মহিলা সমাজ

প্রথিতযশা কবি সুফিয়া কামাল

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৭-২০১৮ ইং ০০:৪৫:০০ | সংবাদটি ২১ বার পঠিত

নারীবাদী ও নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ লেখিকা ও প্রথিতযশা কবি সুফিয়া কামাল। তিনি ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতা সৈয়দা সাবেরা খাতুন। যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙালি মুসলিম নারীদের গৃহবন্ধী জীবন কাটাতে হতো। কঠোর পর্দা প্রথার প্রচলন ছিলো বলে তাদের স্কুল-কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ ছিলো না। সুফিয়া কামালের যে পরিবারে জন্ম হয়েছিলো সেখানে বাংলা ভাষার প্রবেশ এক রকম নিষিদ্ধ ছিলো। সেই বৈরি পরিবেশে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো সুযোগ পাননি। পারিবারিক নানা উত্থান-পতনের মধ্যে থেকেও তিনি স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। সুফিয়ার বয়স যখন সাত বছর তখন তাঁর বাবা সাধকদের অনুসরণে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে তাঁকে নিয়ে তাঁর মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়েই বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন। তাঁর মায়ের পরিবারটি ছিলো শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবার। এই পরিবারে নারী শিক্ষাকে তেমন প্রয়োজনীয় মনে করা হতো না। সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিলো উর্দু। এই কারণে অন্দরমহলে ‘আরবি, ফার্সি’ শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শিখানোর কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। তিনি তাঁর মায়ের কাছ থেকে বাংলা ভাষা শিখেছিলেন। নানা বাড়িতে তাঁর বড় মামার একটি বিরাট গ্রন্থাগার ছিলো। মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় এ লাইব্রেরির বই পড়ার সুযোগ ঘটেছিলো তাঁর।
১৯২৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাত ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে বিয়ে দেয়া হয় সুফিয়াকে। নেহাল আধুনিকমনা ছিলেন বলে তিনি সুফিয়া কামালকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন তিনি। সুফিয়া সে সময়কার বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। একবার কলকাতায় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা ও কাজ সুফিয়া কামালের শিশুমনে দারুণ দাগ কেটেছিলো। তাই সুফিয়া কামালের কাজে-কর্মেও বেগম রোকেয়ার প্রভাব লক্ষণীয়। সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ সেই সময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘সওগাত’ এ প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র যেমনÑ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখা পান। তৎকালীন মুসলিম সমাজে নারীর অগ্রযাত্রা ছিলো নানা চড়াই উৎরাই পূর্ণ। পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে যারা এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাদের মধ্যে সুফিয়া কামাল অন্যতম একজন দৃঢ় প্রত্যয়ী নারী।
নারীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ এ রোকেয়ার সাথে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। সেই সুবাদে বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চা চলতে থাকে। ১৯৩৭ সালে তাঁর গল্পের সংকলন ‘কেয়ার কাটা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই বইটি বিদগ্ধজনের প্রশংসা কুড়ায়, যাদের মাঝে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কবিগণ।
১৯৩২ সালে তাঁর স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি আর্থিক সংকটে পড়ে কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পেশায় নিয়োজিত থাকেন। এরই মধ্যে ১৯৩৯ সালে কামাল উদ্দিন আহমেদের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। কবি সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তানের মধ্যে একজন হলেন এডভোকেট সুলতানা কামাল। তিনি বাংলাদেশের একজন মানবাধিকারকর্মী এবং রাজনীতিবিদ। তিনি রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশ এর উপদেষ্টা ছিলেন।
সুলতানা কামাল বিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানীতে নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে তিনি সিলেটের খাদিমনগরে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাছাড়া তিনি হংকংয়ে ভিয়েতনামী ভাসমান লোকজনের উপর জাতিসংঘের আইনি পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। তিনি একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে সমাজের মানুষের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
দেশ বিভাগের পূর্বে সুফিয়া কামাল নারীদের জন্য প্রকাশিত সাময়িকী ‘বেগম’ এর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নারীদের এই আন্দোলনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৫৬ সালে শিশু-কিশোরদের সংগঠন ‘কচি কাচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবী জানান। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন। এই বছরে তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন, সরকার কর্তৃক ইতোপূর্বে প্রদত্ত তমযা-ই ইমতিয়াজ পদক বর্জন করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাসভবন সংলগ্ন গোটা ধানমন্ডি এলাকা পাকিস্তানি বাহিনীর নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলো, আর ঐ সময় তিনি ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিরাপদে অবস্থান করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কার্ফ্যু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন। প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন তিনি। কবি সুফিয়া কামালের অসংখ্য লেখার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছেÑ কাব্যগ্রন্থ : সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, প্রশস্তি ও প্রার্থনা, উদাও পৃথিবী, অভিযাত্রিক। গল্প : কেয়ার কাঁটা, ভ্রমণকাহিনী : সোভিয়েতে দিনগুলি। স্মৃতিকথা : একাত্তরের ডায়েরি, শিশুতোষ : ইতল বিতল, নওল কিশোরের দরবারে।
সুফিয়া কামাল আজীবন মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে গেছেন এবং নারী প্রগতিতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। নারী অধিকার আদায়ে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় সুফিয়া কামাল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন।
নারী মুক্তির আন্দোলনে সুফিয়া কামালও ছিলেন একজন অগ্রপথিক। বেগম রোকেয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নারীদের প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই প্রথিতযথা কবি আমাদের সাহিত্য অঙ্গনে বিচরণ করেছেন স্বমেধায় এবং বৈচিত্র্যময় লেখার মাধ্যমে। সুফিয়া কামাল ছিলেন একজন সফল সংগঠক ও নারীনেত্রী। আমি তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এবং তাঁর মতো আমাদের দেশের আজকের নারীরাও যেন অধিকার সচেতন ও মুক্তচিন্তার অধিকারী হয় সেই কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT