সাহিত্য

গানের রবীন্দ্রনাথ

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৮-২০১৮ ইং ০১:০৬:২৬ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

সাহিত্য জগতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘কবিগুরু’ বলা হয়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, কবিতার চেয়ে ঠাকুর বাড়ির রাজকুমার ‘রবি’কে গানের মাধ্যমে মানুষ চেনে-জানে বেশি। রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে অনেকে মেডিটেশন করেন। মনে প্রফুল্লতা এনে দেয় রবীন্দ্রনাথ-এর গানের বাণী ও সুর। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও শ্রোতা দর্শক মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর বর্ষার গান এক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় অনেক অনেক বেশি। শ্রাবণ মানেই বৃষ্টির রিমঝিম, শ্রাবণ মানেই রবিঠাকুরের গান। বাইরে অঝোর বারিধারা। জানালায় মুখ রেখে হয়তো আপন মনেই গেয়ে উঠছেন, ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে/ জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।’ এই গানে যেন বিরহী হৃদয়ের হাহাকার মূর্ত হয়ে ওঠে। মনের পর্দায় ভেসে ওঠে চেনা মুখ, ফেলে আসা দুর্লভ কিছু সময়।
রবিঠাকুরের গান যেন মিশে আছে আমাদের অনেকের প্রাণে। মনের ভাব প্রকাশ করতে অনেকেই রবীন্দ্র সঙ্গীত বেছে নেন। আমাদের প্রতিদিনের হাসি-কান্নায়, দুঃখ-বেদনায় আমরা অনেকেই আশ্রয় খুঁজি রবীন্দ্রনাথ-এর গানে কবিতায়। কবিগুরুর বর্ষাবন্দনার কবিতা ও গানে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মানবীয় ভাবনাও। তাই তো বৃষ্টি নামলেই আমাদের মন হয়ে পড়ে স্মৃতিকাতর। ফেলে আসা দিনগুলো উঁকি দিয়ে যায় মনের কোণে ঠিক যেন রবি-কবির গানের মতো- ‘আজি শ্রাবণঘন গহন মোহে/ গোপন তব চরণ ফেলে/ নিশার মতো নীরব ওহে/ সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।’ অথবা ‘এমন দিনে তাঁরে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরিষায়/ এমন দিনে মন খোলা যায়।
নিজের মনের কথা যেন মুখ ফুটে বলতে হয় না। রবীন্দ্রনাথ-এর গানই বলে দেয় অব্যক্ত সে কথা। কবি রবীন্দ্রনাথ-এর প্রকৃতি পর্যায়ের গানের মধ্যে শুধু বর্ষার গানেই যেন অনন্তকাল ডুবে থাকা যায়। গানের কথা ও সুরের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের সঙ্গে মানুষের মনের ভাবের যে মিলন তা যেন চিরন্তন। কবিগুরুর বর্ষার গানে আছে-
‘আজি হৃদয় আমার যায় যে ভেসে/ যাঁর পায়নি দেখা তাঁর উদ্দেশে/ বাঁধন ভোলে/ হাওয়ায় দোলে/ যায় সে বাদল মেঘের কোলে/ কোন সে অসম্ভবের দেশে।’
অথবা ‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার/ দিনের আকাশ মেঘে মেঘে অন্ধকার..... হায় রে!
আমাদের অনেকের দৈনন্দিন জীবনটা যেন অনেকটাই যান্ত্রিক। অত্যন্ত কর্মব্যস্ত দিন। জীবন-জীবিকার টানে ছুটতে হয় আমাদের নাভিশ্বাসে। বৃষ্টিই যেন বদলে দিতে পারে আমাদের এই জীবনধারা। বাইরে মুষল ধারা শ্রাবণের বৃষ্টি। আপনি হয়তো জানালায় মুখ রেখেছেন। কিন্তু মন চলে যায় দূর অতীতে। হয়তো দিনের সব কাজ ভুলে আপন মনে গেয়ে উঠছেন- ‘সে কথা শুনিবে না কেহ আর/ নিভৃত-নির্জন চারিধার/ দুজনে মুখোমুখি/ গভীর দুঃখে দুখি/ আকাশে জল ঝরে অনিবার/ জগতে কেহ যেন নাহি আর।’
বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর বর্ষার গানে বিরহের প্রকাশ তো অনবদ্য। যেমন-
‘কোন পুরাতন প্রাণের টানে/ ছুটেছে মন মাটির পানে/ চোখ ডুবে যায় নবীন ঘাসে/ ভাবনা ভাসে পুব- বাতাসে/ মল্লারগান প্লাবন জাগায়/ মনের মধ্যে শ্রাবণ গানে!’
অথবা, ‘এসেছিনু দ্বারে তব শ্রাবণরাতে/ প্রদীপ নিভালে কেন অঞ্চল ঘাতে/ অন্তরে কালো ছায়া পড়ে আঁকা/ বিমুখ মুখের ছবি মনে রয় ঢাকা দুঃখের সাথি তারা ফিরিছে সাথে।’
বিরহ বেদনা প্রকাশের আরও গভীরতর বাণী হলো-
মনে ছিল আসবে বুঝি/ আমায় সে কি পায় নি খুঁজি/ না- বলা তাঁর কথাখানি জাগায় হাহাকার/ আজ কিছুতে যায় না/ যায় না মনের ভার.........।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর এই যে গানের কথা ‘একি আমরা যাঁরা প্রগতিশীল মনের মানুষ, আমাদেরই সবার মনের কথা নয়!

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT