ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৭-২০১৮ ইং ০১:১১:১৪ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
সূরা : বাক্বারাহ
কাফিরের সংজ্ঞা :
‘কাফির’ এর শাব্দিক অর্থ গোপন করা। না-শুকরি বা কৃতঘœতাকেও কুফর বলা হয়। কেননা, এতে এহসানকারীর এহসান গোপন করা হয়। শরীয়তের পরিভাষায় কুফর বলতে বোঝায়, যে সমস্ত বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা ফরয, এর যে কোনোটিকে অস্বীকার করা।
যথাÑ ঈমানের সারকথা হচ্ছে যে, রসুল (সা.) আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক প্রাপ্ত ওহীর মাধ্যমে উম্মতকে যে শিক্ষাদান করেছেন এবং যেগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে সেগুলোকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করা এবং সত্য বলে জানা। কোনো ব্যক্তি যদি এ শিক্ষামালার কোনো একটিকে হক বলে না মানে, তাহলে তাকে কাফের বলা যেতে পারে।
‘এনযার’ শব্দের অর্থ : ‘এনযার শব্দের অর্থ হচ্ছে এমন সংবাদ দেয়া যাতে ভয়ের সঞ্চার হয়। আর ‘ইবশার’ এমন সংবাদকে বলা হয়, যা শুনে আনন্দ লাভ হয়। সাধারণ অর্থে এনযার বলতে ভয় প্রদর্শন করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শুধু ভয় প্রদর্শনকে ‘এনযার’ বলা হয় না, বরং শব্দটি দ্বারা এমন ভয় প্রদর্শন বোঝায়, যা দয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। যেভাবে মা সন্তানকে আগুন, সাপ, বিচ্ছু এবং হিং¯্র জীবজন্তু হতে ভয় দেখিয়ে থাকেন। ‘নাযির’ যা ভয় প্রদর্শনকারী ঐ সমস্ত ব্যক্তি যারা অনুগ্রহ করে মানবজাতিকে যথার্থ ভয়ের খবর জানিয়ে দিয়েছেন। এজন্যই নবী রসুলগণকে খাসভাবে নাযীর বলা হয়। কেননা, তাঁরা দয়া ও সতর্কতার ভিত্তিতে অবশ্যম্ভাবী বিপদ হতে ভয় প্রদর্শন করার জন্যই প্রেরিত হয়েছেন। নবী গণের জন্য ‘নাযীর’ শব্দ ব্যবহার করে একদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, তাঁরা তাবলীগের দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের কর্তব্য হচ্ছেÑসাধারণ মানুষের প্রতি যথার্থ মমতা ও সমবেদনা সহকারে কথা বলা।
এ আয়াতে রসুলুল্লাহ (সা.) কে সান্ত¦না দেয়ার জন্য বলা হয়েছে যে, এ সমস্ত জেদী-অহংকারী লোক, যারা সত্যকে জেনে-শুনেও কুফরী ও অস্বীকৃতির উপর দৃঢ় অনড় হয়ে আছে, অথবা অহংকারের বশবতী হয়ে কোনো সত্য কথা শুনতে কিংবা সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ দেখতেও প্রস্তুত নয়, তাদের পথে এনে ঈমানের আলোকে আলোকিত করার উদ্দেশে রসুলুল্লাহ (সা.) যে বিরামহীন চেষ্টা করছেন তা ফলপ্রসূ হওয়ার নয়। এদের ব্যাপারে চেষ্টা করা না করা একই কথা।
পাপের শাস্তি পার্থিব সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত হওয়া : এ দু’টি আয়াতের দ্বারা বোঝা গেল কুফর ও অন্যান্য সব পাপের আসল শাস্তি তো পরকালে হবেই তবে কোন কোন পাপের আংশিক শাস্তি দুনিয়াতেও হয়ে থাকে। দুনিয়ার এ শান্তি ক্ষেত্রবিশেষে নিজের অবস্থা সংশোধন করার সামর্থ্যকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। শুভবুদ্ধি লোপ পায়।
মানুষ আখেরাতের হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে গাফেল হয়ে গোমরাহীর পথে এমন দ্রুততার সাথে এগুতে থাকে; যাতে অন্যায়ের অনুভূতি পর্যন্ত তাদের অন্তর থেকে দূরে চলে যায়। এ সম্পর্কে কোন কোন বুযুর্গ মন্তব্য করেছেন যে, পাপের শাস্তি এরূপও হয়ে থাকে যে, একটি পাপ অপর একটি পাপকে আকর্ষণ করে, অনুরূপভাবে একটি নেকীর বদলায় অপর একটি নেকী আকৃষ্ট হয়।
হাদিসে আছে, মানুষ যখন কোন একটি গোনাহর কাজ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সাদা কাপড়ে হঠাৎ কালো দাগ লাগার পর যেমন তা খারাপ লাগে, তেমনি প্রথমাবস্থায় অন্তরে পাপের দাগও অস্বস্তির সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় যদি সে ব্যক্তি তওবা না করে, আরো পাপ করতে থাকে, তবে পর পর দাগ পড়তে পড়তে অন্তঃকরণ দাগে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার অন্তর থেকে ভালো-মন্দের পার্থক্য সম্পর্কিত অনুভূতি পর্যন্ত লুপ্ত হয়ে যায়।
উপদেশ দান করা সর্বাবস্থায় উপকারী : এ আয়াতে সনাতন কাফেরদের প্রতি রসুলুল্লাহ (সা.) এর নসীহত করা না করা সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ সাথে ‘আলাইহিম’ এর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ সমতা কাফেরদের জন্য, রসুলের জন্য নয়। তবে তাদেরকে জানানোর এবং সংশোধন করার চেষ্টা করার সওয়াব অবশ্যই পাওয়া যাবে। তাই সমগ্র কুরআনে কোন আয়াতেই এসব লোককে ঈমান ও ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়া নিষেধ করা হয়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয়ার কাজে নিয়োজিত, তা ফলপ্রসূ হোক বা না হোক, সে এ কাজের সওয়াব পাবেই। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT