সাহিত্য

বুকে মেয়ের কবর

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০৭-২০১৮ ইং ০১:১৭:৫৯ | সংবাদটি ১২৮ বার পঠিত


ছায়রা বানুকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হল। সন্তান সম্ভবা। ৪র্থ সন্তানের জন্ম হবে। মুমূর্ষু অবস্থা। শবাক চৌধুরী ব্যতিব্যস্ত। পকেটে টাকা নেই। বাকী তিন সন্তান বাসায়। সাহায্যের হাত বাড়ায় এমনও কেউ নেই। ক্লিনিকে নেয়ার সামর্থ নেই। গরিবের আল্লাহ সহায়। ভাগ্যিস সময়মত হাসপাতালে নিয়ে আসতে পেরেছেন। এখন সময়ের অপেক্ষা। ডাক্তার, নার্স সবাই প্রস্তুত। শবাক চৌধুরী গাইনী ওয়ার্ডের বাইরে অপেক্ষমান। কখন কী ঘটে। মনে মনে আল্লাহকে ডাকেন। আল্লাহর সাহায্য বড় সাহায্য। আল্লাহ চাইলে সব কিছুই সহজ হয়ে যায়।
হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল এক নার্স। হুজুর এই ইনজেকশনটি নিয়ে আসুন। হাসপাতালে এখন এটাই নিয়ম। প্যারাসিটামল, এন্টাসিড আর দু’একটা স্যালাইন ছাড়া বাকী সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি ওষুধ। শবাক চৌধুরী ভাবেন অবাক করা কান্ড। সরকার থেকে বরাদ্দকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এগুলো যায় কোথায়? একটা ইনজেকশন কিনতে পাঁচতলা থেকে নেমে যেতে হবে সেই ফার্মেসি পাড়ায়? হাসপাতালের এরিয়াও কম নয়। নিতান্ত আধা ঘন্টাতো লেগেই যাবে। এর মধ্যে যদি কিছু একটা হয়ে যায়। নার্স আবার বলে হুজুর কি হল? সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শবাক চৌধুরী বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই-নিশ্চয়ই। আ---মি নিয়ে আসছি। শবাক চৌধুরী জেনারেল শিক্ষিত হলেও দাঁড়ি রেখেছেন লম্বা করে আর মাথায় সব সময় একটা গোল টুপি পরেন। পরনে পেন্ট আর ফুল শার্ট। হুজুর-হুজুরই মনে হয়। তাই নার্স-এর কমেন্ট যথার্থই মনে হল তার কাছে।
ইনজেকশন নিয়ে ফিরে আসার পূর্বেই ছায়রা বানু সন্তান প্রসব করেছেন। শবাক চৌধুরীর হাতের প্যাক ইনজেকশনটি নার্সের দিকে এগিয়ে দেয়ার আগেই নার্স বলল-এটা নিজের কাছে রাখুন। আপনার এক মেয়ে হয়েছে। অবস্থা বেশি ভাল নয়। একটা স্টীলের থালার মধ্যে নার্স অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখান এই আপনার মেয়ে। শবাক চৌধুরী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। চেহারা স্বাস্থ্য বেশ ভালই, তবে স্টীলের থালায় রাখা কেন এটাই মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। আর শবাক চৌধুরী চুপ করে থাকার পাত্র নয়। যাহাই মাথায় আসে চেপে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। নার্সকে তড়িৎ চার্জ- আমার মেয়ে থালায় কেন হ্যা? আর কিছুতে রাখা যায় না? ওর ঠান্ডা লেগে যাবে তো। সর্বনাশ হয়ে যাবে, নিউমোনিয়াও হতে পারে। নার্স ওকে এখান থেকে সরান বলে এমন এক ধমক দিলেন শবাক চৌধুরী নার্স তাতে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে রইল। তারপর ততোধিক ধমকের সুরে সে বলল চুপ করুন। ভাল মন্দ আমরা বুঝব। আপনি এর কী জানেন হ্যা? দ্বিতীয়বার এ রকম করলে রোগী সহ আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এখান থেকে বের করে দিব। অজানা আশংকায় শবাক চৌধুরী চুপ হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন একটা নার্সের এত শক্তি? তাইতো দেখি ইচ্ছে মত ওরা নাচে। বিদেশে হসপিটালে চাকরি কালীন সেখানকার নার্সের রূপ আর দেশের হাসপাতালের নার্সের রূপ দেখে অবাক হন শবাক চৌধুরী। দেশ আর বিদেশে কত ফারাক! বিদেশে হাসপাতালের নার্সগুলো কত অমায়িক-মাটির মত। কত নরম স্বভাব-কত ন¤্র ব্যবহার। কিছু জিজ্ঞেস করলে বিনয়ের সাথে উত্তর দেয়। বিপদে শান্তনা দেয় আর আমাদের এরা----- আর ভাবতে পারেন না শবাক চৌধুরী।
দিলটা খুব নরম শবাক চৌধুরীর। কারও সাথে ঝগড়া ঝাটি হলে কিছুক্ষণ পরে আর মনে থাকে না। আবারও ওদের সাথে মিশেন গল্প করেন। তাই একটু পর স্বাভাবিক হয়ে নার্সকে বললেন-আমার মেয়েটার প্রাথমিক নাম রেখেছি সামিয়া। ঐ নামে আপনি প্রেসক্রিপশন লিখান। গাইনী বিভাগের বিভাগীয় প্রধান একবার দেখে গেলেন মা ও মেয়েকে। সদ্য ভূমিষ্ট মেয়েটির জ্বর জ্বর ভাব। তাই ডাক্তার নার্সকে কী যেন বললেন আর ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেলেন। নার্স একটু পর শবাক চৌধুরীকে বলল এই ইনজেকশন গুলো নিয়ে আসুন বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই প্রস্থান করল। শবাক চৌধুরী নার্সের যাত্রার ধরন দেখে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু নার্সের দ্রুতগতির কারণে সেটা বলতে পারলেন না। মনে মনে শক্ত গালি দিয়ে ফার্মেসির দিকে পা বাড়ালেন। কিছুক্ষণ পর ইনজেকশন নিয়ে হাজির হলে নার্স ছো মেরে তার কাছ থেকে এগুলো নিয়ে ইনজেকশন পুশ করার প্রস্তুতি নিলে শবাক চৌধুরী আর নির্বাক থাকতে পারলেন না। যেই মাত্র ইনজেকশনের জন্য সিরিঞ্জ নিয়ে মেয়েটির দিকে এগিয়েছে অমনি প্রশ্ন করে বসলেন তুমি কী এই ছোট্ট মেয়েকে ইনজেকশন দিবে? নার্স বলল হ্যাঁ, দিতে হবে ডাক্তার বলেছে।
একটু থেমে আবারও শবাক চৌধুরী প্রশ্ন করেন-এতটুকুন মেয়ে ইনজেকশন সহ্য করতে পারবে? তার কেমন যেন মনে হতে লাগল এই শেষ করে ফেলছে আমার মেয়েকে। জীবনের জন্য পঙ্গু করে ফেলছে। ভুল চিকিৎসায় মানুষের কত কিছু হয়। শবাক চৌধুরী মুখ দেখে মনে হল তার মনের গহীনে কে যেন হাতুড়ি বাটাল দিয়ে খুদাই করছে আর উনি সহ্য করে চলেছেন। ইনজেকশনের সুচ পুশ করার সাথে সাথে সদ্য ভূমিষ্ট শিশুটি চিৎকার দিতে শুরু করল আর উয়া উয়া বলে যেন শবাক চৌধুরীকে কাছে ডাকতে লাগল। এদিকে নার্স ইনজেকশন পুশ করছে আর মেয়ের বাবা তার নরম দিলের কোথাও যেন ব্যথা অনুভব করছেন-ঐ মুহূর্তে যারা শবাক চৌধুরীর মুখ দেখেছে বিষয়টি তারাই কেবল অনুভব করতে পারবে।
চারদিন পর ছাড়া পেলেন ছায়রা বানু ও তার শিশু। যদিও মা-মেয়ে অত্যন্ত দুর্বল তথাপি হাসপাতাল ছাড়তেই হল। বাসায় অবুঝ শিশু তিনটি। এদের খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে না বললেই চলে। শবাক চৌধুরী ডাল আর আলু ভর্তা করে আর ভাত রেঁধে রেখে হাসপাতালে চলে যান ওদের কাছে। ওরা ইচ্ছেমত খায় আর ঘুমায়। এই চারদিনে বাসায় যে অবস্থা হয়েছে যেন ময়লা ফেলার বাগাড়। বিছানা-বালিশ, বাসন-কোশন, চেয়ার-টেবিল কোন কিছুরই ঠিকানা নেই। সব কিছু এলোমেলো। বড় ছেলে বশির, মেঝো ছেলে নাসির, আর ছোট মেয়ে ফারিয়া। ওদের বয়স যথাক্রমে ৮, ৬ ও ২ বছর। কেউই এখনও সংসার কী জিনিস বুঝেনি। এই বিপদের দিনে শবাক চৌধুরীর কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্য করতে। কারণ পূর্বেই পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন রয়েছে। পরিবারের বড় ছেলে শবাক চৌধুরী নিজের ইচ্ছামত বিয়ে করে আলাদা থাকেন বলে কেউই তার খুঁজ খবর নেয় না। উনিও এসবের ধার ধারেন না। আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন-আল্লাহই রিযিক দিবেন। আর ধন সম্পদের প্রতিও তার কোন লোভ নেই। কোন রকম খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারলেই হল। আজ এ দুঃসময়ে তিনি টাকার অভাব বুঝেন। টাকা যে কত মূল্যবান তা তিনি হাড়ে হাড়ে অনুভব করছেন, কিন্তু মুখ ফোটে বলার মুখ নেই। পাছে পরিবারের সবাই শুনে হাসবে। আর ভাববে, এখন মজা বুঝ? পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মজা। শবাক চৌধুরী ভাঙবে তবু মচকাবে না। তার আয় বলতে একটা দোকানে সেলসম্যানের চাকরি। ওদিয়েই কোন রকম সংসার চলে। ইতোমধ্যে বেশ টাকা ঋণ হয়েছে। ওটাই বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দিন যায়, ছোট্ট সামিয়া বড় হয়। কিন্তু অসুখ সারেনা। দিনের পর দিন শিশু বিশেষজ্ঞ, কবিরাজ, তাবিজ-কবজ, ঝাড় ফুক দিয়েই যাচ্ছেন। ওর জ্বর সারানো যায় না। শবাক চৌধুরীর মনে একটাই বদ্ধমূল ধারণা জন্মের পর মেয়েটাকে এভাবে স্টীলের থালায় উপুড় করে রাখা ঠিক হয়নি। এখান থেকে মেয়েটির অসুখের সূত্রপাত। কত ডাক্তার, কত কবিরাজ দেখানো হলে জ্বরতো কেউ সারাতে পারে না। কেন কী কারণে জ্বর হয় কেউ কোন উত্তর দিতে পারে না। কেউ বলে মাথায় সমস্যা, কেউ বলে কিডনি সমস্যা, কেউ বলে লান্সে সমস্যা। ওষুধ দেয়, পরীক্ষা দেয়, কিন্তু জ্বর সারে না। মাঝে মধ্যে একটু থামে আবার শুরু হয়। বাবা দিনে ডিউটি করে আর রাতে মেয়েটির পাশে থাকে। চার বছর হয়ে গেল মেয়ের। কোন কথা বলে না। শুধু বলে আব্বা, আম্মা উঃ আঃ। সে হাটতেও পারে না। কোন রকম বালিশে হেলান দিয়ে বসতে পারে কিন্তু নড়তে চড়তে পারে না। এ নিয়ে বাবার চিন্তার শেষ নেই। রাত যত গভীর হউক, উনি যতই ক্লান্ত হউন, আববা ডাক শুনামাত্রই ধড়মড় করে উঠে বসেন। মেয়ের কী কিছু দরকার, পেশাব, পায়খানা, খানা পিনা সবকিছুতে সে আব্বুকে ডাকে। উনিও বছরকা বছর ধরে জনম দুঃখী মেয়ের নিত্য সঙ্গী।
শবাক চৌধুরী মনে মনে ভাবেন হায় আল্লাহ একি তোমার লীলা-খেলা। মেয়েটাকে জন্ম দিয়েছ যখন তখন ওকে জনম দুঃখী করে রেখো না। ওকে ভাল করে দাও খোদা। বলে মনের অজান্তেই চোখে জল ঝরে। ছায়রা বানু দু’হাত দিয়ে স্বামীর মুখ মুছে দেন। তিনি বুঝেন তার স্বামীর এই অবুঝ অবলা শিশুর প্রতি কত ভালোবাসা। কেউ যদি বলতঃ শবাক চৌধুরী আমি তোমাকে অপারেশন করে তোমার লিভার নিয়ে তোমার মেয়েকে ভাল করে তুলি- সে বোধ হয় না বলত না। এতটুকু মেয়ের জন্য তার জানটাও নির্দ্ধিধায় দিয়ে দিতে পারে। মেয়ের প্রতি এমন ভালোবাসা বিরল। তাও আবার প্রতিবন্ধি মেয়ে। ঠিকমত হাঁটতে পারে না, কথাও বলতে পারে না। রাতে মেয়েটি মোটেও ঘুমাত না তবে দিনে একটু আধটু ঘুমাত। ডাক্তারের পরামর্শে ঘুমের ট্যাবলেট বা ইনজেকশন ব্যবহার করতেন না শবাক চৌধুরী। যদি মাত্রা বেশি হয় আর যদি তার মেয়ে আর না জাগে তাহলে এ শোক তিনি সইবেন কী করে? জন্মের পর থেকেই যে মেয়েটি অসুখ ছাড়া একটি দিন অতিক্রম করেনি তার চেয়ে এমন দুঃখী আর কে হতে পারে। শবাক চৌধুরীর বদ্ধমূল ধারণা ডাক্তাররা তার মেয়েকে ভাল চিকিৎসা করতে পারেনি। তার মেয়ে ভুল চিকিৎসার শিকার। পরবর্তী সময়ে যত ডাক্তার দেখিয়েছেন প্রায় প্রতিটি বেলায়ই তার সন্দেহ ডাক্তার ভুল করল না তো? ঠিকমত ওষুধ লিখছে তো? কোন ভুল চিকিৎসা করেনি তো?
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। সামিয়ার ভাল হওয়ার কোন লক্ষণ নেই। এদিকে রাত জাগতে জাগতে বাবার মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। হঠাৎ রেগে যাওয়া, ভাল মন্দ না ভেবে কোন কাজ করা ইত্যাদি তার নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ মেয়ের বয়স এগার বছর। দাঁড়ানোর কোন লক্ষণই নেই। শবাক চৌধুরী শোয়া অবস্থায়ই ওকে দেখছেন। দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। ডাক্তার কবিরাজ দেখাতে দেখাতে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তথাপি রোগ ভাল হল না। এই এগার বছর ধরে শবাক চৌধুরী কোথাও গিয়ে এক রাত থাকেননি। পাছে মেয়ের কষ্ট হয়। কে তাকে দেখবে। মা তো অন্য বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত আর বিছানায় পড়লে ওকে বয়ে নিয়ে গেলেও বলতে পারবে না। এমনি মরার ঘুম। মেয়ের খানা পিনা কোন কিছুর দরকার পড়লে কে দেবে? পাছে যদি খেতে না পেয়ে অথবা পিপাসা পেলে পানি না খেয়ে মারা যায় এটা সে সইবে কেমন করে! তাই শবাক চৌধুরী যেখানেই যান না কেন, রাতে অবশ্যই বাড়ি ফেরেন।
একদিন রাত তিনটা! সামিয়া ডাকল আব্বু। আব্বু...। শবাক চৌধুরী জেগে ওঠে বললেন কী হয়েছেরে মা। তুমি এমন করছ কেন? তুমি কী খাবে- আপেল, আঙ্গুর, জাম্বুরা, চকলেট? সে মাথা নাড়ল, কোন কিছুই চাই না। হাত দিয়ে কাছে ডাকল। বাবা আরও ঘনিষ্ঠ হলে মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। অঝোর ধারায় মেয়ের চোখ দিয়ে টলটল করে পানি পড়ছে। শবাক চৌধুরীও নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কান্না জড়িত কন্ঠে ডাকলেন সামিয়া কি হয়েছে মা! আমাকে বল। সামিয়া কোন কথা বলল না। নিরবে হাত দুখানা আকাশের দিকে দেখাল। বাবা যেন তার জন্য দোয়া করে। হঠাৎ করে হাত দুখানা নেমে এল নিচে। তার চোখ দুটো অসম্ভব বড় হয়ে উঠল। শবাক চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে ছায়রা বানুকে ডাকলেন। উনি তখনও গভীর ঘুমে। শবাক চৌধুরী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন খুব কষ্ট হচ্ছে রে মা! সে কোন সাড়া দিল না। তিনি উচ্চ স্বরে কলেমা পড়তে লাগলেন আর তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। সামিয়া চলে গেল পর পারে।
শবাক চৌধুরী নির্বাক বসে থাকলেন। সকাল হলে পাড়া পড়শি এল। সবাই বুঝাল, দেখ-আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন, যে ক’দিন ওর হায়াত ছিল ও বেঁচে ছিল। আর অন্য দিকে তো ভালই হল তোমাদেরও কষ্ট তারও ছিল কত কষ্ট। সবাই কষ্ট থেকে বাঁচলেন। হঠাৎ শবাক চৌধুরী রেগে গিয়ে বলল- থামুন আপনারা আর কথা বলবেন না। চলে যান, চলে যান আপনারা এখান থেকে। আমার যে কত বড় ক্ষতি হয়েছে তা আপনারা বুঝবেন না।
আমার কোল খালি করে দিয়ে গেছে। একটা বড় সম্পদ খসে গেছে আমার ভাগ্য থেকে। ও এভাবে বেঁচে ছিল আমার কী সুখ তোমরা জানবে না । ওর বিছনাপত্র, বালিশ, কাপড়-চোপড়, সব কিছু এখান থেকে সরিয়ে দাও। এগুলো আর আমার সামনে রেখ না। আমাকে একা করে ফেলে গেছে সামিয়া। সামিয়া তোমার অভাগা বাপকে সঙ্গে নিতে পারলি না!
শবাক চৌধুরীর দিন দিন পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। এ সংসারে তার মন নেই। কী করে তার মেয়ে পরকালে মুক্তি পাবে সেই চিন্তায় অস্থির। এ জীবনে সে অনেক কষ্ট করেছে, পরকালে যাতে সে শান্তি পায় সেই চেষ্টায়ই রইল। বড় বড় ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম উলামার কাছে যান আর কী করলে পরকালে তার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে সেটা জানতে চান। ওরা যার যার জানামত ফতোয়া দেন আর দোয়া করতে বলেন। তার পরও তার মন প্রবোধ মানে না।
বছর ঘুরে আসলে শবাক চৌধুরী গেলেন মেয়ের কবর জেয়ারতে। একী অবস্থা। কবরের এক অংশ দেবে গেছে। রোদ বৃষ্টি কত কি আমার মেয়ের উপর দিয়ে যাচ্ছে। আহ! আমি তো একবারও খেয়াল করিনি। শবাক চৌধুরী বাজারে গিয়ে পলিথিন কিনে এনে কবরটার উপর সুন্দর করে পেতে দিল। ঝড় ঝঞ্ঝা আসলে আমার মেয়েটার বুক বাঁচবে। থোড়া আশ্রয় হবে। কষ্ট থেকে রেহাই পাবে। হাত তুলে শবাক চৌধুরী আল্লাহর দরবারে মেয়ের শান্তি কামনায় দোয়া করলেন। শ্রাবন মাসের কয়েকদিন তখনও বাকী ছিল। হঠাৎ চতুর্দিক অন্ধকার করে ঝড় বৃষ্টি শুরু হল। এক ফসলা ভারি বৃষ্টি শবাক চৌধুরীকে ধুয়ে দিল। উনার দু’চোখ বেয়ে বহমান শোক ধারা বৃষ্টির জলের সাথে একাকার হয়ে গেল। শবাক চৌধুরী কবরের উপর উপুড় হয়ে পড়লেন যেন পলিথিন গুলো বাতাসে উড়ে না যায়। মনে মনে ভাবলেন এখানে কবর দিয়ে ভুল করেছি। মনের গহীনে কবর খুড়ে ওকে কবর দিতে পারলে ভাল হত। দুনিয়ার ঝড় ঝঞ্ঝা খরতাপ কিছুই তাকে স্পর্শ করত না। বৃষ্টি থামলে আনমনে কবিতা রচনা করতে করতে বাড়ির পথ ধরলেন শবাক চৌধুরী...

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT