মহিলা সমাজ

জীবনের খেলা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৮ ইং ০০:৪৪:৩৬ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

আমজাদ সাহেব মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে বেশ সুখি মানুষ। ছেলের জন্য মা সখ করে শিক্ষিত সুন্দরী বউ ঘরে এনেছেন। ছেলের বউকে নিয়ে ভালোই দিন কাটছে তার। আমজাদ সাহেব তার বাবার গড়া প্রতিষ্ঠানের মালিক। সব কিছু তিনি দেখাশোনা করেন। এর সাথে আবার গান বাজনাও তার খুব পছন্দ। স্ত্রী নায়লা কোনো দিনও সন্তানের মা হতে পারবেন না এটা যখন আমজাদ সাহেব জানতে পারলেন তখন মনে খুব কষ্ট পেলেন। কিন্তু স্ত্রীকে গভীর ভালোবাসেন, যা তার কথায় বা কাজে কোনো দিনও প্রকাশ পায় নি। মা এবং স্ত্রী কষ্ট পাবে এই ভেবে সব কষ্টই একাই সামলে নিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে বেড়ানো ঘুরানো সব কিছুতেই সঙ্গ দিতেন। সব সময়ই স্ত্রীকে নুতন কিছু উপহার কিনে দিতেন। সময় পেলে স্ত্রীকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যেতেন।
একদিন মিসেস নায়লা যখন জানতে পারলেন তিনি কোনো দিনও মা হতে পারবেন না, তখন থেকে তিনিরও চিন্তাধারা বদলে যেতে লাগলো। তার ধারণা শাশুড়ি স্বামীকে নিয়ে এতো সুখের সংসারে যদি সন্তানের মা হতে না পারেন তাহলে তার প্রতি সবার ¯েœহ মমতা কি টিকে থাকবে? স্বামীর কাছে কি চিরদিন সুখি থাকতে পারবেন? আমজাদ সাহেব গান পছন্দ করতেন বলে সময় পেলে চুপিসারে বসে গান শুনতেন। আর তখন গান শুনতে শুনতে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। আমজাদ সাহেবের গানের প্রতি দুর্বলতা ও মনোযোগ দেখে মিসেস নায়লা মাঝে মাঝে চিন্তিত হতেন তবে স্বামীকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতেন না।
আমজাদ সাহেব একদিন নায়লাকে বললেন আমি তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে বেড়াতে যাবো। যেখানে থাকবে না কোনো কোলাহল, হৈ, চৈ। তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি নায়লা। মিসেস নায়লা স্বামীর এ অস্থিরতা দেখে খুবই অবাক হয়ে যান। তিনি ভেবে পান না, স্বামীর এ অস্থিরতার কারণটা কি? তবে কি সংসারে নতুন মুখ না দেখাই জীবনের অস্থিতিশীলতা ডেকে আনছে? আমজাদ সাহেব ঠিকই একদিন স্ত্রীকে নিয়ে তার এক ঘনিষ্ট বন্ধুর বাড়ি গেলেন আনন্দ ফূর্তি করার জন্য। কিন্তু হঠাৎ করেই আমজাদ সাহেব কোনো জানি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় আর ওখানে না থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন। স্ত্রী নায়লাকে তিনি কখনো কাছ ছাড়া হতে দিতেন না। দিন দিনই আমজাদ সাহেবের শরীরের অবস্থা খারাপ হতে থাকলো। শেষ পর্যন্ত একদিন আমজাদ সাহেব হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন।
আমজাদ সাহেবের অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে। মিসেস নায়লা খুবই ভেঙে পড়লেন। তিনি সব সময় মানসিক অশান্তিতে ভুগতে থাকলেন। কি নিয়ে বাঁচবেন, কি দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখবেন এ মনোভাব যখন তার মনে সুঁচের মতো বিঁধতে থাকলো তখন নিজেকে অপরাধী বলে মনে হলো। নায়লার এ অবস্থা দেখে শাশুড়ি বউকে ডেকে বললেন তুমি ভেঙে পড়ো না মা, আমি কিভাবে বেঁচে আছি তুমি দেখছো না? তোমাকে ধৈর্য্য ধরতে হবে, তুমি শিক্ষিত মেয়ে, সব কিছু বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন, তুমি ভেঙে পড়লে চলবে না। তোমার শ্বশুরের এ প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে তোমারও অনেক দায়িত্ব আছে।
মিসেস নায়লা খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নেয়। শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে তার খুব কষ্ট হয়। শাশুড়ির কথায় তিনি খুবই বিপাকে পড়লেন। ভেবে চিন্তে শাশুড়ির কথা রক্ষার্থে তাদের প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া শুরু করলেন। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন। একদিন প্রতিষ্ঠানের কাজে বাইরে যেতে হবে বলে অফিসের সব কাগজপত্র ঠিক করতে লাগলেন। তখনই চোখে পড়লো স্বামীর হাতের লিখা একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথা এবং দু’একটি গানের লাইন, এর সাথে একজন মহিলার নাম ও ঠিকানা।
মিসেস নায়লা স্বামীর হাতের লেখা পড়তে থাকেন। এতে আমজাদ সাহেব স্পষ্ট করে লিখে রেখেছেন আমি ছোট বেলা থেকেই গান খুব পছন্দ করতাম। বড় হয়েও আমি গানকে ভালোবাসতে থাকি। গান আমাকে দুর্বল ও পাগল করে তোলে। আমার প্রিয় গানগুলি সব সময় ক্যাসেট প্লেয়ারে শুনি। আমার প্রিয় গানগুলির একজন কণ্ঠ শিল্পিকে খুঁজে বের করি এবং তার সাথে দেখা করতে আগ্রহী হলে শিল্পির সম্মতি নিয়ে তার সাথে দেখা করি। এরপর থেকে সরাসরি তার কণ্ঠে গান শোনার জন্য প্রায়ই তার সাথে দেখা করতাম। তিনি আরো লিখে রেখেছেন, নায়লা কোনো দিনও মা হতে পারবে না। সে কোনো দিনও মা ডাক শুনবে না, তাই আমি এক পর্যায়ে ভেবে চিন্তে ঐ মহিলাকে সব খুলে বলি এবং সেও তার সব কথা আমাকে খুলে বলে। আমি তখন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেই এবং তার সম্মতি নিয়ে তাকে বিয়ে করি। নায়লা কষ্ট পাবে বলে এসব তার কাছে গোপন করি। মহিলার কোলে যে সন্তান আসবে সে তো আমারই সন্তান। আমি তাকে নায়লার হাতে তুলে দেবো। নায়লা তাকে ¯েœহমমতা দিয়ে লালন পালন করে মানুষ করে তুলবে। নায়লাকে সে সন্তান যখন মা বলে ডাকবে এবং তাকেই মা বলে জানবে তখন আমার সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে।
কথাগুলি পড়ে নায়লার চোখে জল আসে। এ ঘটনা তার কাছে খারাপ লাগলেও সে নিজেকে সংযত করে নেয়। নায়লা একদিন ঠিকানা নিয়ে ঐ মহিলা ঝুমা চৌধুরীকে খুঁজে বের করেন এবং তার সাথে দেখা করে তিনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন। মিসেস ঝুমা চৌধুরী নিরুপায় হয়ে নায়লার কাছে সব কথা খুলে বলতে বাধ্য হন। অজানা ভবিষ্যৎকে হাতের মুঠোয় আনার ব্যস্ত প্রত্যাশায় মিসেস নায়লা ওখান থেকে চলে আসেন। তিনি মহিলার প্রতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন। এরপর থেকে নিজেই ঐ মহিলার সাথে প্রায়ই যোগাযোগ করতেন। ঝুমা চৌধুরীর কোলে যখন সন্তান এলো তখন মিসেস নায়লা সে সন্তানকে তার কাছে নিয়ে আসার জন্য প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু কোন মা নিজের সন্তানকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারবে কি? এছাড়া আমজাদ সাহেবও বেঁচে নেই। ঝুমা চৌধুরী সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।
মিসেস নায়লা ঝুমা চৌধুরীকে স্বামীর কথা বলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সব ভুলে গিয়ে ঝুমার কোলের সন্তানকে তার কাছে নিয়ে আসেন। ঝুমা চৌধুরীকে বললেন তোমার যা খুশি ইচ্ছে আমার কাছে চাইতে পারো। তবে তোমার দোহাই ছেলেটিকে তুমি ফিরিয়ে নিতে আমাকে অনুরোধ করবে না। আমি তাকে তার বাবার মতো করে মানুষ করে তুলবো। তাকে লালন-পালন করবো। কোনো প্রয়োজন হলে আমিই তোমার সাথে যোগাযোগ করবো। ঝুমা চৌধুরী এরপর থেকে মিসেস নায়লার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করতেন না। সবাই জানে আমজাদ সাহেবের একমাত্র ছেলে আদনানকে নিয়ে সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন।
ধীরে ধীরে ছেলেটি বড় হয়। বাবার মতো সেও গান পছন্দ করে। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনে। মা মিসেস নায়লা গানকে সব সময় এড়িয়ে যেতেন এটা আদনান ঠিকই টের পেতো এবং মনে মনে ভাবতো মা কোনো গান পছন্দ করেন না? একদিন আদনান মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইলো মা তুমি কেনো গান পছন্দ করো না? তখন মা বলেছিলেন সবার যে সব কিছু পছন্দ হতে হবে এমন কোনো কথা আছে কি? তুমি গান পছন্দ করো এটা ভালো কথা। কিন্তু গান দিয়ে তো জীবন চলে না বাবা। ভালো করে পড়াশোনা করো। জীবনটাকে বুঝতে শেখো, তারপরে অন্যসব।
আদনান এ নিয়ে আর কোনো কথা বাড়ায় নি। দিন, মাস, বছর যায়, আদনান পড়াশোনা চালিয়ে যায়। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ানো ঘুরানো সব ঠিক রাখে। মাঝে মধ্যে মায়ের চোখে পানি দেখে তার মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। কিন্তু মাকে সে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারে না। একদিন আদনান তার কলেজের সহপাঠীদের কাছ থেকে জানতে পারে মিসেস নায়লা তার আসল মা নন। এতে তার মন খুব খারাপ হয়। সে যেনো কেমন হয়ে যায়। অথচ মাকে সে এতো ভালোবাসে, মাও তাকে খুব ভালোবাসেন। কেমন করে এটা সম্ভব, সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
বন্ধুদের কথা তার একটুও বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না। মিসেস নায়লা তার আসল মা নন, এটা ভাবতেও তার খুব কষ্ট হচ্ছে। আদনান তার কষ্টকে চেপে রাখতে না পেরে একদিন সরাসরি মাকে চাপ দেয় সত্যি কথা বলার জন্য। মিসেস নায়লা সেদিনকার মতো সত্যি কথাটা এড়িয়ে গেলেও পরে তাকে একদিন সব বলতে বাধ্য হন। কিন্তু আদনান কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
সে মিসেস নায়লার কাছ থেকে ঝুমা চৌধুরীর ঠিকানা নিয়ে তাকে খুঁজে বের করে, তার সাথে দেখা করে সব জানতে চায়। কিন্তু ঝুমা চৌধুরীও এখানে নীরব থাকেন। সে নিরুপায় হয়ে মিসেস নায়লার কাছে ফিরে এসে মিসেস নায়লাকে নিয়ে ঝুমা চৌধুরীর সাথে দেখা করে। ঝুমা চৌধুরী তাদেরকে এক সাথে দেখে খুব অবাক হন এবং কান্নায় তিনি ভেঙে পড়েন। মিসেস নায়লা ঝুমা চৌধুরীকে সব বলার জন্য অনুরোধ করেন। আদনান সব শোনার পর ঝুমা চৌধুরী ও মিসেস নায়লাকে একসাথে জড়িয়ে কান্নার ভেঙে পড়ে। ঝুমা চৌধুরী তাকে সান্ত¦না দেন। তিনি বলেন আমি তোমার জন্ম দিয়েছি ঠিকই কিন্তু তোমার সব দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। তিনিই তোমার মা তার কাছে তোমাকে ফিরে যেতে হবে।
আদনান বলে তোমরা দু’জনই আমার প্রাণ প্রিয় অতি আদরের মা। একজন আমাকে জন্ম দিয়েছো, আর একজন আমাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছো। এটা আমার জন্য কতো সৌভাগ্যের আমি কাউকে সেটা বুলাতে পারবো না। আদনান বলে চলো মা, তোমাদের দু’জনকে নিয়ে আমি আমার জীবনে এগুতে চাই। আজ থেকে আমরা এক সাথে থাকবো। জীবনটাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তুলবো। আমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না। তুমি গান গাইবে, আমি থাকবো গানের মাঝে। তুমি ঘর সাজাবে। আমি থাকবো ফুলের সুবাস হয়ে। নায়লা, ঝুমা দু’জনই স¯েœহে আদনারের মাথায় হাত রাখেন- আর বলেন, পাগল ছেলে আমাদের।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT