উপ সম্পাদকীয়

কালের গভীরে অমূল্য জীবন

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৮ ইং ০১:৪১:৩০ | সংবাদটি ৪৮ বার পঠিত

জীবন কী? কেন জীবন পেলাম এই পৃথিবীতে? কেনইবা জন্ম হলো আমার? প্রশ্নটা শুধু আপনার বা আমার নয়, এটা জগতের সবারই প্রশ্ন। জীবনে কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়, যেমন সৈয়দ হাদা মিয়া ও সৈয়দ মাদা মিয়া দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনটা দিয়ে দিয়েছেন ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই এ আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেটেই। কিন্তু এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তাঁদের নাম আজ ইতিহাসে উপেক্ষিত। তাঁদের জীবন দানকে মোটেই সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
বর্তমান সমাজে দেখা যায়, স্বার্থের জন্য অনেকেই নানা তাল বাহানা করেন আবার স্বার্থ উদ্ধার হলে কেটে পড়েন। এটা আমাদের বর্তমান সমাজের বড় বৈশিষ্ট্য। এটা কিন্তু আমাদের সবার জীবনে দৈনন্দিনভাবে ঘটে চলছে। কে কার চেয়ে আগে যাবে, কে কাকে বেশি ঠকাবে- এটাই বেশীরভাগ মানুষের চরিত্র আর এটাকেই যেন সবাই জীবন বলে ধরে নিয়েছেন, অবশ্যই ব্যতিক্রম যে নেই তা বলছি না। কিন্তু সেই ব্যক্তিরা বেশিদিন এভাবে থাকতে পারেন না। একদিন নিজের ভুল নিজেই স্বীকার করে নেন। আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এবং প্রেমের তাগিদে কাজ করেন, ফলাফলের জন্য মোঠেই মাথা ঘামান না, সেই ব্যক্তিই জীবনের ওপর নির্ভর করে সমাজে অপরিসীম ও অকপটতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। হয়তো ষোল আনা নিঃস্বার্থ হতে পারেননি, তবুও তা হওয়ার পথে অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছেন। যদি তিনি ষোল আনা নিঃস্বার্থপর হন, তবে তিনি অবশ্যই বিরাট সাফল্য লাভ করতে পারতেন। এই ভূ-পৃষ্ঠে আমরা কী নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি আর কী নিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব? শুধু আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন হয়ে আসবে।
আল্লাহ আমাদের এই ভূ-পৃষ্ঠে জীবন দান করেছেন ঠিকই। কিন্তু আমরা এখানে কী করছি- অন্যকে ঠকাচ্ছি, কুপরামর্শ দিচ্ছি, কত রকম অপকর্ম করছি আরও বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন করছি অন্যদেরকে। আমরা অন্যকে ঠকিয়ে কখনও মহান ব্যক্তি হতে পারব না, শুধু এই সমাজে সমস্যা সৃষ্টি করছি। একজনের প্রতি আরেকজনের মনোভাবকে প্রতিফলিত করছি আর চলছে বর্তমান সমাজের কুটনৈতিক ধারণা এবং সমাজকে আরও বিঘিœত করে নতুন প্রজন্মকে নষ্টের দিকে ঠেলে দেওয়া ।
আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে চিন্তা- আমাদের ভিতরের চালিকাশক্তিকে জাগ্রত করতে হলে চিন্তারোগকে আগে সরাতে হবে। আমরা কঠিন কোনও কাজ করতে যাই না কেন, সবার আগে আমরা চিন্তায় পড়ে যাই, যে কাজটি করছি তাতে সফল হতে পারব কিনা, তা নিয়ে জীবনে অনেক সংশয় জেগে উঠে। জীবনে সবসময় শ্রেষ্ঠতম চিন্তাধারা নিয়ে মন ভর্তি করে রাখা চাই। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সেগুলো মনে মনে ভাবতে হয়। কখনও দুঃস্বপ্ন বা কুকর্র্ম মনে স্থির করা উচিত নয়। কারণ, কুকর্ম মনে প্রশ্রয় দিলে নিজেকে একদিন মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে। ভাল কাজ তথা ভাল চিন্তাধারা সমাজের সামনে তুলে ধরলে জীবনেও সাফল্য আসে এবং আপনার চিন্তাধারায় সমাজের কুকর্মকারী ব্যক্তিদেরও একদিন আপনার জন্য ভাল জীবন গড়ে উঠবে।
সংসারে কিছু চিন্তাধারা আমাদের সফল করেছে। এই সংসারে ভালো মানুষের যেমন স্থান আছে তেমনই খারাপ মানুষেরও স্থান রয়েছে। না হলে সে তো আসতেই পারত না। এখানে আমাদের বিভিন্ন ধরণের ভুল-ভ্রান্তিরও ঠাঁই আছে। জীবনটা পেয়েছি পিছিয়ে যাওয়ার জন্য নয়, সবসময় এগিয়ে যাওয়ার জন্য। জীবনে অনেক ধরনের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যাওয়াটা আমাদের কাজ। সব কাজে যে আমরা সফল হতে পারব তা নয়, তবে সেই কাজের মুখোমুখি হওয়াটা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই কোনও ব্যক্তি এই সংসারে সহজে সফল হননি। সফল হতে গিয়ে একদিন না একদিন বিফল হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাতবার প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে না পেরে বলেছিলেন “হে বিধি, কী লিখিলে আমার কপালে, সাতবার প্রবেশিলুম প্রবেশিকা হলে”। তার পরেও তো তিনি হাল ছেড়ে দেননি।
আমরা জীবনে বিভিন্ন ধরণের ভালবাসা পেয়ে থাকি। প্রথমে মা-বাবার ভালবাসা, প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসা এবং সবশেষে সন্তান-সন্ততির ভালবাসা। এর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ভালবাসা হচ্ছে বাবা-মায়ের ভালবাসা। মা-বাবা জন্ম থেকে শুরু করে নানা রকম দুঃখ কষ্টের মধ্যে লালন-পালন করে সন্তানের জীবনকে সু-পথে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ আমরা অনেকেই সেই ভাল জীবন পেয়েই বাবা-মায়েদের ভুলে যাই, তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই, নতুন করে ঘর বাধি। এটা আজকাল অহরহ ঘটছে আমাদের সমাজে। বিদেশ গেলে তো কথাই নেই। বিশেষ করে ছেলেরা বিদেশ গেলে তাদের অতীত জীবন, তাদের মা-বাবার অবদানকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুলে যান। বেঁচে থাকলে তাদের অবশ্যই একদিন অনুতাপ, অনুশোচনা করতে হবে-দাড়াতে হবে আসামীর কাঠগড়ায় শেষ বিচারের দিন।
এই জীবনটা কে দিয়েছেন, সেই মা-বাবা- জীবনে যদি কিছু করতে হয় তবে তাঁদেরকে সবসময় অনুসরণ করে চলা চাই। তাদের আদর্শকে সামনে রেখে যে কোনও কাজে অগ্রসর হওয়া উচিৎ। মা-বাবা হচ্ছেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা সবচেয়ে মারাত্মক ভালবাসা। সেই ভালবাসা কখনও একদিকে সমাজের কাছে নিজেকে নষ্ট করে দেয়, অপরদিকে নিজেকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়। এই ভালবাসায় মানুষ বিভিন্ন কারণে মারাও যান বহু মানুষ। আর যারা এই ভালবাসায় সফল হয়ে থাকেন, তারা যেন আবার নতুন জীবন পেয়ে যান। যিনি জন্মদাতা তিনি কখনও বলেননি প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসার জন্য নিজের জীবনটা উৎসর্গ করতে, এটা কোনও ধর্মগ্রন্থে আছে বলে আমার জানা নেই। আমাদের এত সুন্দর জীবন খারাপ কাজের জন্য নয়, ভাল কাজের জন্য। আমাদের মহাপুরুষরাও এই ভালবাসার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদেরকে এখনও আমরা অনুসরণ করি। কারণ, তারা এই জীবজগতে মহৎ কাজের ভালবাসায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই জীবন দানের কোনও মূল্য নেই এই সংসারে? কেন আমরা মহান পূণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছি, আমরা কি আত্মহত্যা করার জন্য না ভাল কাজ করার জন্য? আমাদের যুবক-যুবতীদের এখন থেকে সচেতন হতে হবে যে, ভূ-পৃষ্ঠে এসেছি ভাল কাজ করে যাব, সেটাই আমার কল্পনা আর সেটাই আমার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সন্তানের ভালবাসা-সেই ভালবাসা জীবনের অনন্তকালের ভালবাসা এবং নিজে জীবনে যা ভাল-মন্দ কাজ করছেন, সেই ভাল বা মন্দ কাজের ফলাফল নিজেই একদিন পেয়ে যাবেন। আমরা অনেক সময় দেখি ভাল মানুষ হঠাৎ করে মারা যান। আবার, সমাজের কুকর্মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বিভিন্ন রকম কষ্ট করে সন্তানের খারাপ আচার-আচরণ সহ্য করে জীবনকে শেষ পর্যায়ে নিয়ে যান। তাই জীবনে ভাল কাজ করলে ভাল ফল এবং খারাপ কাজের খারাপ ফল থাকবেই।
সময়ই হলো সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। সময় চলে গেলে আর সেই সময় ফিরে আসবে না। তাই সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করলে এর ফলাফল ভাল হবেই। নিজে যে কাজ পছন্দ করেন না, সে কাজে হাত দিবেন না। এতে সময়ও নষ্ট হবে এবং ফলও ভাল হবে না। নিজের কাজ নিজের জীবনে একটি বিশাল অংশ জুড়ে থাকবে এবং সত্যিকারের অর্থেই সন্তুষ্ট হওয়ার একমাত্র উপায়টি হলো, নিজে যা মহান বলে বিশ্বাস করেন তা করা আর মহান কোনও কাজ করার অর্থ হলো, নিজে যা করেন তাকে ভালবাসা। যদি নিজের মনের মতো কাজ খুঁজে না পান, তাকে খুঁজে বের করুন। অন্যকে এমনকি যে আপনাকে পছন্দ করেনা-তারও উপকার করার চেষ্টা করুন, না পারেন চুপ-চাপ থাকুন, অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করবেননা। তাহলেই আপনি নিরাপদে থাকবেন।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT