ধর্ম ও জীবন

আবে যমযম : ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৮-২০১৮ ইং ০১:৫৩:০৭ | সংবাদটি ৭৩ বার পঠিত

মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) আপন স্ত্রী হাজেরা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈলকে আল্লাহর আদেশে নির্বাসন দেয়ার উদ্দেশ্যে সিরিয়া থেকে পূর্বদিকে যাত্রা করেন। বেশ কয়েকদিন চলার পর বর্তমানে যেখানে কা’বা শরীফ অবস্থিত সেখানে এসে যাত্রা বিরতি করলেন। তৎকালীন যুগে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত না ছিলো কোনো আবাস, না ছিলো কোনো খাদ্য ও পানীয়। হযরত ইব্রাহিম (আ.) সেই জনমানবহীন উষর মরু প্রান্তরে সামান্য খাদ্য ও পানীয় স্ত্রীর হাতে দিয়ে ফিরে চললেন দ্রুতগতিতে। পেছন থেকে ডাক দিলেন বিবি হাজেরা। হে আমার প্রিয় স্বামী! আমাদেরকে এই উষর মরু প্রান্তরে রেখে যাচ্ছেন কেন? তিনি স্ত্রীর কথা শুনেও যেন না শুনার ভান করলেন। বিবি হাজেরা এবার উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমার প্রিয় স্বামী! এটা কি আল্লাহর আদেশ? হযরত ইব্রাহিম (আ.) তখন পিছন দিকে না তাকিয়ে জবাব দিলেনÑহ্যাঁ, এটা আল্লাহর আদেশক্রমেই। বিবি হাজেরা মনকে শান্ত¦না দিলেনÑতাহলে আল্লাহ আমাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিশ্চিন্তে কিছু দূর অগ্রসর হয়ে দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেনÑহে আল্লাহ! আমি আমার পরিবারকে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এমন এক অনুর্বর খোলা ময়দানে বসতি স্থাপনের জন্য রেখে যাচ্ছি, যেন তারা তাতে নামাজ কায়েক করে। হে আল্লাহ! কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং ফলমূল দ্বারা তাদের রিজিকের ব্যবস্থা কর, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। (সূরা : ইব্রাহিম, আয়াত : ৩৭)
এ জনমানবহীন মরু অঞ্চরে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করে বিবি হাজেরা শিশু ইসমাঈলকে নিয়ে দিনাতিপাত করতে শুরু করলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রিয় স্বামীর দেয়া সেই খাদ্য ও পানীয় ফুরিয়ে গেল। ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লেন শিশু ইসমাঈল ও বিবি হাজেরা। এ সময় বিবি হাজেরার বুকের দুধও শুকিয়ে গেল। হায়! শিশু ইসমাঈলের জীবন রক্ষা করবে কে? অতিশয় ক্ষুধার কারণে শিশু ইসমাঈলের চেহারা ক্রমেই মলিন হতে লাগল। বিবি হাজেরা সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর জন্য পার্শ্ববর্তী সাফা পাহাড়ে উঠলেন কোনো জনমানব কোথাও আছে কি না তা দেখার জন্য। না, কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব নেই সেখানে। নেমে পড়লেন দ্রুত নিচের দিকে। আবার অসহায়ের মতো দৃষ্টি দিলেন দুধের শিশু ইসমাঈলের দিকে। কী বীভৎস পরিস্থিতি! আবার ছুটে চললেন বিপরীত দিকের মারওয়া পাহাড়ে। কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব আছে কি না তা দেখার জন্য। না, সেখানেও কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। আবার বিবি হাজেরা ছুটে চললেন সাফা পাহাড়ের দিকে। এভাবে সাফা ও মারওয়া পাহাড় তিনি সাতবার প্রদক্ষিণ করলেন। তাঁরই সেই পুণ্যময় স্মৃতি রক্ষার্থে হাজীগণ কিয়ামত পর্যন্ত সাফা-মারওয়া সায়ী করতে থাকবেন। বিবি হাজেরা সাতবার প্রদক্ষিণ শেষে একেবারে হতাশ হয়ে গেলেন। দৃষ্টি দিলেন ওষ্ঠাগত প্রাণ শিশু ইসমাঈলের প্রতি। অবাক হয়ে দেখলেন শিশু ইসমাঈল তাঁর কদম মোবারক (পা দ্বারা) মাটিতে আঘাত করছেন (শিশুরা তো এভাবে পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করে থাকে)। শিশু ইসমাঈলের পায়ের গোড়ালির আঘাতে সেখানে গর্ত সৃষ্টি হয়ে যমযম শব্দ করে পানির ফোয়ারা উঠতে থাকলো। বিবি হাজেরা চারদিকে বালির বাঁধ তুলে দিলেন দ্রুতগতিতে। বর্ণিত আছে যে, বিবি হাজেরা নির্দিষ্ট সীমানায় এ পানি আবদ্ধ না করলে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র আরব ভূখন্ডেই এ পানির ধারা প্রবাহিত হতো। পবিত্র আবে যমযমের সূত্রপাত এভাবেই হয়েছে। কিছু দিন পর ইয়ামনের জুরহাম গোত্রের একদল ব্যবসায়ী তাঁদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন অন্য শহরের উদ্দেশ্যে। তারা লক্ষ্য করলো এ জনমানবহীন এলাকায় এক ঝাঁক পাখির কলরব। অবাব বিস্ময়ে বলল তারাÑ এ পথে তো আমরা অনেকবার যাতায়াত করেছি কিন্তু ইতোপূর্বে তো আমরা এখানে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পাই নি। ব্যাপার কী? তারা দু’জন লোক পাঠালো সেখানে। তারা এখানে এসে আল্লাহর অশেষ মহিমা দেখে অবাক হলো। তারা দেখল পানির ফোয়ারা, তার পাশে মা ও ছেলে। তারা গোত্রীয় লোকদের নিকট ফিরে গিয়ে পানির সুসংবাদ দিলো। পানির সুসংবাদ শুনে তারা সকলে সেখানে আসল। বিস্মিত নয়নে তারা দেখতে পেল এ অভাবনীয় ব্যাপার। অনেক আলাপের পর তারা বিবি হাজেরার নিকট আবেদন-নিবেদন করে বললÑআমরা আপনার প্রতিবেশি হিসেবে এখানে বসবাস করতে চাই। এ ব্যাপারে আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিন। তিনি জবাবে বললেনÑ হ্যাঁ, বসবাস করতে পারবে কিন্তু পানির উপর তোমাদের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। এ শর্তে তোমরা আমার প্রতিবেশি হয়ে থাকতে পারবে। তারা শর্ত মেনে নিয়ে সেখানকার বাসিন্দা হয়ে গেল। শিশু ইসমাঈল ক্রমান্বয়ে কৈশোরে উপনীত হলেন এবং তাদের নিকট থেকে আরবি ভাষা শিখলেন।
জুরহাম গোত্র কাবা ঘরের আশে পাশে বহুদিন অবস্থান করেছিলেন। পরে এক সময় যমযমের পানি বন্ধ হয়ে যায় এমনকি যমযম কূপের স্থানটিও একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আরবীয় ঐতিহাসিকদের মতে, যমযম কূপ প্রাকৃতিক কোন কারণে চাপা পড়ে নি; বরং জুরহাম গোত্রের পাপের কারণে যমযম কূপের পানি শুকিয়ে যায়। এমনকি যমযম কূপের স্থানটিও একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। জুরহাম গোত্রের লোকেরা কাবা শরীফের প্রতি নানাভাবে অবমাননা করে এবং অসম্মান করে। কাবা শরীফের প্রতি প্রদত্ত উপহার সামগ্রী তারা প্রকাশ্য ও গোপনে চুরি ও আত্মসাৎ করে। তাদের এই বিরাট পাপের কারণে যমযম কূপ শুকিয়ে যায়। পরবর্তীতে বন্যার কারণে এর সকল চিহ্ন একেবারে মুছে যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, মুদাদ বিন আমর জুরহামী তাঁর গোত্রের লোকদেরকে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে উপদেশ দেন। কিন্তু তারা তাতে সাড়া দেয়নি। ফলে তিনি কাবার ধনভান্ডারে রক্ষিত দু’টো সোনার হরিণের প্রতিকৃতি এবং তরবারি যমযম কূপে রাতে গোপনে ফেলে দেন। অন্যদের ভয়ে গোপনে কূপটি ভরাট করেন। কারণ তারা জানতে পারলে তারা কিছুতেই তাকে ঐ কাজ করতে দেবে না। তারপর আল্লাহপাক এই পাপী জাতির উপর খোজাআ’ গোত্রকে বিজয়ী করেন এবং জুরহাম গোত্র মক্কা থেকে বিতাড়িত হয়। এর ফলে ইসমাঈল বংশের অধিবাসীগণ মক্কার উপর একচ্ছত্র শাসন পরিচালনার সুযোগ পায়।
পরবর্তীতে রাসূল (সা.) এর দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব এর হাতে যখন মক্কায় শাসনভার আসলো তখনও যমযম কূপের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। এক রাতে খাজা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নে দেখলেন, তাকে বলা হচ্ছেÑহে আব্দুল মুত্তালিব! তোমার বংশীয় ইসমাঈলের যমযম কূপ পুনরায় আবিষ্কার কর। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে খাজা আব্দুল মুত্তালিব সারাদিন সেই স্বপ্ন নিয়ে চিন্তা করেন। কিন্তু যমযম কূপ কোথায় তা তিনি নির্ণয় করতে পারলেন না। তিনি মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনে দোয়া করলেন আল্লাহপাক যেন তাকে যমযম কূপের স্থান সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন। এসব চিন্তা-ভাবনা নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে তাঁকে আবার বলা হলোÑহে আব্দুল মুত্তালিব! কাবা শরীফের সামনে আসাফ-নায়েলা নামের দু’টি মূর্তি আছে। এই মূর্তি দু’টির মাঝামাঝি স্থানে যেখানে সকাল বেলা তুমি ঘুম থেকে উঠে কাককে ঠোকর মারতে দেখবে তার নিচেই আছে যমযম কূপ। পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি স্বপ্নে দেখা স্থানে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই একটি কাক একস্থানে ঠোকর মারছে। সুতরাং তিনি কালবিলম্ব না করে নিজের সন্তানদের নিয়েমাটি খোড়া আরম্ভ করলেন। একটু পরেই দেখতে পেলেন হাজরে আসওয়াদ এবং অন্যান্য ধনরতœ। সেগুলো উঠিয়ে নেয়ার পর যমযমের পানি দেখা গেল। এভাবে খাজা আব্দুল মুত্তালিবের হাতে যমযম কূপ পুনঃ আবিষ্কৃত হলো। সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যমযম কূপের তলদেশের সাথে জান্নাতের হাউজে কাউসারের সম্পর্ক রয়েছে। আর এ কাউসার হলো জান্নাতের একটি নদীর নাম। যে কারণে হজ্বের মৌসুমে অগণিত পাম্প মেশিন দিয়ে অবিরাম পানি উত্তোলন করার পরও পানির কোনো কমতি দেখা যায় না। সেই পবিত্র যমযমের পানি কোনো দিন শেষ হবে না। এজন্যই আবে যমযম পৃথিবীর বুকে মহান আল্লাহর এক অনন্য নিদর্শন।
যমযমের পানি অত্যন্ত বরকতময় পানি। এ পানির বৈশিষ্ট্য অন্যান্য সকল পানি থেকে আলাদা। রাসুলে পাক (সা.) যমযমের পানি পান করেছেন। তিনি যমযমের পানি বেশি করে উত্তোলন করতে এবং তা মুসলমানদেরকে পান করাতে উৎসাহিত করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম, তাবিয়ীন, তাবয়ে তাবিয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, ওলী-আউলিয়া, গাউস-কুতুব, উলামায়ে কেরামগণ সবাই যমযমের পানি পান করার জন্য ছিলেন উন্মুখ। যমযমের পানি পান করার জন্য মুমিনমাত্রই সদা উদগ্রীব হয়ে থাকেন। যমযমের পানি পান করে এর থেকে সকলেই বরকত হাসিল করতে চান। যমযমের পানির অশেষ ফজিলত ও অগণিত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ পানির ফজিলত ও বৈশিষ্ট্যাবলীর কয়েকটি নি¤েœ উপস্থাপন করা হলো :
(১) রাসূল (সা.) ইরশাদ করেনÑ জমিনের উপর সর্বোত্তম পানিই হচ্ছে যমযমের পানি। (২) যমযমের পানি শুধু মানুষ নয়; জিনরাও এ পানি পান করে থাকে। (৩) শরিয়ত ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যমযমের পানি পৃথিবীর অন্যান্য যেকোনো পানির চেয়েও উত্তম। (৪) যমযমের পানি যে যে নিয়তে পান করবে তার সেই নিয়ত পূর্ণ হবে। (৫) যমযমের পানির দিকে তাকালে দৃষ্টিপক্তি বৃদ্ধি পায়। (৬) অন্যান্য কূপ অপেক্ষা যমযম কূপের পানির উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি। (৭) এই কূপের পানি সহজে নিঃশেষিত হয় না বা শেষ হবে না। (৮) যমযমের পানি অন্য পানির চেয়ে এক-চতুর্থাংশ বেশি ভারি। (৯) এ পানি সহজে দূষিত হয় না। বাইরের দূষিত পদার্থ দ্বারা প্রভাবিত হলেও পরে আপনা-আপনি বিশুদ্ধ হয়ে যায়। (১০) কিয়ামত পর্যন্ত এ পানি মানুষ পান করতে থাকবেন-তবুও এ পানি শেষ হবে না। (১১) যমযমের পানি রোগাক্রান্ত ব্যক্তি পান করলে রোগ ভালো হয়। (১২) এ পানি ক্ষুধার্ত ব্যক্তির ক্ষুধা দূর করে। (১৩) এ পানি মানুষের অন্তরকে শক্তিশালী করে। (১৪) যমযমের পানি দ্বারা নবী (সাঃ) এর বক্ষদেশ ধোয়ার কারণে তিনি জীবিত অবস্থায় আসমান-জমিন এবং জান্নাত-জাহান্নাম দেখার মতো শক্তি লাভ করেন। (১৫) এ পানি ঈমানের সাথে পান করলে পঙ্গুত্ব দূর হয়। (১৬) যমযমের পানি ক্যান্সার রোগের মহৌষধ। (১৭) ঈমানের সাথে পেট ভরে যমযমের পানি পান করলে মুনাফেকী দূর হয়। (১৮) এ পানি অন্তরের ভয়ভীতি দূর করে। (১৯) যমযমের পানির রং অন্য পানির রংয়ের মতো হলেও এর স্বাদ অন্য যে কোনো পানির চেয়ে ভিন্ন। (২০) যমযমের পানিতে অনেক রকমের খনিজ পদার্থ মিশ্রিত আছে। (২১) এ পানি নেককারদের পানীয় বলে বিবেচিত। (২২) এ পানি পিপাসার্ত ব্যক্তির পিপাসা দূর করে। (২৩) যমযমের পানির উৎপত্তি হয়েছে হযরত ইসমাঈল (আ.) এর সাহায্যের জন্য। সুতরাং আজও যদি কেউ ঈমানের সাথে সেই পানি পান করে, তাহলে সে আল্লাহর সাহায্য লাভ করবে। (২৪) এ পানিতে অগণিত কল্যাণ ও উপকার রয়েছে। (২৫) যমযমের পানি কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে পান করতে হয়। (২৬) পরিপূর্ণ ঈমানের সাথে তাওবা করে যমযমের পানি পেট ভরে পান করলে গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেনÑ ‘যে কেহ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে ইহা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া-সঞ্জতি’। (সূরা : হজ্ব, আয়াত : ৩২)। আবে যমযম হযরত ইসমাঈল (আ.) এর স্মৃতি বিজড়িত একটি পবিত্র ও বরকতময় পানি। এ পানি মহান আল্লাহর নিদর্শন সমূহের একটি অনন্য নিদর্শন। অতএব এ পানি পান করে এর থেকে উপকৃত হওয়া, বরকত হাসিল করা আমাদের সকলের উচিত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT