ধর্ম ও জীবন

সালাম ও জওয়াব

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৮ ইং ০১:১০:২৬ | সংবাদটি ১৬৫ বার পঠিত

আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয় (সালাম দেওয়া হয়) তখন তোমরা তা অপেক্ষা উত্তমভাবে অভিবাদন কর (সালামের জবাব দাও) অথবা তার অনুরূপ কর। আল্লাহ তায়ালা সব বিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৬)
আল্লাহ তায়ালা সালামদাতার চেয়ে উত্তমভাবে বা তার মত করে সালামের জওয়াব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সা. এর নিকট এসে বললেন, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)। তদুত্তরে তিনি বললেন, ওয়া আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ (তোমার উপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহম বর্ষিত হোক)। তারপর আরেক ব্যক্তি আগমন করল এবং বলল, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ ওয়া রাহমাতুল্লাহ (হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক)। তদুত্তরে তিনি বললেন, ওয়া আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু (তোমার উপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহম ও তাঁহার বরকত বর্ষিত হোক)। অতঃপর আরেক ব্যক্তির আগমন ঘটল এবং সে বলল, আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (হে আল্লাহর রাসুল, আপনার উপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত বর্ষিত হোক)। তিনি বললেন, ওয়ালাইক (তোমার প্রতিও)। শেষোক্ত লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল। আমার পিতা মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হউক। অমুক অমুক এবং আমি আপনার নিকট আগমন করে সালাম করেছি। কিন্তু আমার সালামের জবাব প্রদানে আপনি যে বিষয় উল্লেখ করেছেন, তাদের জবাবে অধিকতর বিষয় উল্লেখ করেছেন। রাসুল সা. বললেন, তুমি তো আমার জন্য কিছুই রেখে দাও নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যখন তোমাদের অভিবাদন করা হয় (সালাম দেওয়া হয়) তখন তোমরা তা অপেক্ষা উত্তমভাবে অভিবাদন কর (সালামের জবাব দাও) অথবা তার অনুরূপ কর।
আলিমগনের সর্বসম্মত অভিমত এই যে, সালাম দেওয়া সুন্নত এবং তার জবাব প্রদান করা ওয়াজিব। সালামের জবাব প্রদান না করলে সে গুনাহগার হবে। কেননা সে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অমান্যকারী।
ইমরান ইবনে হুসাইন রা. বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একটি লোক নবী সা. এর নিকট আগমন করে বলল, আসসালামু আলাইকম। নবী সা. তার সালামের জবাব দিলেন। তারপর লোকটি বসে গেলে তিনি বললেন, দশটি নেকী পেলে। অতঃপর আরো একজন এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। নবী সা. তার সালামের জবাব দিলেন। তারপর লোকটি বসে গেলে তিনি বললেন, বিশটি নেকী পেলে। অতঃপর আরো একজন এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। নবী সা. তার সালামের জবাব দিলেন। তারপর লোকটি বসে গেলে তিনি বললেন, ত্রিশটি নেকী পেলে।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা গড়ে উঠবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের বহুল প্রসার ঘটাও। (মুসলিম, তিরমিযি)
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, আরোহী পায়ে হাঁটা ব্যক্তিকে, পায়ে হাঁটা ব্যক্তি বসা ব্যক্তিকে এবং অল্প সংখ্যক লোক বেশী সংখ্যক লোককে সালাম দেবে। বুখারী মুসলিম।
আবু উমামা সুদাই ইবনে আজলান আল বাহেলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, লোকদের মধ্যে বেশী আল্লাহর নিকটবর্তী সেই ব্যক্তি, যে লোকদেরকে প্রথমে সালাম করে। আবু দাউদ। অপর হাদিসে বলা হয়েছে, হে আল্লাহর রাসুল, দুজনের সাক্ষাৎ কালে কে আগে সালাম দেবে? উত্তরে রাসুল সা. বলেন, যে মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বাধিক নিকটবর্তী হবে। (তিরমিযি)
জাবের রা. বলেন, দুইজন পথচারী একত্র হলে তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দেয় সে অধিক উত্তম। আদাবুল মুফরাদ।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, তোমাদের কোন ব্যক্তি মসলিজে গিয়ে পৌঁছলে সে যেন সালাম দেয়। সে ফিরে যেতেও সালাম দিবে। কেননা, পরের সালাম আগের সালাম থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। (তিরমিযি)
তুফাইল ইবনে ওবাই ইবনে কাব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর নিকট যাতায়াত করতেন এবং তার সাথে বাজারে যেতেন। রাবী বলেন, আমরা বাজারে যাওয়ার পথে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর সাথে সর্বসাধারণ, দোকানদার, ফকির মিসকিন বা অন্য যে কোন লোকের সাক্ষাৎ হতো তিনি তাকে সালাম দিতেন। তুফাইল বলেন, একদিন আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এর নিকট আসলাম। তিনি আমাকে নিয়ে বাজারে যেতে চাইলেন। আমি বললাম আপনি বাজারে গিয়ে কি করবেন? না আপনি কেনাকাটা করেন। না কোন পণ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, না দামদর করেন, না বাজারের কোন মজলিসে বসেন। বরং আমাদের নিয়ে এখানেই বসুন, কিছু আলাপ আলোচনা করি। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. আমাকে বলেন, হে ভুরিওয়ালা আমরা তো বাজারে যাই যাকে সামনে পাই তাকে সালাম দেওয়ার জন্য। আদাবুল মুফরাদ।
ওমর রা. বলেন, আমি এক সফরে আবু বকর রা. এর বাহনের পিছনে সফরসঙ্গী ছিলাম। তিনি যে কোন জনসমষ্টিকে অতিক্রম করা কালে তাদেরকে আসসালামু আলাইকুম বলেন। তারা জবাবে বললো ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আর তিনি আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বললে তারা জবাবে বলে ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আবু বকর রা. বলেন, লোকজন আজ আমাদের চেয়ে অনেক বেশী সওয়াবের অধিকারী হলো। আদাবুল মুফরাদ।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ইয়াহুদীরা তোমাদের কোন ব্যাপারে এতো বেশী ঈর্ষান্বিত নয় যতোটা তারা তোমাদের সালাম ও আমীন বলার ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত। (ইবনে মাজা)
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে কল্যাইময় এক পবিত্র অভিবাদন। সুরা নুর আয়াত-৬১।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমাকে রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, হে বৎস, যখন তুমি তোমার বাড়িতে প্রবেশ করবে, তখন তুমি তোমার পরিবারকে সালাম দিবে। তাহলে তা তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকতময় হবে। (তিরমিযি)
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি কতিপয় শিশুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদেরকে সালাম দিলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ সা. এরূপ করতেন। (রিয়াদুস সালেহীন)
আসমা বিনতে ইয়াজিদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সা. আমাদের একদল মহিলার নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময়, আমাদেরকে সালাম দিলেন। (আবু দাউদ।)
কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ সা. এর শিক্ষা, আসহাবে রাসুল সা. গইের আমল থেকে আমরা সালাম প্রদান ও জবাব দানের নিয়ম, সওয়াব, বরকত সম্পর্কে সুন্দরভাবে জানতে পারি। সালাম ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমানে সালাম দেওয়া ও জবাব দেয়া দুটোতেই দৈন্যদশা বিরাজ করছে। কারণ আমরা আল্লাহমুখী না হয়ে নিজের বড়ত্ব, কর্তৃত্ব, আমিত্ব নিয়ে বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। পরকালকে বেমালুম ভুলে গেছি। সালাম উত্তম দোয়া, শান্তির নিশ্চয়তা বিধান করলেও সালামের সাথে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক কতটুকু তাও একটু ঝালাই করে নেওয়া প্রয়োজন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT