ধর্ম ও জীবন

কুরবানির তত্ত্বকথা

আলী আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৮-২০১৮ ইং ০১:৫৪:১১ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

সচেতন মানুষ বলতেই একথা স্বীকার করবেন যে, বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমের দেশ। সেই সুবাদে তাদের জন্য ইসলাম ইসলামসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি জানা থাকা অত্যাবশ্যক পর্যায়ের। কিন্তু চাপাকষ্ট বুকে নিয়ে বলতে হচ্ছে বাঙালি মুসলিমগণ অধঃপতনের শেষ পর্যায়ের কাছাকাছি। নিজ ধর্ম ও ধর্ম বিষয়ক তথ্যাদি সম্পর্কে কতোটুকু না-ওয়াকিফ হলে তাদের জন্য পত্রিকার পাতায় কলাম লিখে তাদেরই ধর্মের মৌলিক একটি বিধানের মৌলিক কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হয়।
বর্তমান এই তথ্যপ্রযুক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সময়ে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে কুরবানি। দু’টি পক্ষ থেকে কুরবানি আলোচিত। একপক্ষ বলছেন, কুরবানি বিষয়টা পবিত্র কুরআন ও সহিহ সুন্নাহতে নেই বরং মুসলিমগণ তাদের বাৎসরিক দুই আনন্দের দিনের একটিকে ‘বলিউৎসব’ ভেবে ভ্রমে আছে। জাতির পিতা হযরত ইবরাহিম (আ.) কুরবানি করেছেন তাঁর পুত্র ইসহাককে, ইসমাইলকে না। এ দু’পক্ষের প্রথম পক্ষ কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগকে আমরা অসার প্রমাণ করার চেষ্টা করবো শালীনতার সাথে। দ্বিতীয় পক্ষকে নিয়ে অন্য কোনো সুযোগে আলোচনা করা যাবে। আলোচিত প্রথম বিষয়টিকে আর কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে উদ্ধৃতির মাধ্যমে পরিষ্কার করছি।
কুরবানি কোনো ঠুনকো বিষয় নয় যে, ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। যারা কুরবানিকে ইসলামের শাশ্বত বিধান হিসেবে মেনে নিতে নারাজ তাদের জন্য লক্ষ্যণীয়। কুরবানি ছিলো আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর সময়ে। এ সংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের বয়ান।
আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাহাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তাহারা উভয়ে কুরবানি করিয়াছিল তখন এক জনের কুরবানি কবুল হইল এবং অন্য জনের কবুল হইল না। সে বলিল, ‘আমি তোমাকে হত্যা করিবই। অপর জন বলিল, আল্লাহতো একমাত্র মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন।’ তাছাড়া কুরবানির আরো আলোচনা আমাদের সামনে হাজির করেছে পবিত্র কুরআনের সুরা আনআমের অন্য আয়াত।
ঘোষিত হয়েছেÑ‘বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত তথা কুরবানি ও হজ, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাহার কোনো শরিক নাই এবং আমি ইহারই জন্য আদিষ্ট হইয়াছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সূরা : আনআম, আয়াত : ১৬২-১৬৩)
মুসলিম বলতে যে সুরাটি সবার চেনা ও জানা সেটি হচ্ছে কুরআনের সর্বকনিষ্ট সূরা, সূরাতুল কাউসার, সেখানেও সালাতের সাথে বর্ণিত হয়েছে কুরবানির কথা। ইরশাদ হচ্ছেÑ
‘সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো ও কুরবানি করো।’ (সূরা : কাউসার, আয়াত : ২)
এবার আমরা ইসলামের দ্বিতীয় উৎস সহিহ হাদিসের দিকে মনোনিবেশ করছি। এমন অসংখ্য হাদিস রয়েছে যেগুলোর বর্ণনা আমাদেরকে জানায় যে, কুরবানি কোনো অলীক বা কাল্পনিক কিছু নয়। বরং কুরবানি হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধানতম শিয়ার বা প্রতীকের মধ্যে অন্যতম।
পৃথিবীখ্যাত ও সর্বসমাদৃত হাদিসগ্রন্থ সহিহ আল বুখারি ও সহিহ মুসলিম এর কুরবানি বা ‘নুযুক’ অধ্যায়ে চোখ রাখুন, দেখবেন, রাসুল (সা.) ইদুল আযহার দিন নামায পরবর্তী ভাষণে বলেছেন ‘এই দিনের প্রথম করণীয় হলÑ সালাত আদায় করা এরপর কুরবানি করা। যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের পর কুরবানি করল তার কুরবানি পূর্ণ হলো এবং সে মুসলিমদের পন্থা অনুসরণ করলো।’ (বুখারি-৯৫১, মুসলিম-১৯৬১)
একইভাবে হযরত উম্মু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কুরবানির ইচ্ছুক ব্যক্তি জিলহজের চাঁদ দেখার পর সে যেন তার নখ, চুল না কাটে কুরবানি করার আগ পর্যন্ত।’ (মুসলিম-১৯৭৭)
হযরত আলী (রা.) বলেন, ‘আমাদেরকে রাসুল (সা.) আদেশ করেছেন আমরা যেন কুরবানির পশুর চোখ ও কান ভালো করে দেখে নিই এবং কান-কাঁটা, কান-চেরা বা কানে গোলাকার ছিদ্র করা পশু দ্বারা কুরবানি না করি।’ (মুসনাদু আহমাদ, ১/৮০, ১০৮, ১৪৯)
এতোক্ষণের আলোচনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, কুরবানি কোনো খেলো বিষয় নয় বরং এটি পরম্পরায় বর্ণিত ইসলামের শাশ্বত বিধান। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এই সুন্নাহটি নিষ্ঠার সাথে পালন করার তাওফিক দান করুন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT