্য হয়েছিল কোম্পানীগঞ্জবাসী।
মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট, বিদ্যুৎ স্কুল কলেজ সহ যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জবাসীর জন্য অব্যাহত রেখেছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় আজকের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত উপজেলার সকল স্তরের মানুষ আজ তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে। তাঁর অকাল মৃত্যু কখনো পূরণ হবার নয়। মানুষ মরণশীল, জন্মিলে মরিতে হইবে এটা অবধারিত। মানুষ মরে যায় বটে, কিন্তু সে অমর হয়ে থাকে তাঁর কীর্তির মাধ্যমে। সিলেট সদর এক আসন থেকে ১৯৯৬ সালে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহান সংসদের স্পীকার নিযুক্ত হন। সিলেটবাসীর নানাবিধ সমস্যা সমাধানে যুগান্তকারী পদক্ষেপ শুরু করেন। প্রথমেই তিনি সিলেটের রেলস্টেশনকে আধুনিক রেলস্টেশনে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। সিলেটের বাইপাস রোড, শাহজালাল ৩য় সেতু নির্মাণ, কীনব্রীজের নান্দনিক সৌন্দর্যবর্ধনের নানা মাষ্টারপ্ল্যান হাতে নেন এবং যথাসময়ে তা বাস্তবায়িত হয়। মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটের টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করে এই প্রতিষ্ঠানকে বাচিয়ে রাখেন। সিলেটের আন্তর্জাতিক ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে বৃদ্ধির জন্য জায়গা অধিগ্রহণ সহ সিলেট-সালুটিকর-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ রাস্তার বাইপাস সড়ক নির্মাণ করে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ভোলাগঞ্জকে একটি পর্যটন এলাকায় রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
বিশেষ করে কোম্পানীগঞ্জের উন্নয়নের ব্যাপারে তাঁর হাত ছির অত্যন্ত প্রসারিত। যখনই সিলেট সফরে তিনি আসতেন, এয়ারপোর্ট থেকে নেমে সোজা কোম্পানীগঞ্জে চলে যেতেন। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, ব্রীজের কাজ তিনি নিজেই তদারকি করতেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চেঙ্গেরখাল ও কাটাখাল ব্রীজ। এ দুটি ব্রীজ উদ্বোধন করেন নির্ধারিত সময়ের ৬ মাস পূর্বেই। তিনি কথা দিয়েছিলেন যে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মটরযোগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় এনে বিশাল জনসভায় করবেন। ঠিক তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোম্পানীগঞ্জে এনেছিলেন ও বিশাল জনসমাবেশ করেছিলেন। এর জন্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যতদিন থাকবে, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী দলমত নির্বিশেষে সকলের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যোগাযোগের ক্ষেত্রে সিলেট সদরের সাথে নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছিলেন। সিলেট থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পৌঁছতে সময় লাগত প্রায় ৪৫ মিনিট। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে উপজেলায় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি সিলেট-২ সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেন। প্রথমে ভোলাগঞ্জ বি.ও.পি-তে বিদ্যুৎ উদ্বোধন করে বলেছিলেন ‘আজকে যে বিজলী দিয়ে গেলাম, কোম্পানীগঞ্জকে সারা বাংলাদেশের মানুষকে ব্যবসা বাণিজ্যে আকর্ষণ করবে।’ বাস্তবে তা-ই হল। কোম্পানীগঞ্জ বর্তমানে শিল্পনগরীতে পরিণত হয়েছে। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে নিশ্চয় তিনি তাঁর উপজেলাকে ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র দেখে যেতে পারতেন।
ভোলাগঞ্জের পাথরকোয়ারী, বালুরাজীর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বাংলাদেশের যে কোনো উপজেলার চেয়ে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি রাজস্ব দেয় সরকারকে। তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে পৌরসভায় উন্নীত করার কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে তা আর হলো না। কোম্পানীগঞ্জবাসী বর্তমান সরকারকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে পৌরসভায় রূপান্তরিত করার দাবি করছে। তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো বর্তমান সরকারের মাধ্যমে করা হোক। কোম্পানীগঞ্জ-ছাতক রাস্তা নির্মাণে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এর জন্য প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হাজী মদরিছ আলীকে স্মরণ করতে হয়। এ কারণে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন এই দুই উপজেলার মানুষের কাছে।
মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যে কারণে ইতিহাস হয়ে থাকবেন তাহলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথাকালীন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদকে দিয়ে নানাভাবে-নানাকৌশলে কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার জন্য ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার মৃত্যুর পর এমন কোন স্মৃতিফলক নেই, যে কারণে নতুন প্রজন্মরা চিরদিন তাকে স্মরণ করবে। শুধুমাত্র হুমায়ুন স্কয়ার ছাড়া। আসলে সিলেটবাসী প্রত্যাশা করে আধুনিক রেলস্টেশনকে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামে নামকরণ করা হোক। সদালাপী ও অত্যন্ত ভদ্রলোক হিসেবে তিনি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার দুর্গাপাশা গ্রামে ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুজিবনগর প্রবাসি সরকারকে সর্বতোভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাগান্ধীকে বিশেষভাবে প্রলুব্দ করেছিলেন এবং বিশ্বের সকল শান্তিকামী রাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান জাতি তাঁকে চিরদিন স্মরণ করবে। ১৯৭৫ সালে জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে জীবনবাজি রেখে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তাদের মহাবিপদে পিতার ন্যায় বুকে আগলে রেখেছেন। তার স্বীকৃতি স্বরূপ শেখ হাসিনা ও তাঁকে মহান জাতীয় সংসদের মত স্থানে স্পীকারের আসনে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ চাকুরী জীবনে তিনি বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন। তাঁর ৭৩ বৎসরের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে জাতির ক্রান্তিলগ্নে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি অনেকবার মক্কা ও মদিনা শরীফ তওয়াফ ও জিয়ারত করেছেন। তাঁর সুযোগ্য মেয়ে নাসরিন রশীদ চৌধুরী দুরারোগ্যব্যধিতে গত ৪ বৎসর পূর্বে লন্ডনের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মরহুম স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া করি খোদা যেন তাঁকে বেহেশত নসিব করেন।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ভর্তিযুদ্ধে লাঘব হোক ভোগান্তি
  • মানব সম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা
  • ভোটের মাঠে তারকার মেলা
  • আয় বৈষম্য ও সামাজিক অসমতা
  • সামাজিক আন্দোলন : নিরাপদ সড়ক চাই
  • আলী হোসেন খান
  • মৃত্যুই দিয়েছে তাঁরে চিরমুক্তি!
  • আমেরিকা : ট্রাম্প শাসনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব
  • ইলেকট্রনিক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব
  • পরিবহন নৈরাজ্য
  • মাদকবিরোধী অভিযান : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
  • ছড়াকার বদরুল আলম খান
  • একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিগত দশটি নির্বাচন
  • বইয়ের বিকল্প প্রযুক্তি নয়
  • আগুনের পরশমণি ছোয়াও প্রাণে
  • বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যা
  • জনসচেতনতাই পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে
  • এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর কথা
  • এই অপসংস্কৃতির অবসান হোক
  • সৈয়দ সুমন আহমদ
  • Developed by: Sparkle IT