ইতিহাস ও ঐতিহ্য

প্রকৃতিকন্যা সিলেট

আল ফাতাহ মামুন প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৮-২০১৮ ইং ০১:৪০:১৫ | সংবাদটি ৪৯৪ বার পঠিত

বনজ, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত জেলা সিলেট বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত। জৈন্তা পাহাড়ের অপরূপ জাফলংয়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, ভোলাগঞ্জের সারি সারি পাথরের স্তূপ পর্যটকদের টেনে আনে বারবার। সিলেটের প্রবাসীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সিলেটের পাথর, বালুর গুণগত মান দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। জেলার প্রাকৃতিক গ্যাস সারাদেশের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করে থাকে। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) এর পবিত্র মাজার শরীফ এ জেলায় অবস্থিত। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ লোক মাজার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এখানে আগমন করে। শীত মওসুমে সিলেটের হাওর-বাওড়গুলো ভরে উঠে অতিথি পাখির কলরবে।
১৭৬৭ সালে এ অঞ্চল ব্রিটিশদের করায়ত্ত্ব হওয়ার পর ১৭৭২ সালের ৩ জানুয়ারি সিলেট জেলার সৃষ্টি হয়। কালের প্রবাহে ১২টি উপজেলা নিয়ে বর্তমান সিলেট জেলা গঠিত।
পূর্বে ভারতের আসাম, পশ্চিমে সুনামগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা, উত্তরে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়।
ঔপনিবেশিক আমলেই সিলেট দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। সিলেট পৌরসভা সৃষ্টি হয় ১৮৭৮ সালে। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন এক মারাত্মক ভূমিকম্প শহরটিকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলে। পরবর্তীতে ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে উঠে ইউরোপীয় ধাঁচের আরো সুন্দর ও আধুনিক শহর। ১৮৯০ এর শেষদিকে কিছু রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়। ১৯১২-১৫ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি শাখা সিলেটের সাথে সংযুক্ত হলে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সিলেটের বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত অবসান ঘটে। চা শিল্পের কারণে বিশ শতকের প্রথমদিকে সিলেট শহরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৪ শতকে ইয়েমেনের সাধক পুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট জয় করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। নানকার বিদ্রোহ সিলেটের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সিলেটে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান তেমন একটা গড়ে উঠেনি। ভারী শিল্পের মধ্যে আছে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার কারখানা লিমিটেড।
এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিদেশমুখিতা, সস্তা শ্রমের অভাব এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ এর মূল কারণ। সরকারিভাবে সিলেটে দুটি বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে-১. খাদিম নগর ও ২. গোটটিকর।
ভাষা নিয়তই পরিবর্তনশীল এবং ভাষার পরিবর্তন হয় এলাকাভিত্তিক ও দূরত্বের উপর নির্ভর করে। সে হিসেবে সিলেটিদের মুখের ভাষা প্রকৃত বাংলা ভাষা হতে বেশ খানিকটা দূরে। সিলেট ঐতিহাসিকভাবেই আলাদা ভাষা এবং আলাদা সংস্কৃতির ধারণ ও লালন করে আসছে। এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বসবাস, যার ফলে ভাষার ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। পূর্বে সিলেট আসাম রাজ্যের অন্তর্গত থাকার ফলে সিলেটের ভাষা ও সংস্কৃতিতে আসামের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও সিলেটের রয়েছে এক বৈচিত্র্যময় নিজস্ব ভাষা যা নাগরী লিপি হিসেবে পরিচিত। নাগরীর অক্ষর মাত্র ৩২টি। যুক্তবর্ণ সাধারণত ব্যবহার হয় না। মাত্র আড়াই দিনে শেখা যায়। বৃহত্তর সিলেট, কাছাড়, করিমগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় নাগরী লিপির ও সাহিত্যের প্রসার ও সমাদর ছিল।
খনিজ সম্পদে ভরপুর সিলেট জেলা। এ জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদ। হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র, কৈলাশটিলা গ্যাস ক্ষেত্র, সিলেট গ্যাস ক্ষেত্র, সেভরন গ্যাস ক্ষেত্র। বাংলাদেশের মোট গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেটে মজুদ আছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের সাথে সাথে গ্যাস কূপ থেকে খনিজ তেল আহরণ করা হয়। তেল সম্পদের মধ্যে আছে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন।
বাংলাদেশের পাথরের চাহিদার ৯০% ই আসে সিলেট থেকে। সিলেট জেলা চুনা পাথরেও বেশ সমৃদ্ধ।
আবহমান কাল ধরে সিলেট পর্যটকদের কাছে একটি প্রিয় নাম। সিলেটের পথে প্রান্তরে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহ্য। হযরত শাহ জালাল ও শাহপরান (রহ) এর স্মৃতিবিজড়িত এ পূণ্যভূমিতে দেশী বিদেশী ভক্তকুলের আগমন ঘটে। ধর্মীয় গুরুত্বের দিক থেকে সিলেট যে রকম অনন্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও তেমনি। উপমহাদেশের প্রথম চা বাগান মালনী ছাড়া পর্যটকদের কাছে আরেক বিস্ময়।
এছাড়াও সুরমা নদীর উপর কিন ব্রিজ না দেখলে সিলেট ভ্রমণ অনেকটা অপূর্ণই থেকে যায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT