সম্পাদকীয়

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৭-২০১৮ ইং ০০:২৩:১৬ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত


দেশে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য উৎপাদনে সারা বিশ্বে একটি উল্লেখ যোগ্য স্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তার পরেও মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ যাকে বলে সেটা অর্জিত হয়নি এখনও। এই প্রেক্ষাপটে গতকাল দেশে শুরু হয়েছে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ। সপ্তাহের এবারের শ্লোগান হচ্ছে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ মাছে দেশ-বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। কিছুদিন আগেও এমন অবস্থা ছিলো যে, ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’র এই দেশে মানুষ দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতে পারলেও মাছ জুটতো না অনেকের ভাগ্যে। পুকুর-ডোবা, হাওর-বাওর, নদী-নালা, খাল-বিল প্রায় মাছশূন্যই হয়ে পড়েছিলো। বাজারে মাছ ছিলো সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছে, এমনটি বলা যায় না, তবে উত্তরণের পথে আছি আমরা। আর এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহেই ব্যাপকভাবে মৎস্য উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ শুরু হবে বলেই আমরা আশা করছি।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ইতোপূর্বে দেশে যতো প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ছিলো, তার অর্ধেক ইতোমধ্যেই কমে গেছে। বর্তমানে প্রতিবছর ৯ শতাংশ হারে মিঠাপানির মাছ কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে যদি মিঠাপানির মাছ এই হারে কমতে থাকে, তবে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে মুক্ত জলাশয়ের দেশীয় প্রজাতির মাছ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। দেশে এখনও চাহিদার তুলনায় মাছের ঘাটতি কয়েক লাখ টন। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যা- থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে দেড়শ’ কোটি টাকার মাছ আমদানি করতে হয়। তার পরেও থেকে যায় ঘাটতি। এই ঘাটতির পরিমাণ বছরে প্রায় ছয় লাখ টন।
দেশে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হচ্ছে প্রতিবছর, তার মধ্যে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন আহরণ করা হয় ৪৪ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর আয়তনের জলাশয় থেকে। এই মাছের মধ্যে দেশীয় প্রজাতির মাছ রয়েছে ছয় লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিকটন। মোট উৎপাদনের ২৪ শতাংশ হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ।
সাধারণত একটি দেশের নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভব প্রজাতির মাছকেই দেশীয় প্রজাতির মাছ বুঝায়। দেশীয় প্রজাতির মাছ বছরে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র দুই থেকে তিন লাখ মেট্রিকটন। বিদেশি প্রজাতির মাছ উৎপাদিত হচ্ছে ১৬ লাখ মেট্রিকটন। দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক প্রজাতি বিলুপ্তও হয়ে যাচ্ছে। দেশে ইতোমধ্যেই সোয়াশ’ প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
দেশীয় প্রজাতির মাছের এই বিপন্ন অবস্থার জন্য যেসব কারণকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞগণ তার মধ্যে রয়েছে- প্রজনন, বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎসস্থল আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হওয়া, দূষিত হওয়া এবং দেশের বেশিরভাগ জলাশয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় মাছের জীবন ধারণ ও বংশ বিস্তার কঠিন হয়ে পড়া। এর সঙ্গে রয়েছে নির্বিচারে মাছ নিধনসহ মানুষের প্রকৃতি বিরোধী অপরিণামদর্শী আচরণ। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, দারিদ্র্য, লোভ ইত্যাদি কারণেও বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ।
আবহমানকাল ধরেই দেশের প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে খাপ খাইয়ে বেড়ে ওঠেছে এবং এখনও টিকে আছে বহু দেশীয় প্রজাতির মাছ। তাই বাংলাদেশ এখনও দেশীয় প্রজাতির মাছের বৈচিত্র্যের জন্য পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। এখনও আমাদের যে জলাশয় কিংবা পানি সম্পদ রয়েছে, বিশেষ করে মিঠাপানি- তা বিশ্বে অতুলনীয়। এই সম্পদকে কাজে লাগানোই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। তাছাড়া প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষা এবং জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতেই হবে। আর তাই গড়ে তুলতে হবে এই সংক্রান্ত দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাসহ জনসচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই বিষয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। সার্বিকভাবে মাছের উৎপাদন যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা অব্যাহত রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT