ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৮-২০১৮ ইং ০০:৪৬:৪৬ | সংবাদটি ৩৯৩ বার পঠিত

সিলেট থেকে বের হওয়া দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন একজন ‘মেশিনম্যান’। কথাটা শুনতে হয়তো অবাক লাগে। কথাটা সম্পাদক নিজেই স্বীকার করেছেন। অবশ্য ‘মেশিনম্যান’ পেশাটা তার মূল পেশা নয়। সংবাদপত্রের প্রকাশনা যাতে সিলেটের বাইরে থেকে আসা মেশিনম্যানদের হাতে জিম্মি না হয় সেজন্য তিনি আর তার ক’জন সহকর্মী মেশিনম্যানের কাজ শিখেছিলেন। সিলেটের এই দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক হচ্ছেন বাগ্মী বিপিন পাল। তিনি ছিলেন সেই সময়ের ভারতবর্ষের প্রথম সারির একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বাগ্মী ও সাংবাদিক। ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের ‘লাল বাল পাল’ নামে যে তিনজন নেতার কথা মুখে মুখে ফিরতো, তাদেরই একজন হচ্ছেন বিপিন চন্দ্র পাল। মহারাষ্ট্রের বালগঙ্গাধর তিলক, পাঞ্জাবের লালা লাজপত রায়, সিলেটের বিপিনচন্দ্র পালÑ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গের পূর্বে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। বিপিন পাল সম্পাদিত ‘পরিদর্শক’ পত্রিকাটিই হচ্ছে সিলেট থেকে বের হওয়া দ্বিতীয় সংবাদপত্র।
পত্রিকা বের করার পটভূমি হচ্ছেÑ কলকাতায় সিলেটের কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ‘শ্রীহট্ট সম্মিলনী’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। ‘শ্রীহট্ট সম্মিলনী’ সিলেটে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ‘সম্মিলনী’র পক্ষ থেকে ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিপিন পাল, ব্রজেন্দ্রনাথ সেন, ও রাজচন্দ্র চৌধুরীকে সিলেট পাঠানো হয়। তারা সিলেটে এসে ‘সিলেট জাতীয় বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন। বিপিনচন্দ্র পাল ছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক।
সেই সময়টায়, ১৮৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিপিনচন্দ্র পাল সাপ্তাহিক পরিদর্শক পত্রিকাটি বের করেন। এই পত্রিকা প্রকাশনার প্রেক্ষাপট, সেই সময়ের মুদ্রণব্যবস্থা ইত্যাদির একটি সুন্দর ও তথ্যবহুল বর্ণনা বিপিন পাল তার আত্মজীবনীতে দিয়েছেন। ঐতিহাসিক দিক বিবেচনায় তা বর্ণিত হলোÑ‘তখন সিলেটের সাপ্তাহিক খবরের কাগজের নাম ছিল ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’ বাবু প্যারী চরণ দাস প্রতিষ্ঠা করেন। কাগজটির এককালে খুব সুদিন গেছে। কিন্তু আমি ১৮৮০ সালে যখন সিলেটে ছিলাম কাগজটির তখন মৃতপ্রায় অবস্থা। তাছাড়া এই কাগজে নতুন চিন্তা ভাবনা ও নতুন জীবনের কোন বার্তাই থাকতো না। তাই একটি সীমাবদ্ধ দায়িত্বের অংশীদারী কারবার তৈরী করে আড়াই হাজার টাকার মূলধন নিয়ে একটি হাতে ছাপাযন্ত্র, প্রয়োজনীয় হরফ ও অন্যান্য মালপত্র কলকাতা থেকে আনানো হল। তখনকার দিনে সিলেটে খুবই কমই কম্পোজিটর বা ছাপার কাজ জানা লোক ছিল। যে দু’চারজন ছাপার কাজ জানতো, তারা ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’ ছাপাখানায় কাজ করতো। খবরের সাপ্তাহিকটি বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্বেও তারা নোটিশ ও জমিদারী কাগজপত্র ছাপাতো। কলকাতা থেকে কম্পোজিটর ও ছাপার লোক আনা হল। প্রতিবেশী শহর ময়মনসিংহ থেকে একজনকে আনা হল। ইতোমধ্যে ময়মনসিংহে ‘ভারত মিহির’ নামের একটি সাপ্তাহিক খবরের কাগজকে ঘিরে ছাপাখানার ব্যবসা খুব রমরমা চলছিল। ১৮৮০ সালের মাঝামাঝি থেকে নতুন লোকজন নতুন মালমসলা নিয়ে নতুন বাংলা সাপ্তাহিক শুরু হল সিলেটে। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হল এর সম্পাদক হতে। পিতা যখন সিলেটের বাড়ি থেকে আমাকে প্রায় বিতাড়িত করেন। তখন আমি দুই সহকর্মী ব্রজেন ও রাজচন্দ্রের সঙ্গে লালদিঘির পূর্বপাড়ে একটি ছোট্ট দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম। লালদিঘি আমাদের শহরের প্রধান বাজার, বন্দরবাজারের পেছনে অবস্থিত। ছাপাখানা এখানে তুলে নিয়ে আসা হল। আমরা দোতলায় থাকতাম, ছাপাখানা ছিল একতলায়। আমাদের নতুন বাংলা সাপ্তাহিকটির নাম ‘পরিদর্শক’। এই নামে ছাপাখানা নথিভুক্ত করা হল। ময়মনসিংহের ‘ভারত মিহির’-এর মত সিলেটের পরিদর্শকও জন্মমুহূর্ত থেকেই সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এবং অল্প কালের মধ্যে কেবল সিলেট নয়, সারা বাংলার শিক্ষিত জনমতের শক্তিশালী প্রবক্তারূপে গণ্য হল। আমরা সবাইÑআমি, ব্রজেন্দ্র, রাজচন্দ্র এবং রাধানাথও জাতীয় বিদ্যালয়, সংবাদপত্র ও ছাপাখানায় একসাথে কাজ করতে লাগলাম। এই আমার বাংলা সাংবাদিকতায় স্বাধীন দায়িত্বভার গ্রহণ ও পরবর্তী বৃত্তি নির্বাচনে আমার সিলেটের বন্ধুদের কাছে আমি ঋণী। ‘পরিদর্শক’ প্রেস আমাকে ছাপার কাজও হাতে ধরে শেখালো। কারণ দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যদি আমাদের ঠিক ঠিক এবং ভালভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাহলে গোড়া থেকেই আমাদের কলকাতার আমদানী করা লোকদের কবলমুক্ত হতে হবে। এর একমাত্র পথ হচ্ছে প্রিন্টারের কাজ শিখে নিতে হবে। বিষয় সাজাতে, প্রুফ দেখতে এবং মেশিনও চালাতে হবে। আমরা ক’জনই শীঘ্র এই শিল্প আয়ত্ব করে ফেললাম। আমাদের লোকজনের উপর এর একটি মনস্তাত্বিক প্রভাব পড়ল। তারা হৃদয়ঙ্গম করল অসভ্যতা বা অসহযোগ করে তারা আমাদের যদি বাধ্য করে ওদের ছাঁটাই করতে তৎক্ষনাৎ ‘তার’ করে কলকাতা থেকে একদল নতুন কম্পোজিটর আনিয়ে নেব। তাদের সিলেটে পৌঁছাতে যে দু, এক সপ্তাহ সময় লাগবে আমরা নিজেরা সেই সংখ্যাগুলি প্রকাশ করতে পিছপা হবনা।’
পরিদর্শক পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়ে উঠে। কিন্তু পত্রিকা, জাতীয় বিদ্যালয়, ছাপাখানা একসাথে তিনটি প্রতিষ্ঠান চালাতে বিপিন পালকে খুব পরিশ্রম করতে হয়। স্কুলের আয় থেকে সবাইকে দেবার পর যা থাকতো তার সামান্য একটি অংশ পেতেন তিনি। পরিদর্শক পত্রিকাটিও আর্থিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠেনি। সম্পাদক হিসেবে তিনি কোন পারিশ্রমিক পেতেন না। তিনি নিজে উল্লেখ করেছেন,Ñ‘এমনও হয়েছে অনেক সময়ে যে আমরা একবেলাই আহার করেছি।’ এইভাবে আর কত চলে, তিনি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফিরে যান কলকাতায়। তিনি লিখেছেনÑ‘চিকিৎসার জন্য আমি কলকাতা আসতে বাধ্য হলাম। এইভাবে আমার নিজের জন্মস্থানে সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রচারকের জীবন অর্ধ পথে থেমে যেতে বাধ্য হল। এই বায়ু পরিবর্তন ও বিশ্রামের খরচ চালানোর আর্থিক সংগতি আমার ছিল না। আমার বন্ধুরাই যোগাড় করে দেয় এবং ১৮৮০ সালের জুলাই মাসের শেষাশেষি আমি কলকাতায় আবার ফিরে আসি।’
বিপিনচন্দ্র অসুস্থ হয়ে সিলেট ছেড়ে চলে যাবার পর রাজচন্দ্র চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘পরিদর্শক’ প্রকাশিত হয়। রাজচন্দ্র চৌধুরী চলে গেলে সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন করিমগঞ্জের আগিয়াররামের রাধানাথ চৌধুরী। রাধানাথ চৌধুরী সিলেটের কয়েকজনকে নিয়ে সম্মিলিত সমিতি ঞঐঊ টঘওঞঊউ ঈঙ নামে একটি কোম্পানি গঠন করেন। এই কোম্পানি দ্বারা পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অর্থনৈতিকভাবে এ ধরনের একটি অলাভজনক খাতে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেকে নিরুৎসাহী হয়ে পড়েন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই পরিদর্শক প্রেস ঋণের দায়ে নিলাম হয়ে যায়। এর সাথে সম্মিলিত সমিতির অস্তিত্বও শেষ হয়ে যায়। মোক্তার দীননাথ দাশ নামে একজন সমাজ হিতৈষী ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘পরিদর্শক’ প্রেস নিলামে কিনে নেন। তিনি নিজের নামে প্রেসটির নামকরণ করেন ‘দীননাথ প্রেস’। আবার পরিদর্শক বের করার ব্যবস্থা করেন। পরিদর্শক বের হবার কিছুদিনের মধ্যে আবার অর্থ সংকট শুরু হলে এক পর্যায়ে সম্পাদক ও প্রেসমালিক প্রেস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। রাধানাথ বুঝতে পারলেন নিজের প্রেস না থাকলে পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তারও তেমন টাকা পয়সা নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের বাপদাদার সম্পত্তি বন্ধক রেখে প্রেসটি কিনে নেবেন। শেষমেষ তাকে অবশ্য জমি বন্ধক দিতে হয়নি। তার ভাইদের চেষ্টায় তিনি প্রেসটি কিনেছিলেন। চরম অর্থসংকটের মধ্যেও রাধানাথ চৌধুরী পরিদর্শকের প্রকাশনা চালিয়ে যান। রাধানাথ চৌধুরী মৃত্যু পর্যন্ত সকল প্রতিকূলতার সাথে একা সংগ্রাম করে ‘পরিদর্শক’ কে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ আগস্ট মারা যান। তার মৃত্যুর পর তার ভাই আইনজীবী পার্বতীচরণ চৌধুরী প্রেসটি বিক্রি করে দেন। তখন প্রেসটি কিনে নেন ড. ভারত চন্দ্র দাস। তখন ‘পরির্দশক’ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু সময়ের জন্য সিলেটে কোন সংবাদপত্র ছিলো না। সম্ভবত ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ডা. ভারতচন্দ্র দাসের সম্পাদনায় ‘পরিদর্শক’ নতুন জীবন ফিরে পায়। তবে এটি সাপ্তাহিক না পাক্ষিক ছিলো জানা যায়নি। অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য বলেছেন, সিলেট শহরের মির্জাজাঙ্গালের প্রফুল্ল মোহন দাস, শেখঘাটের প্যারী মোহন দাস ও মৌলভীবাজারের নলজুড়ার গোপেন্দ্রনাথ অর্জুন সাপ্তাহিক ‘পরিদর্শক’ সম্পাদনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, প্যারীমোহন দাস ও গোপেন্দ্রনাথ অর্জুন কিছুদিন পত্রিকাটি যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। তবে তারা কখন পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন, তা তারা উল্লেখ করেননি। সম্ভবত: রাধানাথ চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন।
সাপ্তাহিক ‘জনশক্তি’র সর্বশেষ সম্পাদক নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী বলেছেন, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পরিদর্শক পত্রিকা চালু ছিলো। কিন্তু এটি সাপ্তাহিক না পাক্ষিক ছিলো তা তিনি উল্লেখ করেননি।
বিপিন পালের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: রাজনীতি ও সাংবাদিকতার প্রবাদ পুরুষ বিপিনচন্দ্র পাল ১৮৫৮ সালের ৭ নভেম্বর হবিগঞ্জের তরফ পরগনার পৈল গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা রামচন্দ্র পাল এক সময়ে ঢাকার জজকোর্টের পেশকার ছিলেন। পরে তিনি আইনজীবী ও মুন্সেফ হিসেবে কাজ করেন। মা ছিলেন নারায়ণী পাল। বিপিন পাল এক পর্যায়ে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নেন। পরে তিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন।
অসাধারণ বাগ্মী, যুক্তিবাদী, সাংবাদিক, তার্কিক, সমাজ সংস্কারক ও সব্যসাচী লেখক ছিলেন বিপিন পাল। তিনি একজন সুবক্তা হিসেবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে দেশবাসীকে উদ্ধুদ্ধ করেন।
বিপিন পালের বাংলা সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় ‘ভারত সংস্কারক’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। পত্রিকাটি সরাসরি ব্রাহ্ম সমাজের না হলেও ভারতীয় সমাজ সংস্কার সমিতি বা ইন্ডিয়ান সোশ্যাল রিফর্ম এসোসিয়েশনের মুখপত্র ছিলো। প্রতিবাদী ব্রাহ্মদের সাথে এর সম্পৃক্ততা ছিলো। ব্রাহ্ম সমাজের বিভেদের সময় ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে পত্রিকাটির যুগ্ম সম্পাদক কালীনাথ দত্ত ও উমেশ চন্দ্র দত্ত একজন ‘সম্মানিক প্রতিবেদক’ হিসেবে ‘ভারত সংস্কারক’ পত্রিকায় বিপিন পালকে লেখার সুযোগ দেন। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ইঊঘএঅখ চটইখওঈ ঙচওঘওঙঘ পত্রিকায় ইংরেজি সাংবাদিকতায় বিপিন পালের প্রথম হাতেখড়ি হয়। তিনি পত্রিকাটির সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় দু বছর এ পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন। এ সময় তিনি ‘বঙ্গবাণী’ ও ‘ভারত মিহির’-এ নিয়মিত লেখতেন। এক সময় তিনি লাহোর গিয়ে সেখান থেকে প্রকাশিত ঞজওইটঘঊ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বিলেত থেকে ফিরে ঘঊড ওঘউওঅ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করে তাতে ভারতবাসীর বৃটিশ সংশ্রব বহির্ভূত স্বাধীনতার বাণী প্রচার করেন। ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় নিয়মিত লেখতেন। ১৯০৮ সালে তিনি বৃটেন থেকে ঝডঅজঅঔ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেখানে ঝডঅজঅঔ-এর চারটি সংখ্যা বের হয়েছিল। ১৯১২ সালে তিনি ‘হিন্দু রিভিউ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মতিলাল নেহেরু এলাহাবাদ থেকে উঅওখণ ওঘউঊচঊঘউঊঘঞ এবং ডঊঊখণ উঊগঙঈজঅঞ পত্রিকা প্রকাশ করলে বিপিন পালকে সম্পাদক হবার আহবান জানান। তিনি পত্রিকা দুটোর সম্পাদক হন এবং মাসিক বারোশ টাকা সম্মানী লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি আলোচনা, কৌমুদী, ঋজঊঊউঙগ অঘউ ঋঊখখঙডঝঐওচ প্রভৃতি সম্পাদনা করেন। বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে তিনি প্রায় ১৫টি সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন। সেগুলো হচ্ছেÑবাংলা: মাসিক আলোচনা, কৌমুদী, বাংলার জনমত, (সহ-সম্পাদক বাংলা দৈনিক বন্দেমাতরম ও মাসিক সোনার বাংলা), ইংরেজি: ডেইলি বন্দেমাতরম, উইকলি বেঙ্গল পাবলিক অপিনিয়ন (সহ-সম্পাদক), লাহোরের উইকলি ট্রিবিউন (সহ-সম্পাদক), এলাহাবাদ থেকে উইকলি ডেমোক্রেট ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ফ্রিডম এন্ড ফেলোশিপ, মাসিক হিন্দু রিভিউ, উইকলি নিউ ইন্ডিয়া, লন্ডন থেকে পাক্ষিক (মতান্তরে মাসিক) স্বরাজ।
বিপিন পালের লেখনী ছিলো অত্যন্ত ক্ষুরধার। তিনি বাংলায় ১৪টি এবং ইংরেজিতে ৩৭টি বই লিখেছেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইÑ মহারাণী ভিক্টোরিয়া (জীবনী), শোভনা (উপন্যাস), জেলের খাতা, মার্কিন দেশে চার মাস, সত্তর বছর (আত্মকথা), ভারত সীমান্তে রুশ, গবসড়ৎরবং ড়ভ সু ষরভব ্ ঃরসব (াড়ষ. ও ্ ওও), ঞযব হবি ংঢ়ৎরঃ, ঞযব ংড়ঁষ ড়ভ ওহফরধ, গধফৎং ংঢ়ববপযবং, ৎিরঃরহম ড়ভ ইঈ ঢ়ধষ.
বক্তা হিসেবে সুখ্যাতিই বিপিন পালকে ‘বাগ্মী’ উপাধিতে ভূষিত করে। তিনি ছিলেন এক অনলবর্ষী বক্তা। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারতেন। সব লেখকই বলেছেন, তার স্থান ছিলো শ্রেষ্ঠ বক্তাদের প্রথম সারিতে।
সিলেটে অসুস্থ হয়ে বিপিন পাল কলকাতা ফিরে যাবার কিছুদিন পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। তারপর শিক্ষকের চাকরি নিয়ে চলে যান মাদ্রাজ। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই তিনি দলের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ছিলেন কট্টর জাতীয়তাবাদী, ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে ইংরেজদের সাথে কোন আপোসে আসতে তিনি রাজি ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটিশের কবলমুক্ত স্বাধীন ভারত। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নেন। তিনি পন্ডিত মতিলাল নেহেরুর মালিকানাধীন ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করেন। তবে পন্ডিত মতিলাল নেহেরুর পুত্র স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
বিপিন পাল ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২০ মে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখাবার জন্যে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু একসময় হবিগঞ্জের পৈল গ্রাম সফর করেন। বিপিন পাল ছিলেন তার মা বাবার একমাত্র ছেলে। ছাত্রবেলায় তিনি কলকাতায় ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে তার বাবা তার উপর ক্ষেপে যান। তাকে ত্যজ্যপুত্র ঘোষণা করে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। তার বাবা রামচন্দ্র পাল সিলেটের কোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। বিপিন পাল তার আত্মজীবনীতে সেই সময়ের আইনজীবীদের আদালতে যাবার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। আজকের সময়ে সেই দৃশ্যটি কল্পনাই করা যায় না। তিনি লিখেছিলেনÑ‘১৮৬৫/৬৬ সালে ব্রিটিশ রাজ কর্মচারীদের মধ্যে সিলেটে একমাত্র জেলা জজেরই একটি ঘোড়ায় টানা গাড়ি ছিলো। ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য রাজকর্মচারীগণ ছোট ঘোড়ায় চড়ে অফিসে যাতায়াত করতেন তাদের পদ মর্যাদা রক্ষার জন্য। বাঙ্গালী ভদ্রলোকদের মধ্যে একজনের একটি চার চাকার গাড়ি ছিল এবং ওই আইন ব্যবসার পেশা ছাড়াও তার ছিল বৃহৎ জমিদারী। পিতার এক সহবৃত্তি বন্ধুর একটি বগী ছিল, সেটি নিজে চালাতেন। বাকী সকল স্থানীয় ভদ্রমহোদয়গণ তাদের কর্মোপলক্ষে পদব্রজে যাতায়াত করতেন। সঙ্গে থাকতো একজন ভৃত্য যে এক বিরাট বাঁশের ছাতা বাবুর মাথায় ধরে থাকত এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মস্ত বোঝা পিঠে নিয়ে চলত। এই ছাতাগুলির ব্যাস চার থেকে ছ’ ফুট, শক্ত লম্বা বাঁশের আগায় বাঁধা। এই রকম রাজছত্রের ছায়ায় হাঁটা, রীতিমত অভিজাত ব্যাপার ছিলো সেকালে।’ রামচন্দ্র পাল মারা যাবার আগে তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের পৈল-এ ছেলে বিপিন পালের উপস্থিতিতে তার উইল পরিবর্তন করেছিলেন। পৈল গ্রামে বিপিন পালের বাড়ির পুকুরের পাকা ঘাট ছাড়া বাবার বাড়িটির আর কিছুই এখন নেই।(সিলেট প্রেসক্লাব ফেলোশিপ প্রবন

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • খেলাফত বিল্ডিং : ইতিহাসের জ্যোতির্ময় অধ্যায়
  • এক ডিমের মসজিদ
  • মুক্তিযুদ্ধে জামালপুরের কিছু ঘটনা
  • খাদিমনগরে বুনো পরিবেশে একটি দিন
  • ফিরে দেখা ৭ নভেম্বর
  • শ্রীরামসি গণহত্যা
  • প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহ্যের ধারক মৃৎশিল্প
  • বিপ্লবী লীলা নাগ ও সিলেটের কয়েকজন সম্পাদিকা
  • গ্রামের নাম আনোয়ারপুর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • Developed by: Sparkle IT