ধর্ম ও জীবন

লোভ, হিংসা ও অহংকারের ভয়াবহ পরিণাম

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৮ ইং ০১:০৮:১৯ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

লোভ মানুষের পরম শত্রু। লোভ মানুষকে অন্ধ করে তার বিবেক বিসর্জন দিয়ে তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। মানুষ নিজের ভোগের জন্য যখন কোনো কিছু পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে তাকে লোভ বলে। তখন যা নিজের নয়, যা পাওয়ার অধিকার তার নেই, তা পাওয়ার জন্য মানুষ লোভী হয়ে ওঠে। সে তার ইচ্ছাকে সার্থক করে তুলতে চায়। লোভের মোহে সে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ সব বিসর্জন দেয়। তার ন্যায়-অন্যায় বোধ লোপ পায়। সে পাপের পথে ধাবিত হয়। নিজের স্বার্থের জন্য সে অন্যের সর্বনাশ করতে কখনও কুণ্ঠাবোধ করে না। এভাবে লোভ মানুষকে পশুতে পরিণত করে। ডেকে আনে মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিণাম। তাইতো বলা হয়Ñ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’।
লোভ মানব চরিত্রের এক দুর্দমনীয় প্রবৃত্তি। মানুষ যখন লোভের পথে পা বাড়ায়, তখন তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সমাজের অধিকাংশ মানুষ লোভের দ্বারা কমবেশি তাড়িত হয়। লোভ মানুষকে পাপ কাজে নিয়োজিত করে কুপথে ধাবিত করে। লোভের কারণেই মানবজীবনের পরিণাম অনেক সময় দুঃখময় হয়ে ওঠে। নিজের ভোগ-বিলাসের জন্য দুর্দমনীয় বাসনাই হচ্ছে লোভ। আমাদের চারপাশে সর্বত্রই লোভের হাতছানি। অর্থ, বিত্ত, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা প্রভৃতির প্রতি মানুষের প্রচন্ড লোভ। লোভে মানুষ পরিণামের কথা চিন্তা না করে এমন সব কাজ করে যা আইনের চোখে দ-নীয়। ফল স্বরূপ বরণ করে নেয় জীবনের করুণ পরিণতি। লোভের মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে মানুষ তার মা, বাবা, ভাই-বোন সবাইকে অবজ্ঞা করে। স্বীয় বাসনা পূর্ণ করার জন্য সবাইকে ভুলে যেতে দ্বিধাবোধ করে না। টাকার মোহ, সম্পদের মোহ তাকে পাগল করে তোলে। লোভ মানবজীবনের বড় শত্রু, লোভকে এজন্যই পাপের আধার বলা হয়ে থাকে। তিনটি জিনিস মানুষকে ধ্বংস করে। লোভ, হিংসা এবং অহংকার। লোভ তাদের মধ্যে অন্যতম। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা। কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ ও লোভীদেরকে পছন্দ করেন না। লোভ আর স্বার্থ বুদ্ধির দ্বারা তাড়িত হয়ে মানুষ তার ভাই বন্ধুকে হত্যা করে। পরিণামে নিজের আত্মহননের পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করেনা। একথা সত্য ধর্ম লাভের পথে পা দিলে একদিন তার মৃত্যু হবেই। লোভ মানুষকে জঘন্য পথে ক্রমশ তাড়িত করে। কথায় আছে ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।’ আর এভাবেই লোভী ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়। সে অন্যায়, অসত্য আর পাপের পথে ধাবিত হয়ে অকাল মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। পরিণামে নেমে আসে ভয়ঙ্কর মৃত্যু।
লোভ এর আরবি প্রতি শব্দ ‘হারসুন’। এর অর্থ লালসা লিপসা, মোহ, ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা ইত্যাদি। লোভ মানুষের মনের শান্তি বিনষ্ট করে। অধিক পাওয়ার আকাক্সক্ষা মানুষকে সারাক্ষণ বিভোর রাখে। ফলে নিজের কাছে যা আছে তাতে তুষ্ট না থেকে আরো পাবার আশায় সে অস্থির থাকে। লোভ মানুষকে নানা প্রকার অপরাধমূলক কাজের দিকে ধাবিত করে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, কালোবাজারি, মজুদদারি, দ্রব্যে ভেজাল দেয়া সুদ-ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজ লোভের কারণেই সংঘটিত হয়ে থাকে। লোভী ব্যক্তি অন্যের ধন-সম্পদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এবং অবৈধ উপায়ে তা হস্তগত করার চেষ্টা করে। ইসলাম এরূপ লোভকে চিরতরে নিষিদ্ধ করেছে। নবী (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘তোমরা লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাক। কেননা এ জিনিস তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে ধ্বংস করেছে এবং পরস্পর রক্তপাত ঘটানোর ব্যাপারে উস্কে দিয়েছে। আর এই লোভ-লালসার কারণেই তারা হারামকে হালাল সাব্যস্থ করেছে’ (মুসলিম)। লোভের কারণে অনেকে মাত্রাতিরিক্ত খায়। এতে করে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আবার কখনও তা তার জীবননাশেরও কারণ হয়। ধৈর্য্য এবং অল্পে তুষ্টির গুণ থাকলে লোভ-লালসা থেকে মুক্ত থাকা যায়। রসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘হে মানবমন্ডলী! তোমরা চাওয়ার ক্ষেত্রে উত্তম পন্থা অবলম্বন কর। কেননা বান্দার ভাগ্যে যা নির্ধারিত আছে তার অতিরিক্ত সে পাবে না’ (হাকিম)। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সহজ-সরল পথ অবলম্বন করলে লোভ বর্জন করা সম্ভব হয়। নির্লোভ জীবনের মধ্যেই নিহিত আছে প্রকৃত সুখ। নির্লোভ জীবন সকলের শ্রদ্ধা ও ভক্তি অর্জন করে। তাই লোভকে বর্জন করতেই হবে।
মানব চরিত্রের অন্যতম খারাপ দিক হচ্ছে হিংসা। হিংসা শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হলোÑ‘হাসাদুন’। এর মানে হিংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি। অন্যের সুখ-সম্পদ, মান-সম্মান নষ্ট হওয়ার কামনা এবং নিজে এর মালিক হওয়ার বাসনা করাকে হিংসা বলে। শত্রুতা, লোভ, অহংকার, নিজের অসৎ উদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার আশক্সক্ষা নেতৃত্বের লোভ ইত্যাদি কারণে হিংসার সৃষ্টি হয়। হিংসুক ব্যক্তি অন্যের ভালো দেখতে পারে না। হিংসা একটি মারাত্মক মানসিক ব্যধি। হিংসুক ব্যক্তি আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকে। হযরত আদম (আ.) এর মর্যাদা দেখে ইবলিশ তাঁর প্রতি হিংসা করে। ফলে সে অভিশপ্ত হয়। সে চিরতরে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। মানব সৃষ্টির পর সর্বপ্রথম পাপ সংঘটিত হয়েছিলো সেই হিংসার কারণে। হযরত আদম (আ.) এর পুত্র কাবিল হিংসার বশবর্তী হয়ে তার আপন ভাই হাবিলকে হত্যা করেছিলো। হিংসা মানুষের শান্তি বিনষ্ট করে। মনে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখে। হিংসা সমাজে ঝগড়া-ফাসাদ, মারামারি এবং অশান্তি সৃষ্টি করে। হিংসা মানুষের ভালো কাজগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। হিংসা-বিদ্বেষের ভয়াবহ পরিণতির প্রতি সাবধান করে নবী (সা.) ইরশাদ করেনÑতোমরা হিংসা থেকে সাবধান থাক। কারণ আগুন যেমন শুকনো কাঠকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয় হিংসা তেমনি সৎকর্মগুলোকে ধ্বংস করে দেয় (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। হিংসার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে রসুল (সা.) আরো ইরশাদ করেনÑ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মুন্ডনকারী (ধ্বংসকারী) রোগ ঘৃণা ও হিংসা তোমাদের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে আসছে। আমি চুল মু-নের কথা বলছি না বরং তা হলো দ্বীনের মুন্ডনকারী’ (আহমদ, তিরমিজী)। অন্য হাদিসে রসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘পূর্ববর্তী উম্মতের দু’টি রোগ তোমাদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে হিংসা এবং ঘৃণা’ (বায়হাকী)। হিংসা পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে। তাই হিংসা পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে রসুল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘তোমরা একে অপরকে হিংসা করো না, একে অন্যকে ঘৃণা করো না, একে অন্যের ক্ষতি করার কৌশল করো না বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও’ (বুখারি ও মুসলিম)। নবী (সা.) অন্য একখানা হাদিসে বলেছেনÑ‘পরস্পর সদিচ্ছা বা শুভকামনাই দ্বীন।’ হিংসার অপকারিতা সীমাহীন। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে হিংসা থেকে বেঁচে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছেÑ‘আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই যখন সে হিংসা করে’ (সূরা : ফালাক, আয়াত : ৫)। হিংসুককে আল্লাহ পছন্দ করেন না। তাই ইহ-পরকালীন কল্যাণের নিমিত্তে আমাদেরকে সব সময় হিংসাত্মক কার্যকলাপ পরিত্যাগ করতে হবে।
মানব চরিত্রের আরেকটি খারাপ দিক হচ্ছে অহংকার। অহংকার শব্দের অর্থ অহমিকা, আমিত্ব, গর্ব, দর্প, দম্ভ, বড়াই, নিজেকে বড় মনে করা ইত্যাদি। নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় গণ্য করা এবং অন্যকে তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট মনে করাকে অহংকার বলে। মানুষ, বংশ, ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য, শক্তি, সামর্থ্য ইত্যাদি নিয়ে অহংকার করে থাকে। এই অহংকারের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। বিনয়ে জয় অহংকারে ক্ষয়। অহংকার পতনের মূল। অহংকারের কারণেই ইবলিশ অভিশপ্ত হয়ে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘তুমি এ স্থান থেকে নেমে যাও। এ স্থান থেকে অহংকার করবে তা হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি অধমের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা : আরাফ, আয়াত : ১৩)
অহংকার করা মহাপাপ। মানুষের জন্য অহংকার করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘তুমি জমিনের উপর সদম্ভে চলো না। নিশ্চয় তুমি জমিনকে চিরতে পারবে না এবং পাহাড় সমান উঁচুতেও তো পৌঁছতে পারবে না। (সূরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৭)
অহংকারের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ(১) ‘আমি আমার নির্দেশনাবলী হতে ফিরিয়ে রাখবো ঐ সকল লোকদেরকে, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায়’ (সূরা : আরাফ, আয়াত : ১৪৬)। (২) ‘উহারা বিজয় কামনা করল এবং প্রত্যেক অহংকারী ব্যর্থ মনোরথ হল’ (সূরা : ইব্রাহিম, আয়াত : ১৫)। (৩) ‘নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ২৩)। (৪) ‘সূতরাং তোমরা দ্বারগুলো দিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ কর, সেথায় স্থায়ী হবার জন্য। দেখ, অহংকারীদের আবাসস্থল কতো নিকৃষ্ট’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ২৯, সূরা : যুমার, আয়াত : ৭২)। (৫) ‘যারা আমার সাক্ষাৎ কামনা করে না তারা বলে, আমাদের নিকট ফেরেস্তা অবতীর্ণ করা হয়না কেন? অথবা আমরা আমাদের প্রতিপালককে প্রত্যক্ষ করি না কেন? উহারা উহাদের অন্তরে অহংকার পোষণ করে এবং উহারা সীমালঙ্গন করেছে গুরুতর রূপে’ (সূরা : ফুরকান, আয়াত : ২১)। (৬) ‘যারা নিজদিগের নিকট কোন দলীল প্রমাণ না থাকলেও আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে বিতন্ডায় লিপ্ত হয়-তাদের এই কর্ম আল্লাহ এবং মুমিনদের দৃষ্টিতে অতিশয় ঘৃণাই। এভাবে আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়কে মোহর করে দেন’ (সূরা : মুমিন, আয়াত : ৩৫)। (৭) ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকারে আমার ‘ইবাদতে বিমুখ, উহারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্চিত হয়ে’ (সূরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)।
অহংকারের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে অগণিত হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কিত কয়েকখানা হাদিস নি¤েœ উপস্থাপন করা হলোÑ(১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যার অন্তরে বিন্দুমাত্র পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তখন এক ব্যক্তি আরজ করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! প্রত্যেক ব্যক্তিই তো এটা পছন্দ করে যে, তার কাপড়-পোশাক ভালো হউক এবং জুতা জোড়াটি সুন্দর হউক এটাও কি অহংকারের অন্তর্ভুক্ত? তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা নিজেও সুন্দর এবং পছন্দ ও করেন সৌন্দর্যকে। তবে অহংকার হলো, দম্ভের সাথে হককে পরিত্যাগ করা এবং মানুষকে হেয় ও তুচ্ছ মনে করা (মুসলিম)। (২) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন তিন শ্রেণির মানুষের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে, তাদের প্রতি দৃষ্টিও দিবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। এরা হচ্ছেনÑবৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী শাসক এবং অহংকারী ভিক্ষুক’ (মুসলিম)। (৩) হযরত আমর ইবনে শুআইব (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘কিয়ামতের দিন অহংকারীদের পিপীলিকার ন্যায় জড় করা হবে। অবশ্য আকৃতি-অবয়ব হবে মানুষের। অপমান তাদেরকে চারদিক থেকে বেস্টন করে নিবে। ‘বাওলাস’ নামক জাহান্নামের কারাগারের দিকে তাদেরকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। আগুনের অগ্নিশিখা তাদের উপর ছড়িয়ে যাবে। আর তাদের পান করানো হচ্ছে জাহান্নামীদের দেহ নিংড়ানো ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ নামক কদর্য পুঁজ-রক্ত’ (মিশকাত শরীফ)। (৪) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘আল্লাহ তা’আলা (হাদিসে কুদসীতে) বলেন, অহংকার আমার চাদর এবং শ্রেষ্ঠত্ব আমার ইজার। সুতরাং যে এর কোন একটি নিয়ে আমার সাথে টানাটানি করবে আমি তাকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করব’ (মুসলিম)। (৫) হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যে নিজেকে অন্যের চাইতে ভালো মনে করে ও আত্ম-গরিমা করে এবং সুমহান উচ্চ মর্যাদাশীল সত্ত্বাকে (আল্লাহকে) ভুলে যায়। সেই বান্দা সবচেয়ে মন্দ, যে অন্যের প্রতি অত্যাচার করে এবং সীমালঙ্গন করে, আর সর্বোচ্চ শক্তিধরকে (আল্লাহকে) ভুলে যায়। সেই বান্দা সর্বাপেক্ষা মন্দ, যে গাফেল হয়ে পার্থিব কাজে মত্ত হয়ে থাকে, আর করব এবং তাতে বিলীন হওয়ার কথা ভুলে যায়। সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যে উদ্ধত্য প্রকাশ করে এবং সীমালঙ্গন করে আর নিজের শুরু ও শেষকে ভুলে যায়। সেই বান্দাই মন্দ, যে দ্বীন দ্বারা দুনিয়া অর্জন করে। সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যে সন্দেহ সৃষ্টি করে দ্বীনের ব্যাপারে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যাকে লোভ-লালসা পরিচালিত করে। সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যার প্রবৃত্তি তাকে পথভ্রষ্ট করে। আর সেই বান্দাই সবচেয়ে মন্দ, যাকে পার্থিব মোহ লাঞ্চনায় ফেলে (তিরমীজি, বায়হাকী)। (৬) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনÑ‘তিনটি জিনিস মুক্তিদানকারী এবং তিনটি জিনিস ধ্বংস সাধনকারী। মুক্তিদানকারী জিনিসগুলো হলোÑপ্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহকে ভয় করা, সুখ-দুঃখ উভয় অবস্থায় সত্য কথা বলা এবং ধনাঢ্যতা-দারিদ্র্য উভয় অবস্থায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা। আর ধ্বংসসাধনকারী জিনিসগুলো হলোÑপ্রবৃত্তি অনুসারী হওয়া, লোভ-লালসার দাস হওয়া এবং কোনো ব্যক্তি নিজ অহমিকায় লিপ্ত হওয়া। আর এটা হলো সর্বাপেক্ষা জঘন্য’ (বায়হাকী)। (৭) হযরত ওরম (রা.) একদিন মিম্বরে দাড়িয়ে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা বিনয়ী হও। আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছিÑযে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বুলন্দ করে দেন। সে নিজের কাছে ছোট এবং মানুষের কাছে হয় সম্মানী। অন্যদিকে যে ব্যক্তি অহংকার করে আল্লাহ তাকে হেয় করে দেন। সে মানুষের চোখে তুচ্ছ পরিণত হয় এবং নিজের কাছে কেবল সে বড়। পরিশেষে সে মানুষের কাছে কুকুর বা শূকর অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত ও তুচ্ছ পরিণত হয় (বায়হাকী)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাতটি জিনিসের পরিবর্তে অপর সাতটি জিনিসকে প্রাধান্য দেয়া বুদ্ধিমানের কাজÑ(১) দওলতমন্দীর পরিবর্তে গরিবী। (২) ইজ্জতের পরিবর্তে জিল্লত। (৩) অহংকারের পরিবর্তে বিনয়। (৪) উদরপূর্তির পরিবর্তে ক্ষুধা। (৫) আনন্দের পরিবর্তে চিন্তা-ভাবনা। (৬) উচ্চ মর্যাদার পরিবর্তে নি¤œমর্যাদা। (৭) হায়াতের পরিবর্তে মউত। একখানা হাদিসে আছেÑ আটটি বস্তু অপর আটটি বস্তু হতে পূর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারে নাÑ(১) চোখ নজর (দৃষ্টি) হতে। (২) জমিন বৃষ্টি হতে। (৩) নারী পুরুষ হতে। (৪) আলেম ইলিম হতে। (৫) ভিখারী সওয়াল হতে। (৬) লোভী মাল হতে। (৭) সাগর পানি হতে। (৮) আগুন কাঠ হতে (আল-মুনাব্বিহাত)। হাদিস শরীফে আছে, আল্লাহপাক হযরত মুসা ইবনে ইমরান (আ.) এর নিকট তাওরাত কিতাবে ওহী নাজিল করেছিলেন। নিশ্চয়ই পাপের উৎস তিনটি অহংকার, হিংসা ও লোভ। এগুলো থেকে আরো ছয়টি উৎসের উৎপত্তি হয়। কাজেই সব ক’টি মিলে পাপের উৎসের সংখ্যা দাঁড়াল নয়টি। উল্লেখিত তিনটি ব্যতিত বাকী ছয়টি হলোÑপেট ভরা, ঘুম, আরামপ্রিয়তা, মালের মহব্বত, প্রশংসা লাভের খাহেশ, নেতা হবার আগ্রহ।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন, একবার রাসূল (সা.) ইবলিসকে জিজ্ঞেস করলেনÑ আমার উম্মতের মধ্যে তোমার বন্ধু কতোজন? সে বলল, দশ শ্রেণির লোক আমার বন্ধু। (১) জালিম শাসক। (২) অহংকারী ব্যক্তি। (৩) যে ধনী লোক আয়ের উৎস ও ব্যায়ের খাত সম্পর্কে বেপরোয়া থাকে। (৪) যে আলেম জুলুমের কাজে শাসনকে সমর্থন করে। (৫) অসাধু ব্যবসায়ী। (৬) গুদামজাতকারী। (৭) ব্যভিচারী। (৮) সুদখোর। (৯) যে কৃপণ ব্যক্তি ধন সংগ্রহের সময় এর উৎস সম্পর্কে বেপরোয়া থাকে। (১০) যে সর্বদা মদ পান করে (আল-মুনাব্বিহাত)। (১২) হাদিস শরীফে আছেÑ আদম সন্তানের দেহে এমন চারটি উপাদান রয়েছে যেগুলোকে অপর চারটি জিনিস দূর করে। এগুলো হলোÑঅকাল (বুদ্ধি), দ্বীন, হায়া-শরম ও নেক আমল। ক্রোধ বুদ্ধিকে দূর করে। হিংসা দ্বীনকে দূর করে। লোভ শরম দূর করে। গীবত-পরনিন্দা নেক আমলকে দূর করে।
হযরত ওমর (রা.) বলেনÑদশটি জিনিস না থাকলে অপর দশটি জিনিস সুন্দর হয় না। (১) পরহেজগারী ব্যতিত বুদ্ধি সুন্দর হয় না। (২) ইলিম ব্যতিত বুজুর্গী সুন্দর হয় না। (৩) আল্লাহর ভয় ব্যতিত কামিয়াবী সুন্দর হয় না। (৪) ইনসাফ ব্যতিত শাস

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT