উপ সম্পাদকীয়

পাহাড় ধ্বস

মো. হিরু মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৮ ইং ০১:৪৩:২১ | সংবাদটি ৪৫ বার পঠিত

বাংলাদেশে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিধসকে আশঙ্কাজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে আমরা যতটা প্রতিরোধ ও প্রশমন করতে পারি ভূমিধসের ক্ষেত্রে তা দেখতে পাই না। বিগত ৫০ বছরে সংঘটিত অধিকাংশ ভূমিধসই পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশে ভূমিধসের ইতিহাস, কারণ ও ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ভূমিধস সংঘটনের ক্ষেত্রে প্রধানত মানুষই দায়ী এবং সেই মানুষই এর দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
২০১৭ সালে সংঘটিত ভূমিধস নিয়ে আমাদের এক চলমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানব বসতি ও অভিগমনের দ্বারা অরক্ষিত পাহাড়সমূহ বৃষ্টিপাতের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধসে পড়ছে। এখানে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে মানববসতি, পাহাড়ের অবস্থানগত দিক, উচ্চতা, ভূমির ঢাল ও বৃষ্টিপাত। বিদ্যমান পাহাড়সমূহের মধ্যে মাঝারি উচ্চতার পাহাড় বেশি ধসে পড়ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ২০১৭ সালের ভূমিধস একটি নতুন বার্তা দিয়েছে আর তা হলো পাহাড়ি এলাকায় বসবাসে অনভ্যস্ত বাঙালিদের হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। কারণ সমতলের জীবনযাত্রা ও পাহাড়ি এলাকার জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে তারা পাহাড়কে তাদের প্রতিবন্ধক ভাবে এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা পাহাড়ে যাচ্ছেতাই করছে।
ভূতাত্ত্বিক গঠনগত দিক থেকে বাংলাদেশে তিন ধরনের পাহাড় রয়েছে-বালু প্রধান, স্যান্ডশেল অলটারকেশনস (বালু ও শক্ত মাটির স্তরবিশিষ্ট) ও কাদা প্রধান পাহাড়। অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড় ধসের সঙ্গে একটি আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। জুন-জুলাই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক সময়। পাললিক শিলা প্রধান এসব পাহাড় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলেই অরক্ষিত হয়ে পড়ে। পাহাড়ি এলাকায় বিগত ৫০ বছরের বৃষ্টিপাত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো নয়। কিন্তু ঋতুভিত্তিক বৃষ্টিপাতের তারতম্য উল্লেখ করার মতো অর্থাত্ কোনো বছর বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত ও অধিক বৃষ্টিবহুল হচ্ছে আবার কোনো বছর বর্ষাকাল নাতিদীর্ঘ ও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ২০১৭ সালের ১০ জুন থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনেই ৯৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পরিমাপ করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ঢাল বরাবর জুম চাষ, পাহাড় কাটা ও বিশেষ করে গাছপালা নিধন করার ফলে বৃষ্টির ফোঁটা সরাসরি পাহাড়ের গায়ে দীর্ঘ সময় আঘাত করার ফলে উপরে বালি ও নিচে শক্ত মাটি প্রধান ও বালি প্রধান পাহাড়গুলো ধসে পড়ে। স্বল্প ও মাঝারি উচ্চতার পাহাড়সমূহ সাধারণত এ ধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠনের হয়ে থাকে এবং এসব পাহাড়েই জনবসতি বেশি গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে পাহাড় ধসের কারণে প্রতি বছর প্রাণহানি, রাস্তাঘাট ও সম্পদের যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এর প্রতিকার ও প্রশমনের জন্য রাষ্ট্রীয় পলিসির পরিবর্তন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। কোনো ঘটনাকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অর্থই হচ্ছে ঐ দুর্যোগের ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা সংকেত প্রচার ও ঐ দুর্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বাধ্যবাধকতা আছে। তারা ভূমিধস হ্রাস ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে কতটুকু সক্ষম তা প্রশ্নের সম্মুখীন। পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ হলো অবৈধ বসতি নির্মাণ ও নির্বিচারে পাহাড় কাটা যা ১৯৯৫ সালে প্রণীত পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাহাড় কাটার কারণে ঐ আইনে সাজা ভোগের নজির নেই বললেই চলে। দুর্বল ভূমি ব্যবস্থাপনা ভূমিধস সংঘটনের সবচেয়ে বড় পরোক্ষ কারণ। পাহাড় ধস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় ভূমি ব্যবস্থাপনা বলা চলে এক অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে। কোনো কোনো পাহাড় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা, কোনোটি আদিবাসী রাজার কিংবা গোত্রপ্রধান, আবার কোনোটি বনবিভাগ এবং কোনোটি স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। পাহাড়ি ভূমি ব্যবস্থাপনার এই অনিয়মের কারণেই পার্বত্য এলাকায় মানুষ যত্রতত্র বসতি গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা পাহাড়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলস্বরূপ ভূমিধস প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ডা. দেওয়ান নূরুল হোসেন চঞ্চল
  • দেশীয় চ্যানেল দর্শক হারাচ্ছে কেন?
  • বিশ্ব বরেণ্যদের রম্য উপাখ্যান
  • আশুরা ও কারবালার চেতনা
  • জলবায়ু পরিবর্তন ও সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী
  • অধ্যাপক ডাক্তার এম.এ রকিব
  • শিশু নির্যাতন ও পাশবিকতা
  • প্রবীণদের প্রতি নবীনদের কর্তব্য
  • রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে আগস্টের শোকাবহ ঘটনাবলী
  • সংযোগ সেতু চাই
  • টিবি গেইট ও বালুচরে ব্যাংকিং সুবিধা চাই
  • হাসান মার্কেট জেল রোডে স্থানান্তর হোক
  • ২৭নং ওয়ার্ডের কিষণপুর-ঘোষপাড়ার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
  • দেশীয় রাবার শিল্প বাঁচান
  • পরিবর্তিত হও : ছকের বাইরে ভাবো
  • শিক্ষা ও চিকিৎসায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
  • কতটা ভালোবাসি দেশ?
  • রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান আন্তর্জাতিক চাপেই সম্ভব
  • শুধু একবার বলুন : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
  • Developed by: Sparkle IT