সাহিত্য

প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই

মো. আলমগীর হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৭-২০১৮ ইং ০১:৩৮:৩২ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

প্রাথমিক শিক্ষার সাথে তিন বছর জড়িত ছিলাম বলেই প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশী কিন্ডারগার্টেন বইটি দেখে পড়ার লোভ সামলাতে পারিনি। একজন কলেজশিক্ষক যে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে এরকম বিশ্লেষণধর্মী, গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন সেজন্য লেখক ধন্যবাদ পেতেই পারেন। বইটি পড়ে পাঠ-প্রতিক্রিয়া দেবার ইচ্ছা পোষণ করলাম। সেই হৃদয়ের টান থেকেই লেখা।
প্রাককথনেই কিন্ডারগার্টেন স্কুলের চমৎকার সংজ্ঞার্থ দিয়েছেন লেখক। বাংলাদেশি শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেনও যে শিক্ষায় অবদান রাখছে তা তিনি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এবং এও উল্লেখ করেছেন, সব কিন্ডারগার্টেন হয়ত মানসম্মত পাঠদানে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির আলোচনায় তিনি লিখেছেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ ৫ বছর বয়স থেকে ১ বছর মেয়াদি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। যদিও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেনে পূর্ব থেকেই এ ধরনের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। যেখানে শিশুদেরকে খেলা ও আনন্দের মাধ্যমে বর্ণমালা, সংখ্যা, ছড়া প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয়।’
বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সময়ে কেমন ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা- তা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন অধ্যাপক হেনা সিদ্দিকী। প্রাচীন যুগ, মুসলিম শাসনামল, ইংরেজ শাসনামল, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ আমলে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র তিনি আমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন সাবলীলভাবে। প্রাচীন যুগে গুরুকেন্দ্রিক শিক্ষা, বৌদ্ধশিক্ষায় মঠকেন্দ্রিক শিক্ষার কথা জানতে পারি। এবং প্রাথমিক স্তরের মূল লক্ষ্যই ছিল ‘সিদ্ধি’ লাভ করা। মুসলিম শাসনামলের আলোচনায় ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির নদীয়া জয়ের প্রসঙ্গ এসেছে। এই সময়ে মক্তবকেন্দ্রিক শিক্ষা চালু হয়। সেই সময়ে হিন্দু ছেলেমেয়েদের জন্য পাঠশালায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
ইংরেজ শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র উপস্থাপন করেছেন তিনি এভাবে, ‘---শেখানোর মাধ্যম ইংরেজি হলেও তারাই প্রথম দেশিয় ভাষার মাধ্যমে উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি ও পরিচালনা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন যার প্রভাব এখনও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়।’ এ পর্বে তিনি মিশনারিদের আগমন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, লর্ড হার্ডিঞ্জের ভার্নাকুল স্কুল, উইলিয়াম হান্টারের শিক্ষা কমিশন, লর্ড কার্জনের পুনরায় ভার্নাকুলার স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছেন। এবং ১৯৪৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষার নি¤œ ও উচ্চ এই দুটি স্তরের পরিবর্তে চার বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষাকাল নির্ধারণ করা হয় যা ইংরেজ শাসনের শেষ কাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল তা তিনি উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তান আমল, বাংলাদেশ আমল এবং বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র উপস্থাপন করেছেন তিনি। বিশ্লেষণধর্মী এ আলোচনা তথ্য-উপাত্তের জন্য খুবই জরুরি। অধ্যাপক সিদ্দিকী কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, জার্মান প্রসঙ্গ, মনটেসরি শিক্ষা এবং ইতালিয়ান চিকিৎসক ও শিক্ষক মারিয়া মনটেসরির কথাও নিয়ে আসছেন তাঁর আলোচনায়। বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রকৃতি এবং অভিভাবকদের বৈশিষ্ট্যও উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক হেনা সিদ্দিকী ব্যক্তিজীবনে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন। আমাদের দেশের অভিভাবকেরা কোন জায়গায় ভুল করেন, কী তাদের বৈশিষ্ট্য তা স্পষ্ট করেছেন পাঠকদের কাছে। আবার অভিভাবকদের উপর তিনি শুধু দোষ চাপিয়েই দেন নি, কিন্ডাগার্টেনগুলোর সমস্যাও বর্ণনা করেছেন নিখুঁতভাবে। এখন যে অনেকেই একমাত্র ব্যবসায়িক ফায়দায় এরকম স্কুল চালাচ্ছেন এবং শিক্ষা যে পণ্য হয়ে গিয়েছে তা বলতে তিনি ভুল করেন নি।
‘হিলসিটির ডায়েরি থেকে’ অংশে তিনি এ স্কুলের কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। অটিজম যে কোনো রোগ নয় এবং অটিজম শিশুদের প্রতি আলাদা যতœ নেওয়া এবং এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেছেন। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এবং প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাঁর এ বইয়ে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ কৌশল, পাঠদান কৌশল ও বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন। লেখক প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশী কিন্ডারগার্টেন বইয়ে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে প্রাথমিক শিক্ষার বিচার-বিশ্লেষণ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর তারতম্য এবং কোন কোন জায়গায় আমাদের আরও উন্নত করতে পারলে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপ্লব ঘটবে সে বিষয়েও পাঠকদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যাঁরা কাজ করবেন, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে জানতে চাইবেন তাঁদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এ বই। গত একুশে বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে চৈতন্য প্রকাশন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT