উপ সম্পাদকীয়

সড়ক সন্ত্রাস প্রসঙ্গ

মোঃ রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৮ ইং ০১:৩৮:৪০ | সংবাদটি ৩১ বার পঠিত

আমাদের দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বিভিন্ন স্থানে ১৫/২০ এমন কি ৪০/৫০ জন পর্যন্ত মানুষ মারা যাচ্ছে। এমন কোন দিন নেই যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত না হয়। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এত প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, এটাকে আর সড়ক দুর্ঘটনা না বলে সড়ক সন্ত্রাসই বলা যুক্তিযুক্ত। সড়ক পথে যাত্রীদের জান-মালের কোন নিরাপত্তা নেই। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো আজ মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিবহন শ্রমিক নামধারী ড্রাইভার ও হেলপার সড়কপথে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তারা কোন প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গাড়ি চালাচ্ছে আর অহরহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ড্রাইভার ও হেলপারদের অসতর্কতা বা খামখেয়ালীর কারণেই ঘটে থাকে। ড্রাইভার ও হেলপার সড়কে প্রায়ই নৌকা দৌড়ের ন্যায় প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালায়। পিছনের গাড়ি সামনের গাড়িকে ওভারটেক করে চলে যেতে চায়, আবার সামনের গাড়ি পিছনের গাড়িকে পাস দিতে চায় না। এ ধরণের অসৎ ও বেআইনী প্রতিযোগিতার কারণে কখনো গাড়ি রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে, আবার কখনো বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির সাথে মুখোমুখী সংঘর্ষ বাঁধে। যার ফলে বহু লোক হতাহত হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই ড্রাইভার ও হেলপার পালিয়ে যায়।
অপরদিকে প্রশিক্ষণ বিহীন এবং লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভারদের গাড়ি চালানোর কারণেও অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ ছাড়াও ফিটনেস বিহীন গাড়ি এবং গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বহন করাও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। যন্ত্রদানব ট্রাকতো আরো মারাত্মক-ট্রাকের ড্রাইভাররা বেপরোয়া ট্রাক চালিয়ে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিচ্ছে এবং পথচারীদের চাপা দিয়ে মারছে। যার ফলে সড়ক পথে ঝরছে তাজা রক্ত, মরছে মানুষ এবং বাড়ছে লাশের মিছিল। কিন্তু সড়কপথে বিরাজমান এসব অনিয়ম এবং অপকর্ম দূর করার জন্য সরকারের কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই। সরকারের বি.আর.টি.এ এবং ট্রাফিক পুলিশ ড্রাইভার ও হেলপারদের নানা অপকর্ম করার সুযোগ দিচ্ছে। বি.আর.টি.এ অসাধু কর্মকর্তা ও ভূয়া লাইসেন্স দিচ্ছে। এসব ভূয়া লাইসেন্স দিয়ে আনাড়ী এবং অদক্ষ ড্রাইভাররা বিনা প্রশিক্ষণে গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু সরকার যদি সড়কপথে বিরাজমান এসব অনিয়ম দূর করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা এতটা প্রকট আকার ধারণ করত না।
এতক্ষণ তো সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা হলো-এখন ড্রাইভার ও হেলপার কিভাবে ইচ্ছা করে মানুষ হত্যা করছে, এ ব্যাপারে আলোচনা করা হচ্ছে। আমাদের দেশে ড্রাইভার ও হেলপারদের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় তারা ইচ্ছা করে মানুষ হত্যা করছে। তারা এখন আর মানুষ মারতে মোটেই ভয় পায় না। যে কারণে দেখা যায় সড়ক-মহাসড়কগুলোতে বাস, ট্রাক, কার্গো ইত্যাদির ড্রাইভাররা প্রায়ই ছোট ছোট গাড়ী যেমন-লেগুনা, ফোরস্ট্রোক, হোন্ডা ইত্যাদিকে পিছনের দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে এসব ছোট গাড়ীর যাত্রীদের হত্যা করে। কঠোর আইনের বিধান থাকলে বড় গাড়ীর ড্রাইভার ও হেলপাররা বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে ছোট গাড়ীর যাত্রীদের হত্যা করত না। তারা আইন মেনে গাড়ী চালাতে বাধ্য হত। অনেক সময় দেখা যায় বাস ও ট্রাকের ড্রাইভার ও হেলপাররা পথচারী অথবা, রাস্তার পাশে দাড়ানো লোকদের ইচ্ছা করেই গাড়ী চাপা দিয়ে হত্যা করে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ড্রাইভার ও হেলপাররা প্রতিযোগিতা করে গাড়ী চালিয়ে প্রায়ই পথচারীদের চাপা দিয়ে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, বর্তমানে আমাদের দেশের ড্রাইভার ও হেলপাররা যেভাবে বেপরোয়া গাড়ী চালিয়ে এবং গাড়ী চাপা দিয়ে মানুষ মারছে, এটাকে কোনভাবেই দুর্ঘটনা বলা যাবে না বরং এটাকে মানুষ হত্যা বলতে হবে।
আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত সড়ক সন্ত্রাসের কারণে বহু মা-বাবা সন্তানহারা হচ্ছে, আবার বহু সন্তান পিতা-মাতা হারা হচ্ছে, আবার কখনো সড়ক দুর্ঘটনায় গোটা পরিবার নিহত হচ্ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে গত ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে। ঐ দিন দুপুর সাড়ে বার ঘটিকায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কের বাম পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। এমন সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চালক শিক্ষার্থীদের উপর বাস উঠিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলে দুই শিক্ষার্থী মারা যায় এবং ১২ জন আহত হয়। কী হৃদয় বিদারক ঘটনা। কোন মানুষ এ ধরনের নিষ্ঠুর কাজ করতে পারে না। যে সব ড্রাইভার ও হেলপার এভাবে ইচ্ছা করে মানুষ খুন করবে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির বিধান রেখে অবিলম্বে আইন প্রণয়ন করতে হবে সড়ক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সারাদেশের ছাত্রসমাজ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তারা জাবালে নূর পরিবহনের ঘাতক ড্রাইভার ও হেলপারের ফাঁসি দাবী করছে। সাথে সাথে তারা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ড্রাইভার ও হেলপারদের ফাঁসির বিধান রেখে সড়ক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করার জন্য নয় দফা দাবী সরকারের নিকট পেশ করেছে। ছাত্রদের দাবীগুলো সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
ছাত্রদের এই আন্দোলন এবং ন্যায্য দাবীর সাথে দেশের সর্বস্তরের জনগণ আজ ঐক্যমত্য। তাই সরকারের উচিত অবিলম্বে ছাত্রদের ন্যায্য দাবী মেনে নিয়ে সড়ক সন্ত্রাস প্রতিরোধ করা। বর্তমান সরকারের জনৈক মন্ত্রী পরিবহন শ্রমিকদের নেতা। তিনি পরিবহন শ্রমিকদের সমর্থন দিচ্ছেন। সরকার যখন সড়ক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করতে চায়, তখন তিনি এতে বাঁধা দেন। একজন মন্ত্রী হয়ে এবং সরকারী সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তিনি শ্রমিক নেতা হতে পারেন না এবং জনস্বার্থে কোন আইন তৈরী করতে বাধা দিতে পারেন না।
অনেক সময় দেখা যায় যে যখন সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কোন ড্রাইভার অথবা হেলপারকে পুলিশ গ্রেফতার করে তখনই পরিবহন শ্রমিকরা পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়ে দেশে জনদুর্ভোগ এবং নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে। এর ফলে সরকার পরিবহন শ্রমিকদের নিকট নতি স্বীকার করে দোষী ড্রাইভার বা হেলপারকে মুক্তি দিয়ে দেন। পরিবহন শ্রমিকদের এহেন অন্যায় আবদারের নিকট সরকারের নতি স্বীকার শুধু দুঃখজনকই নয় বরং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতিও হুমকী স্বরূপ। কারণ সরকার হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই সরকার যদি কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অন্যায় আবদারের নিকট নতি স্বীকার করে তখন সরকারের সার্বভৌম ক্ষমতা ক্ষুন্ন হবে এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত হচ্ছে কঠোর আইন প্রয়োগ করে যে কোন মূল্যে পরিবহন ধর্মঘট বন্ধ করা এবং জনদুর্ভোগ দূর করা। কাজেই সরকারের উচিত কঠোর আইন প্রণয়ন করে সড়ক পথে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সড়ক সন্ত্রাস বন্ধ করা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT