সম্পাদকীয়

কৃষিতে নারীর অবদান

প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৭-২০১৮ ইং ০২:০৫:১৩ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

কৃষিতে নারীর অবদান স্বীকৃতি পাচ্ছে না। আমাদের কৃষিতে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ। অথচ তাদেরকে এই স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। বরং তারা সর্বত্র বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। নারীরা কৃষি উৎপাদনে ঘরে বাইরে একইসঙ্গে সহায়তা করে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামে বসবাসরত প্রতিটি মহিলাই নিজ নিজ পরিবারে কৃষি ও কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। প্রত্যক্ষভাবে কৃষি খামার কিংবা কৃষি জমিতে কাজ করা নারীর সংখ্যা কম হলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক নারীকে এই খাতে শ্রম দিতে হয়। পারিবারিক প্রতিপত্তি ও সামাজিক মর্যাদার কারণে নারীরা নিজের ঘরে কিংবা খামারে পরিশ্রম করলেও তা প্রকাশে তারা ওপারগতা জানান। গ্রামের প্রতিটি পরিবারে মা, স্ত্রী, কন্যা কোন না কোন ভাবে কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত। কিন্তু ব্যাপারটি খুব একটা প্রকাশ্যে আসে না। এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাজ করছে। মানবজাতির আদি পেশা হচ্ছে এই কৃষি। সভ্যতার সূচনাতে মানুষ প্রথমেই মাটিতে ফসল চাষ করা শেখে। আর এই কৃষির উৎপত্তি হচ্ছে নারীদের হাত ধরেই।
আদিকালে এই কৃষি ছিলো পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তখন নারী-পুরুষ সবাই মিলে খাবার সংগ্রহ করতো। আদিম মানুষেরা বনজঙ্গলে বসবাস করতো, পশুপাখী শিকার করে এগুলোর মাংস খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতো। তখন পুরুষেরা পশুপাখী শিকারে ব্যস্ত থাকতো আর নারীরা গৃহের কাজে মগ্ন থাকতো। সেই সময়ই নারীদের হাত ধরে বন থেকে সংগৃহিত বীজ থেকে অংকোরোদগম ঘটতো। আর এভাবেই নারীর হাত ধরে কৃষি কাজের উৎপত্তি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কৃষির সব কর্তৃত্ব চলে আসে পুরুষের হাতে। অবস্থাটা এমনই যে, বর্তমানে নারীদের বেশীরভাগই একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে ও গৃহের কাজে জড়িত। তারা সন্তানের লালন পালনের পাশাপাশি গৃহস্থালীর অন্যান্য কাজও করছে। এর বাইরে যে সময়টুকু থাকে তার পুরোটাই তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি কাজে ব্যয় করছে। আবহমানকাল ধরে নারীরা বাড়ির আশেপাশে নানা ধরণের মওসুমী শাকসব্জি চাষ করে আসছে। অনেক এলাকায় নারীরা মাঠে ধান রোপণ, নিড়ানি ও পরিচর্যার কাজেও নিয়োজিত হচ্ছে। এছাড়া ঘরে ঘরে নারীদের হাঁসমুরগী পালনের একটা ঐতিহ্যতো আছেই। কৃষি খাতে নারীদের অবদান ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে এর স্বীকৃতি তারা পাচ্ছে না। কৃষি অর্থনীতিতে নারীরা যে অবদান রাখছে এর পরিমাপগত স্বরূপ নির্ধারণ করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে নারী কিষাণীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া জরুরী। স্বরণ করা যেতে পারে ১৯৯৫-৯৬ এর শ্রম জরিপে প্রথমবারের মতো নারী যে ‘কৃষক’ তা বিবেচনায় আনা হয়। তবে ঐ পর্যন্তই। এখন পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদনে নারীদের অবদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া, এই নারী কৃষক বা কিষাণীদের নিয়ে আলাদা কোন পরিসংখ্যানও নেই। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের পাশাপাশি কিষাণীদেরও কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উপজেলা পর্যায়ে। এতে করে পক্ষান্তরে নারী কৃষকদের অবদানকে কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বলেই আমরা মনে করছি। আর ২০০৫-২০০৬ সালের শ্রম জরিপে বলা হয়, কৃষি ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর অবদান ২৬ দশমিক তিন শতাংশ বেশী। তাছাড়া ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংকের জরিপে বলা হয়, কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। সুতরাং এদেশে বিভিন্ন পেশায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা যেভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, কৃষিখাতেও ঘটছে তাই। এই ধারার অবসান হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT