ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৮-২০১৮ ইং ০০:৫১:০২ | সংবাদটি ১৯৮ বার পঠিত


ভয়াবহ ১৯৭১। স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়-হয়। পাকিস্তান আক্রমন করেছে ভারত। প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে পশ্চিম ফ্রন্টে। এদিকে মুক্তি ও মিত্র বাহিনী মিলে গঠন করেছে যৌথ কম্যান্ড। যুদ্ধ চলছে ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে। চারদিক থেকে পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য বাহিনীকে বিতাড়িত করে নিয়ে আসছে ঢাকার দিকে। প্রতিটি ফ্রন্টে মার খাচ্ছে পাকিস্তানিরা। বেঘোরে মারা যাচ্ছে অগণিত পাকি সেনা। অন্যরা পালিয়ে পালিয়ে ছুটছে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার দিকে। জেনে গেছে ওরাÑপরাজয় নিশ্চিত। টের পেয়েছে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পদলেহী দালাল জামায়াতে ইসলামিও। তাই জাতিকে পঙ্গু করে দেবার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে জামায়াত এবং তাদের সশস্ত্র সংগঠন আল বদর। ওরা প্রণয়ন করে বুদ্ধিজীবি হত্যার নীল নকশা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল রাজনৈতিক, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা, আইনজীবি, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রসরমান ব্যক্তিদের হত্যা করতে থাকে তালিকা ধরে ধরে। বাংলা মায়ের সন্তান হয়েও ওরা হত্যা করছিল বাঙালিদের, বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। হত্যা করে চলেছে বাঙালি ছাত্র-যুবক, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক-সমর্থকদের। এরই ধারাবাহিকতায় বদর বাহিনী নামে টিকাটুলিতে। থাবা বিস্তার করে ওদের সেখানেও।
বাংলার পূর্বাকাশে স্পষ্ট তখন রক্তিম আভা। মাত্র ৬টি ভোর অতিক্রম করলেইতো ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের সর্বাধিক মর্যাদার মুহূর্ত। হাজার বছর ধরে জাতি অপেক্ষমান যে ক্ষনটির তরে। কিন্তু তা আর হয়নি। ১০ ডিসেম্বর দিন অন্তে পৃথিবীর ঐ অংশে নেমেছে আঁধার। সে আঁধারও কেটে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে। উঠবে সূর্য। কাঁটবে অন্ধকার। এর আগেই পুরনো ঢাকার টিকাটুলিতে নামে সশস্ত্র আল বদরের দল। নামে কি ওরা বাস করতো সেখানেই। সেখানকার ২ নম্বর কে এম দাস লেনের বাড়িটি দখল করে প্রতিষ্ঠা করেছিল ওরা ক্যাম্প। বাড়ির মালিক ডাঃ নন্দী তখন অবস্থান করছিলেন ভারতে। আর বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা লোকদের তাড়িয়ে দিয়ে দখল নিয়েছে ওরা। এরপর থেকে দুই নম্বর বাড়িটি আল বদর ক্যাম্প। রাত্রিযাপনও করে ওরা সে বাড়িতে। ২৭ নম্বর বাড়ি শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের ছেলে এ. কে. ফয়জুল হকের। স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকায় তিনি অবতীর্ণ। আল বদর বাহিনীর সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। আর, কে. এম. দাস লেনের তিন নম্বর বাড়ির দরজায় পড়লো আল বদরের ঠোকা। পাশাপাশি বাড়ি। প্রতিদিন দেখছে একে অন্যের মুখ। হয়তো জানে ওরা আশে পাশের প্রতিটি বাড়ি-ঘরের খোঁজ-খবর। আর ৩ নম্বর কে. এম. দাস লেনের বাড়িটি বিশেষ বিশেষ কারণে সবারই পরিচিত। দোহারের হাতুরপাড়া গ্রামের চৌধুরীদের বাড়ি। কেউ বলতো ‘চৌধুরী বাড়ি’, কেউ বা বলতো ‘লাল বাড়ি’। লাল রংয়ের বাড়ি বলেই হয়তো এমন করে বলতো লোকজন। বাড়ির ছেলে মেয়ে প্রত্যেকেই ব্রিলিয়েন্ট শিক্ষার্থী। ক্রীড়া সংস্কৃতি চর্চা সহ নানা ক্ষেত্রে তারা সেরাদেরও সেরা। চৌধুরীদের এই লাল বাড়ির এক সন্তান তখন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কমান্ডার। প্রথমে কমান্ড করছিলেন সালমা সাব-সেক্টর। পরে দায়িত্ব নিয়েছেন কে. ফোর্স নামক ব্রিগেডের। নাম তাঁর মেজর আব্দুস সালেক চৌধুরী। তার বড় ভাই আব্দুল মজিদ চৌধুরী ব্রিটেনে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিরাট কর্মযজ্ঞে সম্পৃক্ত। ছোট ভাই আব্দুল মতিন চৌধুরীও মুক্তিযুদ্ধ করছেন ৬ নম্বর সেক্টরে। সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই আব্দুল মালিক চৌধুরীও যুদ্ধের পক্ষে যথাসাধ্য কাজ করেছেন এই বাড়িতে অবস্থান করে করেই। আব্দুল খালেক চৌধুরী সাদেক ভাইদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ। ভাই আব্দুস সালেক চৌধুরী সেনানিবাস থেকে কৌশলে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাবার পর পাকিস্তানি সৈন্যরা বাড়ি সার্চ করতে আসে। সে সময় আব্দুল মতিন চৌধুরী ও আব্দুল খালেক চৌধুরীকে আটক করেছিল বাড়ি থেকেই। মেজর সালেকের খোঁজ বের করার তরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এই দু’ভাইকে। মানসিক নির্যাতন ও চালিয়েছিলো। কিন্তু প্রাণ রক্ষা হয়েছিলো তাদের। হত্যা করেনি পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যরাও। আর, সেই চৌধুরী বাড়িতেই সর্বশেষ পদার্পণ করে আল বদর নামক জামায়াতের আধা সামরিক বাহিনী। নক করে কয়েকবার ঘরে। তারপরই লাথি দিতে থাকে চৌধুরী বাড়ির দরজায়। ঘুম ভেঙে যায় বাড়িশুদ্ধ লোক জনের। ঘুম ভেঙেছে আবদুল খালেক চৌধুরী সাদেকেরও। হুড়মুড় করে সবাই ছুটে আসেন দরজায়। ততোক্ষণে ঢুকে পড়েছে বসার ঘরে। জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে সবাইকে। ভোর রাতে ভদ্রলোকের বাড়িতে ঢুকে পড়া, দরজায় লাথি দেয়া, বাড়ির লোকজনদের নানা প্রশ্নে জর্জরিত করাতো ভদ্র সমাজে কল্পনাও করা যায় না। না, ওদেরকে ভদ্রতার কোনো সংজ্ঞাতেই ফেলা যায় না। প্রত্যেকেরই নাম জানতে চাচ্ছে সর্বাগ্নে। আব্দুল খালেক চৌধুরীকেও জিজ্ঞেস করে একই প্রশ্ন। উত্তরে বললেন তিনি, ‘আব্দুল খালেক চৌধুরী’। আব্দুল খালিক চৌধুরী (ব্যঙ্গাত্ব সুরে)। তা হলে সাদেক, কে? প্রশ্ন করলো তাকে আবার। উত্তরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি’। এবার পড়ে যান তিনি কঠিন জেরার মুখে। বললো, ‘তোমার নাম সাদেক। তা হলে আব্দুল খালেক চৌধুরী বললে কেন? সাদেকতো আমার পারিবারিক ডাক নাম। কেউ প্রশ্ন করলেতো ভালো নাম বলতে হয়। এটাই প্রচলিত নিয়ম। কিন্তু তাদের কাছে যুক্তির কোনো স্থান নেই। ওরা যুক্তির ধার ধারে না। এসব কথা শুনতেও চায় না। বললো আব্দুল খালেক চৌধুরী মিথ্যা কথা বলেছেন। অতএব তাদের সঙ্গে যেতে হবে তাকে এবং মিথ্যা বলার কারণও ব্যাখ্যা করতে হবে। কোথায় যাবেন, কার কাছে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবেÑএ সব প্রশ্নের কোনো উত্তর আল বদররা দিতে বাধ্য নয়। ওরা কারোর কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেবে না। পাকড়াও করে তাকে। চলছে তাকে নিয়ে টানা হেচড়া।
শয্যা ছেড়ে উঠতে যাদের একটু দেরি হয়েছিলো তারাও সবাই চলে এসেছেন। যেন সমস্বরে সবাই বলছেন উনার ডাক নাম সাদেক পাড়ার বা বাইরের সবাই জানেন। কিন্তু ভালো নাম আব্দুল খালেক চৌধুরী। এক রত্তি মিথ্যে বলেননি তিনি। কাকুতি মিনতি করছেন। কিন্তু মন গলছে না ওদের। জোর করে নিয়ে যাবে। এ সময় টানাটানি করছে আব্দুল খালেককে নিয়ে। বড় বোন জাহেদা চৌধুরী বুলবুল এগিয়ে আসলেন সামনে। জড়িয়ে ধরলেন ছোট ভাইকে। কোনো ভাবেই তাকে নিয়ে যেতে দেবেন না। আর তখনই বাড়িশুদ্ধ লোকজন প্রত্যক্ষ করলেন আল বদরের ভয়ঙ্কর রূপ। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ধমক দিলো বোনকে। কড়া ভাষায় নির্দেশ দিলো ‘এখনই ছেড়ে দাও। নতুবা গুলি করবো।’ তবু ভাইকে ছাড়ছেন না বোন। ছাড়বেন না নিতে হয় নিয়ে যাক তাকেসহ। কিন্তু ভাইকে একা নিয়ে যেতে দেবেন না। এদিকে আব্দুল খালেক চৌধুরী বুঝে গেছেন আল বদর সদস্যদের মনোভাব। তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবেই এটা নিশ্চিত। আর, এরা পাষন্ড। এদের বুকে দয়া-মায়ার অবশিষ্টটুকুও নেই। এরা পারে না এমন কোন অপরাধ কর্মও নেই জগতে। বোনের বুকে বুলেট বিদ্ধ করতেও হাত কাপবে না। হত্যা করতে পারে যাকে-তাকে যে কোনো অবস্থায়। তাই ত্বরিৎ’ ছাড়িয়ে নিলেন নিজেকে তার বন্ধন থেকে। তাকালেন শেষবারের মতো বোনের মুখপানে। বললেন, ‘ছেড়ে দাও আমাকে। কোনো লাভ হবে না জড়িয়ে ধরে। কারণ, আমাকে নিয়ে যাবার জন্যেই এসেছে ওরা। সুতরাং ওদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না।
আল বদররা টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে আব্দুল খালেক চৌধুরীকে। পিছে পিছে আহাজারি করে করে ছুটছেন ভাই বোনেরা। গিয়েছিলেন গলির শেষ মাথা অবধি। সেখানে বদর বাহিনীর গাড়ি। তাতে তুলে নিলো আব্দুল খালেককে। তারপর চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলো গাড়িখানা। কি করবেন ভাই-বোনেরা কিছুই বুঝতে পারছেন না। ততোক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। জাহেদা চৌধুরী ছুটে চলেন ২৭ নম্বর বাড়িতে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে করে ডাকলেন এ. কে. ফয়জুল হককে। আব্দুল খালেকদের দুই নম্বর ভাই আব্দুল মজিদের সহপাঠী ছিলেন ফয়জুল হক। লাল বাড়ির চৌধুরীদের সঙ্গে আত্মীয় সম্পর্ক। জাহেদা চৌধুরী নিজেই বলেন তার সম্পর্কে ‘আমার দুই নম্বর ভাই আব্দুল খালিক চৌধুরীর সহপাঠী হিসেবে সব সময়ই আসতো আমাদের বাড়িতে। আমিও ছোট ভাইয়ের মতো আদর করতাম। সে সময় তার কতো আব্দার ছিলো আমার কাছে। অসহযোগ আন্দোলনকালে সে-ও সম্পৃক্ত ছিলো। আমাদের বাড়িতে সারাদিন বসে বসে গান শুনতো। এইতো সেই ফয়জুল হক যে আপা বলতে ছিলো অজ্ঞান। আর আমি যখন আমার ভাইয়ের জীবন রক্ষার দাবি নিয়ে তার সামনে দাড়ালাম ফয়জুল হক তখন নির্বিকার। বললাম আমার ভাই সাদেককে বদর সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। তুমি ওকে ছাড়িয়ে দাও ভাই। এভাবে কাকুতি মিনতি করছিলেন জাহেদা চৌধুরী। আর, ফয়জুল হক তখন শান্তনা দিয়ে বলেন, ‘আপা ওকে ফিজিক্যাল ট্রেনিং স্কুলে নিয়েছে। কালই ছেড়ে দেবে। কোনো চিন্তা করো না। আমি আছি না।’ মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বিদায় দিলেন জাহেদা চৌধুরীকে।
আব্দুল খালেক চৌধুরী ফিরে আসেননি আর কখনো। ফয়জুল হক যা বলেছিলেন তা কি সঠিক ছিলো। তাকে কি ফিজিক্যাল ট্রেনিং স্কুলেই নেয়া হয়েছিল। তা-ই যদি হয়ে থাকে তার কথামতো পরের দিন ফিরে আসেননি কেন? তখনতো আশ্বস্থ করে বলেছিলেন ‘আমি আছি না।’ তিনিতো ছিলেন। তা হলে কি করেছেন? আব্দুল খালেক চৌধুরী ফিরে না আসাতে জানা গেলো না কি প্রশ্ন তাকে করা হয়েছিলো। সে দিন ছিলো ১০ ডিসেম্বর। তারপর এগারো, বারো, তেরো, চৌদ্দ, পনের হয়ে আসলো ১৬ ডিসেম্বর। স্বাধীনতা পেলো বাংলা নামক ভূ-খন্ড। উল্লাসে ফেটে পড়েছে দেশ। কিন্তু কান্নার রোল উঠেছে টিকাটুলির লাল বাড়ি অর্থাৎ ৩ নম্বর কে এম. দাস লেনের চৌধুরী বাড়িতে। এই প্রথম আসলেন ২৭ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা চৌধুরী বাড়ির সুহৃদ এ. কে. ফয়জুল হক। নিজে থেকেই বলতে থাকেন, ‘আপা সাদেকের কোনো সংবাদ পেয়েছেন? সংবাদতো তিনিই এনে দেবার কথা। বলছিলেন তো ‘আমি আছি না।’ হ্যাঁ, তিনি ছিলেন। কিন্তু কোনো সংবাদ এনে দেননি। আজো তার কাছে নেই কোনো সংবাদ। বললেন, ‘গতকাল অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত জীবিত ছিল সে। এরপর কখন কি হয়েছে বলতে পারবো না।
সাদেক আসেননি। সাদেক আসবেন না। জামায়াতের সশস্ত্র গ্রুপ আল বদর যাদের তুলে নিয়েছিল তাদের কেউ-ই ফিরে আসেননি কখনো। তারা আসবে না কেউ কোনো দিন। সে কথা জানেন সবাই। কিন্তু আব্দুল খালেক চৌধুরী সাদেককে কখন, কোথায় হত্যা করেছে তা ও জানা যায়নি। কোথায় ফেলেছে প্রাণহীন দেহ, কি হয়েছে লাশের এ সব কোনো তথ্যই জানেনা পরিবারের সদস্যরা। শুধু জানেন আল বদর সদস্যরা তুলে নিয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের কোনো বিচার হয়নি-হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। যিনি জানতেন আল বদর সদস্যরা পরিচিতি সেই এ. কে. ফয়জুল হক তো মুখ খোলেন নি কখনো। পরে এক সময় যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামী লীগে। সে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন সাংসদ। তারপর মন্ত্রী। এ সবও দেখতে হয়েছে শহীদ আব্দুল খালেক চৌধুরী সাদেকের পরিবারকে।
পাকিস্তানি সেনা বাহিনী আটক করেছিল আব্দুল খালেক চৌধুরী এবং তার ভাই মেজর আব্দুল মতিন চৌধুরী ফেরদৌসকে। জিজ্ঞাসাবাদ করেই ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাংলার কুলাঙ্গার জামায়াতিদের সংগঠন আল বদরের হাতে থেকে রক্ষা পেলেন না তিনি। এমন কি লাশ ও গুম করে দেয়। জামায়াতের এই নিষ্ঠুরতার তুলনা কি আছে কোথাও? অফিস থেকে তুলে নিয়েছিল পরিবারের সব বড় ছেলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক চৌধুরীকে। নিয়েছিল চোখ বেঁধেÑপাকি সেনাদের গাড়িতে করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়েও দিয়েছে। কিন্তু বদর সদস্যরা ছাড়েনি সাদেককে।
এ. কে. ফয়জুল হক আওয়ামী লীগ করতেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নৌকা প্রতীকধারী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনও করেছেন। তিনি জাতীয় পরিষদের ৬৫ নম্বর আসন, বাকেরগঞ্জ ৮ থেকে প্রার্থী হন। জয়ও পেয়েছিলেন। নির্বাচিত হলেন এম. এন. এ. বা জাতীয় পরিষদ সদস্য। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ এবং এর নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনই বাতিল করে দেন। বঙ্গবন্ধু তখন আহবান করেন অসহযোগ আন্দোলন। তখনও বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এ. কে. ফয়জুল হক। অসহযোগ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেছেন সক্রিয়ভাবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাতে অংশ নেননি তিনি। বরং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আল বদর, রাজাকার বাহিনীর সঙ্গেও ছিল সখ্যতা। জানতেন ওদের ভেতরের বাইরের সব সংবাদ। আর ওদের পক্ষেই যদি কাজ করে থাকবেন তা হলে আওয়ামী লীগের এম. এন. এ হয়ে দেশের ভেতরে খোদ রাজধানীতে কেমন করে বাস করলেন নিরাপদে?
অবাক হবার মতোই ঘটনা। আওয়ামী লীগের এম. এন. এ. হলেও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন ফয়জুল হক। আরো বেশি অবাক করেছেন তিনি এবং আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য সেদিন তার এম. এন. এ. পদ হারাতে হয়নি। ১৯৯৬ সালেও তিনি আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী পরিষদেও ঠাঁই করে নেন। ঘটনাটি সুকান্তের চেয়েও বেশি অবাক করেছে জাতিকে। এ রকম হয়তো আরো বহু ফয়জুল হক বিদ্যমান রয়েছেন আওয়ামী লীগের ভেতরে। তা না হলে আব্দুল খালেক চৌধুরী ওরফে সাদেকদের হত্যাকারীদের বিচার হয় না। কেন প্রকাশ হয় না হত্যাকারীদের নাম পরিচয়। কি বিচিত্র এই দেশ, আর কি বিচিত্র এই দেশের ফয়জুল হকরা।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বিবি রহিমার মাজার
  • তিন সন্তানের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বীকৃতি
  • হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর ও দীঘি
  • শিক্ষা বিস্তারে গহরপুরের ছমিরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • বিলুপ্তির পথে সার্কাস
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ
  • বাংলাদেশের লোকশিল্প
  • উৎলারপাড়ের পোড়া পাহাড় আর বুদ বুদ কূপ
  • চেলা নদী ও খাসিয়ামারা মোহনা
  • সিলেটে মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য সাময়িকী
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • Developed by: Sparkle IT