ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৭-২০১৮ ইং ০২:৩৭:০৪ | সংবাদটি ৮৭ বার পঠিত

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাহের উদ্দিন খানের পৈত্রিক নিবাস। একটি রাজনৈতিক পরিবারে তার জন্ম। নিজেও রাজনীতি করে আসছেন সেই ছাত্রকাল থেকে। চাচা আজিজুল ইসলাম খান ছাত্র রাজনীতি করেছেন ষাটের দশকে। তারপর জাতীয় রাজনীতিরও পরিচিত মুখ। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের একজন নেতা। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন তাহের উদ্দিন খানের শ্বশুর পÿের অনেকেও। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মনি সিংহের সঙ্গে সম্পর্কিত শ্বশুর পরিবার। তাহের উদ্দিনও ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর শিÿকতা শুরু করেন সুনামগঞ্জ আর নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকায় একটি বিদ্যায়তন বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেইতো শুরু তার কর্ম জীবনের। তবে, যুগপৎ চলছিলো রাজনীতিও। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন সেই তখন থেকেই।
পেশা পরিবর্তন না করেও প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেন এক সময় তাহের উদ্দিন খান। যোগদান করলেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল মহাবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে নেত্রকোনা কলেজ। ইতোমধ্যে পিএমসি করেছেন। যোগ দিয়েছেন সিলেট এমসি ইন্টারমেডিয়েট কলেজে। এসব জায়গা ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের আগে আগেই আসলেন ঢাকায়। পোস্টিং পেয়েছেন ইন্টারমেডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে। সে সময়তো ব্য¯Íতা তাঁর অফুরান। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ন্যাপের পÿে প্রচারণা। ৭১ এ অসহযোগ আন্দোলন। তারপর আবার মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে সেখানে যতোটুকু সম্ভব করেছেন। করে যাচ্ছেন প্রতিদিন।
ময়মনসিংহের আইনজীবি এডভোকেট মহিউদ্দিন আহমেদের ৪র্থ সন্তান হাসিনা বেগম কেবল বিএ পরীÿা দিয়েছেন। তখনই বিয়ে হয়ে যায় তাহের উদ্দিন খানের সঙ্গে। সে পÿে অনেকেই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। হাসিনা বেগমের কাজিন ফজলুল হক, মোজাম্মেল হকরা সিপি আইয়ের নেতা। হাসিনা বেগম নিজেও কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন সরকারি চাকুরি করে করেও। তার বড় বোন রোকেয়া বেগম পার্টি করতেন। ফরেন সার্ভিসে চাকুরি করেছেন ১ম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে। সিনিয়র এসিস্ট্যেন্ট সেক্রেটারি পদ মর্যাদায় থাকা কালে ২০০১ সালে অবসর নেন হাসিনা বেগম।
১৯৭১ সালে তাহের উদ্দিন-হাসিনা বেগম দু’কন্যা সন্তানের জনক-জননী। তাদের কন্যা সোমার বয়স তখন ৪ বছর এবং সাথীর ২ বছর। এ নিয়েই তাঁদের সংসার। ফলে, পিছুটানতো ছিলোই কিছুটা। তবুও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা পালন করতে হবে, করেছেন তারা দু’জনেই। অসহযোগ আন্দোলনের এক পর্যায়ে স্ত্রী হাসিনা বেগম এবং দু’মেয়েকে পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়ি বারহাট্টার যশমাধব। ঢাকায় ব্য¯Í সময় কাটাচ্ছেন তিনি নানা কাজে। কিন্তু পরিবার পরিজন থেকে কতোদিন দূরে থাকবেন? মেয়েদের মুখ ভেসে উঠে প্রায়ই। ১৯৭১ এর ২৩ বা ২৪ মার্চ নিজেও গেলেন বাড়িতে। দু’দিন থেকে নিয়ে আসবেন সন্তানদের। কিন্তু গ্রাম থেকে রওয়ানা করার আগেই সংবাদ পেলেনÑ ঢাকায় গণহত্যা শুরু করেছে পাকি¯Íানি সেনা বাহিনী। ধ্বংসযজ্ঞের কাহিনী ইতারে ভেসে ভেসে পৌঁছালো বারহাট্টার যশমাধব গ্রামে। কি করবেন তাহের উদ্দিন? ঢাকা ফেরার কথা ভাবতেও পারেন নি আর। তা হলে কি করা উচিৎ তার?
তাহের উদ্দিন খান একজন শিÿক শুধু ননÑ অভিজ্ঞ রাজনীতিকও। খুবই রাজনীতি সচেতন। বুঝতে তাঁর দেরি হয়নি পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে। নিজের করণীয়ও ঠিক করে নেন তাৎÿণিক। এদিকে ঢাকায় তার বাসা পুড়িয়ে দিয়েছে পাকি¯Íানি সেনা বাহিনী। বাস করতেন তিনি ইপিআর গেইটের কাছে। সে এলাকার সকল বাড়ি-ঘর পুঁড়ে ছাই ভস্মে পরিণত করে দিয়েছে। তাতেতো দমে যাবার পাত্র নন তাহের উদ্দিন। পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করলেন। দেশে সে কাজটি করে করে এক পর্যায়ে চলে গেলেন দেশের বাইরে একেবারে ভারতীয় ভূ-খন্ড। ভূমিকা রাখছেন মুক্তিযুদ্ধে। পার্টির নির্দেশানুযায়ী কাজ করেছেন সেখানে। কিন্তু সন্তানদের কি হবে? ওরা কি গ্রামে নিরাপদ? সে প্রশ্নতো সার্বÿণিক মনে আসে তার। তাই যুদ্ধের শেষ দিকে প্রবেশ করেন অবরুদ্ধ বাংলায়। আত্মগোপন করে করে চলে যান নিজ গ্রামে। যেভাবেই হোক সেখান থেকে নিয়ে আসবেন নিজের পরিবার।
দ্বিতীয় সন্তান তার সাথী। মাত্র দু’বছরের মেয়ে। সে সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। গ্রামে নেই চিকিৎসার ব্যবস্থা। ছুটোছুটিও করতে পারছেন না তিনি ঠিক মতো। রাজাকাররা তার অবস্থানের সংবাদ পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। গেলেন ময়মনসিংহ। কিন্তু সে শহরের পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর। শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও আছেন আতঙ্কে। যোগাযোগ করলেন কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে। অভয় দিলেন তিনি। আহবান জানালেন ঢাকায়। কলেজে যোগদান করলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। তাছাড়া থাকার ব্যবস্থাও করে দেবেন নিজ দায়িত্বে। তাহের উদ্দিন অন্তত মেয়ের সুচিকিৎসার বিষয় চিন্তা করে চলে যান ঢাকায়। অধ্যÿ সাহেব ঠিকই থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কলেজ ক্যাম্পাসেই রয়েছে দু’টি বাড়ি। একটি অধ্যÿ মহোদয়ের জন্যে। অন্যটি হোস্টেল সুপারের। হোস্টেল সুপারের বাড়িটি এখন খালি থাকায় সেখানেই ঠাঁই নিলেন তাহের পরিবার।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ, ঔষধ-কাপড় সহ নানা রকম জিনিষপত্র সংগ্রহ করা, সঠিক লোকটির হাতে সেগুলো তুলে দেয়া ইত্যাদি কাজ করে চলেছেন। যোগাযোগ করতেন অনেকেই। রাতে আসতেন শ্রমিক নেতা লুৎফুর রহমান। আরো কারো কারো আসা যাওয়াটা হয়তো অধ্যÿের নজরে আসে। তারপর ঘটে-ঘটনা। একদিন বাড়িতে আসে পাকি¯Íানি হানাদার সৈন্য। সোজাসুজি প্রবেশ করে ঘরে। তাহের উদ্দিন কে? পরিচয় গোপন করার কোনো সুযোগ তখন আর নেই। হয়তো নিশ্চিত হয়েই এসেছে ওরা। তাহের উদ্দিন পরিচয় দিলেন নিজের, ‘আমিই প্রফেসর তাহের উদ্দিন খান’। সাথে সাথেই মেয়েদের থেকে আলাদা করে নিয়ে যায় একটি কÿে। স্ত্রী হাসিনা বেগমকেও সে কÿে যেতে দেয়নি। শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ। কোথায় ছিলেন এতোদিন, কি করেছেন। ভারতে গিয়েছেন কি না, মুক্তিযুদ্ধের প্রশিÿণ কোথায় গ্রহণ করেছেন, কোথায় যুদ্ধ করেছেন কমান্ডার কোথায়, অস্ত্র কোন জায়গায় রেখেছেনÑ আরো কতো শত প্রশ্ন। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত তিনি। বসিয়ে রেখেছে উদোম দেহে। কয়েক ঘণ্টা ধরে পরীÿা করে হাতের কনুই, পায়ের হাঁটু। তারপর শরীরের অন্যান্য অঙ্গ। হাসিনা বেগমের তখন মুর্ছা যাবার অবস্থা। দু’মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলøাহর দরবারে কান্নাকাটি করছেন। ভিÿে চাইছেন স্বামীর জীবন। অন্য দিকে মানসিক নির্যাতন করে চলেছে তাহের উদ্দিনকে। এভাবে জীবন মৃত্যুর সন্ধিÿণে কাঠিয়েছেন তিনি চার পাঁচ ঘণ্টা।
কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে হোস্টেল সুপারের বাড়ি। মাঝে কিছু দিন জমে উঠেছিলো বাড়িটি। রাতে বিরাতে আনা-গোনা ছিলো নিভৃতচারিদের। আসতেন তারা গোপনে। চলেও যেতেন ঠিক একইভাবে। আর, ঐ দিন যারা আসলো তারা সশস্ত্র হয়ে, সদলবলে প্রবেশ করে। প্রফেসর তাহের উদ্দিন খানকে বিচ্ছিন্ন করে নিল স্ত্রী-কন্যাদের নিকট থেকে। দু’ঘরে আলাদা-আলাদা আটকে রাখে সবাইকে। এ অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে ওরা রাজনীতিবিদ প্রফেসর তাহের উদ্দিনকে। চারদিকে বন্দুকধারি মিলিটারি। চোখ ওদের রক্তবর্ণ। যেন বের হচ্ছে আগুণের ফুলকি। জিব থেকে বের হচ্ছে লালা। রক্তের নেশা চরম পর্যায়ে। যে কিছু করতে পারে রক্তপানের উদ্দেশ্যে। খট-খট, খুট-খুট বুটের শব্দ তুলে পায়চারি করছে ঘরময়। সৃষ্টি হয়েছে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। তাহের উদ্দিন ধরেই নিয়েছেন জীবনের শেষ দিন তার। যে কোনো মুহূর্তে গর্জে উঠবে যে কারো হাতের আগ্নেয়াস্ত্র। বুলেট বিদ্ধ হবে সরাসরি বুকে। তারপর হয়ে যাবেন স্বাধীনতার বলি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা শুধুই ছিলো সময়ের ব্যাপার।
হানাদার সর্দারের অসংখ্য উত্তর দিচ্ছেন- না, না, জানি না, দেখি নাই ইত্যাদি শব্দ দ্বারা। আর মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৃত্যুর। প্রতি মুহূর্তেই যেন এগিয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর সড়ক ধরে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন সামনেই ‘কুল দো শেক’ রা¯Íা বন্ধ। জীবনের সমাপ্তি এখানেই। এভাবেই কেটেছে ৫ ঘণ্টা। তারপর নানা শর্ত আরোপ করে সে দিনের মতো চলে যায় পাকি¯Íানি জানোয়ারগুলো। প্রফেসর তাহের উদ্দিনও আর এখানে থাকতে সাহস পেলেন না। রাতের আঁধারে চলে যান শহরের গেন্ডারিয়া। সেখান থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে। এ করে করেই কাটিয়ে দেন ১৬ ডিসেম্বর অবধি। সেই মৃত্যুর সড়ক ধরে অনেক দূর হেঁটে আসলেও প্রফেসর তাহের উদ্দিন খান বেঁচেছিলেন ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অবধি।
শিÿকতা থেকে অবসর নেবার পর তাহের উদ্দিন খান চলে যান উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায়। দু’কন্যা ছাড়াও তখন তিনি পুত্র তানজির খানের পিতা। সবাই সে দেশের বাসিন্দা। সেখানেই মৃত্যুরবণ করেন তিনি।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT