পাঁচ মিশালী

আমার পাঠশালা

অধ্যাপক মো. আহবাব খান প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৭-২০১৮ ইং ০০:৫৮:৩১ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

জগন্নাথপুর উপজেলার আশারকান্দি ইউনিয়নের জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম আমি। এই বিদ্যালয়টি গ্রামের উত্তর দিকে মুখ দিয়ে দু’পাড়ার মাঝখানে অবস্থিত। দুই পাড়ার মধ্যে অবস্থিত থাকায় উভয় পাড়ার ছাত্র-ছাত্রী অতি সহজে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে। এই স্কুলটি প্রথম অবস্থায় জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘খান বাড়ি’তে ছিলো। স্কুলের নিজস্ব জায়গা ও ঘর না থাকা পর্যন্ত খান বাড়িতে থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা করতো। ঐ সময় খান বাড়ির বাংলা ঘরে স্কুল বসতো। পরে জামালপুর ও রৌডরের বিদ্যানুরাগী সম্মানিত গ্রামবাসি স্কুলের জন্য নিজস্ব জায়গা ও স্কুল ঘর নির্মাণ করে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তর করেন।
আমি ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। গাছ-গাছালি পরিবেষ্টিত এই স্কুলে হেমন্তে ছাত্র-ছাত্রীরা দলে দলে স্কুলে উপস্থিত হতো। এ দৃশ্য এতোই সুখকর ও সুন্দর ছিলো যা না দেখলে অনুভব করা যাবে না। আমি যখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি ঐ সময় স্কুলে একজন স্যার ছিলেন। স্যারের হাতে সব সময় জালিবেত থাকতো। চতুর্থ শ্রেণি অথবা তৃতীয় শ্রেণির মেধাবী ও চৌকস কোনো ছাত্রকে দিয়ে গণনা ও নামতা শেখাতেন। আমার এমনও মনে আছে গণনা এভাবে শিখানো হতো, বড় ভাই বলতেন ১ একে ১ আমরা সমস্বরে জোরে জোরে বলতাম ১ একে ১, ২ একে ২, ৩ একে ৩। এভাবে নয় দশ আট আটানব্বই। আমরা বলতাম নয় দশ আট আটানব্বই জোরে জোরে ও সমস্বরে ১০ দশে একশ’। এভাবে গণনা করতাম। এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, নামতা পড়তাম ঠিক একইভাবে। গণনা ও নমতা পড়তাম বিদ্যালয়ের সামনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একেক দিন একেক বড় ভাই আমাদেরকে গণনা ও নামতা শিক্ষা দিতেন আর আমাদের শিক্ষক মহোদয় দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পড়া নিতেন ও পড়া বুঝিয়ে দিতেন। আমরা মাঝে মাঝে চেঁচামেচি করলে, শব্দ করলে হাতের বেত দিয়ে টেবিলের উপর জোরে শব্দ করতেন, আমরা স্কুলের সকল ছাত্র-ছাত্রীরা নিরব হয়ে যেতাম মনে করতাম স্যার বেত দিয়ে আমাদেরকে মারবেন। কিন্তু কোনো দিনই স্যার আমাদের উপর বেত তুলেননি।
প্রথম শ্রেণির একটি বিষয় ছিলো আদর্শলিপি। আদর্শলিপি বিষয় আমাদের স্যার পড়াতেন। আদর্শলিপিতে অ ও কিছু সহজ সরল শব্দ ও বানান থাকতো। শব্দ ও শব্দের বানান আগের দিন শিক্ষক মহোদয় বানান উচ্চারণ করে বলে দিতেন এবং শব্দ, বানান, উচ্চারণ পরের দিন শিখে মুখস্ত করে আসতে বলে দিতেন। স্যারের উচ্চারণ ও বানান আজো কানে ভাসে। মনে হয় এই তো সে দিন স্যার পড়া শিখি আসার জন্য দিয়েছেন এবং বুঝিয়ে দিয়েছেন কিভাবে বাড়িতে পড়বো। অথচ ৫০ বছর আগের কথা, ঝলঝল করে মনের মনিকোঠায় এখনও ভেসে ওঠে।
ঐ সময়ে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আশারকান্দির ফুফাজি মো. আব্দুর রব চৌধুরী। পরে খলকু ভাই এবং শেষে শাহারপাড়ার সৈয়দ শফিক স্যার। একদিন স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, সবাই যার যার বাড়িতে দল বেঁধে যাচ্ছি। কিন্তু আমি দলছুট হয়ে পিয়ারাদের বাড়ির কাছে কাঁদতে লাগলাম। তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। বয়স ৫ কিংবা ৬ হবে। অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখে পিয়ারার মা বের হলেন আমাকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন তোমার কোন বাড়ি? আমি সঠিক ঠিকানা বলতে না পারায় ভদ্র মহিলা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। আমি আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগলাম। ইতোমধ্যে স্কুলের পাশের বাড়ির সমিততা বোয়াই এলেন তার মাথায় পানের উড়া। উল্লেখ্য যে, সমিততা বোয়াই ফেরি করে পান বিক্রি করতেন, তার আরেকটি পরিচয় তিনি বুধরাইলের কন্যা পীর সাহেবের কাছে মুরিদ। বেশ কয়েকবার আমি আমার মায়ের সাথে সমিততা বোয়াইয়ের নেতৃত্বে হুজুরের কাছে গেছি। সমিততা বোয়াইকে দেখে সাহস বেড়ে যায়। আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগলাম। সমিততা বোয়াই বললেন এরে ছিনচনানি এ খা’র বাড়ির লন্ডনী মামুর ঘরর ভাই, তার নাম হরুন। মামী কিবা চিন্তা কররা। তাড়াতাড়ি বাড়িত লইয়া যাই।
অন্যদিকে আমি বাড়িতে না যাওয়ায় মা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। আমাকে কোলে নিয়ে সমিততা বোয়াই আর তার সঙ্গে পিয়ারার মা। আমাকে দেখে মা খুশি হয়ে কোলে তুলে নিলেন। পিয়ারার মা আমার হারানোর আদি ইত্য ঘটনা মায়ের কাছে বর্ণনা করলেন। মা প্রায়ই আমার হারানোর কথা অমাাকে বলতেন। যার জন্য আজো এই ঘটনার কথা মনে পড়ে। আমার গ্রামের স্কুলে সর্বশেষ গিয়েছিলাম একটি অনুষ্ঠানে। সেটি ছিলো ‘মদরিছ আলী ট্রাস্ট’ এর বৃত্তি বিতরণী অনুষ্ঠান। ঐ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। শিক্ষা কর্মকর্তা না আসায় এবং ভাগ্যক্রমে আমি ঐদিন বাড়িতে থাকায় উপস্থিত সবাই আমাকে প্রধান অতিথি করার জন্য অনুরোধ করেন। আমিও রাজী হই এবং তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি হয়ে অনুষ্ঠানে যোগদান করি। সেখানে গিয়ে দেখলাম আশারকান্দি ইউনিয়নের সব পাঠশালা স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তাদের কৃতি ছাত্র-ছাত্রী ও আমাদের মুরুব্বি, ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকবৃন্দ, বিদ্যানুরাগী সুধীজন। আমার খুব ভালো লাগলো আমার পাঠশালা স্কুলে পুরো ইউনিয়নের বিদ্যানুরাগী সদস্য ও মানুষ গড়ার কারিগর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ। বার বার মাইকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করেছেন ঘোষক। আমি ঘোষণা শুনে পুলকিত হই। কতো অনুষ্ঠান কতো জনসভায় নিজের নাম প্রধান অতিথি হিসেবে শুনেছি কিন্তু এভাবে তো পুলকিত হইনি। মনে হয় নিজের পাঠশালায় অনুষ্ঠান তাই বার বার মনে দোলা লাগে। অনুষ্ঠান শুরু হয়, সভাপতিত্ব করেন আলহাজ মো. মদরিছ মিয়া। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অনেক কথাই বললাম, বিশেষ করে জামালপুরের পাঠশালার সুনামের কথা বললাম। সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এ আশাবাদ ব্যক্ত করলাম। আলহাজ মদরিছ সাহেবের বৃত্তির প্রশংসা করলাম। আরও বললাম হাজী সাহেবের বৃত্তি পেয়ে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রী খুশি হবে যারা বৃত্তি পায়নি তারা ভবিষ্যতে আরো ভালোভাবে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। সার্বিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অত্র স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. নূর উদ্দিন সাহেব। সভায় সভাপতি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় পর্বে প্রীতিভোজ। আমি প্রীতিভোজে অংশগ্রহণ করতে চাইনি কারণ আমার সিলেট আসার তাড়া ছিলো। তারপরও জামাই মো. তোতা মিয়া জোর করে মদরিছ ভাইয়ের প্রীতিভোজে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করলেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT