উপ সম্পাদকীয়

আপন ভুবন, অচেনা আকাশ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৭-২০১৮ ইং ০০:৩৬:৩৪ | সংবাদটি ১৫ বার পঠিত

বাঙালি মহলে কথাটা চাউর করে দিলাম, আমি গাড়ি কিনব। কারও জানা থাকলে আওয়াজ দেবেন। আওয়াজ দিল মোহাম্মদ হোসেন। ওর এক পাঞ্জাবি বন্ধু, শিয়ালকোটের এস.পি। ভদ্রলোকের ১৯৬৪ মডেলের খুব ভাল কন্ডিশনের প্রায় নতুন ভোক্সওয়াগন গাড়ি। তিনি আমেরিকায় প্রশিক্ষণ শেষে আসার সময় এনেছিলেন, বেশিদিন না চালিয়েই বেচে দিচ্ছেন। নিয়ে নিলাম। দাম সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এভাবে ইস্ট পাকিস্তানি ‘ফকির’ এক মাসের মধ্যে গাড়ির মালিক হয়ে গেল। ফলে শুধু সরকারি কাজ নয়, বিকেলে শহরে যাওয়া, বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় দাওয়াত-জিয়াফত সবই ঠেকান দেয়া সম্ভব হতো সেই নীল রঙের ‘ফোক্সিতে’। গাড়িটা সত্যি বলতে চোখ বুঁজেই কিনেছিলাম, শুধু বন্ধু মোহাম্মদ হোসেন জাম্পুর কথায়। সে বিক্রেতার সততা সম্বন্ধে খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। কার বাসায় যেন রাতে আমাদের ডিনারের দাওয়াত ছিল। সেখানে ওই গাড়ি বিক্রেতা ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। তাঁর কথাবার্তা খুব ভাল লাগল আমার। কিনে ফেললাম তাঁর বাইরে অন্ধকারে দাঁড়ানো গাড়ি। ‘একটু দেখবেন না, চালাবেন না একটু?’ ভদ্রলোক জানতে চাইলেন। আমি বললাম, থাক, কাল টাকা দিয়ে তবেই দেখব।
পরদিন টাকা দিয়ে গাড়ি নিলাম। পুরো সাড়ে পাঁচ হাজার লোন দিয়েছিল অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক, ডি.সি তারিক খান সাহেবের মৌখিক সুপারিশে। কেনার পর দেখি গাড়িটি লেফট-হ্যান্ড-ড্রাইভ। আমেরিকানদের জন্য বানানো গাড়ি তো, তাই। তখন গাড়ি কেনা থেকে পিছিয়ে আসা হয়ত যেত, কিন্তু সেটা আমার কাছে মর্যাদাহানিকর মনে হল। তা ছাড়া ওটা বা আর সব কিছুই আগেভাগে দেখার দায়িত্ব তো আমারই। কেনাবেচার ব্যাপারে প্রথম কথাই হল : ‘বায়ার বিএ্যাওয়্যার’-তোমাকেই সাবধান হতে হবে ক্রেতা। যা হোক, লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ হলেও গাড়িটি আর সব দিক থেকে ভাল। এ যেন বিয়ের পর শুভদৃষ্টির সময় বর আবিষ্কার করল, সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী, গৃহকর্মে নিপুণা, উচ্চশিক্ষিতা কনেটি ট্যারা। তখন ‘সবই তাঁর ইচ্ছা’ বলে মেনে নেয়া ছাড়ার আর কী-ই বা করার থাকে।
যেদিন গাড়ি চালিয়ে শেখপুরা গেলাম ডি.সি সাহেরেব ওখানে মিটিংয়ে যোগ দিতে, সেদিন গাড়ি দেখে ডি.সি সাহেব খুব খুশি। ‘চমৎকার গাড়ি কিনেছ, তা মাইলেজ কত দিচ্ছে?’ ডি.সি তারিক খান এত সস্তা গাড়িতে কোনদিন চড়েছেন কিনা আমার সন্দেহ। তবু তাঁকে ধন্যবাদ, ত াঁর সহায়তায় এখন আমার চলাফেরা অনেক স্বচ্ছন্দ হয়েছে।
কিন্তু আমার ‘রায়েশগাহ’ দেখে খান সাহেব দারুণ হতাশ হলেন। একদিন বিকেলে হুট করে তিনি এসে উপস্থিত আমার বাসায়। ‘এদিক দিয়ে ফিরছিলাম লাহোর থেকে। ভাবলাম, তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই’। বললেন ডি.সি সাহেব। আমাদের মধ্যে ততদিনে একটা ‘ওয়াকিং রিলেশনশিপ’ গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাই বলে ‘আপস্টার্ট শিরোমণি’ তারিক খান নামক গজস¤্রাটের এই ‘ফকিরের’ কুঁড়েঘরে অকস্মাৎ পাদুকাধুলি দেয়ার খায়েশ হল কেন? আমাদের প্রায়ান্ধকার বৈঠকখানায় তাঁকে কোথায় বসাব, কী খেতে দেব ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে দেখি তিনি একটি প্রাগৈতিহাসিক সোফায় বসেই পড়েছেন। বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছে তাঁকে। ততক্ষণে আমার স্ত্রীও এসে যোগ দিয়েছেন এবং তাঁর পেছনে পেছনে চায়ের ট্রে হাতে ইব্রাহিম। সেই নাক উঁচু ভদ্রলোক বিশুদ্ধ ইংরেজিতে আমাকে ও আমার পতœীকে বললেন, আমি সত্যি দুঃখিত, তোমাদের এ রকম একটা পচা বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু কী করব বল, এটা একটা নতুন সাবডিভিশন, বাড়ি-ঘর-দুয়ার, কোর্ট-কাচারি কিছুই গড়ে ওঠেনি এখানে। তাঁর আন্তরিকতা আমাকে স্পর্শ করল। আমি বললাম, তবু আপনি যে এটার ব্যবস্থা করেছেন সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আর আমার জন্য চিন্তা করবেন না, আমি যে কোন পরিস্থিতিতেই খাপ খাইয়ে নিতে পারি নিজেকে।
তবে শাহদারার এই বাড়িটি নিয়ে একদিন সত্যি সত্যি ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম। সেদিন বোধ হয় রোববার ছিল, ছুটির দিন। হঠাৎ বাবুর্চি ইব্রাহিম ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, একটা সুন্দর গাড়িতে করে এসেছেন এক সাহেব। আপনাকে চাচ্ছেন। আমি চিরকাল বাসায় লুঙ্গি পরে থাকি। আর গরমের দিনে সচরাচর খালি গা। সেদিনও লুঙ্গি পরা অবস্থায় ছিলাম। তবে শীতকাল ছিল, তাই খালি গা ছিলাম না। সুন্দর গাড়ির কথা শুনে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দেখি, সত্যি গাড়িটা সুন্দর। আর শুধু সুন্দরই নয়, দামিও বটে। মার্সিডিস। আর গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সকলের বস সংস্থাপন বিভাগের সচিব শোয়েব সুলতান খান, যিনি একাডেমিতে আমাদের ডেপুটি ডাইরেক্টর (প্রশাসন) ছিলেন। ভুত দেখা বলা ঠিক হবে না, শোয়েব সাহেবকে দেখে আমি ফেরেশতা দেখার মত চমকে উঠলাম। ‘স্যার, আপনি?’ ‘হাসনাত, (ওই নামেই তিনি আমাকে ডাকতেন) আমি পিন্ডি যাচ্ছি। আমার একটু বাথরুম যাবার দরকার পড়েছে। যদি ...’। সঙ্গে সঙ্গে আমার হায়-হুলস্থূল শুরু হয়ে গেল, ভাঙ্গি কোথায়? ইব্রাহিম দেখ তো ভাঙ্গি গেল কোথায়। বশিরা, বশিরা।
শোয়েব সাহেবকে আমার সেই ‘বিখ্যাত’, তবে মোটামুটি অব্যবহৃত, বৈঠকখানায় বসিয়ে আমি নিজেই সুইপার বশিরার খোঁজ করতে লাগলাম। সৌভাগ্যবশত, বশিরা খিড়কি দরজার বাইরে বসে কাঁকই হাতে মাথার উকুন বাছছিল। মিনিট পাঁচেকের ভেতর বসকে সাদর সম্ভাষণ জানালাম অন্দরমহলে।
বস শোয়েব সাহেবকে আমরা বেশ ভয়ই পেতাম একাডেমিতে। তিনি খুব কেতাদুরস্ত চৌকশ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শৌচাগারে জলবিয়োগ সেরে এসে তিনি প্রথমেই আমাকে বললেন, ‘হাসনাত, তুমি এ বাড়িতে আছ আমাকে আগে বলনি কেন? এ বাড়িতে তুমি থাকতে পার না। আমি বুঝতে পারছি, এটা বাড়ির কোন জাতই না। তুমি কালই একটা চিঠি দাও। আমি তোমাকে গুলবার্গে একটা বাড়ি বরাদ্দ করে দেব। আমি এখন চলি। আমার একটু তাড়া আছে’। ‘আপকি বড়ি মেহেরবানি’ বলতে বলতে আমি তাঁকে গাড়িতে তুলে দিলাম। তাঁকে চা খাওয়ার কথা বলতে বললেন, আজ নয়। তোমার লাহোরের বাসায় গিয়ে খাব একদিন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পর কাজের দিক দিয়ে শহদারাকে কিছুই মনে হতো না। প্রায় দিনই বিকেলে বা সন্ধ্যায় লাহোর শহরে কোন বন্ধুর বাসায় আর না হয় আনারকলি বাজারে সময় কাটাতে চলে যেতাম। কোন ড্রাইভার ছিল না, তাই আমাকে নিজেই গাড়ি চালাতে হতো। লাহোরে আমার গাইড ও সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল পিয়ন মকবুল। এরকম সৎ, নিষ্ঠাবান ও বিশ্বস্ত একজন পিয়ন আমার চাকরি জীবনে খুব কমই পেয়েছি। কোন কিছু করতে বললে সে কোনদিন না বলত না। কথা বলত সব সময় মাটির দিকে কিংবা ওপরের দিকে তাকিয়ে। আমার ছেলেমেয়েকে দেখাশোনা করার জন্য সে এক কিশোরী গৃহকর্মী জোগাড় করে এনে দিল। সেই পারভিন মেয়েটিও খুব ভাল ছিল। সে রোজ সকালে আসত আর সন্ধ্যায় চলে যেত। সে আমাদের সঙ্গে থেকে থেকে কিছু কিছু বাংলা কথা শিখে ফেলেছিল। বাচ্চাদের সঙ্গে সে বাংলা বলতে চেষ্টা করত। এমনিতে তারা সবই কথা বলত পাঞ্জাবিতে। বাবুর্চি ইব্রাহিমও ছিল খুবই কর্তব্যনিষ্ঠ। কোন কোনদিন সব কাজকর্ম শেষ করে, সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে লাহোরের প্রচন্ড শীতের ভেতর দুপুর রাতে ইব্রাহিমকে ঘরে ফিরতে দেখেছি। পরদিন আবার ঠিক সময়মত এসে হাজির ডিউটিতে। মকবুল-ইব্রাহিম-পারভিনদের কথা কিছুতেই ভোলা যায় না। দুঃখের বিষয়, একাত্তরে আমরা বাংলাদেশে ফিরে আসার পর এদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি কোনদিন।
পশ্চিম পাকিস্তানে মহকুমা প্রশাসকের প্রধান দায়িত্ব তখন ছিল আদালতে বসে মহকুমা হাকিমের কাজ করা। পূর্ব পাকিস্তানে একজন এসডিও-কে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হতো উন্নয়ন-কাজকর্ম, আইন-শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, জনসংযোগ ইত্যাদি নিয়ে। শাহদারাতে এগুলো কিছুই ছিল না বলা যায়। জেলা সদরে বসে ডিসি ও তাঁর সহকর্মী এডিএম-এডিসি-রাই এগুলো সামাল দিতেন। অন্য কথায়, জেলা প্রশাসনের কাজ তখন পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়নি। এতদিন পরে নিশ্চয়ই আগের মত আর কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা নেই। শুনেছি এখন নাকি পাকিস্তানেরও বাংলাদেশের মত মহকুমাগুলোকে জেলাতে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমরা যেসব মহকুমায় মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছি সেগুলো এখন জেলা হয়ে গেছে। যেমন আমাদের সাবেক ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা হয়েছে জেলা। তেমনি শাহদারাও হয়েছে জেলা।
শাহদারাতে একদিন ঘোড়া চড়ার সুযোগ হয়েছিল। তবে সে অভিজ্ঞতাটি খুব সুখকর ছিল না। ওই এলাকার ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার মোহাম্মদ খান আমাকে খুব বলে-কয়ে নিয়ে গেলেন প্রত্যন্ত এলাকার একটি বনাঞ্চল পরিদর্শনে। ওখানে নাকি গাছ-চুরি খুব বেড়ে গিয়েছিল। শাহদারা থেকে বেশ দূরে ওই এলাকা। প্রথমে কিছু দূর জীপে গিয়ে পরে ঘোড়ায় চেপে যেতে হল প্রায় মাইল পাঁচ-সাতেক মাঠের ভেতর দিয়ে। আমাকে যে ঘোড়াটি দেয়া হয়েছিল ওটা যাওয়ার সময় দেখলাম চলতেই চায় না। বহু কষ্টে ওকে বাগে এনে পৌঁছালাম অকুস্থলে। কয়েক ঘা চাবুকও লাগাতে হয়েছিল ঘোড়াটিকে।
ফেরার পথে হঠাৎ সে ছুটতে লাগল তুফান মেইলের মত। মোহাম্মদ খান সাহেব ছিলেন ভাল ঘোড়সওয়ার। তিনি অনেক পিছে পড়ে গেলেন। আর আমার ঘোড়াটি বোধ হয় খুব রেগে গিয়ে উম্মাদের মত ছুঁটতে লাগল। হঠাৎ সামনে পড়ল একটা শুকনো খাল, প্রায় ৪/৫ হাত চওড়া। ঘোড়াটি দিল লম্বা লাফ। আর আমি ছিটকে পড়লাম তার ওপর থেকে। ... হাত-পা ভাঙেনি, তবে শয্যাশায়ী থাকতে হল দু’তিন দিন।
এই মোহাম্মদ খান আমাকে একটা বন্য ছাগল জাতীয় প্রাণী দিয়েছিলেন পুষতে। ওটাকে নাকি উরিয়াল বলে। বাসার ভেতর উঠানে সারাদিন বেঁধে রেখে তাকে এটা-ওটা খাওয়াতাম আমরা। হঠাৎ একদিন প্রাণীটি মারা যায় কোন অসুখ-বিসুখ ছাড়াই। তার লম্বা শিং দু’টো আজও আছে আমাদের কাছে।
আমার ও আমার অন্যান্য বাঙালি সহকর্মীর কিন্তু একটা লাভ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মহকুমায় চাকরি করে। আমরা বিচারকার্যে খুব ভাল করে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলাম। বরং বলা উচিত মনোনিবেশ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। অন্যান্য ম্যাজিষ্ট্রেটদের মত সকাল-সন্ধ্যা আদালতে বসে একাগ্রচিত্তে বিচার-কাজ করতে হতো। আমাদের মহকুমা আদালতগুলো লাহোর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত হওয়ায় লাহোর জেলা জজ কোর্ট ও হাইকোর্টের আইনজীবিরাও প্র্যাকটিস করতেন আমাদের কোর্টে। তাঁদের এবং শাহদারার অনেক আইনজীবীর দক্ষতা ও প্রজ্ঞা ছিল প্রশংসনীয়। এঁদের মধ্যে সোহরাব বলে শাহদারার একজন তরুণ আইনজীবীর আইনজ্ঞান, উপস্থাপনা ও যুক্তিতর্ক ছিল খুবই উঁচু মানের। বলতে দ্বিধা নেই, এই ভদ্রলোকও লাহোর-শাহদারার কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীর কাছ থেকে ওই সময়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি।
প্রথম প্রথম আদালতের ভাষা অর্থাৎ পাঞ্জাবি ভাষা নিয়ে আমার একটু একটু অসুবিধা হতো। তবে যেহেতু উর্দু ভাষার সঙ্গে পাঞ্জাবি ভাষার যথেষ্ট মিল ছিল তাই প্রথম থেকেই মোটামুটি বুঝতে পারতাম কে কী বলছেন। মাস খানেকের মধ্যে পাঞ্জাবি ভাষা ভালই বলতে শিখে গেলাম আমি। আদালতের উকিলবৃন্দ ও সুযোগ্য পিএসআই (প্রসিকিউশন সাব ইন্সপেক্টর) তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা মালিক আমজাদ খান আমাকে যথেষ্ট সহায়তা করতেন এ ব্যাপারে।
একদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল প্রথম দিকে। এরপর থেকে আদালতের উকিল-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই সতর্ক হয়ে যান আমার ব্যাপারে। তখন মাত্র সপ্তাহ দুয়েক হয় আমি যোগদান করেছি। একদিন একজন সাক্ষীর জবানবন্দী হচ্ছিল।
তার আগে এখানে স্মৃতি থেকে আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের কাজ পাঞ্জাবি ভাষায় কীভাবে শুরু হতো তা তুলে ধরছি। (আসলে এই একই গৎবাঁধা কাজটি এত বেশিবার করেছিলাম যে ওটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল তোতাপাখির মত।) সাক্ষী কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর পর পাঞ্জাবিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হতো। সাধারণত পিএসআই বা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী শুরু করতেন এভাবে।
আদালতের কর্মচারি : দস্ ভাই, যো আখোঙা ইমান নাল সাচ আকোঙা (বল্ ভাই, যা বলব ইমানের সঙ্গে সত্য বলব।)
সাক্ষী : যো আখোঙা ইমান নাল সাচ আখোঙা।
কর্মচারি : তয়াড্ডা না কী যে? (তোমার নাম কী?)
সাক্ষী : আল্লাহ দিত্তা।
কর্মচারি : তয়াড্ডা পিউ দা না কী যে? (তোমার পিতার নাম কী?)
সাক্ষী : বুটা।
কর্মচারি : কোন হোন্দে হো? (তুমি কী?) অথবা তোয়াড্ডা যাত কী জে? (তোমার জাত কী?)।
সাক্ষী : জাঠ আঁরাই (অথবা জাঠ গুন্দল, রাজপুত ইত্যাদি কান গোত্র)।
কর্মচারি : কিত্থে দা? (তুমি কোথাকার লোক?)
সাক্ষী : (তার গ্রামের নাম বলবে।)।
কর্মচারি : হোন দস্, কী হয়াসি। (এখন বল্, কী হয়েছিল)।
সাক্ষী : উয়ো জনাব, কোই ছা বেলা সি। আসি সাডা খু দে কুল বয়ঠাসন। .... (ও জনাব, আনুমানিক চা-খাওয়ার সময় ছিল। আমি আমাদের কূয়োর কাছে বসেছিলাম)।
পাঞ্জাবের গ্রামবাসীরা সময়ের হিসাব বলত এভাবে : সকালবেলা হচ্ছে, ছা (চা) বেলা। দুপুর, রুটি বেলা। সন্ধ্যা, শাম দা ওয়াকত।
সাক্ষীদের আরেকটা কথা খুব মনে পড়ে। যে সাক্ষী ‘বয়েঠ গিয়া’ বা ‘বসে যেত’, অর্থাৎ বৈরী ঘোষিত হতো আদালত কর্র্তৃক, অথবা কোন সাক্ষী যখন কিছু বলতে চাইত না, তখন সে বারবার বলত : মেনু কোই পাতা নাহি, জনাব। (আমি কিসসু জানি না, জনাব)।
তা সেদিন পিএসআই এক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণকালে জরুরি প্রয়োজনে আমার অনুমতি নিয়ে পাশের আদালতে গেলেন একটুক্ষণের জন্য প্রতিপক্ষের আইনজীবীকে বললাম সাক্ষ্যগ্রহণ চালিয়ে যেতে। এক পর্যায়ে আমার মনে হল ওই তরুণ উকিল-নাম ছিল মমতাজ-সাক্ষীর পাঞ্জাবি কথার ভুল তরজমা করলেন ইংরেজিতে। আমি ইংরেজিতে অনুদিত বাক্যটি লিখে রাখলাম। তারপর বললাম, উকিল সাহেব, ও তো বোধ হয় এটা বলেনি। আপনি আবার শুনুন তো। উকিল সাহেব সাক্ষীকে দিয়ে কথাটি আবার বলালেন এবং একই রকম অনুবাদ করলেন। এবার আমি তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলাম এবং ওখানেই সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করে পিআসআই আমজাদকে ডেকে পাঠালাম। তখন বিকেলবেলার সময়, আমার আদালতে আর কোন উকিল ছিলেন না। যা হোক, আমজাদ এলেন এবং সাক্ষী আবার কথাগুলো উচ্চারণ করল। আমি যে অর্থ করেছিলেন, দেখা গেল, আমজাদও একই অর্থ করেছেন সেই পাঞ্জাবি ভাষার বাক্যের। তখন উকিল সাহেব বারবার ক্ষমা চেয়ে বলতে লাগলেন, হুজুর, লোকটার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তাই তরজমাটা উল্টে গেছে। আমি তাঁকে কড়া ধমক দিয়ে বললাম, আর কোনদিন এই রকম কিছুতে পেলে ওকালতি ওখানেই শেষ করিয়ে ছাড়ব। এই ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া আমার জন্য খুব শুভ হয়েছিল। পরে আর কখনও কেউ এ ধরনের ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে সাহস করেনি। মাসখানেকের মধ্যে আমার পাঞ্জাবিও ‘কাট্ কাট্ আন্দি’ (কিছু কিছু আসে) থেকে একেবারে ‘ঢিট্ পাঞ্জাবি’ (কঠিন পাঞ্জাবি) না হলেও মোটামুটি সড়গড় হয়ে যায়। আমি এরপর নিজেই কথা বলতাম সাক্ষী ও অন্যান্যদের সঙ্গে কোন দোভাষী ছাড়াই।
মামলা নিষ্পত্তির জন্য পাঞ্জাবে তখন ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রবল চাপ ছিল। সেই চাপ মহকুমা হাকিম-কাম-প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আমার ওপরও সমানভাবে ছিল। আমাকেও প্রত্যেক মাসে ডি.এম (ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। ডি.সি ও ডি.এম সব সময় একই ব্যক্তি ছিলেন।) সাহেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পুলিশ-মাজিস্ট্রেসি মিটিংয়ে অন্যান্য ম্যাজিস্ট্রেটদের মত জবাবদিহি করতে হতো। ম্যাজিস্ট্রেটদের মাসিক কাজের পরিমাপ করার এক অভিনব পদ্ধতি চালু ছিল পাঞ্জাবে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট একটি মামলার সব কার্যক্রম সমাপ্ত করে মামলাটিতে রায় প্রদান করলে সেই মামলার জন্য তিন (?) নম্বর (বলা হতো ইউনিট) অর্জন করতেন। এমনিভাবে ছোটখাট নিষ্পত্তির জন্যও নম্বর (ইউনিট) ছিল। মাসের শেষে মোট কত ইউনিট অর্জন করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তার ওপর তাঁর দক্ষতা বিচার করা হতো। ডি.এম সাহেব মাসিক সভায় বিভিন্ন আদালতের মামলা সংক্রান্ত একটি বিশাল তথ্য-বিবরণী সামনে নিয়ে বসতেন। ওই বিবরণীতে কোন মামলা তিন মাস, কোনটি ছ’মাস, কোনটি এক বছর, কোনটি তারও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে তার পরিসংখ্যান থাকত। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে সর্বসমক্ষে জবাবদিহি করতে হতো। আর তারিক খান সাহেবের মুখের জবানের এমনি যা সুনাম ছিল, তার ওপর এ ধরনের মওকা

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • আইনজীবী-সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম চৌধুরী
  • সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল কবে শেষ হবে?
  • রাস্তাটির সংস্কার চাই
  • প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • আবর্জনা সমস্যা : উৎপাদনের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে
  • উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রয়োজন
  • সিটি নির্বাচন : কাকে ভোট দেব?
  • রথযাত্রা
  • বিবেক দ্বারা হোক পথ চলা
  • মাদকাসক্তি ও তার প্রতিকার
  • Developed by: Sparkle IT